নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

অসুস্থ শহরের নাগরিক মন, তাই পালিয়ে বেড়ানোর আয়োজন...

কাঙাল মিঠুন

ইদানীং/ আবছা রোগে মরে যায় বইয়ের পাতা/ ক্যালেন্ডারে নকশা আঁকে প্রাক্তন প্রেমের দাগ/ বাগানের ফুল চুরি করে যায় আবেগহীন গুবরে...

কাঙাল মিঠুন › বিস্তারিত পোস্টঃ

মধ্যবিত্তের নাগরিক কথন-১৪

৩০ শে নভেম্বর, ২০১৭ বিকাল ৫:৩০



মন্তুজ মিয়ার মনটা খারাপ দেখে একটু নড়েচড়ে বসলো সে। এরকমটা সাধারণত হয় না, অফিসের কেরানি হিসেবে সে চাকরি করলেও তার আচার ব্যবহারের কারণে তাকে ভালোবাসে না কিংবা তার পিছনে মন্দ বলে এরকম লোক পাওয়া দুষ্কর, স্বয়ং বড়কর্তা পর্যন্ত তার নাম ধরে ডাকলে অনেকখানি আদর আর সম্মান থাকে। কারণ সপ্তমীর চাঁদের মতো এক চিলতে হাসি তার মুখে সবসময়ই থাকে।
‘কী ব্যাপার মন্তুজ ভাই? মন খারাপনি’ বলেই দেয়ালের ওপাশে টং দোকানটাতে চায়ের অর্ডার করলো মধ্যবিত্তটি। অনেক অফিসেই এখন এরকম চায়ের দোকান হয়েছে। ঠিক অফিসের সীমানার ভেতরেই থাকে, একেবারে বাউন্ডারি ঘেঁষে। ওপাশে রাস্তা। অফিসের ভেতরেও বেচে, বাইরের খরিদ্দারদের কাছেও সমান তালে বিক্রি হয়। ইটের দেয়ালে পেরেক মেরে কলা-পাউরুটি-কেক ইত্যাদি ঝুলিয়ে রাখে দোকানদার। তবে এসবের চেয়ে বেশি হচ্ছে চা-সিগারেটের খরিদ্দার। তার মধ্যে বেশিরভাগই অফিসের পাতি-কর্তারা। বড়কর্তারা তেমন একটা আসে না, সম্মানের কোনো গণ্ডগোল আছে মনে হয়!
সরকারি অফিসগুলোতে যতটুকু কাজ তার চেয়ে বেশি অবসর। মাঝে মাঝে জুন বা ডিসেম্বর ক্লোজিং সময়ে এতো চাপ থাকে যে অফিসের সীমানা লাগোয়া দোকানেও যাওয়ার সময় থাকে না পাতি-কর্তাদের। এসময় ডাক পড়ে মন্তুজদের; ‘মন্তুজ চা’, ‘মন্তুজ বেনসন’, ‘মন্তুজ দুইটা মালবোরো’র ডাকে এতো দৌড়াদৌড়ি শুরু হয় যে এক সেকশানের মন্তুজ অন্য সেকশানের মন্তুজের সঙ্গে দাঁড়িয়াবান্ধা খেলছে।
‘না ভাই। এমনেই’ দেওয়া উত্তরটা তার সঙ্গে গেলো না এটা মন্তুজ বুঝতে না পারলেও মধ্যবিত্তটা বুঝতে পারলো ঠিকই। এই মূহুর্তে মন্তুজকে তুমি করে না আপনি করে বলা উচিত সেটা নিয়ে একটু চিন্তায় পড়ে গেল।
‘চা খাইবায়নি’ সিগারেট ধরাতে ধরাতে মনে মনে খুশি হয়ে সিলেটি এই সম্বোধনটাকে ধন্যবাদ দিল। সিলেটে যাই হোকের বাইরে এই সম্বোধন আপনি/তুমি/তুই কোনোটাকেই ভালো করে বোঝায় না।
‘না ভাই’ এক চিলতে হাসতে চেষ্টা করলেও হাসিটা বেশি বড় হলো না। বিধবা নারীদের সাদা শাড়ির পাড় শাড়ির জমিনের তুলনায় যেমন চিকন লাগে, মন্তুজের মুখের হাসিটা সেরকমই লাগলো।
‘কিছু ট্যাকার দরকার, হাজার পাঁচেক হইলেই হবে’ মন্তুজের পাশে বসতে বসতে কথাটা বলে ফেলল, তখনও নড়বড়ে বেঞ্চিতে পুরোপুরি বসতে পারেনি মধ্যবিত্ত।
‘ক্যান?’ আপাতত সম্বোধন ছাড়াই কথা বার্তা চলুক কিছুক্ষণ।
‘আমার একটা মেয়ে এইবার ভার্সিটি পরীক্ষা দিবো স্যার। ডাকায় ফরম তুলত পারে নাই। জামা-কাপড় পাড়ার দর্জি থিকা বাকিতে বানাই দিছি। পরীক্ষা দিবার যাইব দূরে, কিছু নগদ ট্যাকা দরকার।’
এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো বলে যাচ্ছিল মন্তুজ, খটকাটা তখনই লাগলো। সে জানে মন্তুজ মিয়ার সবার বড় সন্তান ছেলে, এইবার জেএসসি পরীক্ষা দেবে। এর পর মেয়ে, ক্লাস ফোরে পড়ে, তার পরে দুই জমজ ছেলে স্কুলে যাওয়ার বয়স হয়নি। একবার নিয়ে এসেছিল অফিসে। গুলুগালু চেহারা। তবে কি সে আগে একটা বিয়ে করেছিল? মন্তুজ মিয়াকে দেখেতো এরকম কখনোই মনে হয় না!
হঠাৎ মনে পড়লো, প্রতি বছর ভার্সিটি ভর্তি পরীক্ষায়ই তার এরকম টাকার দরকার হয়। তার কোনো না কোনো ছেলে বা মেয়ে পরীক্ষার্থী থাকেই। ঢাকায় কারও পরীক্ষা হলে বড়কর্তার কাছ থেকে ছুটি নিয়েই তাদের পরীক্ষা হলে নিয়ে যায়।
ঘটনা কী?
কয়টা বিয়ে করেছে মন্তুজ মিয়া?
পৃথিবীতে দায়িত্ব খুব খারাপ বিষয় ও বোধগুলোর মধ্যে একটা। যার দায়িত্ববোধ যতো বেশি তার বিবেকবোধ ততো বেশি টনটনে। প্রত্যেকেরই কম বেশি দায়িত্ববোধ থাকে। তার মধ্যে কেউ কেউ নিজের উদ্যোগেই অনেক কাজ করে ফেলে। সেগুলোকে এক কথায় স্বার্থের বাইরে চিন্তা করলেও আসলে তা স্বার্থের বাইরে নয়। প্রত্যেক কার্যের পিছনে কোনো না কোনো স্বার্থ লুকিয়ে থাকে। আপাতপক্ষে যে লোকটি সমাজ সেবার কথা বলে নিজের মতো নীরবে মহৎ কাজ করে যাচ্ছেন, তার পিছনেও একটি করে কারণ আছে। আর সেটি হচ্ছে আত্মসুখ, সেটিই মানুষকে অনেকদিন বুকের ভেতর এক ধরনের শীতল নদী বইয়ে দেয়। এতে নাকি ভালো ঘুম হয়, অনেক ভালো একটি ঘুম হয়। যেমন কার্তিক মাসের দিন শেষে ভোররাতে হাল্কা হাল্কা শীতের ওম দিতে একটা পাতলা কাঁথাই যে পরিমাণ আরাম দেয়, শান্তি দেয়; এ ধরনের বনে খেয়ে মোষ তাড়ানো মহৎ কার্যকলাপগুলো নাকি তাইই।
মন্তুজ মিয়ার সর্বসাকুল্যে বিবাহ একটাই। আলাপের মা, বড় সন্তানের নাম দিয়েই তার পরিচয়। ছিপছিপে এক হারা গড়নের শরীর। চোখা নাক, কিন্তু চোখগুলোই স্বর্গীয়। অবাধ্য ষাঁড়ও তার চোখে চোখ রাখতে সম্মান দেবে। মহিলার আসল নাম কি জানতে পারেনি, তবে মেট্রিক পর্যন্ত পড়াশোনা আছে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে নারীদের নিজস্ব কোনো নাম থাকে বলে মনে হয় না, থাকলেও তা কাজীর গরু গোয়ালে নয় কেতাবের মতোই। প্রথম প্রথম বাপের বাড়িতে থাকাকালীন ডাকলেও পরে বিয়ে হয়ে গেলে আর সেই সুযোগ থাকে না। কখনো কখনো শ্বশুর বাড়ির লোকজন তো ‘নতুন বৌ’য়ের নতুন নাম দিয়ে দেয়। যেনো বাপের বাড়ির নাম ধরে ডাকলে জামাই বাড়ির অসম্মান। যেমন তার নিজের মায়ের নামও তার বড়বোনটি জন্মানোর পর আচমকা বদলে গিয়েছিল। অবশ্য এর আগেও যে নাম ধরেই ডাকা হতো তা নয়, ‘নতুন বৌ’ এর পরে ‘রাঙা বৌ’ বলেই ডাকা হতো। মায়ের গায়ের রঙ নাকি বেশ কটা ছিল অন্যান্য মহিলাদের তুলনায়।
মন্তুজ মিয়ার সঙ্গে বিয়ের মাসখানেক আগে একটা দুর্ঘটনায় পা ভেঙ্গে যায় আলাপের মায়ের। ডাক্তার বলে ভালো চিকিৎসা না হলে খোঁড়া হয়ে যেতে পারে। কিন্তু বাপের অবস্থা ভালো না হওয়ায় মন্তুজ মিয়াই তাকে হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে হবু বৌ’র যথাসাধ্য চিকিৎসা করায়। তার এক কথা, কথা দিয়েছে বিয়ে হবে। বিয়ে হবেই। মেয়ে তো আর অন্ধ হয়ে যায়নি! এখনো কিছুটা খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটে আলাপের মা। তবু সস্তার বাসাবাড়ির নারীমহলের মধ্যমণি তিনি। পদ্মা নদীর মাঝি’র চরিত্র খোঁড়া মালার কথা মনে পড়লো মধ্যবিত্তটির। আহা বেচারী মালা!
আশেপাশের বাসার সব নারীই কোথাও কোথাও অর্থোপোর্জানের জন্য যায় কিন্তু আলাপের মা বাসার বাইরে খুব একটা যায় না কখনো। আসলে পারে না। বেশি হাঁটলে রগে টান ধরে। তাই তেমন কোথাও যেতে না পারলেও একটা কাজের জন্য সম্মানিত সে,বাচাদের পড়ালেখা করায়। সকাল সকাল রান্না-বান্না করতে করতেই আশে পাশের বাসার বাচ্চা-কাচ্চারা বই খাতা কলম নিয়ে চলে আসে। রান্না করতে করতেই তাদের পড়াতে থাকে; এদের গরীব বাবা-মা যে যেরকম পারে কিছু টাকা পয়সা দেয়। এর মধ্যে মন্তুজ মিয়া গোসল করে অফিসে যাবার জন্য তৈরি হতে থাকে, বাচ্চাদেরও তৈরি করতে থাকে। হুঁ, তার অনেকগুলো ছেলে মেয়ে, ঘরেও আছে বাইরেও আছে। বস্তায় বসে কেউ শুয়ে, বসে, সারা গায়ে লালা মাখিয়ে মন দিয়ে পড়ছে, কেউ অক্ষর লেখা শিখছে। ঘরে যেগুলোকে স্কুলের জন্য তৈরি করছে সেগুলো তার রক্তের, আর বাইরে যেগুলো আছে সেগুলো তা আত্মার। কোনোটাই কম নয়। কাঁধের একপাশে টিফিন ক্যারিয়ারের ফিতাটা ঝুলিয়ে, দুই হাতে দুই সন্তানকে ধরে ঘর থেকে বেরিয়েই বলে, ‘যাই রে বাতাসী’ আলাপের মা’কে মাঝে মাঝেই বাতাসী বলে ক্ষেপায় সে। রোমান্সে থাকলে গালটা একটু টিপে আদর করে যায়। বাচ্চারা হেসে ওঠে, আর লজ্জায় গাল রাঙা হয় আলাপের মা’র।
মন্তুজ মিয়ার টাকার দরকার। লোকমান ভাইয়ের বড় মেয়েটা টুকলি, এবার জেএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। গত বছরই মেয়েটাকে বিয়ে দিতে চেয়েছিল লোকমান ভাই। সে শুনেই বলেছে, খাওন খরচ তুমি দেও লোকমান, পড়ার খরচ আমি দিমু। মাইয়া গাঙে দিয়া ভাইস্যা আহে নাই। এপর্যন্ত বড় করছ। আর কয়ডা দিন তোমার ঘরের ভাত খাইলে কি কম পড়বো। নিজে তো দিনে বিরি-সিগারেট খাও ৭০-৮০ টাকার। এই পক্ষীর মতোন মাইয়াডা কি তার বেশি খরচ করে?
আসলে টুকলি মোটেও পক্ষীর মতোন না, বেশ গাট্টাগোট্টাই। তার মায়ের মতো। তার মাও দশাসইই বলা যায়। সে তুলনায় লোকমান ভাই একটু পড়তির দিকেই।
পাড়ার চা দোকানে এ নিয়ে বেহস কথা কাটাকাটি হয়। প্রথমদিকে সবাই লোকমানের দিকে ঝুঁকলেও পরে মন্তুজের সাহসী কথায় তারা লোকমানের পিছ ছেড়ে দেয়। রাগের বশে টুকলিকে নিয়ে নিজের বাসায়ই চলে আসে সে। পরের দিনই অবশ্য লোকমান মাফ-টাফ চেয়ে নিয়ে যায়। হাজার হোক নিজের সন্তান তো!
ঘটনার পরই টুকলির পড়াশোনায় বেশ আগ্রহ দেখেছে সবাই। এবার জেসএসসি পরীক্ষায় ভালো করবে বলেছে স্কুলের হেড মাস্টার।
চিন্তায় থাকা মন্তুজের মাথায় হাত রাখলো মধ্যবিত্তটি। হাতে একটি খাম। ‘বড় সাহেব যাইতে বলল ভাই’ খামটা দিতে দিতে বললো।
বড় সাহেব নামে বড় সাহেব হলেও বয়স বেশি না। সবে ৩৫ এর ঘর পেরিয়েছে। চাকরির পদবীর তুলনায় বয়সটা কমই। সরকারি গাড়ি করে আসে, যায়। বৌও সরকারি বড় মাপের চাকুরে।
‘সেলাম, ছার’ ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বললো মন্তুজ।
‘সেলাম, মন্তুজ একটা উপকার করতে হবে যে। না, না টাকার জন্য নয়, বলতে বলতে মন্তুজের হাতে ধরা খামটার দিকে তাকালো বড় সাহেব।
‘শুনলাম তোমার ওয়াইফ বাচ্চাদেরকে পড়ায়। আমি কালকে আমার ছেলেকে তোমার ওখানে পাঠিয়ে দেবো। ড্রাইভার তোমার বাসা চেনে বলেছে। ওকে একটু পড়ালেখা শিখায়ো।’
এ হেন কথায় মন্তুজের চোখ গুলো যখন বড় হয়ে ভিজে শুরু করেছে তখনই আবার বড় স্যার বলতে লাগলেন,
‘মন্তুজ, আমি চাইলে মাসে হাজার বিশেক টাকা খরচ করে ওর জন্য অনেকগুলো প্রাইভেট টিউটর রাখতে পারি। কিন্তু ও পড়া শিখবে ঠিকই, কিন্তু মানুষের মনটা পাবে না। তোমার বাসায় আরও অনেকগুলো ছেলেমেয়ে পড়ে ওদের সঙ্গে যদি পড়ে তাহলে আর যাই হোক, একটা মানুষের মন পাবে। এবার যাও, এক কাপ কফি বানায়ে নিয়ে আসো।‘
হতভম্ব মন্তুজ মিয়া ফিরে আসার জন্য উলটো ঘুরতেই বড় স্যার আবার বললো,
‘আর হ্যাঁ, তোমার যতগুলো ছেলে মেয়ে, তাদের কোনো সমস্যা হলে যদি কোনো সাহায্য লাগে আমার কাছে আসতে ভুল করো না। তোমার ছেলে মেয়ে কয়টা?
‘ছার, গুনি নাই। আশেপাশে সবাইতো আমার ছেলে মেয়ে। কারে বাদ দিয়ে কার কথা বলবো!’
মন্তুজের গলা কাঁপছিল, কথার সুরে কান্না থাকলেও পিতৃত্বের দায়টাই বেশি মনে হলো।
© কাঙাল

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.