নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

অসুস্থ শহরের নাগরিক মন, তাই পালিয়ে বেড়ানোর আয়োজন...

কাঙাল মিঠুন

ইদানীং/ আবছা রোগে মরে যায় বইয়ের পাতা/ ক্যালেন্ডারে নকশা আঁকে প্রাক্তন প্রেমের দাগ/ বাগানের ফুল চুরি করে যায় আবেগহীন গুবরে...

কাঙাল মিঠুন › বিস্তারিত পোস্টঃ

মধ্যবিত্তের নাগরিক কথন-৫

২৪ শে অক্টোবর, ২০১৭ দুপুর ২:১২

সূর্যটা তার বাড়ি যাবে বলে যেদিকে হেলে পড়ে, অফিস শেষে সেদিকটাতেই মুখ করেই হাঁটতে হয়। জ্যামে চিঁড়ে-চ্যাপ্টা হওয়ার চেয়ে হাঁটতে হাঁটতে খারাপ লাগে না। মাঝে মাঝে একটু একটু বাতাস লাগে। এতে যতোটুকু না শান্তি পাওয়া যায় তার, জ্যামে বাসে আটকে ঘামে ভিজতে থাকা লোকগুলোকে দেখলে আরও প্রশান্তি হয়। এটা ঠিক রেসিজম কি না বলতে না পারলেও রেসিজম ব্যাপারটা আমাদের রক্তে মিশে আছে। নইলে সারাদিন অফিস খেটে বাসায় ফিরছে সেও, তাহলে কেনো জ্যামে পড়া লোকগুলো দেখে তার আনন্দ হবে?
রোদ সরাসরি চোখে এসে যখন লাগে খুব বিরক্ত লাগে মাঝেমধ্যে। ছোটবেলায় একই রকম ভাবে রোদ লাগতো। শুধু মুখের বাম পাশে। সকাল সকাল পূর্ব দিকে রোদ, মাইল চারেক হেঁটে দক্ষিণ দিকে যেতো সে। স্কুল শুরু হতো ১০টায়, কিন্তু সকালেই পৌঁছানোর তাড়া থাকতো। নইলে রোদ খুব তেতে উঠতো। আর ফেরার সময়ও একই ঘটনা। উত্তর দিকে আসতো, বাম গালে রোদ লাগতো। মাঝে মাঝে শুক্রবার করে আয়নায় চোরা চোখে দেখতো, বাম গালটা আসলেই ডান গালটার চেয়ে কালো কি না! কখনো কখনো নিজের মনে হাসতো, এরকম এক গালের সুন্দরী মেয়েদের কি হবে, বিয়ে হবে না নাকি!
ক’দিন আগে কাদের যেনো একটা র্যা লি হচ্ছিলো, রাস্তায় যানজটে গাড়ি যখন ইঞ্জিন স্টার্টে রেখে সত্তুর বছরের বৃদ্ধের মতো ঠকঠক করে কাঁপছিলো; পিছন ফিরে দেখছিল কতোটুকু এসেছে মাত্র। যদিও অর্ধেক রাস্তা এসেছিলো মাত্র, তখনি বাসের পিছনদিক থেকে র্যা লি বাসটাকে ওভারটেক করে যাওয়া শুরু করে। মনে মনে হিসেব করে নেয়, র্যা লি শেষ হতে যে সময় লাগবে এই জ্যাম ছাড়তে আরো দুইগুণ বেশি সময় লাগবে। আগ পাছ না ভেবে নেমে র্যা লির লোকেদের ভিড়ে মিশে যায়।
মিশে গিয়ে খেয়াল করেছিল সবার মাথাতেই সাদা ক্যাপ। আশেপাশে তাকাতেই একটা মধ্যবয়স্ক লোক হাতে একটা ক্যাপ ধরিয়ে দিলো। সাদা ক্যাপে গোলাপি রঙে কিছু একটা লেখা। মাথায় দিয়ে মনে মনে ভাবছিল কি লেখা দেখতে। কিন্তু লেখা দেখেই লাভ কি আর। অন্তত পঞ্চাশটা টাকা তো বেঁচে গেলো। এখন থেকে সময়-অসময়ে এই ক্যাপ মাথায় দিয়ে রোদ কিছুটা হলেও বাঁচানো যাবে।
আজ রোদের উত্তাপ পেয়ে ক্যাপের কথা মনে হতেই ব্যাগ হাতড়ে ক্যাপটা খুঁজে পেলো না সে। বাসায় রেখে এসেছে। ময়লা হয়ে গিয়েছিলো। ধুয়ে দেবে বলে বাথরুমে রেখেছিলো, আর ধুয়ে দিতে মনে নেই। বাথরুমের কথা মনে হতেই হারপিকের কথা মনে হলো। একটা হারপিক নিয়ে যাওয়া লাগবে। অন্তত ফ্লোরটা পরিস্কার না করলে কাপড়ও ধোয়া যাবে না। বেশ পিচ্ছিল শ্যাওলা পড়ে আছে। মনে হিসেব করে দেখলো হারপিক নেওয়া যাবে না, টাকা নাই। তাহলে? হঠাৎ মাথায় ১০০ ওয়াটের বাল্ব, সার্ফ এক্সেল নিলেই তো হয়!
আজকাল সাথে একটা ঝোলানো ব্যাগ নিয়ে ঘোরে সে। একটা পাতলা মতোন গল্পের বই, একটা প্যাড, একটা কলম রাখে। মাঝে মাঝে পানির বোতলও রাখে। এতে একটু ওজনদার হলেও কিছু মনে করে না। এই মরার শহরে এক গ্লাস পানি খেলেও এক টাকা! ভাংতি না থাকলে কোনো কোনো দিন একেক দোকানি বলে উঠে ‘মামা, এক ট্যাকা ভাঙতি নাই। এক গেলাস পানি খায়া ফালান।’
অথচ এক টাকার বাদামটানা কিংবা গুড় জ্বালের নারকেলটানা খেয়ে কতো পেট ভরিয়েছে ছোটবেলায়! যেদিন দুইটাকা হাতে সেদিন এক দৌড়ে ভাজাপোড়ার দোকানে। গরম ভাজা দুই রকমের পুরি, আলু পুরি আর ডাল পুরি। কিন্তু সমস্যা হতো একা খেতে গেলে। প্রথমত একটা পুরি একা খাওয়া যেতো না, দ্বিতীয়ত একা একটা কিনলে আরেকটা কেনা যেতো না। কারণ একেকটার দামই দুই টাকা। কোনোদিন সঙ্গী পেলেই বেশ মজা হতো; দুটো পুরি কিনে দোকানিকে দিয়ে ভাগ করিয়ে নিতো সমান দুই ভাগে। এরপর বাজারের পিছন দিকে কোনো মতে চেপেচুপে, মুখটা কোনোরকম ভদ্দরলোকের মতো করে খেলার মাঠটা পেরুতে পারলেই ভোঁ-দৌড়! মাঠের পিছনে যে বেতের ঝোপটা, সেখানে একটা কাঁচের সিরাপের পুরনো বোতলে লবণ-মরিচ গুঁড়া মাখানো থাকতো। সময় সময়ে ওখানে কাঁচা আম, বড়ই, খাওয়া হতো। যখন যে ফল প্রায় শেষের দিকে, তখন বিকল্প কিছু একটা বের করা লাগতো। হাঁটতে হাঁটতে ভাবতো, একটা ঝিনুকের খোলের মাঝ বরাবর ব্রিজের সিমেন্টে ঘষে ঘষে ধারালো করতে হবে। আমের খোসা ছাড়ান সহজ হয়।
ছোটবেলার কথায় হঠাৎই রাফিনার চেহারাটা মনে আসলো তার। তার বয়স যখন বছর সাতেক, তখন রাফিনার জন্ম। কোলে করে বড় করলেও কোনোদিন চাচাতো বোনের মতো দেখতে পারেনি সে, একটু কেমন যেনো লাগতো। ওকে দেখলেই বুকের কোথায় যেনো একটা মোচড় দিয়ে উঠতো। ও যখন ভার্সিটিতে পড়ে, রাফিনা তখন এসএসসি পরীক্ষা দেবে। পরীক্ষার আগে খুব দামি একটা কলম আর স্কেল দিয়ে বলেছিলো ‘পরীক্ষাগুলো তোর জন্যে দে, কিন্তু রেজাল্টটা আমার। ভালো রেজাল্ট না করলে তো ভালো চাকরি পাবি না। আমার একার আয়ে তো সংসার চলবে না।’
রাফিনা কি বুঝেছিলো কে জানে! শুধু চোখ গুলো নিচের দিকে রেখে, ডান পায়ের বুড়ো আঙ্গুল দিয়ে মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে একটা কথাই বলতে পেরেছিলো ‘কালকা সকালে আমার সাথে পরীক্ষার হলে যাইবেন? আমার একলা ডর লাগতাছে’। সে গিয়েছিলো, আর পরীক্ষার হলে ঢোকার আগে একটা সাফারি চকলেট কিনে দিয়েছিলো। বলেছিলো প্রশ্ন দেখে ভয় পেলে এটা খেলে ভয় কেটে যাবে।
রাফিনার ভয় কেটেছিলো কি না জানে না সে। তবে একা একা অনেক কাজ করতেই শিখে গিয়েছে সে। গত বছর সে যখন ঢাকায় পাকাপাকি চলে এসেছে তখন রাফিনা পড়তে চলে গেছে খুলনার দিকে। ভার্সিটি বন্ধ হলে একা একা যাওয়া আসাও করতো। তখন ভয় করতো কি না কে জানে।
একটু আগে মা ফোন দিয়েছিলো, পরশু শুক্রবার রাফিনার বিয়ে। পড়াকালীন সময়ে বিয়ে করতে মানা করেছিলো সে। কিন্তু কেনো বিয়ে করতে রাজি হয়েছে বোঝা যাচ্ছে না। তাছাড়া কেনো পড়াশোনা চলা সময়েই বিয়ে করবে না, সেটা কি রাফিনাকে কখনো ব্যাখ্যা করেছিলো? মনে পড়ে না!
সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতে অফিসের কাছেই চলে এসেছিলো। হাঁটার গতি একটু কমিয়ে দিয়ে মিছিল থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিলো। অফিসে ঢোকার মুখে ডান পাশের দোকানে সে যায় না, দোকানিটা বেশ হোঁৎকা মুখো। তাই বাম পাশের দোকানটাতে এক গ্লাস পানি গলায় ঢালতে ঢুকেছিলো মধ্যবিত্তটি।
মাথা উঁচু করে গ্লাসটি খালি করতে হঠাৎ দেখেছিলো থরে থরে সাজানো সাফারি চকলেট। আগ পাছ না ভেবে ছয়টা কিনে নিয়েছিলো।
চাঁদ তারা যাই উঠুক, সেদিন সারারাত আকাশের দিকে তাকিয়ে থেকে আর সাফারি চকলেট খাবে বলে মনে মনে ভেবেছিল।
হাঁটতে হাঁটতে আনমনে পকেটে হাত দিয়ে প্রায় গলে যাওয়া একটা নিঃসঙ্গ চকলেট পেলো। একটু অবাক হয়ে বের করতেই আকাশের দিকে তাকালো, মনে হলো এই পড়ন্ত বিকেলেও অনেকগুলো তারা দেখা যাচ্ছে।
মোড়ক খুলে মুখে দিয়ে চিবুতে চিবুতে খেয়াল করলো সে; নিঃসঙ্গ চাঁদের চেয়ে একলা তারাগুলোই আজকাল তার চোখে পড়ে বেশি।
-০-

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.