| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
জুল ভার্ন
এপিটাফ এক নিঃশব্দ প্রচ্ছদে ঢাকা আছে আমার জীবনের উপন্যাস... খুঁজে নিও আমার অবর্তমানে... কোনো এক বর্তমানের মায়াবী রূপকথায়। আমার অদক্ষ কলমে... যদি পারো ভালোবেসো তাকে... ভালোবেসো সেই অদক্ষ প্রচেষ্টা কে, যে অকারণে লিখেছিল মানব শ্রাবণের ধারা.... অঝোর শ্রাবণে।।
সময়ের আলোচিত একটি নাম- হুতি....
হুতি কারা?
ইয়েমেনের আনসারুল্লাহ আন্দোলনের উত্থান, আদর্শ, অর্থ ও ক্ষমতার বিস্তার মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে হুতি নামটি এখন অত্যন্ত পরিচিত। বিশেষ করে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলা, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাতের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা এবং ইরানের সঙ্গে সম্পর্কের কারণে গত এক দশকে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে হুতিদের গুরুত্ব অনেক বেড়েছে।
হুতিদের আনুষ্ঠানিক নাম আনসারুল্লাহ (Ansar Allah)। এটি ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চল থেকে উঠে আসা একটি জায়েদি শিয়া ধর্মীয়-রাজনৈতিক আন্দোলন, যা সময়ের সঙ্গে একটি শক্তিশালী সশস্ত্র সংগঠনে পরিণত হয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো- হুতিরা কারা, তাদের জাতিগত ও ধর্মীয় পরিচয় কী, কীভাবে তারা বিদ্রোহী শক্তিতে পরিণত হলো, কোথা থেকে তাদের অর্থ ও অস্ত্র আসে এবং তারা কীভাবে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছে?
চলুন সংক্ষেপে কিন্তু ধারাবাহিকভাবে বিষয়টি দেখা যাকঃ
১. হুতিরা কোনো পৃথক জাতিগোষ্ঠী নয়ঃ
প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার- হুতিরা আলাদা কোনো জাতি বা নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী নয়। তারা মূলত আরব ইয়েমেনি জনগোষ্ঠীরই অংশ।
‘হুতি’ নামটি এসেছে হুসাইন বদরউদ্দিন আল-হুতি-এর নাম থেকে। তিনি উত্তর ইয়েমেনের সাদা (Saada) অঞ্চলের একজন ধর্মীয় ও রাজনৈতিক নেতা ছিলেন এবং পরবর্তীকালে যে আন্দোলনটি আনসারুল্লাহ নামে পরিচিত হয়, তার অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠাতা ও মুখপাত্রে পরিণত হন।
আন্দোলনের শিকড় উত্তর-পশ্চিম ইয়েমেনের পাহাড়ি অঞ্চল, বিশেষ করে সাদা প্রদেশে।
২. শুরুটা ছিল ধর্মীয় ও সামাজিক পুনর্জাগরণ আন্দোলন হিসেবেঃ
হুতি আন্দোলনের শিকড় ১৯৯০-এর দশকের একটি যুব আন্দোলনের মধ্যে নিহিত। এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগঠন ছিল Believing Youth বা আল-শাবাব আল-মুমিন।
গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্প, স্কুলভিত্তিক কার্যক্রম ও ধর্মীয় শিক্ষার মাধ্যমে তরুণদের মধ্যে জায়েদি ঐতিহ্য, ধর্মীয় পরিচয় এবং সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টা করা হতো।
তখন এটি মূলত কোনো পূর্ণাঙ্গ সশস্ত্র আন্দোলন ছিল না।
কিন্তু ইয়েমেনের রাজনৈতিক সংকট, ধর্মীয় পরিচয় নিয়ে উত্তেজনা, রাষ্ট্রের দুর্নীতি এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার ফলে আন্দোলনটি ধীরে ধীরে রাজনৈতিক ও সামরিক চরিত্র লাভ করে।
৩. তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস কী?
হুতিরা ঐতিহাসিকভাবে জায়েদি শিয়া ইসলাম-এর সঙ্গে সম্পর্কিত। জায়েদি মতবাদ শিয়া ইসলামের একটি শাখা হলেও এটি ইরানের প্রচলিত টুয়েলভার বা দ্বাদশ ইমামপন্থী শিয়া মতবাদের সঙ্গে এক নয়।
জায়েদিরা ইসলামের প্রথম পাঁচ ইমামকে বিশেষ মর্যাদা দেয়। এ কারণে তাদের অনেক সময় “Fiver Shia” হিসেবেও বর্ণনা করা হয়।
জায়েদি ধর্মতত্ত্বের কিছু দিক সুন্নি ইসলামের সঙ্গে তুলনামূলকভাবে কাছাকাছি। ইয়েমেনে বহু শতাব্দী ধরে জায়েদি ও সুন্নি জনগোষ্ঠী পাশাপাশি বসবাস করেছে।
তবে আধুনিক হুতি আন্দোলনের রাজনৈতিক ও মতাদর্শিক বিকাশকে শুধু ঐতিহাসিক জায়েদি ধর্মতত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না।
সময়ের সঙ্গে এর মধ্যে ইরানের ইসলামি বিপ্লব, ‘প্রতিরোধ’ বা Resistance ideology এবং আঞ্চলিক শিয়া রাজনৈতিক আন্দোলনের প্রভাব যুক্ত হয়েছে।
৪. কেন তারা বিদ্রোহী হয়ে উঠল?
হুতি আন্দোলনের উত্থানের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করেছে।
ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উদ্বেগঃ
১৯৬২ সালের বিপ্লবের আগে উত্তর ইয়েমেনে দীর্ঘ সময় ধরে জায়েদি ইমামদের রাজনৈতিক আধিপত্য ছিল।
রাজতন্ত্রের পতনের পর নতুন প্রজাতান্ত্রিক ব্যবস্থায় জায়েদি ধর্মীয় ও রাজনৈতিক অভিজাতদের প্রভাব কমে যায়।
পরবর্তী সময়ে সৌদি আরবের প্রভাব এবং সালাফি মতাদর্শের প্রসার উত্তর ইয়েমেনের ঐতিহ্যবাহী জায়েদি সমাজের একটি অংশের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করে।
আলী আবদুল্লাহ সালেহর শাসনঃ
দীর্ঘদিনের প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ-এর শাসন ছিল দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি ও রাজনৈতিক কেন্দ্রীকরণের অভিযোগে ব্যাপকভাবে সমালোচিত।
হুতিরা একই সঙ্গে সরকারের পশ্চিমাপন্থী নীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সামরিক সহযোগিতার বিরোধিতা করতে থাকে।
বিশেষ করে ২০০৩ সালে ইরাকে মার্কিন আগ্রাসনের পর হুতিদের রাজনৈতিক অবস্থান আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
তাদের সমাবেশে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী স্লোগান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে।
৫. হুসাইন আল-হুতির মৃত্যু এবং সশস্ত্র সংগ্রামের সূচনাঃ
২০০৪ সালে ইয়েমেনি সরকার হুসাইন আল-হুতিকে গ্রেপ্তারের উদ্যোগ নিলে সংঘর্ষ শুরু হয়। একপর্যায়ে হুসাইন আল-হুতি নিহত হন। এর পর আন্দোলনটি দ্রুত সামরিক রূপ নিতে থাকে।
২০০৪ থেকে ২০১০ সালের মধ্যে সাদা যুদ্ধ নামে পরিচিত একাধিক দফা সংঘর্ষে হুতিদের সঙ্গে ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর যুদ্ধ হয়। এই সময়েই হুতিরা একটি সংগঠিত ও অভিজ্ঞ গেরিলা বাহিনীতে পরিণত হয়।
৬. ২০১৪: সানা দখল এবং ক্ষমতার মোড় পরিবর্তনঃ
২০১১ সালের আরব বসন্ত ইয়েমেনের রাজনৈতিক কাঠামোকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়। আলী আবদুল্লাহ সালেহ ক্ষমতা ছাড়লেও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা দূর হয়নি। এই পরিস্থিতিতে হুতিরা জনপ্রিয় অসন্তোষ, বিশেষ করে জ্বালানি মূল্য বৃদ্ধি ও সরকারের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে থাকে।
২০১৪ সালে তারা রাজধানী সানা দখল করে।
এরপর তারা ইয়েমেনের রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে নিজেদের অবস্থান তৈরি করে এবং প্রেসিডেন্ট আবদ রাব্বুহ মনসুর হাদির সরকার কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। পরবর্তীকালে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ আন্তর্জাতিক রূপ লাভ করে।
৭. বর্তমানে ইয়েমেনের কতটা তাদের নিয়ন্ত্রণে?
হুতিরা বর্তমানে ইয়েমেনের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের একটি বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করে। এর মধ্যে রয়েছে রাজধানী সানা, তাদের ঐতিহাসিক ঘাঁটি সাদা, এবং গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগরীয় বন্দর হুদায়দাহ।
তাদের নিয়ন্ত্রিত ভূখণ্ডে ইয়েমেনের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ বসবাস করে- বিশেষ করে দেশের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ উত্তরাঞ্চলে।
তারা নিজেদের রাজনৈতিক কাঠামোর মাধ্যমে প্রশাসন পরিচালনা করে এবং Supreme Political Council তাদের ক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান।
তবে পুরো ইয়েমেন তাদের নিয়ন্ত্রণে নয়। দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তি, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সঙ্গে যুক্ত বাহিনী এবং অন্যান্য স্থানীয় গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।
৮. হুতিদের অর্থ আসে কোথা থেকে?
হুতিদের সামরিক ও প্রশাসনিক সক্ষমতার পেছনে একাধিক অর্থনৈতিক উৎস রয়েছে।
ইরানের সহায়তাঃ
হুতিদের সঙ্গে ইরানের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয়গুলোর একটি।
ইরান তাদের আঞ্চলিক “Axis of Resistance” বা প্রতিরোধ অক্ষের অংশ হিসেবে দেখে।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গোয়েন্দা ও সরকারি প্রতিবেদনে হুতিদের কাছে ইরানি অস্ত্র, প্রযুক্তি, অর্থ ও সামরিক সহায়তা পৌঁছানোর প্রমাণ রয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে-
ড্রোন প্রযুক্তি;
ব্যালিস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তি;
সামরিক প্রশিক্ষণ:
গোয়েন্দা ও প্রযুক্তিগত সহায়তা।
তবে হুতিরা নিজেদের ইরানের “proxy” বা পুতুল বাহিনী হিসেবে অভিহিত করার বিরোধিতা করে এবং নিজেদের স্বাধীন ইয়েমেনি আন্দোলন হিসেবে দাবি করে।
অভ্যন্তরীণ কর ও রাজস্বঃ
হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় বিভিন্ন ধরনের কর, শুল্ক ও ফি আদায় করা হয়। হুদায়দাহসহ নিয়ন্ত্রিত বন্দর ও বাণিজ্যিক পথ থেকে রাজস্ব সংগ্রহ তাদের অর্থনৈতিক শক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস।
জ্বালানি ও কালোবাজারঃ
ইয়েমেনের যুদ্ধ অর্থনীতিতে জ্বালানি, পণ্য পরিবহন এবং কালোবাজারও গুরুত্বপূর্ণ। হুতিদের বিরুদ্ধে জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্য নিয়ন্ত্রণ করে অবৈধ বা অতিরিক্ত রাজস্ব আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
খুমসঃ
হুতি-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় খুমস নামে ধর্মীয় করের ব্যবস্থা রয়েছে। এটি ইসলামী ঐতিহ্যে সম্পদের একটি অংশ নির্দিষ্ট ধর্মীয় ও সামাজিক কাজে দেওয়ার ধারণার সঙ্গে সম্পর্কিত।
তবে হুতি নেতৃত্ব কীভাবে এবং কোন পরিসরে এটি প্রয়োগ করে- এ নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক রয়েছে। তাই এটিকে সরলভাবে “২০ শতাংশ কর” হিসেবে উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
৯. শিক্ষা ব্যবস্থায় হুতিদের প্রভাবঃ
হুতিদের ক্ষমতা শুধু সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়; তারা শিক্ষা ও তরুণ প্রজন্মের ওপরও ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করছে।
তাদের নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে স্কুলের পাঠ্যক্রম ও শিক্ষা উপকরণে পরিবর্তন আনার অভিযোগ রয়েছে।
বিশেষ করে-
হুতি আন্দোলনের ইতিহাস ও নেতৃত্বের প্রচার ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতাদর্শ।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলবিরোধী অবস্থান।
‘প্রতিরোধ’ বা Resistance ideology।
আনুগত্য ও সামরিক সংস্কৃতি- ইত্যাদি বিষয় শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করার অভিযোগ রয়েছে।
১০. ‘সামার ক্যাম্প’- শুধু ধর্মীয় শিক্ষা নয়?
হুতিদের পরিচালিত Summer Camp বা গ্রীষ্মকালীন ক্যাম্প তাদের মতাদর্শ প্রচারের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম।
এগুলোতে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা দেওয়ার পাশাপাশি রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং হুতি আন্দোলনের প্রতি আনুগত্য তৈরির চেষ্টা করা হয় বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। হুতিদের শিক্ষা ব্যবস্থায় ইরানের মতোই বিজ্ঞান প্রযুক্তি বিষয়ে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
কিছু ক্যাম্পে সামরিক প্রশিক্ষণ ও অস্ত্র ব্যবহারের প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ কারণে সমালোচকেরা এগুলোকে ideological indoctrination এবং future recruitment-এর মাধ্যম হিসেবে দেখেন।
১১. হুতিদের যোদ্ধাদের শিক্ষাগত পটভূমি কেমন?
হুতি আন্দোলনের প্রাথমিক জনভিত্তি এসেছে উত্তর ইয়েমেনের পাহাড়ি ও উপজাতীয় সমাজ থেকে।
এই অঞ্চলে ঐতিহাসিকভাবে আধুনিক প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগ সীমিত ছিল।
তবে এর অর্থ এই নয় যে হুতিদের নেতৃত্ব অশিক্ষিত।
আন্দোলনের নেতৃত্ব ও মধ্যম পর্যায়ের কমান্ড কাঠামোর মধ্যে ধর্মীয় শিক্ষা, রাজনৈতিক প্রশিক্ষণ এবং বিজ্ঞানভিত্তিক সামরিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তিরা রয়েছে।
বিশেষ করে দীর্ঘ গৃহযুদ্ধের অভিজ্ঞতার ফলে হুতিরা-
ড্রোন, ক্ষেপণাস্ত্র, গোয়েন্দা কার্যক্রম, নৌ-যুদ্ধ এবং আধুনিক অসম যুদ্ধকৌশল সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য সক্ষমতা অর্জন করেছে।
ইরান ও লেবাননের হিজবুল্লাহর সঙ্গে তাদের সামরিক ও প্রযুক্তিগত যোগাযোগের কথাও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
১২. হুতিদের সবচেয়ে বড় শক্তি কোথায়?
হুতিদের শক্তিকে শুধু তাদের অস্ত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি বোঝা যাবে না। তাদের শক্তির কয়েকটি স্তর রয়েছে-
প্রথমত; উত্তর ইয়েমেনের পাহাড়ি অঞ্চলে শক্তিশালী সামাজিক ও উপজাতীয় ভিত্তি।
দ্বিতীয়ত; দীর্ঘদিনের গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞতা।
তৃতীয়ত; ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন প্রযুক্তির ব্যবহার।
চতুর্থত; লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থান।
পঞ্চমত; ইরানসহ আঞ্চলিক মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্ক।
ষষ্ঠত; ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতাদর্শের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা।
শেষ কথাঃ
হুতিদের বোঝার জন্য তাদের শুধু “শিয়া সশস্ত্র গোষ্ঠী” হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
তারা একই সঙ্গে-
একটি ধর্মীয় পুনর্জাগরণ আন্দোলনের উত্তরাধিকার,
একটি রাজনৈতিক সংগঠন, একটি উপজাতীয়-সামাজিক শক্তি, একটি সশস্ত্র বিদ্রোহী বাহিনী, এবং বর্তমানে ইয়েমেনের একটি বড় অংশের কার্যত শাসক।
তাদের উত্থানের পেছনে রয়েছে ধর্মীয় পরিচয়ের প্রশ্ন, উত্তর ইয়েমেনের ঐতিহাসিক রাজনীতি, আলী আবদুল্লাহ সালেহর শাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ, ২০০৪ সালের যুদ্ধ, ২০১৪ সালের সানা দখল এবং পরবর্তী গৃহযুদ্ধ।
অন্যদিকে, ইরানের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক তাদেরকে ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়ে পরিণত করেছে।
আজকের হুতি আন্দোলন তাই শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটের ফল নয়; এটি ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ইসরায়েল-ফিলিস্তিন সংঘাত, লোহিত সাগরের বাণিজ্যপথ এবং মধ্যপ্রাচ্যের বৃহত্তর শক্তির রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
আর সেই কারণেই- ছোট একটি পাহাড়ি ধর্মীয় আন্দোলন থেকে কীভাবে হুতিরা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম আলোচিত সশস্ত্র শক্তিতে পরিণত হলো- এই ইতিহাসটি বোঝা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
©somewhere in net ltd.