নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

অসুস্থ শহরের নাগরিক মন, তাই পালিয়ে বেড়ানোর আয়োজন...

কাঙাল মিঠুন

ইদানীং/ আবছা রোগে মরে যায় বইয়ের পাতা/ ক্যালেন্ডারে নকশা আঁকে প্রাক্তন প্রেমের দাগ/ বাগানের ফুল চুরি করে যায় আবেগহীন গুবরে...

কাঙাল মিঠুন › বিস্তারিত পোস্টঃ

মধ্যবিত্তের নাগরিক কথন-১১

০৩ রা নভেম্বর, ২০১৭ রাত ৮:৪৩


জীবনটাকে একই রুটের গাড়ির মতো মনে হচ্ছে ইদানিং। যেনো এক পয়েন্ট থেকে যাত্রা শুরু করে আবার একই জায়গায় ফিরে আসা সিটিং সার্ভিসের গাড়ি। কেবল টিকেট কেটে উঠে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা। তবুও গাড়ি গুলোর থেমে থাকার কিছু লিমিটেশন আছে। কোথাও কোনও কাউন্টারে একটু হলেও থেমে দাঁড়ায়। কিছু যাত্রী নেমে যায়, আবার কিছু ওঠে। পুরো সিস্টেমটাকেই পৃথিবীর একটা ছোট সংস্করণ মনে করলে গাড়িটা হলো পৃথিবী, বিভিন্ন দামের টিকেট হলো বয়স, যা বিভিন্ন স্টপেজে নেমে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়। বাসের বিভিন্ন সিটগুলো ধনী-মধ্যবিত্ত-গরীব ইত্যাদির শ্রেণি। একদম শেষ দিকে যারা বসে তারা গরীব। লিকলিকে ঘামে ভেজা সিট, ভাঙা জানালায় বালি-বাতাসের অবাধ আগমন। চলতি বাসে খানা-খন্দ-স্পিড ব্রেকারের ঝাঁকি খেতে খেতে সামনে এগোয় আর বাসের ড্রাইভারকে বাপ বাপান্ত করে, যেনো ঈশ্বরের বিরুদ্ধে নিরন্তর অভিযোগ করে যাওয়া একদল বাস্তুহারা মানুষ। যেনো কোনো ফ্ল্যাট বাসার নিচ দিয়ে হেঁটে যাওয়া পথচারীর উপর চৌদ্দ তলা থেকে ফেলে দেওয়ার রান্না ঘরের নোংরায় মাখামাখি লোকটা উপরের দিকে তাকিয়ে অজানা কাউকে গালি গালাজ। যেনো বাড়ির আশে পাশে ঘুরঘুর করা নেড়ি কুকুরটার গায়ে বাড়ির কর্ত্রীর বসে থাকা জলচৌকিটি অকারণে ছুঁড়ে দেওয়ার পর কুকুরটার ঘেউঘেউ মন্তব্য। যেনো এরা গরীবের মধ্যে আরও গরীব, ছোটলোকের মধ্যে আরও ছোট লোক।
অফিস ফিরতি পথে মাঝে মাঝে চোখ আটকে যায় কিছু বড় বড় গাছের ডালে, এদের মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকাটাকে এক রকমের ঔদ্ধত্যই মনে হয়। এখানে এ দালানের সঙ্গে ও দালান পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলে, উচ্চতার গর্বে পা মাথা সটান করে দেওয়া আকাশমুখো ইটগুলোর ভিড়ে এই প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে চলা গাছগুলোর বেঁচে থাকা কি খুব দরকার?
সন্ধ্যার বাতাসটা তার নৌকা পালে হাওয়া লাগিয়ে গোধূলির শেষ বেলাটা উপভোগ করছে। জীবন থেকে হারিয়ে যাচ্ছে আরেকটা সন্ধ্যা। হাতে হাত লাগিয়ে কারও সাথে বসে থাকার সোনালি সময়গুলো কেমন যেনো ফ্যাকাসে হয়ে যাচ্ছে।
‘ভাই কিছু মনে না করলে একটা কথা শুনবেন?’
অপরিচিত নারীটার কথায় আকাশ-দালান-গাছের চিন্তা বাদ দিয়ে ফিরে এলো যানজট, গাড়ির হর্নের নগরীতে। উত্তর দেওয়ার আগে চোখগুলো এক পলক দেখে নিলো সস্তার কালো কাপড়ের বোরকা পড়া নারীটির চোখ। কারণ এ ছাড়া আর কোনো অংশই দেখা যাচ্ছে না।
কথায় অশিক্ষিতের টান থাকলেও বেশ শুদ্ধ করে বলার চেষ্টা, অনেক দিন নগরে থাকার ফলাফল। একেও কি বোদ্ধারা নগরায়ন বলবে?
‘জ্বি, বলেন।’ বলে পকেটে হাত দিয়ে দেখে নিলো খুচরা কয় টাকা আছে, সাধারণত এ ধরনের বোরকা পরা নারীরা বলে বসে, আমি বিপদে, বাসে যাওয়ার ভাড়া নাই, দুইদিন খাই না, মেয়ের বিয়ে ইত্যাদি ইত্যাদি।
‘কিছু মনে করবেন না। আমার ভাই দেখতে আপনের মতোই, এরুম লম্বা-স্বাস্থ্য...’
মহিলার কথা চলতেই চলতেই মাথার ভেতর হাজার চিন্তা খেলতে লাগলো। এই মহিলা কি আবার তাকে ভাই বানানোর ফন্দি করছে নাকি!
ভাবতে ভাবতে একটু নিচের দিকে তাকাতেই মহিলার স্ফীত উদর দেখতে পেল। অভিজ্ঞতা বলে অন্তত ছয় মাসের গর্ভাবস্থা পেরিয়ে গেছে। আমাদের দেশের মহিলারা নিজেদের গর্ভাবস্থা অন্যকে জানাতে লজ্জা পায়। এর সঠিক কোনো কারণ না জানলেও নিজে নিজে একটা কারণ সে দাঁড় করিয়েছে, স্বামী সোহাগের কথা সবাই জেনে যাবে। কেননা যৌনতা এখানে ট্যাবু, হোক সে প্রেমিক, হোক সে স্বামী। যৌনতা তো যৌনতাই!
‘ঈদের তো এহনো দেরি আছে, এই টুপিওয়ালাত্তে ভাইয়ের জন্যি একটা টুপি কিনতাছি। ঈদের আগে এরা দাম বাড়ায়ে দেয়। আর ভালা করে দেইখা নিই, পরে যদি মাপে না হয়। লোকটাকে তো পাবো না। তাই আপনার মাথার মাপে যদি নিতে পারতাম। আপনার মাপে হইলেই হবে।’
হুম, বড় হিসেবের জীবন, হিসেবের টাকা, হিসেবের সম্পর্ক। কিন্তু আবেগগুলো কি আর কোনো হিসেব মেনে আসে? বোন তার ভাইয়ের জন্য একটা টুপি কিনবে, তাও হিসেব করে?
আবাসিক রাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে টুপি মাপতে শুরু করলো মধ্যবিত্তটি। সরু রাস্তার মোড় থেকে দুই তিন কদম সামনেই একটা কালো প্রাইভেটকার অলস দাঁড়িয়ে আছে, ভেতর থেকে অল্প অল্প সিগারেটের ধোঁয়া উড়ছে, প্রাইভেটকার সামনে পিছনে জ্যাম লেগে গেছে। সেদিকে খেয়াল নেই ড্রাইভারের, আরামসে ধোঁয়া ছাড়ছে। নগদ টাকায় কেনা সিগারেটের শরীরকে উসুল করছে। ভেতরে আগুন জ্বলছে, ঘামে ভিজে থাকা রিক্সাওয়ালাটার শরীরেও। তাই সামনের রিক্সাওয়ালাটাকে গালি দিয়ে বলছে, ‘হালার পুত, সামনে টানতে পার না?’
গালি না অভিযোগ?
কাকে দিলো?
ঘামে ভেজা জীবন? না বেহিসেবী রাস্তা দখল করে থাকা প্রাইভেটকারকে?
ভ্রাম্যমান ফেরিওয়ালাটার কাছ থেকে দামি দুটো টুপি কিনলো সে। মেয়েটির চোখে মুখে আতঙ্ক দেখতে পাচ্ছে, সে তো একটা চেয়েছে, দুইটা কেনো? দাম কিভাবে দেবে?
পকেট থেকে খুচরো আর মানিব্যাগ থেকে নীল-নীল রঙের নোট বের করে ফেরিওয়ালাটার হাতে দিল। মেয়েটির হাতে টুপিগুলো দিতে দিতে বললো, ‘একটা আপনার ভাইয়ের জন্য আরেকটা দুলাভাইয়ের জন্য। ভালো থাকবেন।‘
ভাই বুঝলেও দুলাভাই বলতে কাকে বোঝালো; মেয়েটা যখন সে হিসেব করতে ব্যস্ত ঠিক তখনই জীবনের ঝুঁকি নিয়ে রাস্তাটা পার হয়ে গেলো মধ্যবিত্তটি।
মধ্যবিত্তের আবেগ কি সব সময় হিসেব করে আসে?
না আবেগের সব সময় হিসেব করে আসতে হয়?
-০-

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.