| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ইদানীং/ আবছা রোগে মরে যায় বইয়ের পাতা/ ক্যালেন্ডারে নকশা আঁকে প্রাক্তন প্রেমের দাগ/ বাগানের ফুল চুরি করে যায় আবেগহীন গুবরে...
কোনোমতে জুতাটা পায়ে গলিয়ে বেল্টটা হাতে নিয়ে ছুটছে। আরেকটু দেরি হলে সেই তাকে দেখতে পাবেনা। প্রতিদিন ঠিক সাড়ে আটটায় গেট থেকে বের হয়। অতক্ষণ গেটের পাশের দোকানটায় দাঁড়িয়ে চা-সিগারেট খায় সে। তারপর বের হলে একটু দূর দিয়ে পিছন পিছন হেঁটে সিগারেটে শেষ সুখটানটা দিয়ে ফেলে দেয়। বাস স্টপে বাস আসার আগ পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকে। এমনো হয়েছে তার বাস কয়েকটা চলে গিয়েছে। উত্তেজনায় সে আরো দু’একটা সিগারেট খেয়েছে। কিন্তু সে যায়নি। যেনো তার আগে যাওয়াটা বড় মানুষের বেয়াদবি।
দৌড়াতে দৌড়াতে গলির দোকানটায় এসে সিগারেট ধরিয়ে চায়ের কাপটা হাতে নিতেই সে গেট থেকে বেরিয়ে এলো।
ধুর!
আজকে আর চা খাওয়াটা হলোনা। তাড়াতাড়ি চুমুক দিতে গিয়ে খানিকটা ঠোঁট পুড়েও গেলো।
‘ইস’ শব্দটা করে যখন চায়ের কাপটা ফেরত দিতে যাবে তখন চাওয়ালার বাঁকা চোখের ডাক
‘মামা, আজকা থিকা চা ছয় ট্যাকা, চিনির দাম বাড়তি।’
অন্যদিন হলে হয়তো দু একটা পালটা কথা বলে কিংবা নীরবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে যাচাই করে নিতো আসলে তাই কিনা। তবে তা করতে না পেরে দোকানে খুব তাড়াতাড়ি ইঁদুর ঢোকার দোয়া পড়ছিল।
আচ্ছা! সে তাকে পছন্দ করে বলে প্রতিদিন এখানে এসে চা খায় এটা কি দোকানদার টের পেয়ে গেছে? টেম্পোরারী কাস্টমার মনে করে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে না তো? হতে পারে, সবাই তো নিজের সুবিধাই আগে দেখে।
সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে দোকানের বিল মিটিয়ে হাঁটা দেয় সে। ইতিমধ্যে এক কাঁধে ভ্যানিটি ব্যাগ নিয়ে বেশ খানিকটা পথ এগিয়ে গেছে। তাকে ধরতে গেলে দৌড়াতে হবে এখন। দৌড়ালে অবশ্য কেউ কিছু মনে করবে বলে মনে হয়না, বাস ধরতে গেলে অনেক মেয়ে-মহিলাকেও দৌড়াতে দেখেছে সে।
আচ্ছা, আজকে কি রঙয়ের লিপস্টিক দিয়েছিলো সে ? প্রতিদিন ভিন্ন ভিন্ন রঙয়ের লিপস্টিক দেয় সে। ঠোঁটে গাঢ় রঙয়ের লিপস্টিক দিয়ে যখন বের হয়, মনে রোদের রঙ হয় একেক দিন একেক রকম। মেয়েটা এতো গাঢ় রঙ ব্যবহার করে কেনো? ঠোঁটে কোনো অসুখ নেইতো ? যেমন শ্বেতী? ছোটবেলায় পাশের বাড়ির এক মেয়েকে দেখতো ঠোঁটে সারাদিন কড়া করে লিপস্টিক দিয়ে রাখতে দেখতো। কোনো দিন ভুলে গেলে পুঁই গাছের বীজ কিংবা সেগুন গাছের ডাল দিয়ে ঠোঁট রাঙিয়ে রাখতো। মা বলেছিলো ‘ঐ মাইয়াডা! ওর ঠুটো অসুখ। ধলি রোগ। দেখলে ভালা মাইনষে বিয়ে করতো না।’ সে মেয়েটার এখন ভালো একটা বিয়ে হয়েছে। অনেক টাকা খরচ করে কিভাবে যেনো ওর স্বামী ওকে ভালোও করে দিয়েছে। এখন আর আগের মতো কড়া লিপস্টিক দেয়না।
ওর নাম জিজ্ঞেস করবো? কি বলবে? আরেকটু কাছে যাবে? সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে মেয়েটা বাসে উঠে যায়। একটু পরে ছেলেটাও। প্রতিদিনকার অভ্যাসের ব্যতিক্রম হয় না, আজও না।
তেমন কাজ না থাকায় আজ তাড়াতাড়িই বের হয়েছে। অফিসের সামনে ফুটপাতের চায়ের দোকানে কাপটা হাতে নিয়ে কেবল রাস্তায় তাকিয়েছে, এমন সময় দেখে ওড়নায় মুখ আবছা ঢেকে গুটি গুটি পায় তার দিকে এগুচ্ছে মেয়েটা। ভাবখানা যেনো ধুলোবালির জন্য মুখ ঢেকে রাখা। এই ভঙ্গি সে আগেও দেখেছে। সন্ধ্যার আগে তারা যখন খেলা শেষ করে মাঠে গেঞ্জি খুলে বসতো যখন পাশের বাড়ির হাফসা আপা বদর ভাইয়ের সাথে দেখা করতে যেতো এভাবে মুখ ঢেকে।
হঠাৎ মনে হয় যদি এখানে এসে মুখ খুলে বলা শুরু করে ‘কি? সমস্যা কি ? আমার পিছে ঘুর ঘুর ক্যান এতো? আমি লিপস্টিক দেই কারণ আমার ঠোঁটে এই সমস্যা। তাতে আপনার কোনো সমস্যা?’ তাহলে কোনোভাবেই ভালো হবেনা। অফিসের নিচে এমন দৃশ্য হলে কাল কলিগদের কাছে মুখ দেখাতে পারবেনা।
এক লাফে ফুটপাত থেকে নেমে চাওয়ালার পাশে দাঁড়ায় সে। যেনো মেয়েটা তাকে দেখতে না পায়। মেয়েটাও তার দিকে না তাকিয়েই মোবাইল বের করে কাকে যেনো ফোন দেয়। সামনের মোড়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে কালো পালসার বাইকে বসা এক যুবক। ওড়না চেপে ধরে বাইকে উঠে বসে এদিক ওদিক তাকায়। এই দৃষ্টিটাও সে মাঝে মাঝে হাফসা আপার চোখে দেখেছে। বদর ভাইয়ের সাথে দেখে করে আসার পর দৃষ্টিতে বেশ ক্লান্তি আর হাঁটায় পরিশ্রান্তি থাকতো।
বাইক স্টার্ট হয়, যুবকসহ চলে যায় সে। হাতের কাপের চা ঠাণ্ডা-জল হয়ে যায়।
হঠাৎ হেসে ওঠে সে, কালকে থেকে আর চিনির অজুহাতে দাম বেড়ে যাওয়া ছয় টাকার চা খাওয়া লাগবেনা!
ঠাণ্ডা চায়ে একটা জোরে চুমুক দেয়, মধ্যবিত্তটি।
-0-
©somewhere in net ltd.