| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ড.আজিজুল হাকিম এর জীবনালেখ্য
ড.আজিজুল হাকিম ১৯৪৯ সালের ৪জানুয়ারী চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলা শহরে জন্ম গ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মোল্লা আফতাব উদ্দিন ভারতের নৈহাটির বাসিন্দা ছিলেন। দেশ বিভাগের পর ১৯৪৮ সালে স্বপরিবারে আলমডাঙ্গায় স্থায়ী ভাবে বসবাস শুরু করেন। মোল্লা আফতাব উদ্দিন আলমডাঙ্গা আসার পর ডাক বিভাগে স্বল্প বেতনে ডাকহরকরার চাকুরী গ্রহণ করেন। ব্যক্তি জীববে ড.হাকিম ৩ভাই ও ২বোনের মধ্যে তৃতীয়। বাল্যকালে অত্যন্ত দুঃখ কষ্টের মধ্যে দিন যাপন করেই ১৯৬৬ সালে আলমডাঙ্গা পাইলট মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে ২য় বিভাগে এসএসসি পাস করেন এবং ঐ বছরেই খুলনা ক্রীসেন্ট জুট মিলে চাকুরী গ্রহণ করেন। চাকুরী চলমান অবস্থায় তিনি ১৯৬৭ সালে আজম খান কমার্স কলেজে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন, এবং কঠোর পরিশ্রম করে ১৯৬৯ সালে ৩য় বিভাগে এইচএসসি পাশ করেন,পরবর্তীতে ১৯৭২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ঐ কলেজ থেকে কমার্সে ¯œাতক পাশ করেন। ঐ সময় ৭৯’এর গণ আন্দোলন, পরবর্তীতে দেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং পিতৃবিয়োগ ও পিতার সংসারের দায়িত্ব ভার গ্রহণের জন্য তার লেখাপড়ায় ভাটা পড়ে। এমনকি যুুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশে ক্রীসেন্ট জুট মিল বন্ধ হয়ে গেলে তিনি মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। তবুও তাঁর কর্মময় জীবন থেমে থাকেনি। ১৯৭০ সালে থেকে তিনি খুলনা বিভাগীয় পাবলিক লাইব্রেরীতে চাকুরী প্রাপ্ত হন। সেখানে তিনি ১৯৮৭ সাল পর্যন্ত এককালীন ১৭বছর চাকুরী করেন, চাকুরীরত অবস্থায় তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন ১৯৮৪ সালে ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ২য় শ্রেনীতে ¯œাতকত্তোর ডিগ্রী লাভ করেন। প্রচন্ড ধর্যশীলতা ও নিজের উপরে আস্থাশীল হয়ে ড.হাকিম ক্রমান্বয়ে এগিয়ে চলতেন। একই সাথে তিনি চিটাগং সরকারী পাবলিক লাইব্রেবীতেও অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করেছেন। ব্যবস্থাপনা বিষয়ে ¯œাতকত্তোর ডিগ্রী অর্জন করেন এবং চাকুরীরত অবস্থায় তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৮২ সালে লাইব্রেরী এন্ড ইনফরমেশন সাইন্সে ¯œাতকত্তোর ডিগ্রী লাভ করেন। লেখাপড়ার প্রতি অদম্য আগ্রহ প্রশংসার দাবী রাখে।
ড.হাকিম সব সময় নতুন কিছুর প্রাপ্তি আকাঙ্খা তাঁকে আরও বড় হবার প্রেরণা যুগিয়েছে। ১৯৮৭ সালে বিভাগী সরকারী পাবলিক লাইব্রেরীর চাকুরী ছেড়ে দিয়ে খুলনা পাবলিক কলেজ, বয়রা তে লাইব্রেরী-কাম লেকচারার এর চাকুরী গ্রহণ করেন। এখানে ১৯৯৫সাল পর্যন্ত চাকুরীরত ছিলেন এবং চাকুরী চলমান অবস্থায় কর্তৃপক্ষের অনুমতি সাপেক্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইব্রেরী এন্ড ইনফরমেশন সাইন্সে গবেষণা শুরু করেন এবং ড. মনিরুজ্জামান, সাবেক ভিসি এর অধীন থিসিস করে ১৯৯৬ সালে পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। ড. হাকিম ১৯৭৭ সালে ২৭মে আসমা হাকিম নামের একজন উচ্চ শিক্ষিতা মহিলার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন, ব্যক্তি জীবনে তিনি শাওখিন ফেরদৌস শান্ত ও সুবর্ণা ফেরদৌস কান্তা নামের দুই মেয়ের জনক,স্ত্রী আসমা হাকিম একজন বিদূষি মহিলা। তিনি বাংলা এবং লাইব্রেরী এন্ড ইনফরমেশন সাইন্সে মার্ষ্টাস এবং এম এড ডিগ্রী অর্জন করেছেন। ড. আজিজুল হাকিমের বড় হওয়ার প্রেরণা ছিলো তার স্ত্রী, আসমা হাকিম বর্তমানে খুলনা জেলা শিশু একাডেমীতে চাকুরী রত, তার বড় মেয়ের জামাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে লাইব্রেরী সাইন্সের শিক্ষক, তিনি জাপান সরকারের বৃত্তি নিয়ে বর্তমানে উচ্চতর ডিগ্রী অর্জনের উদ্দেশ্যে টোকিও ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডি করছেন।
ড. হাকিম কর্মজীবনে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে তার পদচারনা এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মেধা ও অভিজ্ঞাতাকে প্রতিষ্ঠানিক রুপ দিতে তিনি সর্বদায় বিচলিত থাকতেন। ১৯৯৫ সালের ২২মার্চ তিনি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী লাইব্রেরীয়ান হিসেবে যোগ দেন, ৫বছর ঐ পদে থেকে ২০০০ সালে তিনি ডেপুটি লাইব্রেরীয়ান হিসেবে পদোন্নতি লাভ করেন। পরবর্তীতে ডেপুটি রেজিষ্ট্রার(অপপধফধসু) ডাইরেক্টর ইনচার্জ (চঁনষরপ জবষধঃরড়হ ধহফ চঁনষরপধঃরড়হ),ডেপুটি রেজিষ্টার(সংস্থাপন) এবং সর্বশেষ তিনি লাইব্রেরীয়ান হিসেবে ঐ বিশ্ববিদ্যালয়েই তার কর্মজীবনের অবসান ঘটে। তবে তিনি থেমে থাকেন নি, তার স্থাপিত জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীন “ইলাম” নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাষ্টার্স এবং ডিপ্লোমা ইন লাইব্রেরী সাইন্স এর উপর লেকচারার হিসেবে তার মেধাকে বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়েছেন। তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি ইলামের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি লাইব্রেরী এক্সপার্ট হিসেবে বাংলাদেশ ইউনিভার্সিট অফ ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি(বুয়েট) এর অনারারী শিক্ষক হিসেবে লাইব্রেরী এন্ড ম্যানেজমেন্ট এর উপর শিক্ষকতা করেছেন। (১৯৭৭-১৯৮০)।
অতিথি লেকচারার হিসেবে লাইব্রেরী এন্ড ইনফরমেশন সাইন্স এর উপর খুলনা বিভাগীয় সরকারী লাইব্রেরী, বাংলাদেশ ইনিসটিটিউট অব লাইব্রেরী এন্ড ইনফরমেশন সাইন্স খুলনা, লাইব্রেরী ডেভোলপমেন্ট ইন ন্যাশনাল ইনসটিটিউট ঢাকা, প্রভৃতি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেছেন।
ড. হাকিম লাইব্রেরী এন্ড ইনফরমেশন সাইন্সকে এতই ভালবেসেছিলেন যে, সারা বাংলাদেশে এই তথ্য প্রযুক্তিকে ছাত্র -শিক্ষকদের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য দেশকে কিছু দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তার প্রকাশনার মধ্যে(০১) বিব্লিও গ্রাফি এন্ড ডকুমেন্টশন (কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে লেভেলের টেক্সবুক), (০২) পাবলিক লাইব্রেরী মুভমেন্ট ইন বাংলাদেশ (০৩) বয়োগ্রাফি এন্ড বিব্লিও গ্রাফি অফ কনভোকেশন স্পিসেস বাই দি ভাইস চ্যাঞ্চেলর অব ঢাকা ইউনিভার্সিটি
(১৯২১-১৯৮৩)। (০৪) লাইব্রেরী এডমিষ্ট্রিশন (০৫) পাবলিক লাইব্রেরীজ ইন বাংলাদেশ, হিসট্রি, প্রবলেম এন্ড প্রোসপেক্টস। (০৬) মডার্ন লাইব্রেরী এন্ড ইনফরমেশন সাইন্স। উক্ত বই গুলো প্রকাশ করে সংশ্লিষ্ট ছাত্র-শিক্ষকদের মাঝে তিনি ব্যপক স্বীকৃতি লাভ করেছিলেন।
তিনি ব্যন্ডক আয়োজিত বিভিন্ন সভা সেমিনারে তার বক্তব্য রাখতেন। তিনি ইউনিভার্সিটি গ্রান্ড কমিশনের লাইব্রেরী এন্ড ডিজিটাল লাইব্রেরী অর্গানাইজিং এন্ড ডেভলপমেন্ট প্রোগামে বিভিন্ন সময়ে অংশ গ্রহণ করে গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞানের উন্নয়নে তার মেধা বিকশিত করেছেন।
ড. হাকিম বাংলাদেশ ন্যাশনাল লাইব্রেরী ঢাকা কর্তৃক আয়োজিত বিভিন্ন সভা সেমিনারে নিয়মিত অংশ গ্রহণ করতেন। লাইব্রেরী এন্ড ইনফরমেশন সাইন্সকে শিক্ষামূখী করার ক্ষেত্রে তার অবদান অপরিহার্য। তিনি খুলনা লাইব্রেরী এসোসিশনের সভাপতি নিযুক্ত হয়েছিলেন। বাংলাদেশ লাইব্রেরী এসোসিয়েশন ঢাকা, এর আজীবন সদস্য ছিলেন এবং ডিজিটাল লাইব্রেরী এন্ড ইনফরমেশন সাইন্স ঢাকা এর সদস্য নিযুক্ত হয়েছিলেন।
ব্যক্তি জীবনে তিনি অত্যন্ত সাধারন জীবন যাপন করতেন, তার সখের মধ্যে ফুটবল খেলা ও বই পড়া অতি প্রিয় ছিলো।
তার রচনা সামগ্রীতে বাংলা ও ইংরেজী ভাষার পান্ডিত্য লক্ষ্য করা গেছে। তিনি জীবনের শেষ প্রান্তে এসে স্থায়ী ভাবে বসবাস করার জন্য খুলনা মুজগুন্নি আবাসিক এলাকা,বয়রা তে একটি দ্বিতল ভবন নির্মাণ করেন। বর্তমানে ঐ বাড়িতে তার স্ত্রী আসমা হাকিম বসবাস করেন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তার পিতার মাতার আবাসস্থল চুয়াডাঙ্গা জেলার আলমডাঙ্গা উপজেলায় মাঝে মাঝে আসতেন এবং স্মৃতি বিজড়িত তার এই চেনা শহরটি প্রাণ ভরে আলিঙ্গন করতেন। এই শহরে তার অগ্রজ ভ্রাত্রিপ্রতিম মেয়র,আলহাজ্ব মীর মহিউদ্দিন ও ইঞ্জিনিয়ার হায়দার সাহেবের প্রতি ছিলো তার প্রচন্ড শ্রদ্ধাবোধ ও ভালবাসা। তাদের সাথে নিয়ে বাবা-মায়ের কবর জিয়ারত করতেন। তিনি মীর মহিউদ্দিন ও হায়দার সাহেবের প্রতিষ্ঠিত আলমডাঙ্গা মহিলা ডিগ্রী কলেজ পরির্দশন করেছেন এবং গ্রন্থাগার ও ইনফরমেশন সাইন্সের উন্নয়নে মূল্যবান বক্তব্য রেখেছেন ও আর্থিক সাহায্য প্রদান করেছেন।
ড.হাকিম অত্যন্ত দানশীল ব্যক্তি ছিলেন। গরীব ও মেধাবী ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য তিনি অনেক আর্থিক সাহায্য করতেন। মুসলমান হিসেবে তার ছিলো খোদাভীতি এবং ইমানী দায়িত্ববোধে তিনি পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতেন। তার সফল জীবনের সকল প্রাপ্তিতে আল্লাহ তালার অবদান হিসেবে মনে করতেন। তার জীবনের একটি বিষয় মেঘমুক্ত আকাশের মত পরিস্কার যে, তিনি লাইব্রেরী ও ইনফরমেশন সাইন্সকে এতই ভালোবেসেছিলেন যে, তার স্ত্রী বাংলা সাহিত্যের ¯œাতক (সম্মান) ও ¯œাতকত্তোর ডিগ্রী ধারী হয়েও পুনরায় স্বামীর প্রেরণায় লাইব্রেরী ও ইনফরমেশন সাইন্সে ¯œাতকত্তোর ডিগ্রী অর্জন করেন ,অপর দিকে তিনি বড় মেয়ের বিয়ে দিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞাণ বিভাগের একজন শিক্ষকের সাথে। বর্তমানে তিনি ঐ বিষয়ে জাপান সরকারের বৃত্তি নিয়ে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন। এতেই প্রমানিত হয় যে,ড.হাকিম লাইব্রেরী ও ইনফরমেশন সাইন্সের একজন সাধক ছিলেন।
লাইব্রেরী ও ইনফরমেশন সাইন্স কে শিক্ষামূখী করার জন্য বর্তমান সরকার মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে সহকারী লাইব্রেরীয়ান নিয়োগ দেওয়ার ক্ষেত্রে যে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন,বাংলাদেশ লাইব্রেরী ও ইনফরমেশন সাইন্স এসোসিয়েশনের পক্ষে তার মতামত জ্ঞাপন অন্যন্য সাহসী ভূমিকা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের ছাত্র-শিক্ষকগণ মনে স্মরনীয় হয়ে থাকবে।
৪অক্টোবর-২০১২ ইং তারিখ এই মহান ব্যক্তিত্ব ও গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞান এই সাধকের মহা প্রয়াণ ঘটে, জাতী একজন মহান ব্যক্তিত্বকে হারালো।
©somewhere in net ltd.