| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
আপনার সাথে যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি অঙ্গরাজ্যের একজন মানুষকে দেখা করিয়ে দিয়ে যদি বলা হয় 'ক্লাইমেট চেইঞ্জ' নিয়ে আলোচনা করতে, তবে রীতিমতো ঝগড়া বেধে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
আপনি হয়তো ছোটবেলায় পাঠ্যবই থেকে শুরু করে পেপার, পত্রিকা, ডকুমেন্টারি, ফিল্ম ইত্যাদি নানা স্থানে পরিবেশ বিপর্যয়, গ্রীনহাউজ এফেক্ট, কার্বন নিঃসরণ, মেরুদেশের তাপমাত্রা হ্রাস সহ বহু বিপর্যয়ের ব্যাপারে জেনে এসেছেন। কিন্তু আপনার চেয়েও উন্নত শিক্ষাব্যবস্থা, তথ্যপ্রযুক্তি, শিল্প, সরকার, প্রচারমাধ্যম এবং আর্থিক সঙ্গতি থাকা সত্ত্বেও মিসিসিপি অঞ্চলের আমেরিকান মানুষটা পৃথিবীব্যাপী স্বীকৃত গ্রীনহাউজ এফেক্ট সম্পূর্ণ অস্বীকার করবেন।
কেন?
ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিবেশ সংরক্ষণ চুক্তি বাতিল করার পর থেকেই আমি এই ব্যাপারে অনেক কৌতুহলী হয়ে উঠি। কেন পৃথিবীর একটি মোড়ল রাষ্ট্র পরিবেশ সংরক্ষণের প্রতি অন্যান্য মোড়ল রাষ্ট্রের সম্মতি থাকা সত্বেও, এবং বিশ্বসমাদৃত একটা সমস্যা বিষফোঁড়ার মতো টিকে থাকার পরও পরিবেশ সংরক্ষণ অস্বীকার করবেন; পুরোটাই একটা খটকা জাগানো প্রশ্ন। প্রাথমিকভাবে ট্রাম্পের পরিবেশ চুক্তির বিরোধিতা করার মূল কারণ, যা বিশ্বের সবাই জেনে আসছে; তা হলো শিল্পরক্ষা। যেহেতু, প্রায় সকল উন্নত দেশেই কলকারখানার কারণে কার্বন নিঃসরণের পরিমাণ বেশি, আর বৈশ্বিক উষ্ণতায় তারাই মূলত দায়ী; সেহেতু পরিবেশ সংরক্ষণ চুক্তির আওতায় কারখানা মালিকরা বিপাকে পড়বেন। তাদের উৎপাদন বিঘ্নিত হবে, ফ্যাক্টরি ম্যাটেরিয়াল বদলাতে হবে, অনেক প্রোডাক্ট, বাই প্রোডাক্ট, ক্যাটালিস্ট ইত্যাদির পরিবর্তন করতে হবে; এছাড়াও বহু ঝামেলা তাদেরকে পোয়াতে হবে বলেই ট্রাম্প আমেরিকার অর্থনীতির উপর শিল্পায়নের প্রভাব বিবেচনা করেই গ্রীনহাউজ এফেক্টের বিরোধিতা করে আসছেন।
কিন্তু পুরোটাই কি তাই?
ষাটের দশকের আগ থেকেই পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আলোচনা হলেও সত্তরের দশকে তা আলোর মুখ দেখে। প্রতিষ্ঠিত হয় গ্রিনপীসের মতো বহু পরিবেশবাদী সংগঠন। নাসা সহ স্বীকৃত সকল সায়েন্টিফিক অর্গানাইজেশন তাঁদের জরিপ এবং গবেষণার ফলাফল প্রকাশ করতে থাকে একের পর এক। এবং তাতে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয় যে, পরিবেশ নিশ্চিতভাবেই ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে এবং আমরা মানুষেরাই এর জন্য দায়ী। যেহেতু চায়নার পর যুক্তরাষ্ট্রই সবচে বেশি কার্বন নিঃসরণকারী এবং চায়নাও তাদের ইন্ডাস্ট্রিয়াল সেক্টর পরিবেশবান্ধব করতে যুক্তরাষ্ট্রীয় শিল্পপতিদের মতো নেতিবাচক মনোভাব দেখায় না, সেহেতু মার্কিন জনগণ এক্ষেত্রে সচেতনতার পরিচয় দিলো। পঞ্চাশটা ফেডেরাল স্টেটেই আন্দোলন দানা বেধে উঠলো, যার পুরোভাগে ছিলো বিজ্ঞানীমহল এবং গ্রিনপীসের মতো সংগঠন। সবুজ প্ল্যাকার্ড, ব্যানার, ক্যাপ আর গেঞ্জিতে যুক্তরাষ্ট্র ভর্তি হয়ে গেলো
কিন্তু আন্দোলনকারীদের বিপরীত পক্ষও ছিলো। হ্যাঁ, শিল্পমালিকদের কথাই বলছি। যেহেতু মার্কিনীরা টাকার উপর দাঁড়িয়েই পরষ্পরের কাঁধ মেপে নির্ণয় করে, কে বড়; সেহেতু মার্কিন স্টেট কাউন্সিলর থেকে ওয়াইট হাউসের সিনেটরদের প্রায় সবাই শিল্পমালিকদের মধ্য থেকেই আসেন। দুয়েকটা যে ব্যতিক্রম নেই, তা না। তবে ডেমোক্রেটদের চাইতে রিপাবলিকানদের ক্ষেত্রে এই ব্যতিক্রম কমই পরিলক্ষিত হয়। যার উদাহারণ ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই, ব্যবসায়ী কাম প্রেসিডেন্ট।
প্রায় প্রতিটা টেলিভিশন চ্যানেলেই পাব্লিক এওয়ার্নেস তৈরির বিপরীতে সরকারী আমলা, শিল্পমালিক এবং লবিস্টদের দৌরাত্ম্য গেলো বেড়ে। ভুঁইফোড় বহু সংগঠন সৃষ্টি হলো, যাদের বাস্তব সদস্যসংখ্যা ১০ বা ১৫ জনও হবেন না। সকল গণমাধ্যমে তারা প্রচার শুরু করে দিলো, 'ক্লাইমেট চেইঞ্জিং ইজ জাস্ট আ হোক্স'। গুজব। সরকারি ভাড়া করা বুদ্ধিজীবীদের দৌরাত্ম্যে টিভিচ্যানেল সয়লাব হয়ে গেলো। তারা শুধুমাত্র শিল্পমালিকদের টাকা খেয়ে প্রচার করে বেড়াতে লাগলো, আসলেই বৈশ্বিক উষ্ণায়ন বলতে কিছুই হচ্ছে না। জনগণ স্পষ্টত দুভাগে বিভক্ত হয়ে গেলো।
১৯১৭ সালে সোভিয়েত রাষ্ট্র গঠনের পর থেকেই আমেরিকা তাদের পুঁজিবাদ টিকিয়ে রাখতে তাঁদের অর্থ আর সমাজব্যবস্থায় একটা সুন্দর মেইকআপ লাগিয়ে দিলো। 'ফ্রিমার্কেট পলিসি' যার অফিশিয়াল নাম। এই ফ্রিমার্কেটকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেই ভাড়া করা বুদ্ধিজীবীরা টেলিভিশন সেট বা খবরের কাগজের মধ্যে বলে বেড়াতে লাগলো, পরিবেশবাদী আন্দোলনকারীরা সবাই কম্যুনিস্ট। তারা এর স্বপক্ষে কোন প্রমাণ উপস্থাপন করতে না পারলেও টিভি অনুষ্ঠানে তরমুজ নিয়ে আসা শুরু করলো। ফলটা কেটে জনগণকে দেখাতে লাগলো, 'তরমুজের বাইরে সবুজ হলেও ভেতরে লাল।' আসলেই তারা টিভি অনুষ্ঠানে তরমুজ কাটতো।
বেশিরভাগ রিপাব্লিকান স্টেট এবং ক্ষেত্রবিশেষে ডেমোক্রেটরাও এক্ষেত্রে জনগণকে বোঝাতে জোর প্রচারণায় নেমে গেলো। বাস্তববাদী জনগণ বুঝতে শিখলো, পরিবেশ পরিবেশ করে চেঁচিয়ে মরলেই হবে না; পরিবেশ ঠিক হয়ে গেলে আমরা গরিব হয়ে যাবো। বলাই বাহুল্য, জনগণকে লেইমভাবেই বোঝানো হয়েছিলো। পরিবেশের সাথে অর্থনীতি, রাজনীতি, সমাজনীতি ইত্যাদি জড়িত বলেই নাকি পরিবেশ আন্দোলন করার আগে দেশের কথা ভাবতে হবে। তারা জনগণকে এটা বোঝালো না, এভাবে কার্বন নিঃসরণ ঘটতে থাকলে ন্যুইয়র্কই ডুবে যাবে; বিপরীতে তাদের মন্ত্র চলতে থাকলো শিল্পায়নের পক্ষে।
সর্বশেষ বারাক ওবামা অনেক চাপের মধ্যেও পরিবেশ বিষয়ক একটা বিল পাশ করতে সক্ষম হলেও তা যথেষ্ট ছিলো না। ডেমোক্রেটদের দ্বারা সেই বিল উত্থাপিত হবার কারণে রিপাবলিকান এবং মিসিসিপির মতো রিপাবলিকান সংখ্যাগরিষ্ঠ স্টেটগুলোর জনগণ অবস্থান নিলো পরিবেশ সংরক্ষণের বিপক্ষে। তাদেরকে বোঝানো হলো, পরিবেশ সংক্রান্ত আইন বাস্তবায়িত হলে তাদের উপর চাপবে ট্যাক্সের বোঝা, তারা হয়ে পড়বে বেকার এবং নিন্ম আয়ের মানুষেরা ভিক্ষুকে পরিণত হবে।
যদিও কিছু রিপাবলিকান সিনেটর এখন সত্যের পক্ষেই অবস্থান করছেন, তবু তাদের বহু প্রশ্নের মোকাবিলা করেই টিকে থাকতে হচ্ছে রাজনীতিতে।
ক্লাইমেট কাহিনীটা লেখার গৌণ উদ্দেশ্য ছিলো, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রভাবে যে আমাদের দেশটাও ধ্বংসের মুখে দাঁড়িয়ে আছে; সে সম্পর্কে সতর্কীকরণ।
আর মুখ্য উদ্দেশ্য ছিলো, সরকার সম্বন্ধে। আপনাকে খুব ভালোভাবে অনুধাবন করতে হবে, বাংলাদেশ আর যুক্তরাষ্ট্র এক না। তাদের দেশের ব্যবসায়ী আর রাজনীতিবিদরা শিল্পায়ন রক্ষায় পরিবেশের বিরুদ্ধে যে জঘন্য মিথ্যাচারের আশ্রয় নিয়েছিলো, তার ফল এখনো ভোগ করছে পুরো বিশ্ব; ভবিষ্যতেও করেই যেতে হবে। ওদেশে যেই কারণে সরকার জনগণকে কাঠের চশমা পরিয়েছে, আমাদের দেশে সেই কারণে পরাবে না; এটাই স্বাভাবিক। সেজন্যই আমি আহবান করবো তাদের প্রতি, যারা লেখাটা শেষ পর্যন্ত পড়লেন; দয়া করে টিভি নিউজ, টকশো, আলোচনা, সংবাদপত্র ইত্যাদি থেকে তথ্য সংগ্রহের সময় সতর্ক থাকবেন।
পৃথিবীর প্রতিটা দেশের সরকারই ক্ষুদ্র স্বার্থের বিবেচনায় জনগণকে বোকা বানিয়েই যাচ্ছে। কখনো তরমুজ কেটে, কখনোবা ইতিহাস পড়িয়ে।
সিদ্ধান্ত আপনার, আপনি বোকা হবেন কি না।
©somewhere in net ltd.