| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
দেশের পুকুর-দীঘি, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়, নদী-নালা ও জলাশয়ে মাছের সাথে ঝিনুকে মুক্তা চাষ করে প্রতি একরে ৪০ লাখ টাকা অতিরিক্ত আয় করা সম্ভব বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ মাৎস্য গবেষণা ইন¯িটটিউটের (বিএফআরআই) বিজ্ঞানীরা। ইতোমধ্যে তারা ময়মনসিংহের ¯¦াদুপানি কেন্দ্রের পুকুরে ¯¦ল্পসময়ে মিঠাপানির ঝিনুক থেকে মুক্তা উৎপাদনে প্রাথমিক সফল্য অর্জন করেছেন। গবেষণাকালে কৃত্রিম উপায়ে ঝিনুকে পাঁচ মাসে দুই থেকে তিন মিলিমিটার আকারের মুক্তা উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। এর আগে একই সাইজের মুক্তা উৎপাদন করতে সময় লেগেছিল দেড় থেকে দুই বছর। ¯¦ল্পসময়ে ঝিনুকে মুক্তা উৎপাদন প্রযুক্তি মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণের মাধ্যমে বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদিত মুক্তা বিদেশে রফতানি করে প্রতি বছর ১৫০০ কোটি টাকা বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। একই সাথে এতে ২০ থেকে ৩০ লাখ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
আমাদের বঙ্গোপসাগর ছিল প্রাকৃতিক মুক্তার আবাসস্থল। বাংলাদেশের মহেশখালী ছিল ‘পিংক পার্ল’ বা গোলাপি মুক্তার জন্য জগদ্বিখ্যাত। বাংলাদেশে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য পুকুর-দীঘি, খাল-বিল, হাওর-বাঁওড়। এসব জলাশয় মুক্তা বহনকারী ঝিনুকে পরিপূর্ণ। দেশের প্রায় সর্বত্রই মুক্তা বহনকারী ঝিনুক পাওয়া যায়। তবে গুণগত উৎকর্ষস¤পন্ন গোলাপি মুক্তা বৃহত্তর ঢাকা, মু›সীগঞ্জ, ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, কিশোরগঞ্জ, সিলেট, রাজশাহী, বগুড়া, ফরিদপুর, পাবনা, কুমিলল্লা ও চট্টগ্রামে বেশি পাওয়া যায়। প্রাচীনকাল থেকেই দেশের সর্বত্র কম-বেশি মিঠাপানির ঝিনুক থেকে মুক্তা সংগ্রহের প্রক্রিয়া চলে আসছে।
জানা যায়, ১৯৬৪ সালে তৎকালীন ‘পূর্ব পাকিস্তান ক্ষুদ্র শিল্প সংস্থা’ মুক্তা আহরণ বিষয়ে প্রথম জরিপ করে। ওই জরিপের তথ্য অনুযায়ী দেশে মুক্তা সংগ্রহের কেন্দ্রের সংখ্যা ছিল ৯৮। এসব কেন্দ্রে প্রতি বছর ১২ হাজার ৬২৯ তোলা মুক্তা সংগৃহীত হতো।
বিএফআরআই সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭৪-৭৯ সালে চাঁদপুরের ¯¦াদুপানি মাৎস্য গবেষণা কেন্দ্রে একটি গবেষণা প্রকল্পের অধীনে প্রযুক্তির অভাবে প্রথম মুক্তা চাষে তেমন সফলতা পাওয়া যায়নি। ওই গবেষণায় ৬০০ ঝিনুকে বহিস্থ পদার্থ হিসেবে কাচের টুকরো প্রবেশ করিয়ে মুক্তা উৎপাদনে প্রচেষ্টা নেয়া হয়। এতে ৯০ শতাংশ ঝিনুক বেঁচে ছিল। গবেষণার প্রথম মাসেই ৩৬ শতাংশ ঝিনুক প্রবেশকৃত পদার্থ নির্গত করে দেয়, ৩২ শতাংশ ঝিনুকে অসমতল মুক্তা জন্মে।
অ্যাকুয়াকালচার এক্সপেরিমেন্ট স্টেশনের অধীনে এফএও-এর সহায়তায় ১৯৮৩-১৯৮৪ সালে মুক্তা চাষে আরো একটি গবেষণা পরিচালিত হয়। গবেষণার ফলাফলে দেখা যায়, বহিস্থ পদার্থ ঝিনুকে প্রবেশ করানোর তিন সপ্তাহের মধ্যে শতকরা ২৫ ভাগ ঝিনুক মারা যায়। অবশিষ্ট ঝিনুকের ৩২.৬ শতাংশ বহিস্থ পদার্থ বের করে দেয়। ২৭.৩ শতাংশ ঝিনুকে ছোট মুক্তা এবং মাত্র ১৫.১ শতাংশ ঝিনুকে স¤পূর্ণ মুক্তা জন্মে। ৫৭.৬ শতাংশ ঝিনুকে মুক্তা উৎপাদিত হয়নি।
১৯৯৯ সালে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউ›িসল এবং বাংলাদেশ মাৎস্য গবেষণা ইন¯িটটিউটের বিজ্ঞানীদের সমš¦য়ে বাংলাদেশে মুক্তা চাষের সম্ভাবনা শীর্ষক এক সমীক্ষায় দেখা যায়, বাংলাদেশে মুক্তা চাষের উজ্জ¦ল সম্ভাবনা রয়েছে।
বিএফআরআই ১৯৯৯-০১ সালে ময়মনসিংহের ¯¦াদুপানি কেন্দ্রে ও কক্সবাজারের সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রে আরেকটি গবেষণা করা হয়। ময়মনসিংহের প্রথম গবেষণায় দু-তিন মিলিমিটার সাইজের মুক্তা তৈরিতে সময় লেগেছিল দেড় থেকে দুই বছর। এরপর অর্থাভাবে মুক্তা গবেষণা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। গত বছর মুক্তা গবেষণার বর্তমান অবস্থা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিজ্ঞানীদের সাথে মতবিনিময় করেন এবং মুক্তা গবেষণা আবার শুরু করার নির্দেশ দিলে মৎস্য ও প্রাণিস¤পদ মন্ত্রণালয়ের অধীনে ২০১০-১১ অর্থবছরে একটি ‘কোর’ গবেষণা প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। ওই প্রকল্পের অধীনে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ঝিনুকে মেন্টাল টিস্যু ঢুকিয়ে অপেক্ষাকৃত কম গভীরতার পুকুরে ছেড়ে দেয়া হয় এবং নিয়মিত পরিচর্যা করা হয়। এতে পাঁচ মাসেই ঝিনুকে দুই থেকে তিন মিলিমিটার আকারের মুক্তা জন্মে, যা ‘রাইস পার্ল’ নামে পরিচিত। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বছরব্যাপী চাষ করা হলে মুক্তার আকার আরো বড় করা সম্ভব হবে। গ্রামীণ যেকোনো পরিবেশে বাড়ির আঙ্গিনায় ছোট-বড় পুকুরে মাছের সাথে অতিরিক্ত ফসল হিসেবে মুক্তা চাষ করা সম্ভব বলে প্রকল্পের প্রধান গবেষক ড. মোহসেনা বেগম তনু জানান।
তিনি জানান, মুক্তা চাষে মাছের কোনো ক্ষতি হয় না। ঝিনুকের জন্য পৃথক কোনো খাবার দিতে হয় না। তিনি আরো জানান, আগে মুক্তা উৎপাদন করতে প্রায় দুই বছর লাগত। এজন্য মুক্তা চাষে অনেকেই আগ্রহী ছিলেন না। এবার ¯¦ল্পসময়ে মুক্তা উৎপাদনে সফল হওয়ায় অনেকেই আগ্রহী হয়ে উঠছেন। গ্রামীণ মানুষরা তাদের দৈনন্দিন কাজের অবসরে বাড়ির আঙ্গিনার পুকুরে মুক্তা চাষে নিজেদের অর্থনৈতিকভাবে ¯¦াবলম্বী করতে পারবেন।
তার মতে, মিঠাপানির ঝিনুকে উৎপাদিত মুক্তার আন্তর্জাতিক চাহিদা রয়েছে। ইউরোপের বাজারে ছোট মুক্তার চাহিদা বেশি। কিছু দিন আগে নেদারল্যান্ড থেকে এক মহিলা উদ্যোক্তা ইন¯িটটিউটে এসে বাণিজ্যিকভাবে এ দেশের মিঠাপানির মুক্তা (যা রাইস পার্ল নামে খ্যাত) উৎপাদন ও আন্তর্জাতিক বাজারে বিপণনের আগ্রহ দেখিয়েছেন। তা ছাড়া ঝিনুকচূর্ণেরও বাজারমূল্য রয়েছে।
গবেষণার ফলাফলে দেখা গেছে, একটি ঝিনুকে ১০ থেকে ১২টি মুক্তা জন্মে। প্রতিটি মুক্তার খুচরা মূল্য ৫০ টাকা। প্রতি শতাংশে ৬০ থেকে ১০০টি ঝিনুক চাষ করা যায়। এক হিসাবে দেখা যায়, প্রতি শতাংশে ৮০টি ঝিনুকে গড়ে ১০টি করে ৮০০ মুক্তা পাওয়া যায়, যার বাজারমূল্য ৪০ হাজার টাকা। সেই হিসাবে প্রতি একরে ৪০ লাখ টাকার মুক্তা উৎপাদন করা সম্ভব। কাজেই মাছের সাথী ফসল হিসেবে মুক্তা চাষ খুবই লাভজনক।
বাংলাদেশ মাৎস্য গবেষণা ইন¯িটটিউটের মহাপরিচালক ড. গোলাম হোসেন জানান, মুক্তা চাষের ওপর আরো ব্যাপক আকারে গবেষণা করার পরিকল্পনা ইন¯িটটিউটের রয়েছে। এ লক্ষ্যে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়ন করে পরিকল্পনা কমিশনে জমা দেয়া হয়েছে। ১২ কোটি টাকা ব্যয়ে ওই প্রকল্পটি অনুমোদিত হলে ঝিনুকের প্রজনন কৌশল উদ্ভাবন এবং মুক্তা চাষে আরো ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করা সম্ভব হবে। মুক্তা চাষের উদ্ভাবিত প্রযুক্তি ইনটিটিউট থেকে ইতোমধ্যে বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে দেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে বলেও তিনি জানান।
©somewhere in net ltd.