| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ইদানীং/ আবছা রোগে মরে যায় বইয়ের পাতা/ ক্যালেন্ডারে নকশা আঁকে প্রাক্তন প্রেমের দাগ/ বাগানের ফুল চুরি করে যায় আবেগহীন গুবরে...
Every day cannot bring rain. কথাটার অর্থ হওয়া উচিত ছিলো প্রতিদিন বৃষ্টি হয়না। আগের দিন সারাদিন মাথার চাঁদি ফাটানো গরম আর রাতের বেলা ঝুম ঝুম বৃষ্টি। বাইরে ঠান্ডা আর ঘরের ভেতর অসহ্য গরম। এ দুইয়ে মিলে সারারাত ভালো করে ঘুম হয়নি তার। তবুও সকাল বেলা অফিসে যাওয়ার আগে ছাতাটাকে একবার হাতে নেয়।
যদিও খুব একটা ব্যবহার করেনা সে, তবুও মাঝখানের গোল অংশে একটা বড় ছিদ্র হয়েছে, ছিদ্রের আশেপাশের কাপড়টার অবস্থাও মলিন। গরীবের ছাতায় বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা, সস্তা রসিকতাটা মনে হতেই আপন মনে একবার হেসে নিল। ভাঙা,মলিন তবুও এটি দিয়েই কাটিয়ে দিয়েছে আজ ছয় বছর। সেই কবে অনার্স পড়ার সময় কোনো এক জন্মদিনে নিজের ব্যবহার করা সাদা ডোরাকাটা ছাতাটি সহসা উপহার দিয়ে বসেছিলো তার এক ক্লাসমেট বান্ধবী।
‘জানতাম না দোস্ত আজকে তোর জন্মদিন। নে এইটাই রাখ। প্রিয় মানুষকে প্রিয় জিনিসটাই দিতে হয়’।
বলে ছাতার কড়াটাতে চাপ দিয়ে বন্ধ করে মুঠোভর্তি করে দিয়ে দিয়েছিলো। বিনিময়ে তাকে একটা মাউন্টেন ডিউ এর কাঁচের বোতল খাইয়েছিলো। বাকিতে। কাল বিকেলের আগেই টাকাটা দিয়ে যাবে। এরকম একটা রফা দোকানীর সাথে করতে হয়েছিলো। যদিও মেয়েদের ছাতা তারপরও মেয়েলি ভাবটা কমই আছে, ছেলেদের বললে দিব্যি চলে যায়।
ছাতাটা আকাশের দিকে মেলে দিয়ে আরও কয়েকটা ফুটো খুঁজতে খুঁজতে ভাবলো, আচ্ছা ছাতাটা না হয় ভালো নেই; কিন্তু বান্ধবীটা কেমন আছে?
অনেক দিন দেখা হয়নি। শেষ কথা হয়েছিলো অনার্স ফাইনাল পরীক্ষার শেষ দিন। হলে ঢোকার আগেই বলেছিলো তার জন্য অপেক্ষা করতে। পরীক্ষা শেষ করে যখন চায়ের দোকানে এক-দুই চায়ের কাপে চুমুক দেবে তখন চোখে পরে অসম্ভব লাল দুটি চোখ নিয়ে আস্তে ধীরে ঢুকছে সে। কেনো যেনো জিজ্ঞেস করতে পারেনি, ‘তোর চোখ লাল কেনোরে?’
নিজেকেই সান্ত্বনা দিয়েছিল, হয়তো সারারাত পড়েছে। চা খাওয়া শেষ করে সে হঠাৎই বললো ‘সিগারেট খাবি?’ বেশ আশ্চর্য হয়েছিলো সে! গত চার বছর, সেশন জটে পরে মোট পাঁচ বছর তিন মাসে ২৬দিনে একদিনও সিগারেট খাওয়া দেখতে পারেনি। বরঞ্চ কোনোদিন সিগারেট খেয়ে এসে পাশে বসলে ধোঁইয়ার গন্ধ নাকে গেলেই কাশতে কাশতে নরকে যাওয়ার অভিশাপ দিতো, সেই আজকে বলছে সিগারেট খাবে কিনা!
‘হাঁ হয়ে আছিস ক্যান, খাবি কিনা বল?’
‘খাবো।’
পার্স থেকে টাকা বের করে দিয়ে বলেছিলো ‘যা দুইটা নিয়ে আয়। একটা আমার জন্য। বেনসন আনিস। ম্যাচ আছে?’
বিস্মিত চোখগুলো মাটির দিকে রেখে হঠাৎই কিলবিল করা প্রশ্ন মাথায় নিয়ে মাথাটা একদিকে হেলিয়ে সামনে এগিয়ে গিয়েছিলো সে। তবে এতো বছর পর মনে প্রশ্নগুলো ঠিকঠাক মনে না থাকলেও, কেন সিগারেট খাবে, বেনসনই কেনো খাবে, এটার নাম কোত্থেকে জানলো,এই ধরনের ভাবনাই ভাবছিলো বলে মনে হয়। সিগারেট নিয়ে আসতেই সবার সামনে সিগারেট ধরাচ্ছে দেখে সে একটু অস্বস্থি জানাতেই সে বলে উঠে ‘তোর কি অসুবিধা হচ্ছে? হলে চলে যা। আমার পাশে থাকার দরকার নেই তোর!’
ঠিক ওই মূহুর্তে ওকে বিদ্রোহী বিদ্রোহী লাগছিলো। তাছাড়া পাশে বসে একটা মেয়ে ফুঁক ফুঁক করে সিগারেট টানছে, খ্যাঁকখুঁক করে কাশছে, আশেপাশে হেঁটে যাওয়া পরিচিত মানুষ গুলো কেমন কেমন চোখে তাকিয়ে যাচ্ছে ব্যাপারটাতে বেশ লজ্জা লাগছিলো তার। হয়তো সে যাওয়ার পরপরই কোনো বেরসিক বন্ধু বলে উঠবে ‘কি দোস্ত! মাইয়াগো লগে বিড়ি খাইতে খুব মজা। আমাগো লগে তো আর খাইবানা, খাইবা?’
পুরনো কথা ভাবতে ভাবতে তৈরি হচ্ছিলো সে। আজ অফিসে অডিটর আসতে পারে বলে তার পিয়ন বন্ধুটি জানিয়ে দিয়েছিলো গতরাতে। আসলে পিয়ন হলেও একসঙ্গে বিড়ি-সিগারেট খাওয়ার সুবাদে বেশ ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছে। অনেক সময় অনেক খবরই আগাম বলে দেয় সে। সিগারেটখোরদের কিছু বাড়তি সুফল আছে, যেমন খুব তাড়াতাড়ি মানুষকে আপন করে নেয়ার ক্ষমতা, সার্কেল বাড়ানোর ক্ষমতা।
নাস্তা করার সময় নাই, দুই গ্লাস পানি খেয়েই দৌড় দিয়ে সিঁড়ি ভাঙতে লাগলো। চাকরিটা আজ থাকলে বাঁচে সে!
বান্ধবীর কর্মকাণ্ডে বেশ বিরক্ত লাগছিলো তার। তবে সে নিজে যে নারী স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না তা না, তবে সে পরিবেশ কি তৈরী হয়েছে এখনো?
যাওয়ার আগে কোলে নোটভর্তি ভ্যানিটি ব্যাগটি একপাশে রেখে শেষ কথা বলেছিলো,
‘তোর হাতটা একটু দিবি? ধরবো!’
কিছুটা বিরক্তি, কৌতূহল, উত্তেজনা, শরীরের কম্পন সব মিলিয়ে যখন তার হাত ধরেছিলো; দুইজনের হাতই ঘামছিলো। ঘামছে কেনো নিজে? সে? দুইজনেই? ও না হয় মেয়েটিকে মনে মনে পছন্দ করে বলে স্নায়ুর চাপে ঘামছে, তাহলে কি মেয়েটিও তাকে পছন্দ করে?
কি জানি আজ পর্যন্ত উত্তর পায়নি। জিজ্ঞেসও করেনি। যেদিন মাস্টার্স ভর্তির শেষ তারিখ সেদিন কল দিয়েছিলো। নাম্বার বন্ধ। ক্লাসের কেউই তার খবর দিতে পারেনি। আর বলেছে তুই যেখানে জানিসনা, আমরা কি করে জানবো? তোর সাথেই না মাখামাখি ছিল!
এতোদিন পর বছরখানেক আগে জেনেছে ব্যাংকার স্বামী, দুই সন্তান নিয়ে ভালো আছে সে।
তবে কি সে তাকে ভালোবাসতো না?
বাসের সামনের সিটে মধ্যবয়স্ক লোকটি কিসে চাকরী করে জানতে ইচ্ছে করছে তার। অনেকক্ষণ ধরে নিজের ডায়াবেটিস নিয়ে রাজকীয়ভাবে পাশের লোকটির সাথে প্যাটরপ্যাট করে যাচ্ছে সে। খেতে পারেনা আগেরমতো, পেট ভরে খাওয়া কি অনেক দিন অনুভব করেনি সে এই সব। কিন্তু শরীর দেখে মনে হচ্ছে এই শরীর একদিনে হয়নি। হররোজ আলস্যদেবীকে পূজা করা শরীরে মাত্রাতিরিক্ত ওজনের লোকটার শরীরে ডায়াবেটিস বাসা বাঁধলে তো আফসোসই হওয়ার কথা!
ছোটবেলায় কেটে ফেলে রাখা গাছের ডালে ওঠে সবাই একসুরে একটা ছড়া কাটতো, ‘পেটটা ঢোল, মাথাটা গোল’। লোকটাকে দেখে সেই ছড়াটার কথাই মনে পড়ছে বারবার।
ডানপাশের ফ্রেঞ্চ কাট দাড়ির লোকটি ভাড়া নিয়ে রীতিমতো ঝগড়া শুরু করে দিয়েছে কন্ড্যাক্টরের সাথে। কন্ড্যাক্টর বলছে ভাড়া দশ টাকা, আপাদমস্তক ভদ্র পোষাক পড়া লোকটি বলছে আট টাকা। ফ্রেঞ্চকাটের দাবি, সে প্রতিদিন যায় বলে ভালো ভাড়া জানে। কন্ড্যাক্টর মধ্যবিত্তের দিকে তাকিয়ে বলে,
‘দেহেন ত ভাই, আমি বাসের ইস্টাপ। উনি ভাড়া আমার চাইতে বেশি জানে নি?’
ফ্রেঞ্চকাটের কথা শুনে সে স্পষ্ট বুঝে গেল সে মধ্যবিত্ত হলেও মানসিকতার দিক দিয়ে অত্যন্ত নিম্নবিত্ত। অত্যন্ত মধ্যবিত্তের মান সম্মানবোধ বেশ প্রখর থাকা উচিত। আর কিছু হোক, অন্তত ফ্রেঞ্চকাটকে সমর্থন দেবে না সে।
‘হ, ঠিক কইছেন, ভাড়া দশ ট্যাকাই’।
জ্যামে আটকে অডিটরের চিন্তায় কন্ড্যাক্টরকে সমর্থন দেয় মধ্যবিত্তটি।
-০- 
©somewhere in net ltd.