| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ইদানীং/ আবছা রোগে মরে যায় বইয়ের পাতা/ ক্যালেন্ডারে নকশা আঁকে প্রাক্তন প্রেমের দাগ/ বাগানের ফুল চুরি করে যায় আবেগহীন গুবরে...
ইদানীং কিছু ব্যাপার নিয়ে ভাবতে শুরু করেছে সে। নোটিশ ছাড়াই হঠাৎ হঠাৎ মাথায় এসব ঢুকে যায়। অফিসের যাওয়ার সময় রাস্তার পাশেই যে নার্সারি স্কুলটা, সেখানে বাচ্চাকে স্কুলে দেওয়ার জন্য হঠাৎ হঠাৎ রাস্তার মাঝখানেই দামি গাড়ি থামিয়ে জ্যাম লাগিয়ে দেয় মুখ ভার করে থাকা অভিভাবকগুলো। অসম্ভব রকমের গম্ভীর মুখ করে থাকা বাবা-মা গুলো সাদা ধবধবে, খরগোশের মতোন সাদা আর কালো ভুরুর নিচে কালো চোখের মানব ছানাগুলোকে যখন গাড়ি থেকে হাত ধরে নামায় তখন মনে হয় এই মানব শিশুগুলো কি আসলেই এদের? অন্তত সাদা চামড়া ছাড়া কোনো মিল দেখা যায় না। আশেপাশে পথচলতি মানুষের ভোগান্তি বাড়িয়ে এই বাবা-মা বা নাগরিকগুলো কি সন্তানদের এই শেখাচ্ছে যে গাড়ি থাকলেই সব করা যায়। হুটহাট থামানো যায়? জ্যাম লাগানো যায়? রং সাইডে গিয়ে রিকশাওয়ালাকে ধমকানো যায়? আরও অনেক কিছু যায় থেকে জায়েজ বানিয়ে নেয়া যায়?
তার ছেলেবেলাটা কি এরকম ছিলো? মাথায় ঘুরতে থাকে অঞ্জনের ‘বাড়ি ছেড়েছি ডিসেম্বর মাসে, ছাড়তে হয়নি দাদা তাড়িয়েছে, ফিরতে হলে আড়াইশো টাকা...’ গানটি।
না দাদা তাড়ায়নি। বাবাই বের করে দিয়েছিলেন। অবশ্য বের করে দেওয়া কি না বলা মুশকিল, ভাগ্য বদলের সওদা করতে পাঠিয়েছিলেন। ইংরেজির বারো মাসের কোন মাসটি যে আসলে জীবনের কালো দাগ দিয়ে দিয়েছে; তা অনেক নিঃসঙ্গ রাতে, ঘুমানোর আগের সময়টাতে, কোনোভাবেই মনে করতে পারেনি সে।
তবে মনে আছে স্কুলের চৌহদ্দি পার হওয়ার আগেই তল্পিতল্পা গুটিয়ে, বাড়ির পাঠ চুকানোর কলমটা হাতে নিয়ে গ্রামের পথে রিকশার জন্য দাঁড়িয়েছিল। সে রিকশাটাই তার গ্রাম্য পরিচয়ের শেষ প্যাডেল ঘুরিয়ে শহরে এনে ফেলেছে। সেই আবেগ মাখা কিশোর বয়সে বাড়ি যেত সপ্তাহে একবার। মা -বাবাও তেমন কিছু বলতেন না। ধীরে ধীরে কমে আসে বাড়ির টান। নাড়ির টান। হয়তো তখন কল্পনায় অন্য শহরের অন্য কোনো নারীর টান।
ধীরে ধীরে হয়ে যায় পুরোদস্তুর শহুরে। কিন্তু আসলেই কি? কতোটুকু? বুকের ভিতর সবুজ ধানক্ষেত নিয়ে কতোটুকু শহুরে হতে পেরেছে আজকের ভোল পালটানো মধ্যবিত্তটি?
ভাগ্য অন্বেষণের পথে কোনো নির্দিষ্ট ঘর ছিলোনা তার, আজকে যেমন নেই। এই মেস, ওই মেস কিংবা হোস্টেল, মেস বোর্ডারের সাথে বাজার করা নিয়ে দর কষাকষি, রুমমেটের নাক ডাকার শব্দে সমূহ অনিদ্রার ভবিষ্যৎ দেখে দেখেই পার করে দিয়েছে অর্ধেক জীবন। যে বয়সে পরিবারের কাছ থেকে সামাজিক রীতিনীতি শিক্ষা নেয়ার কথা, সে বয়সেই পরিবার থেকে অনেক দূরে নিজের ভবিষ্যৎ গড়তে চিন্তিত, শঙ্কিত মধ্যবিত্তটি ভুলতে বসেছিল পরিবারের সংজ্ঞা। বাবা মায়ের মুখ, ছেলেবেলার সহপাঠীদের ফুটবলের লাথি, বার্ষিক পরীক্ষা শেষে খোলা ধানক্ষেতে দৌড়ানোর অবাধ স্বাধীনতা। অথচ পরীক্ষার খাতায় দিব্যি মুখ বুঁজে লিখতে হয়েছে ‘পরিবারই প্রথম শিক্ষাদাতা সংগঠন...’!
এখনো হঠাৎ হঠাৎ বুকে ঘা লাগে এইসব বাচ্চাদের দেখলে, কি সুন্দর করে বাবা মায়েরা স্কুলে দিয়ে যায়। অথচ তার ছেলে বেলায় স্কুলে ঠিকঠাক গিয়েছে কি না রাখার দরকার কারো ছিলো কি না চিন্তার ব্যাপার। প্রথম যেদিন স্কুলে যায় সেদিন বাবা হেডমাস্টারকে বলেছিলেন, ‘মানুষ না হইলে স্যার জানডা খালি রাইখেন। হাড্ডি-মাংস না থাকলেও চলবো।‘
আজ মানুষ হয়েছে কি না জানে না, তবে পরিচিত কেউ যদি বলে ‘শহরে থাকি, বাসায়। বাবা মায়ের সাথে।’ খুব হিংসা লাগে। চিৎকার করে বলতে ইচ্ছে করে ‘আমারও বাসা আছে,পরিবার আছে, বাবা-মা আছে!’
পারে না। এই সমাজ তাকে শিখিয়েছে তোমার কোনও বাড়ি নেই। জীবন নৌকা কোথায় গিয়ে ঠেকবে তুমি জানো না। কাজ করে যাও। জীবন তোমার, স্বার্থপরের মতো গুছিয়ে নাও। অন্যের দিকে তাকানোর সময় নেই এখন। এ বড় আজব প্রতিযোগিতাময় সময়।
মধ্যবিত্তটির পাওয়া হয়নি ঘরের সুখ। গভীর রাতে বাবা মায়ের সাংসারিক আলাপ, পরনিন্দাকারিনী নারীর শত্রুকে দেয়া অভিশাপ, নবদম্পতির টুকরো খুঁনসুটি, সদ্য জন্ম নেয়া শিশুর অধিকার আদায়ের সুতীব্র চিৎকার!
তার আর বাড়ি যাওয়া হয়না।
কতোদিন? আঙুলে গুনতে ইচ্ছে করছে না আর। অনেক দিনের পুরনো চৌকির ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ, টেবিলে ঘুণপোকার কটকট আওয়াজ, বুড়ো ফ্যানের ঘ্যাঁসঘ্যাঁস ছাপিয়ে কানে বাজে নিস্তব্ধ গ্রামের ঝিঁঝি পোকার ক্রন্দন, রাত বিরাতের ঘুমভাঙা পাখির হৃদয়চেরা আর্তনাদ, মধ্যরাতের দমকা বাতাসে গাছের পাতার উদাসীন ডাক।
যে বুড়ো সজনে গাছটার ফুলের গন্ধে ছেয়ে যায় সারা বাড়ি সেটা আছে কিনা, গোয়াল ঘরে আশ্রয় নেয়া চড়ুইয়ের দল অন্য কোথাও ডেরা বেঁধেছে কিনা, এই বর্ষায় বাড়ির পিছনের ডোবাটায় কোলাব্যাঙেরা দলবেঁধে ডাকলো কিনা, এই ফাগুনে নতুন কলমের আম গাছটায় মুকুল আসলো কিনা, বট গাছের মগডাল থেকে পেড়ে আনা টিয়াপাখির বাচ্চাটার জন্য সেই মা পাখিটা তাকে ক্ষমা করেছে কিনা, বড্ড জানতে ইচ্ছে করে আজকাল।
সবার সব নদী হয়তো শুকায়, সব পাখিও ঘরে আসে। কিন্তু মধ্যবিত্তটির বেয়ে চলার নদী শুকায় না, দিন গোধূলী হয়না। সেও ক্লান্ত পাখির মতো নিজের ঘরে ফেরে না।
ছ’তলার ফ্ল্যাটে খরচ বাঁচাতে আরও চারজন রুমমেটসহ থাকে। অথচ তার গ্রামের বাড়ির থাকার ঘরটায় থাকার কেউ নেই। মালিকের মেয়ের বিয়ে। আগামী মাসে। এখন থেকেই আলোকসজ্জা চলছে, জানালা দিয়ে নেমে আসা লতার মতো কারেন্ট বাতিগুলো মিটমিট করছে থেকে থেকে।
ঘুমের বড়িগুলো গলায় ঢালার আগে ৩৩ কোটি দেবতা আর ১ লাখ ২৪ হাজার পয়গম্বরের দিব্যি-কিরা-কসম কেটে শপথ নিলো, তাজা তাজা দামী ফুলের নরম বিছানায়, ডিজে মিউজিকের বিনিময়ে বাড়িওয়ালার মেয়েটির কুমারীত্ব বিক্রি হওয়ার আগেই তার কাছে মধ্যবিত্তের আত্মাটা বন্ধক দিয়ে আসবে।
-০-

©somewhere in net ltd.