| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
হুমায়রা হারুন
মানুষের শ্রেষ্ঠত্ব শুধু প্রযুক্তিতে নয়, বরং মননের বিনিময়ে। ব্লগে যোগাযোগের মধ্যে সেই শ্রেষ্ঠত্বেরই প্রকাশ ঘটে। আপনি যখন লেখেন, মন্তব্য করেন, কিংবা অন্যের ভাবনা পড়েন — আপনি তখন মানব প্রজাতির মননে অংশ গ্রহন করেন।
শীলা আজ সন্ধ্যায় ছাড়া পেয়েছে হাসপাতাল থেকে। মন্ট্রিয়ল জেনারেল হাসপাতাল। একদিনের রাখে সার্জারির হলে। পরের দিন দেখে ছেড়ে দেয়। বাইরে শীতের রাতের এক হাঁটু বরফ ভেদ করে এখন রাস্তা পার হয়ে কিভাবে শীলা বাড়ি ফিরবে এই ভেবেই সে কাহিল। সার্জারি নিয়ে এই দুর্বল শরীরে এবার তাকে একলা বেরুতে হবে। বরফ ঢাকা পথটুকু পার হতে হবে । প্রচন্ড দুর্বল শরীর নিয়ে যত না কাহিল, একা একা বাড়ি ফেরার চিন্তায় আরও বেশী সে এখন কাহিল। আরেকটু যদি বেশী দিন হাসপাতালে রাখতো ওরা! একটু সুস্থ সবল হয়ে বাড়ি ফিরতে পারতো। ওরা যে একদিনের বেশী রাখে না।
তাও তো বলে কয়ে আরো একদিন বেশী থেকেছে। ছাড়া পেয়েছে এই সন্ধ্যায়।
আজ মার্চের ১৫ তারিখ। ২০০৯. অফিশিয়ালি বসন্তের শুরু। কিন্তু তার মানে তো এই নয় যে আজই সব বরফ গলে রাস্তা পরিষ্কার হয়ে গেছে। কিভাবে পেরুবে এই বড় রাস্তাটা? তারপর তার বাসার সরু পথ? এই শহরে তার কেউ এমন নেই, যাকে বলবে 'আমার পাশে এসে হাতটা একটু ধরো। বলবে, 'আমার হাতটা ধরে এই বরফ ঢাকা পথটা পার করে দাও।'
নার্সরা তার অবস্থা দেখে, আর তার বিবরণ শুনে বারবার জিজ্ঞেস করছে, ‘তুমি একা থাকো? কেউ নেই তোমার? এখান থেকে তুমি একা যেতে পারবে তো? বাড়ি যেতে ধরে নিলাম না হয় তোমার পাঁচ মিনিটের জায়গায় আধা ঘন্টা লাগবে। আমরা কিন্তু আধাঘন্টা পর তোমাকে তোমার বাসায় ফোন দিব।’
তখন শীলার সেল ফোন ছিল না। বাসার ল্যান্ডফোনে-ই যোগাযোগ সারতে হতো। বিদেশে বিভূঁইয়ে তার প্রতি নার্সদের উৎকণ্ঠা দেখে শীলা ভীষণ অবাক হল। তবুও বলতে পারল না যে, বাসার সামনে বরফ জমা সরু পথটা পরিষ্কার করবার কেউ নেই। আজ নিশ্চয়ই বরফ জমে চকচকে স্ফটিকের মত পিচ্ছিল হয়ে আছে।
কিভাবে যাবে তবে?
ওয়ার্ড-এর রোগীদের সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়ে গুডবাই বলে খুব আদর ভরা বিদায় সম্ভাষণকে হৃদয়ে ভরে হাসপাতাল থেকে বের হল । এবার পা রাখল বরফ মাখা রাস্তায়। বড় রাস্তা সাধারণত পরিষ্কার থাকে। কিন্তু যার যার বাসার সামনের রাস্তাটুকু পরিষ্কার করার দায়িত্ব তার তার নিজের। হাসপাতালে আসবার আগের সপ্তাহেও বরফ পরিষ্কার করেছে নিজ হাতে। শীলার বিল্ডিং-এর কেয়ার টেকার কোনভাবেই রাস্তা পরিষ্কারের কাজটা করতে চায় না। তাই বাধ্য হয়ে শীলা কিছু অংশ নিজের ইচ্ছায় পরিস্কার করে রাখতো । কেয়ারটেকার ভদ্রলোক বড্ড অলস, ভীষণ ভাবুক একজন মানুষ। মির্চার দেশের মানুষ তো। রোমানিয়ান। সারাদিন ভাব জগতেই পড়ে থাকে। বিল্ডিংয়ের সামনে বরফ জমলে কি আর না জমলেই কি । যদি গলে আইস হয় তাতেই বা তার কি? সে তো আর আছাড় খাবে না।
এই গত সাত দিন ধরেই না ব্যথায় কাতর। মনে হয়েছে যেন মৃত্যু বেশী দূরে নেই । এখন যে ব্যথাটা হচ্ছে এটা দশগুণ বাড়লেই রাণী -আন্টির মতন তারও জানটা বের হয়ে যাবে। এখন যে জানটা গলার কাছে এসে বসেছে, সে দিব্যি টের পাচ্ছে। রাণী আন্টি চলে গেছেন ৭ দিন হলো। দেশ থেকে সংবাদ এসেছে। এবার কি তারও যাবার পালা। নাহ্ এ ব্যথা নিয়ে থাকা যায় ন। সারা রাত যদি এভাবে জেগেই থাকতে হয় তাহলে কেন না হাসপাতালের মেঝেতে -ই রাত টা কাটাবে শীলা।
তাই দেরি না করে পরদিন সকালে গলির পথ ধরে বের হয়ে বাঁ দিকে তাকালো পেঁপের দোকান বরাবর রাস্তার দিকে। যাবে কি, ব্যথা কমানোর জন্য পেঁপে কিনতে? আবার ডানদিকে তাকিয়ে ভাবলো, নাকি ডানদিকের ঐ হাসপাতালে যাবে চিকিৎসা করাতে? হাসপাতালে এর এগে কখনো যায় নি। তাই একটু ভয়ও কাজ করছিল। তবুও সাহস ভরে শীলার সে দিন প্রথম বারের মতন হাসপাতালে যাওয়া।
২
সন্ধ্যায় ছাড়া পেয়ে শীলা এবার বড় রাস্তা পেরিয়ে নিজের বাড়ির পথে পা বাড়ালো। সরুপথ বেয়ে ২৫ কদম গেলে তার তিনতলা অ্যাপার্ট্মেন্ট বিল্ডিংয়ের এন্ট্রেসের সিঁড়ি। এক পা, দুই পা করে সাব্পধানে পা টিপে টিপে সে আগাচ্ছে । এখনো মনের জোরের আবেশে, সদ্য সার্জারি হওয়ার ঘটনাটা ভুলে থাকতে চাইছে। কারণ তাকে বরফ ঢাকা ‘পুল -সিরাত’ পার হতে হবে। শীতের রাতে এখন বাজে আটটা। চারিদিক শুনশান। কোথাও একটা প্রতিবেশী দৃষ্টির সীমানায় পড়ছে না। থাকলে তাকে ডেকে সে বলবে, ‘আমার হাতটা একটু ধরো।’ কিন্তু বেশ সময় ধরে অপেক্ষা করার পরও কারোর দেখা মিলছে না। কোনরকমে ২৫ কদম ফেলে যেই না এসে দাঁড়িয়েছে সিঁড়ির গোড়ায়, খেয়াল করল পায়ের নিচে স্বচ্ছ স্ফটিকের মত আইস্ -এর বিশাল চাক। ওখানে পা দিয়ে ভর রাখা যাবে না । ভর পেলেই পা পিছলে যাবে। তখন সিঁড়িতে পড়ে চোয়াল ভাঙ্গতে খুব একটা বেশি সময় লাগবে না। স্বচ্ছ বরফের চাকটা সিঁড়ির গোড়া আর রাস্তার ঠিক সংযোগস্থলে এমন একটা ঢাল তৈরি করেছে, যেখানে দাঁড়িয়ে আইস - স্কেইটাররা 'সি -স' খেলার মত দুলে দুলে উপরে উঠে আবার উলটো ভাবে নিচের দিকে পিছলে পড়তে পারবে অনায়াসে । শীলার তো আইস্ - স্কেটিং দুরের কথা , আইস্ কি জিনিস তাই তো সে জীবনে চোখে দেখেনি। আর এই দূর দেশে এসে অসুস্থ শরীর নিয়ে এখন পড়েছে মহা বিপদে।
যখন বাড়ির গলি বরাবর এগোচ্ছিল তখন ওই দূরের মাঠ বরাবর অপর প্রান্তে উপর তলার প্রতিবেশী, ইলিয়াকে গাড়ি করে বাড়ি ফিরতে দেখেছিল। শীলাকে দেখে সে থেমেছিল। ডাকলে আসতো। কিন্তু শীলা তো তখনো জানতো না যে সিঁড়ির কাছে বরফ জমাটবদ্ধ হয়ে কঠিন আইসক্রিম তৈরি হয়ে আছে।
বেশ কিছুক্ষণ কেটে গেছে। শীলা সাহস পায় না কদম ফেলার। প্রায় দশ মিনিট তো হবেই। আজ মনে হয় সারারাত এই সিঁড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে, সকাল না হওয়া অব্দি। তখন যদি কারো দেখা মেলে। এই স্বচ্ছ স্ফটিকের উপরে অন্তত একট কদম রাখার মত সাহস এবং ব্যালেন্স কোনটাই শীলার নেই।
ঠিক তখনই কেন জানি, এসব ভাবতে ভাবতে শরীরটা নিজের আয়ত্তের বাইরে একটু দুলে উঠলো। শীলা ভাবলো মাথা ঘুরছে কেন। নাহ্ তা তো না। এ কি হচ্ছে? শরীরটা দুলতে দুলতে পা দুটো পিছলে পিছলে অনায়াসে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে । কিন্তু পিছলে পড়তে পড়তে পরলো না। বরফের চাকের ঠিক পাশে এসে আপনা আপনি একদম থেমে গেল নিজের চেষ্টা ছাড়াই । কেন এমন হলো? কিভাবে হলো কিছুই বুঝতে পারল না । তাকে পিছন থেকে ধাক্কা দিয়ে এই পথটুকু পার করে দিল কেউ যেন। সে নিজে যে সাহসও করে না তা সে জেনেই তো ঠাঁয় দাঁরানো। সামনের দিকে পা ফেলার একটুও চেষ্টা করেনি । এবং সেটা সে খুব ভালো জানে। তাহলে কি হলো তার সাথে। কদম না তুলেই দুলতে দুলতে নিজের অজান্তে পিছলে পিছিলে আগানো।
কেউ যেন তাকে সামনে ঠেলে দিয়েছে আর বলছে, 'এবার যাও।'
কিন্তু কে আছে তার পিছনে?
চারিদিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। আর কেউ থাকলে, সে তো পেছন দিক থেকে ধাক্কা দেবে না। পাশে এসে হাত ধরবে।
তাও অনুমতি চেয়ে নেবে। অথবা শীলা অনুরোধ করলে তাহলেই হাত বাড়াবে।
শীলা এবার অনায়াসে কদম রাখল সিঁড়ির চওড়া পাকা জায়গাটিতে। এখন সে নিরাপদ। এবার কিছুদূর এগোলেই আরেকটা সিঁড়ি । তারপর মূল বিল্ডিং -এর ভারী কাঁচের দরজা ঠেলে এন্ট্রেন্সে প্রবেশ।
সেখানে কিছুদূর এগুলে পাশে পরে মেইল বক্স। মেইল চেক করতে গিয়ে হঠাৎ করে শীলার কানে এলো এক ভারি কন্ঠ। পেছনে তাকিয়ে দেখে কৃষ্ণ বর্ণের মধ্য বয়সী একজন ভদ্রলোক তাকে বেশ গল্প করার ছলে বলছেন, এই বরফটুকু পার হওয়া এমনকি কঠিন? দেখ কত সহজ!
সাধারণ জুতো পড়া পা দিয়ে দুলে দুলে একবারে 'সি -স' খেলার মত করে ঐ ঢাল অংশ টুকু বেয়ে একবার উপরে উঠছেন আবার পিছলে নামছেন। খুব আনন্দের ছলে তার পারদর্শিতা দেখাচ্ছেন ।
কে ইনি?
উনি কি এতক্ষণ শীলাকে পর্যবেক্ষণ করছিলেন? তার আশ পাশেই ছিলেন? কিন্তু শীলার পাশে তো কেউ ছিল না।
আর তখনই শীলার বুঝতে দেরি হলো না, ইনি তার গার্ডিয়ান অ্যাঞ্জেল। এখন মানুষ রূপে আবির্ভূত হয়েছেন তার সামনে । তাই শীলা তাকে স্বচক্ষে দেখতে পাচ্ছে। একটু ভয়, একটু শিহরণ অনুভূত হচ্ছে। উনি তা বুঝতে পেরে সাথে সাথে পরিবেশ হালকা করার জন্য প্রশ্ন করলেন, ‘বলতো তোমার বিল্ডিংয়ের কেয়ার -টেকারকে কিভাবে পাওয়া যাবে?
শীলা বুঝেছে এটি একটি মামুলি প্রশ্ন। তিনি খুব ভালোই জানেন কে, কোথায় থাকে। কারণ তিনি যে সবকিছু জানেন। তবুও প্রশ্ন করছেন যেন শীলা ভয় না পায়।
শীলা সম্পূর্ণ সজ্ঞানে উত্তর দিল, এই যে সরু রাস্তা দেখছেন, এ বরাবর আরো এগুলে আরেকটা এন্ট্রেন্স পাবেন। সেই দরজা দিয়ে ঢুকলে দোতলায় থাকেন কেয়ারটেকার।
অনেক ধন্যবাদ জানালেন তিনি, তারপর প্রস্থান গ্রহণ করলেন কিন্তু দুষ্টুমি ছলে দেখিয়ে গেলেন এই হিমালয় জয় করার পথটুকু আসলে ভয় পাবার মতন কিছুই না।
৩
শীলা এই প্রথম তার গার্ডিয়ান এঞ্জেল -কে চাক্ষুষ দেখে অবাক হয়েছিল। মধ্যবয়সী কৃষ্ণাঙ্গ লোকটি ৫ ফুট ১১ -এর মতো লম্বা। এরা মানবরূপী হয় মাঝে সাঝেই । বিশেষ করে যখন তাদের দায়িত্বে থাকা মানুষটির সাহায্যের খুব প্রয়োজন হয়। ইনারা হায়ার ডাইমেনশনাল বিং, যারা সর্বদাই মানুষের অভিভাবক হিসাবে নিয়োজিত। আজ শীলার দুঃসময়ে পাশে থেকে তাকে তার পথটুকু পার করে দিয়েছেন। শুধু পথই পার করে দেন নি, তাকে জানান -ও দিয়ে গেছেন যে, তিনি তার আশপাশেই আছেন সব সময়।
২৬/১০/২৬
©somewhere in net ltd.