| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ইদানীং/ আবছা রোগে মরে যায় বইয়ের পাতা/ ক্যালেন্ডারে নকশা আঁকে প্রাক্তন প্রেমের দাগ/ বাগানের ফুল চুরি করে যায় আবেগহীন গুবরে...
সকাল সকাল ঘুমটা ভাঙলো মোবাইলের রিংটোনে। রাতে ঘুমানোর আগে অ্যালার্ম দিয়ে রাখেনি এটা তার মনে আছে, আবার মা’কেও সে না জাগা পর্যন্ত ডাক দেওয়ার কথা মানা করেছিল। শহরে খাওয়া-পরার চিন্তা না থাকলেও ঘুমের বড্ড অভাব। মানুষগুলো সব রাত জাগা নিশাচর, যেনো রাত বাড়লেই তাদের ব্যস্ততা শুরু হয়। গাড়ির ভেঁপু দিয়ে অন্যের ঘুম নষ্ট করার মধ্যে এক ধরনের পৈশাচিক আনন্দও পায় মনে হয়।
ঘুম ঘুম চোখে এক চোখ বন্ধ করে মোবাইলটা হাতে নিয়ে ঘাড়টা উঁচু করে ব্যাপারটা বোঝার চেষ্টা করলো, অ্যালার্ম না রিংটোন!
মোবাইলের স্ক্রিনে রতন, ধরতে না ধরতেই কলটা কেটে গেলো। মোট ২৬টা মিসকল। ইনকামিং প্রতিটা কলে গড়ে ২৫ সেকেন্ড করে রিংটোন বাজে। কখনো কখনো অপারেটর ভিন্নতায় এ সময়টা কম বেশিও হয়। তার মানে রতন যদি ২৬ বার কল দিয়ে থাকে ২৫ সেকেন্ড গুণ ২৬ হিসেবে প্রায় ৬৫০ সেকেন্ড, ভগ্নাংশ বাদে পুরা ১০ মিনিট ধরে তাকে পেতে চেষ্টা করে যাচ্ছে রতন। ইংরজিতে আর এ টি এ এন। নামের ব্যাপারে বেশ খুঁতখুঁতে সে, কারও নাম ফোনবুকে সেভ করার ক্ষেত্রে পারলে তার সার্টিফিকেট দেখতে চায়। একজনের ভুল নাম লেখার মতো বিষয়টা তার কোনোদিনই ভালো লাগে না। কিন্তু রতনের বেলায়ই গড়বড়, ‘ও’ এর জায়গায় এ দিয়ে লিখতে হয়েছে। তাতে কি! নামে তো আর ভাগ্য বদলে না। যদি থাকে নসিবে ঘুরে ফিরে আসিবে।
কল করার আগে ব্যালান্স চেক করাটা তার পুরনো অভ্যেস। তাতে একটা বড় সুবিধা আছে, কাউকে জরুরি কথা বলার সময়টা হিসেব করে নেওয়া যায়। এখন যা ব্যালান্স আছে তাতে ওর সাথে ২ মিনিট ৩৪ সেকেন্ড কথা বলা যাবে, এর এটাই যথেষ্ট। নইলে রতনের বাড়ি দুই মিনিটের হাঁটা রাস্তা।
‘কি রে, ভোর সাড়ে পাঁচটায় কল দিয়ে মস্কারি করতেছিস ক্যান?’
‘কই তুই?’ রতনের কণ্ঠস্বরটা বেশ ভারি, রাতজাগা রাতজাগা।
‘আমার ঘরে, ঘুমাই।’ বলে পাশবালিশটা টান দিয়ে দুই হাঁটুর মাঝে রাখতে রাখতে একটা আদুরে শব্দ করলো। যেরকমটা আদর পেলে পোষা বেড়ালই করে।
‘তাড়াতাড়ি মরাখোলায় আয়।’ বলেই উদ্বিগ্নতার একটা বড় শ্বাস ছাড়লো রতন।
ঘুমটা ছেড়ে গেলো। সকাল বেলা ঘুম চোখে-বাসি মুখে এরকম কথা শুনলে ঘুম অবশ্য থাকারই কথা না।
‘কেন কি হইসে?’
‘পরাণ কাকার ছোট মেয়েটা, পাখি কাল রাতে মারা গেছে।’
‘পাখি কেডা আবার, নমিতা নি?’
উত্তেজনায় রতন নমিতার ভালো নামের সাথে ডাকনাম গুলিয়ে ফেলেছে খেয়াল করে ছোট্ট করে বললো ‘হুম’।
‘আইতাছি।’
লুঙ্গিটা টান দিয়ে ঠিক করে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে দরজা লাগাতেই তালার কথা মনে পড়লো। গত কয়েকবার ধরে বাড়িতে আসলে নিজের রুম থেকে বাইরের দরজা দিয়ে তালা মেরে বের হয়। তাতে আড্ডা মেরে রাতদুপুরে এসে বাবা মা’কে ডাকা লাগে না। আর সবচেয়ে বড় ব্যাপার যখন ইচ্ছে তখন আসা যায়।
টেবিলের একটা পায়া ঘুণে খেয়ে ফেলেছে, কোনোরকমে টিনের বেড়াটার সাথে ঠেস দিয়ে রাখা। ড্রয়ারটা টান দিতে বোঁটকা গন্ধ, কয়েকটা শক্তিশালী তেলাপোকা নাকে মুখে ঝাপটা মেরে উড়ে গেলো, বাদুড়ের মতো।
মরচে ধরা গোল গোল কয়ড়ায় তালা লাগাতে তেলের কথা মনে হলো, তালাটায় তেল দেয়া লাগবে। এখন বড়ঘরে মা বাবা ঘুমাচ্ছে। দরজা খুললেই ক্যাঁচকোঁচ শব্দ করে ঘুম ভাঙিয়ে দেবে। গিয়ে তেল আনা সম্ভব না, পরেীক সময় দিবে। দরজাটাতেও দিতে হবে।
লুঙ্গির কোঁচায় চাবি, মোবাইল, কয়েকটা খুচরো টাকা রাখতে রাখতে পূর্ব দিকে হাঁটতে লাগলো। কুয়াশা না পড়লেও ঘাসগুলো বেশ ভেজা ভেজা। খালি পায়ে হাঁটতে পারলে বেশ হত। অনেকদিন হাঁটা হয় না। কিন্তু এখন শহুরে জুতা পরা অনভ্যস্ততা পায়ে সইবে কি?
একটু সামনে এগোলে ঝোপড়া একটা লিচুগাছ, বয়স আন্দাজ আশি হবে বলে ছোটবেলা থেকে শুনে এসেছে। সে হিসেবে এখন একশো পেরিয়ে যাওয়ার কথা। আলপথ দিয়ে গেলে তাড়াতাড়ি হবে দেখে মোটা রাস্তাটা ছেড়ে ছোট চিকন আল ধরেই যাওয়া শুরু করলো। হাতের বামে মোড়টা পার হয়ে একটু সামনে এগোলেই বেত কাঁটার ঝোপ, এদের পূর্ব পুরুষদের দিয়েই স্কুলের মাস্টাররা পিঠের লালচে দাগ বানাতেন; ছাত্রদেরকে মানুষ বানাতেন। তার পিঠেও হয়েছে। আর তাতে সে মানুষ হয়েছে কি’না বলা মুস্কিল!
কাঁটার ঝোপটা পেরোলেই নদীর ধারে মরাখোলা। নদীর ধারে মড়া পুড়লে নাকি ছাইগুলো ভাসতে ভাসতে একসময় গঙ্গায় পৌঁছায়, তাতে মানুষ মুক্তি পেয়ে যায়। ছোটবেলায় স্নান করাতে নিয়ে নিবারণ কাকা বলেছিলেন। মরার পর উনাকেও এখানে পোড়ানো হয়েছে, তাহলে কি তিনিও গঙ্গায় গিয়েছেন?
ঢালু ধরে নামতেই রতনের গলা ‘এদিকে আয়।’
ঢালে নামতে নামতে শরীরের নিয়ন্ত্রণ নিজের বশে আসার আগেই আঙুলে সস্তার সিগারেট ধরিয়ে দিলো। কেবল দুই-তিন টান দেওয়ার মতো পুড়েছে। এখনো ছাই ফেলেনি। গ্রামে দামি সিগারেট তেমন একটা পাওয়া যায় না। বেশিরভাগ লোকই বিড়ি খায় তবে কোনো বিয়ে-উৎসব-পার্বণে মোটামুটি মাঝারি দামের সিগারেটও চলে। তাও সে দাম শহরের তুলনায় সস্তায়ই।
দুই টান দিয়ে বললো ‘কি হইছিল?’
কোনো ভণিতা না করেই একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রতনের জবাব, ‘বিষ খাইছিল, ক্ষেতের বিষ। কাল সন্ধ্যায় কাকা কিনা রাখছিল। এক ঘণ্টায়ই শেষ। কেউ কিছুই বুইঝা উঠতে পারে নাই।’
দীর্ঘশ্বাসটা অনেকটা অসহায় কৃষকের মতো লাগলো। গোয়াল ঘরে অসাবধানতাবশত আগুন লাগলে ভেতরে শক্ত দড়িতে বাঁধা গরু পুড়ে মরতে দেখে অসহায় কৃষক যেভাবে হাহাকার করে অনেকতা সেরকম, এরপর অনেকদিন পর্যন্ত সমব্যথীদের প্রশ্নের জবাব দিতে দিতে একসময় আর হাহাকার থাকে না; হয়ে যায় লম্বা দীর্ঘশ্বাস আর ময়লা গেঞ্জির হাতায় চোখ মোছা পর্যন্ত।
‘ক্যান?’
‘প্রেম-পিরিতির ব্যাপার। বাপে মানে নাই।’ বলেই অন্যদিকে তাকালো রতন।
চোখ মুছছে না’তো? তবে কি রতন পাখিকে পছন্দ করতো? তার সাথে সম্পর্কই পরাণ কাকা মানে নাই বলে অপরাধী অপরাধী শুকনো দীর্ঘশ্বাস ফেলছে?
-০-

©somewhere in net ltd.