| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ইদানীং/ আবছা রোগে মরে যায় বইয়ের পাতা/ ক্যালেন্ডারে নকশা আঁকে প্রাক্তন প্রেমের দাগ/ বাগানের ফুল চুরি করে যায় আবেগহীন গুবরে...
মধ্যবিত্তের নাগরিক কথন-০
সারা গ্রামে একটাই টেলিভিশন। উঠান জুড়ে মানুষ দেখছে বাংলা ছবি। শীতের সূর্যটা টুপ করে বিদায় নিল। মানুষের পিছনে, এক নারী এদিক ওদিক হাঁটছেন। আর মানুষের ভিড় লক্ষ্য করছেন। তাঁর প্রসব ব্যথা উঠেছে। তিনি তাঁর জা 'কে দেখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু ব্যথা ও লজ্জায় ডাকতে পারছেন না।
পরপর দুটো মেয়ে। একটা ছেলে না হলেই নয়। বৈষ্ণব সেবা, অষ্ট প্রহর কীর্তন মানত করা যে!
ভগবান কি মুখ তুলে চাইবেন না?
সারা সন্ধ্যা মাকে যন্ত্রণা দিয়ে মধ্যরাতে আগুন রঙের ছেলেটি জন্ম নিলো। বাবা ঠাকুর ঘরের সামনে লম্বা হয়ে শুয়ে পড়লেন। আনন্দ ও কৃতজ্ঞতা!
সদ্য প্রসবিত আধ বোঁজা চোখের মা ' কে কেউ ডাক দিয়ে বললো, ‘ও মুখপুড়ি দেখ, তোর ঘরে আগুইন্যা দেবতা আইছে।’
মেঝবোনটি আনন্দে চোখে জল নিয়ে চিৎকার দিলো, ‘ভাই হইছে, ভাই ফুডা দিয়াম’। জেঠুরা আনন্দে একে অন্যের সাথে শাঁখ বাজানোর প্রতিযোগিতা শুরু করলো। শুভাকাংখী কুলনারীরা গুনে গুনে পাঁচটি উলুধ্বনি দিলো।
আজ থেকে বিশ পঁচিশ বছর আগেকার কথা বলছি। তখন সিজারিয়ান করে বাচ্চা জন্ম দেয়ার ব্যাপার কেউ জানতো কিনা জানিনা। অন্তত একটা ভালো রাস্তা ও ও বিদ্যুৎবিহীন গ্রামে প্রসবের আগে একটা রিক্সা ডাকার চিন্তাও হয়তো করতো না। সবার চোখ থাকতো আঁতুড় ঘরের দিকে, কি হয়? ছেলে না মেয়ে?
আঁতুর ঘর হতো জন্মের পর মূল ঘরের লাগোয়া বা একটু দূরে খড়ের চাল, বস্তা, ত্রিপাল কিংবা চাটাইয়ের বেড়া দিয়ে একটা অস্থায়ী খেলনা ঘর। প্রসববেদনায় কাতর মায়ের গর্ভ থেকে সন্তান বেরিয়ে আসতো। হয়তো তাড়াহুড়ো করে বানানো খেলনা ঘরটিতে সন্তান এসেই দেখতো খড়ের ফাঁক দিয়ে বিশাল আকাশ, রাতের চাঁদ কিংবা ভাগ্য খারাপ হলে অষ্টপ্রহর মেঘ। অশৌচ পালন শেষ হলে সেই ঘরের সবটুকু ভেঙে নিয়ে পুড়িয়ে ফেলা হত। আর জন্মের পরপরই জন্মপ্রক্রিয়ার বর্জ্যগুলো উঠোনের এক কোণে কিংবা বাড়ির পাশে পুঁতে ফেলা হতো। সদ্য জন্ম নেয়া শিশুর নাড়ির কিছুটা অংশও হয়তো থাকতো। ভাগ্য বদলের সওদা কিংবা নিজের জীবনে অভিনয়ের তাগিদে সেই সন্তান বাড়ি ছেড়ে নব্বই দশকের নায়কের মতো পাড়ি জমায় অন্য কোথাও। বাড়িতে বাবা-মা-আত্মীয়দের মুখে পড়ে থাকে নামের অস্তিত্ব, ‘আমাদের ছেলে অমুক জায়গার বড় অফিসার’।
ফলে সেই পোঁতা নাড়ি আর নারী (মা) যদি জন্মস্থানে থাকেন তাহলে সাহিত্যের ভাষায় সেটা একই সাথে নাড়ি ও নারীর টান।
আমরা কতটুকু উদারমনা জানিনা, কিন্তু একটা দিকে আমি/আমরা চরমভাবে স্বার্থপর। নাড়ি আর নারীর টান। কারণ আমাদের বয়সী বেশিরভাগের জন্ম হয়েছে এই সনাতনী পদ্ধতিতে, ফলে নাড়ির একটা অংশ পোঁতা আছে বাড়িতে। আর নারীও আছে।
কিন্তু নাড়ী ও নারীর টান পেছনে ফেলে জীবনের ফিল্মে বন্দী নিজেদের বন্দী করতে কখনো, নায়ক, কখনো ভিলেন, কখনো কমেডিয়ান।
আসলে আমরা কে? এই নগর, শহরে আমরা রূপান্তরিত নাগরিক। যাদের আসল পরিচয় শুধুই মধ্যবিত্ত। নিজেদের ঠিকানা ছেড়ে আমরা অন্য কোনও ভুল ঠিকানায় কুরিয়ার হয়ে গেছি।
আর কোনো ঠিকানায় ফেরা হয়নি কারও!
-০-

©somewhere in net ltd.