| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ইদানীং/ আবছা রোগে মরে যায় বইয়ের পাতা/ ক্যালেন্ডারে নকশা আঁকে প্রাক্তন প্রেমের দাগ/ বাগানের ফুল চুরি করে যায় আবেগহীন গুবরে...
ঘটনাটা অন্য রকম ঘটতে পারত।
তার জন্ম হতে পারতো সোনার চামচ মুখে নিয়ে। রূপোর থালায় মা তাকে খাবার খাওয়াতেন। চাকর-চাকরানীর একোল-ওকোল বদল করে সে হতে পারতো অনেক খেলনার মালিক। আধো মুখে ‘ব্যা ব্যা ত্যা ত্যা’ শুনে আনন্দে আহ্লাদে না চাইতেও তাকে এনে দিতো খেলনা, সাইকেল। কিংবা বাজারের সেরা আইসক্রিমটি। কিংবা সবচেয়ে দামি চার্জার রিমোট কন্ট্রোল গাড়ী। একটু বড় হয়ে তার নিজস্ব আকাশী বা গোলাপী রঙের রুমের জানালা দিয়ে দেখতো এক চিলতে আকাশ। কখনো ছাদে বসে ভাবতো পৃথিবীর শেষ সীমানাটা ঐ!
কিন্তু তা হয়নি।
তার জন্ম হয়েছিলো মধ্যবিত্ত এক পরিবারে। সবচেয়ে বড় বোন; বড়বু’ জন্মের কিছুদিন পর থেকেই অর্থাভাবে গরুর দুধ নয়, ভাত খেতে শুরু করেছিলো। সকালে বাবা ভাত খেয়ে অফিসে গেলে মা অবশিষ্ট ভাতের সাথে ভাতের মাড় মিশিয়ে সকালের খাওয়াটা সারতেন।
বড়বু’ নাকি মামা বাড়ি যেতো সস্তা পোষাকগুলো পড়ে। বড়লোকদের বাসাবাড়ির পুরনো কাপড় কিনে একটু ধুয়েই যারা নতুন মাল বলে বিক্রি করতো, যেগুলোকে গ্রামের বাড়িতে ‘নিলাইম্মা পোশাক’ বলে সেগুলোই। কোনোদিন অফিস ফেরত ছাপোষা বাপটা রাস্তার পাশে ‘তিরিশ টাকার মাল ১০’এ বিক্রি করা কোনো হকার থেকে কিনে এনে নতুন খবরের কাগজে মুড়ে নিতো। বাড়িতে ঢোকার আগেই ডাক দিতো ‘কই রে?’; লাফাতে লাফাতে মাথা ন্যাড়া, ঢোলা হাফপ্যান্ট পরা মেয়েটি সামনের সামনের কয়েকটা দাঁত বের করতেই নাকের ছিদ্র থেকে সর্দি ঝরে পড়তো। এক হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মেয়েটি সর্দি মুছতে মুছতেই পুরনো সাইকেলটাকে অনেক আর্তনাদ করিয়ে দাঁড় করিয়ে দিতেন বাবা। মেয়েটার সামনে নতুন খবরের কাগজে মোড়া পুরনো জামাটি ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে বলতেন ‘দেখ মা তোর জন্য কি এনেছি!’ হয়তো দামি কাপড় না দেবার আক্ষেপ মুখের হাসিতেই ছড়িয়ে দিতেন, বোনের কি আর তখন নতুন পুরনো বোঝার জ্ঞান ছিলো? থাকলে কি ওগুলো পরতো?
শীতের দিনেও তাই হতো। তীব্র শীতেও এরকম পাতলা শীত পোষাকে ঠির ঠির করে কাঁপতো বড়বু’। আর অবস্থা সম্পন্ন আত্মীয়রা এ বিষয়ে বাবাকেই খোঁটাটা বেশি দিতেন। যেনো ইচ্ছে করেই মেয়েটাকে পোশাক কিনে দেয় না।
আহারে!
এরপরের যে বোন, মধ্যবিত্তটি শুনেছে মা তাকে বড় করেছেন ভাতের মাড় খাইয়ে। শিশুর পরিপূরক খাদ্য হিসাবে যে পরিমান গরুর দুধ খাওয়ানো দরকার সে সময়ে তা কেনার সামর্থ্য মধ্যবিত্ত বাবাটির ছিলোনা।
এরপর তার জন্ম।
ততোদিনে নাকি পরিবারের অবস্থা অনেক খানি বদলেছে। বছরে অন্তত দু-তিনটে ‘রেডকাউ’ এর টিনের কৌটা ঘরে ঢোকার সামর্থ্য হয়েছে। বড় বোন-মেজো বোন শৈশবের অপ্রাপ্তির ফল গুঁড়ো দুধ চুরি করে খেয়ে পুষিয়ে নেয়। ফলে খালি কৌটার সংখ্যা বাড়ে। মা’র ঘর-গেরস্থালির কাজেও লাগে। আবার কখনো দুধ চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়ে মায়ের কাছে বকুনি খায়।
তাই সে সোনার চামচ বা রুপার চামচ নিয়ে না জন্মালেও স্টিলের চামচ মুখে নিয়েই জন্মেছিলো। দুই বোনের আদর পেয়ে ছন্নছাড়া হয়েছে।
একটা অপরিচিত প্রজাপতির পিছন ছুটে বাউণ্ডুলে হয়েছে। খেলার ছলে একটা গঙ্গাফড়িং ধরে তার লেজে সুতো বেঁধে সারাদিন নির্মম খেলা খেলে সন্ধ্যায় অনুতপ্ত হৃদয়ে দুঃখ পেয়েছে। মগডালে পাখির বাসায় হায়েনা হয়ে আক্রমণ করে বাচ্চা পেড়ে এনে মায়ের কাছে বকুনি খেয়েছে।
একা একা মন খারাপ করে সারাটা দুপুর বু’দের স্কুল থেকে আসার অপেক্ষায় বাগানে বটগাছটার নিচে বসে থেকেছে। বু’র টিফিনের পয়সায় আনা আট আনার আমড়ার অর্ধেকটা খেয়ে তাদের সাথে বাড়ীর পথ ধরেছে।
দুপুরে নদীতে সাঁতার কাটতে গিয়ে চোখ লাল করে ফিরেছে। বিকেলে, বড়শিতে মাছের বদলে ঢোঁড়া সাপ ধরে বড়শি ফেলে পালিয়েছে।
সন্ধায় ঘুমে ঢুলুঢুলু চোখে, মায়ের ভাত না দেয়ার শর্ত কিংবা চোখে কাঁচামরিচ ডলে দেয়ার ভয়ে সারা বাড়ি চিৎকার করে মাতিয়েছে ‘আমার দেশ বাংলাদেশ, ঢাকা তার রাজধানী .........’
ইদানীং অফিস ফেরতা গুমোট দিনগুলোতে হঠাৎ হঠাৎ গোধূলী আকাশের দিকে তাকিয়ে সব গুবলেট মনে হয়, এলোমেলো মনে হয়। পুরনো দিনের কথাগুলো মনে পড়া কি খুব দরকার! ছোটবেলার কথা মাথায় আসা কি খুব দরকার?
এখন কিছুই তো একরকম নেই। সেও বড় হয়ে গেছে। তা না? আসলেই কি সবাই বড় হয়? না বড় হওয়ার ভান ধরে?
রাস্তার পাশের টং দোকান দেখে থামলো। দেখে দেখে খুব দামী একটা সিগারেট কিনে ধরালো সে। সে যে বড় হয়ে গেছে অন্তত নিজের কাছেই এটা প্রমাণ করা দরকার!
খুকখুক কেশে খানিকটা শুকনা ধোঁয়া আকাশের দিকে ছেড়ে ভাবতে লাগলো, তার জীবনের ঘটনাটা এরকম না ঘটলেও পারতো।
-০-

©somewhere in net ltd.