| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ইদানীং/ আবছা রোগে মরে যায় বইয়ের পাতা/ ক্যালেন্ডারে নকশা আঁকে প্রাক্তন প্রেমের দাগ/ বাগানের ফুল চুরি করে যায় আবেগহীন গুবরে...
পাবলিক বাসগুলোর মধ্যেও এক ধরনের অলিখিত শ্রেণীবিভাগ আছে, এতদিন খেয়াল করেনি সে। অপেক্ষাকৃত বড়, এক পাশে তিন সিট বিশিষ্ট বাসগুলো মোটামুটি উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা যাদের হয়তো গাড়ি কেনার সামর্থ্য থাকলেও পুরো মাস চালানোর মতো সঙ্গতি নেই তাদের দখলে। কখনো কখনো ছুতো দেখিয়ে পাঁচ টাকার জায়গায় দশ টাকাও নিয়ে নেয় কন্ড্যাক্টর। দিতে হয়, এতো সব উঠতি উচ্চবিত্তের ভিড়ে না দিলেও মান সম্মানের প্রশ্ন উঠে আসে।
এই বাসগুলোতে যারা চড়ে বেশিরভাগই বেশ ধোপ দুরস্থ। ধুলা মাখা বাতাস জানালা বেয়ে পরিস্কার ফিটফাট কাপড় চোপড় মহিলাদের অল্প বিস্তর প্রসাধনী, হাল্কা লিপস্টিকের গন্ধকে বাসের এ মাথা থেকে ও মাথায় নিয়ে যায়। আর সবচেয়ে যে ব্যাপারটা চোখে পড়ে তা হলো ঘামের গন্ধ নেই। মোটামুটি ভালো মানের সুগন্ধিতে ঘিরে থাকে পুরো গাড়ীটা। ভিড়ের চাপে এক মাথা থেকে অন্য মাথায় গেলে একেক জনের কাছ থেকে একেক ধরনের সুগন্ধি নাকে লাগে।
হাজার বছর ধরে শ্রেনীবিভাগের যাঁতাকলে পিষ্ট কথিত শিক্ষিত সভ্য জনসাধারণেরা এখনো ভুলতে পারেনি এই প্রথা। তাই নিজের চেয়ে বয়স্ক বাসের হেলপারটিকে অবহেলায় ‘তুমি’ করে বলে, কখনো পাঁচ টাকা বেশি ভাড়া চাইলে ধমক দিয়ে তুইও বলে। কিংবা হেলপার যদি কম বয়স কিংবা পিচ্চি হয়, তাহলে ‘তুই’ ছাড়া মুখে আর কোনও ভাষা থাকেনা। অথচ এই শিশুটাই একটু ভালো জামাকাপড় পড়ে তার সামনে আসলে ‘বাবু’ ছাড়া সম্বোধন আসে কিনা সন্দেহ!
আর ছোটো বাস গুলি, দুই পাশে কচুক্ষেতের সারির মতো করে সিট বসানো, সিটের কাভার কবে লাগিয়েছিলো মালিক কিংবা চালক কারোরই মনে নেই; সেই বাসগুলিতে ওঠে নিম্নবিত্ত ধরনের লোক গুলো। কোনো কবিরাজি দোকানে কাজ করে, পুরনো শার্টে সস্তার সুগন্ধি মেখে দাঁড়িয়ে থাকে হাবলার মতো, মাঝারি মানের কলেজে পড়ে, কিংবা হাইকোর্টের কেরানি, পান খেয়ে ঠোঁটের দুপাশে লাল আভা নিয়ে যে মহিলাটি উঠলো সে সকাল বেলা অফিসে অফিসে ঝাড়ু দেয়। পাঁচ টাকার ভাড়া দুই টাকা দেয়া নিয়ে বেশ কিছুক্ষণ তর্ক করবে কন্ড্যাক্টরের সাথে, কন্ড্যাক্টর হার মেনে নিয়ে নিজের ক্ষতি মেনে নিতেই আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেবে মহিলাদের সংরক্ষিত সিটে যে পুরুষটি বসে আছে তাকে সরিয়ে বসতে দেয়ার জন্য। এ নিয়েও কিছুক্ষণ তর্ক হবে। বসতে না পারা লোকগুলো হাত উঁচিয়ে রড ধরে রাখবে, বগলের নিচ থেকে বের হবে ঘামের বোঁটকা গন্ধ। পিছনের সিট থেকে কেউ থেমে থেমে কেশে উঠছে, আর সহযাত্রীর বিরক্ত মাখা মুখে নিজেকে ভদ্র প্রমাণ করার শেষ চেষ্টাটাও বৃথা হয়।
হাল-ফ্যাশনের ওড়নায় স্কার্ফ পড়ে যে তরুণীটি ইঞ্জিনের পাশে বসে আছে সে জানেনা, সে যতোই নিজেকে পর্দানশীল করে গড়ে তুলুক তার দিকে অন্তত বেশ কয়েক জোড়া চোখ আড়চোখে তাকিয়ে আছে সব সময়। সামান্য বাতাসে স্কার্ফ নড়ে গেলে কিংবা কড়া ব্রেকে একটু বেসামাল হয়ে গেলেই চোখ গুলো সরাসরি হামলা করে বসে তার হাতের নিচে, আঁটোসাঁটো জামার পেটের ভাঁজে। ঘামে ভেজা শরীরের ভাঁজগুলোকে কৈশোরে বাংলা নায়ক নায়িকার বৃষ্টিভেজা দৃশ্যও কল্পনা করে হয়তো কেউ।
তরুণীটির পাশেই যে মধ্যবয়স্ক মহিলাটি স্কুল ড্রেস পরা, গলা জড়িয়ে ধরা যে ছ’ সাত বছরের বাচ্চাটিকে কোলে নিয়ে বসে আছেন, ঠাণ্ডা চোখে তাকিয়ে আছেন ড্রাইভারের পিছন দিকে রাস্তার পাশের দোকান গুলোতে। তিনি জানেননা এই সন্তানটিই হয়ত আর আট-দশ বছর পরে এই এলাকারই কোনো রেস্টুরেন্টে ঘনিষ্ঠজনের সাথে একান্তে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় কাটাবে, আর তিনি ফোন দিলে বিরক্তি ভরে বলবে ‘মা। বিজি আছি। আই উইল কল ইউ ব্যাক’।
নয়তো মহিলাটির ভাবনায় আর বছর দশেক পরে স্বামীর চাকরি থেকে অবসর। ভাড়া বাসা ছেড়ে দেওয়ার চিন্তাটাও চুলের নিচ দিয়ে ফুঁড়ে ঢুকে যেতে পারে। তখন কোথায় যাবে? গ্রামে? থাকা যাবে? এতোদিনের শহরের সুযোগ সুবিধা নিয়ে পরে থাকা শহর ছেড়ে গ্রামে কিভাবে থাকা সম্ভব? শরৎ চন্দ্রের উপন্যাসে লেখা গ্রামগুলো আজকাল বড় চোখে ভাসে।
বাচ্চারা তো আর যাবেই না! বইয়ের পাতায় দেখা গ্রাম তাদের কাছে ছবির মতো। জোর করে নিয়ে গেলেও কয়েকদিনের পরে কি হবে? ‘বোরিং, ডিসগাস্টিং’, ‘কেনো নিয়ে এলে’ বলে গ্রামের অন্য আত্মীয়দের সামনে যখন তখন অপমান করবে নাতো?
ঠিক এই মুহুর্তেই বাসের মাঝখানের কোনো এক সারির সিটে নড়েচড়ে বসে মধ্যবিত্ত। আজকে সকাল সকাল বাসে উঠেই সিট পেয়ে গেছে। শহরে সকাল না হলেও গ্রামে এখন মানুষ অর্ধেক ক্ষেতের কাজ করে ফেলেছে, অথবা ঘর-দোর লেপে-পুছে রান্নাও বসিয়ে দিয়েছে করিৎকর্মা কোনো গৃহিনী। মোবাইলটা হাতে নিয়ে ভাবছে আব্বাকে ফোন দেবে কিনা; বর্গাচাষী রশিদকে এবার সবগুলো জমি দিয়ে দেয়ার কথা বলবে কিনা! গতবার অর্ধেক জমি করে ভালো ধান ফলিয়েছিলো সে।
পাশের সিটে আধা পাকা খোঁচা খোঁচা দাড়ি নিয়ে মধ্যবয়স্ক লোকটি ঘুমুচ্ছে। তার পিছনের সিটের লোকটি ঘাড়ের পিছনদিকে সিটের উপর দিয়ে হাত তুলে মুঠ দিয়ে রেখেছে; আঙ্গুলগুলো খোঁচা লাগছে মাথায়। ওদের কারও কোনো চিন্তাই সে জানে না।
কেবল শহরের কম বেতনের কর্মস্থলের পথে সস্তা মোবাইলটা হাতে নিয়ে বাড়ির চিন্তায়, আমাদের অসহায় মধ্যবিত্তটা!
-০-

©somewhere in net ltd.