নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

অসুস্থ শহরের নাগরিক মন, তাই পালিয়ে বেড়ানোর আয়োজন...

কাঙাল মিঠুন

ইদানীং/ আবছা রোগে মরে যায় বইয়ের পাতা/ ক্যালেন্ডারে নকশা আঁকে প্রাক্তন প্রেমের দাগ/ বাগানের ফুল চুরি করে যায় আবেগহীন গুবরে...

কাঙাল মিঠুন › বিস্তারিত পোস্টঃ

ছানি পড়া আলো

০১ লা এপ্রিল, ২০২০ সন্ধ্যা ৭:৫৯

বড় রাস্তার মোড়টা ঘুরতেই ছোট গলির মতোন যে রাস্তাটা হাতের বাঁদিকে ঘুরে গেছে, সে পথ দিয়ে মিনিট দশেক হাঁটলেই পুরনো পুকুর। কচুরিপানা আর জলজ গাছে যতোটুকু না ঢেকেছে তারচেয়ে বেশি ঢেকেছে আশেপাশের বড় গাছগুলোর পাতায়। পুকুরের পাড়ঘেঁষা ছোট ঝোপটা দূর থেকে ছোট মনে হলেও কাছে গেলে বোঝা যায় পার্থক্য, অন্তত কয়েকডজন গর্তে কয়েকডজন শেয়াল বেশ আরাম করেই বর্ষা আসার আগ পর্যন্ত বাস করে সংবৎসর।
পুকুরের বাঁ পাড় ছুঁয়ে যে মোটা বাতড় সোজা পশ্চিমদিকে চলে গেছে; সেটা একেবারে গিয়ে থেমেছে পাঁচিল ঘেরা বাড়িটাতে। এক সময়কার জৌলুস ছিল, আধিপত্য ছিল, চাকচিক্য ছিল; অন্তত ৭০-৮০ বছরের পুরনো দেয়ালগুলোতে বোঝা যায়। বেশিরভাগ জায়গায় ভেঙ্গে গেলেও কর্তার সারিয়ে তুলতে কার্পণ্য না থাকায় পুরাতন মেরামত থাকলে আধুনিকতার কাজের পার্থক্য সহজেই চোখে পড়ে। অন্তত রঙটস এক থাকলেই ইটের পরিবর্তন যে কারও চোখে পড়বে। অথচ এই বাড়িটাতে প্রত্নতাত্ত্বিকদের আনাগোনা খুবই প্রয়োজন ছিল বলে আফসোস করেন পুরনো দেয়াল ঘেরা বাড়ির পাশে, ছাপড়া ঘর তুলে বাস করা হরেন তালুকদার।
৭৫ পেরিয়ে যাওয়া শরীরটা এখনও বেশ পেল্লাই, যৌবনে কুস্তি খেলতেন সে চিহ্ন এখনও স্পষ্ট। আগের মতো তাগদ না থাকলেও কুঁচকে যাওয়া চামড়ার নিচে যৌবনের মাংসপেশি গুলো কিলবিল করে ওঠে কখনও কখনও। দাঁত না থাকায় কথা বেশ অস্পষ্ট তবে কোনো কারণে রেগে গেলে ন্যূনতম আধা কিলো দূর থেকে শিশু কিশোর যে কেউ বলে দিতে পারবে তার গলার আওয়াজ।
ভোর পাঁচটায় ঘুম থেকে উঠে পাশের বাড়ির নলকূপ থেকে পটাপট স্নানটা সেরে নেন। আগে প্রায় সোয়া মাইল দূরের নদীতে গেলেও ইদানীং চোখে ঝাপসা দেখছেন। গ্রামের ডাক্তার বলেছেন চোখে পর্দা বা ছানি পড়ছে। অপারেশন করাতে হবে। আগামী আশ্বিনে কলার বাগানটা বেচে করবেন বলে প্রতিদিন সকালেই বলেন, কিন্তু আশ্বিন আসে আশ্বিন যায়; সংসারের মা লক্ষ্মী বাড়ন্ত থাকায় কলার বাগান আর বেচা হয় না তাঁর!
আকাশটা লালচে আভা থেকে সাদা হতে থাকার আগেই হাঁটুর উপর সাদা পাতলা ধুতিটা তুলে যখন বাড়ির পিছনের বড় আম গাছটার গোড়ায় ঝোপটার নিচে প্রাকৃতিক কাজ সারতে বসেন, তার কীয়ৎক্ষণ আগেই দেখা হয় নছরুল্লাহর সাথে। ফজরের নামাজ পরতে যাচ্ছে। হরেনকে দেখা মাত্রই পকেট থেকে ভাঁজ করা টুপিটা বের করে মাথায় দিতে যান তখনই মুখ থেকে বের হয় "আদাব দাদা, আর কদ্দিন! একটা চাকা আর সিমেন্টের চাক বসায় নেও। বেশি ট্যাকা লাগে না। না হয় আমরাও কিছু সাহায্য করলাম"।
বিনিময়ে হরেন তালুকদারের ফোকলা হাসি। বছরকে বছর একই আচরণ চলে আসলেও হরেনের বাড়ির পিছে স্যানিটারি চাকাও বসেনি, নছরুল্লারাও সাহায্য করতে পারেনি। কেবল বড় আমগাছটার গোড়ায় জৈব সারের ঘাটতি মিটে যাচ্ছে। এরপর পরই তিনি স্নানটা সেরে নেন।
---
হরেন তালুকদারের সাথে আমার পরিচয় বছর দশেক আগে। বন্ধুর বড় ভাইয়ের বিয়ের বরযাত্রী হওয়ার সুবাদে সেই এলাকায় গিয়েছিলাম। পরদিন সকালে নতুন বৌ নিয়ে চলে আসার কথা থাকলেও বৃষ্টিতে আটকে পড়ি। কাছের বাজারে কাকডাকা ভোরে চায়ের দোকান খুলেছে কিনা সন্দে' করতে করতে মাঝামাঝি ভিজে গিয়ে একটা দোকানে উঠলাম। পলিথিন, বিস্কুটের খালি প্যাকেট, আধভেজা কাগজ চুলায় দিয়ে আগুন ধরানোর চেষ্টা করছিলেন যে চা দোকানি, আমাদের দেখে বেশ আহ্লাদিত হয়ে উঠলেন। ভালো পোশাকের শহুরে খরিদ্দার দেখে জোরে জোরে ভিজে যাওয়া চুলায় ফুঁ দিতে লাগলেন।
একটা তিনপায়া টেবিলের সারিবদ্ধ বয়াম থেকে বাদাম দেওয়া দুটি বিস্কুট তুলে মুখে দিতেই সৌম্য দর্শন লোকটি ঢুকলেন। একটা তেজি ষাঁড় দড়ি ছিঁড়তে অনেক কসরত করার এক পর্যায়ে যখন দড়ি ছিঁড়ে দৌড় দেয়, তার দোকানে ঢোকার ভঙ্গিটা ছিল সেইরকমই।
" তাহের বাই, চা অইছাও।"
"লারে বাপু। বোসে যাও দিকি। "
আর আমাদের দিকে তাকিয়ে দুই হাত বুকের কাছে নিয়ে বললেন " লমস্কার। অধীনের লাম হরেন, হরেন তালুকদার। বিবাহ বাড়িতে আইসেছেন মনে কয়! "
তখনই পরিচয় হয়েছিল, হরেন তালুকদারের সাথে।
তখনও চোখে ছানি পড়া শুরু করেনি। জোরে হেসে উঠলে সামনের দু একটা দাঁতও দেখা যায়। চামড়াটাও কুঁচকে যায়নি।
সদালাপী আধাবুড়ো হরেন তালুকদারের সাথে বৃষ্টিভেজা সকালে বাদাম দেওয়া বিস্কুটের সাথে চা খেতে প্রথম পরিচয়।
---
বৃষ্টির ছাঁট একটু করে বাড়ছিল, ছোটবেলায় পড়া সেই কুকুর বিড়াল (ক্যাটস অ্যান্ড ডগ) না হলেও ইঁদুর বিড়াল হচ্ছিল। দোকানের সামনের মাটির রাস্তাটা থেকে একটা গন্ধ বের হচ্ছিল। দীর্ঘদিন একই জায়গায় পরিত্যক্ত চা পাতা, বিস্কুটের খোসা, পানের উচ্ছিষ্টাংশ, চুনের জল ইত্যাদি ফেলতে ফেলতে মাটিতে আর মাটির গন্ধ ছিল না। যেমন ধানি মাটির এক রকমের গন্ধ, বাড়ির পিছনে টিউবওয়েলের পাড়ের মাটির এক রকমের গন্ধ কিংবা পুকুর পাড়ের আমগাছটার গোড়ার যে মাটির গন্ধ তাতে অনেক রকম ভিন্নতা থাকে।
খানিকটা ভিজে যাওয়া চুলায় বাঁশের চোঙা ধরে ফুঁ দিতে দিতে দোকানির মুখ-চোখ লাল হয়ে উঠলেও সজাগ দৃষ্টি ছিল আমাদের দিকে। তাড়াতাড়ি ভেতর থেকে আরেক রকমের বিস্কুট এনে একটা খালি বয়ামে রাখা শুরু করলো। আমাদের দেখিয়ে দেখিয়ে, যেমন ট্রেনে বা বাসে ফেরিওয়ালারা খেলনা বিক্রির আগে বাচ্চাদের প্রলুব্ধ করে থাকে।
চারকোনা বিস্কুটের উপর খয়েরি টানা দাগ।
"ভালা বিছকুট, ভালা বিছকুট " বলে সায় দিচ্ছিলেন হরেন। ঠিক আমাদের সামনের বেঞ্চে উবু হয়ে শরীরটা সামনের দিকে ঝুঁকে বসেছিলেন। সাদা আধময়লা ধুতিটা হাঁটুর উপরে, একটা হাত তিনেক আঁশটে লাল রঙের গামছা বাঁ কাঁধে ঝুলছিল। আগেকার দিনের অবস্থাসম্পন্ন গেরস্থরা নাকি বাঁ কাঁধে গামছা রাখতেন, আর শীতের দিনে সাদা কাশ্মিরি চাদর। এখনও অনেকে অনুসরণ করেন কিন্ত মর্মার্থ জানে না এরকম অনেকেও বাঁ কাঁধে চাদর বা গামছা রেখে ঘুরে বেড়ান।
আমরাও প্রলুব্দ হলাম, দোকানি সফল হল। বাদামের গুঁড়ো দেওয়া বিস্কুট ছেড়ে হাত বাড়ালাম নতুন বিস্কুটের দিকে, সাদা সাদা।
হরেনের হাসিতে ঠিক কী ছিল সেটা বুঝে উঠতে পারিনি। তবে তার বিস্কুট উচ্চারণে এক ধরনের প্রগলভতা ছিল। বয়াম খুলে একটা বিস্কুট মুখে চেপে ধরে আরেকটা তাকে সাধলাম। তিনি হাতজোড় করে না না করতে লাগলেন। যতোই নেওয়ার অনুরোধ করি, তিনি মানা করেন। আর জোর করে হাতে দেওয়ার মতো অধিকারও নাই। কিন্তু সকাল বেলা সামনে একজন লোক তাকিয়ে দেখবে আর তাকে দেখিয়ে দেখিয়ে বিস্কুট খাব, এটা ভাল লাগছিল না।
সমাধা করলেন দোকানি। তিনি এসে বললেন "ল্যে ল্যে কাকা, বাবু দিচ্ছেন। বালোবেসেই দিচ্ছেন যে! "
এরপর তিনি আর না করলেন না, হাত পেতে নিলেন। নেওয়ার ভঙ্গিটা ছিল অনেকটা দুর্গাপূজার অষ্টমী -নবমীর দিন মহা প্রসাদ নেওয়ার মত, চোখ দুটো নিচের দিকে দুহাত পেতে। অঞ্জলীর মতো করে। যাকে হয়তো শ্রদ্ধাবনত চোখ বলা যায়। হয়তো প্রয়োজন থাকলেও এভাবে নেওয়াটা তার আত্মসম্মানে লাগছিল। অল্প পরিচিত আমাদের অনুরোধ তার আত্মবোধের দেয়াল টপকাতে না পারলেও কিন্তু দীর্ঘদিনের পরিচিত দোকানির অনুরোধ বা নির্দেশ তিনি সম্মান করেছেন দেখে লোকটার প্রতি সম্মান জাগল।
বাইরে একটা ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা বাতাস বইছিল। বৃষ্টি মাখা বাতাসে কিছুটা জলীয় বাষ্পও ঘুরে বেড়াচ্ছিল। সাদা কাঁচের কাপটা কয়েকবার ধুয়ে দোকানি যখন আমাদের সামনে লাল রঙের পানীয়টা রাখলেন, ক্রমাগত ধোঁয়া উঠছিল। উঁচু বেঞ্চে চায়ের কাপ রাখতেই তিনি হুট করে নিয়ে নিলেন না। আমরা চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে ইশারা করতেই তিনি ধীরে সুস্থে ডান হাতটা বাঁ কাধের গামছায় মুছলেন, একটা ছোট ঢিল ছোঁড়ার মত করে গামছাটা কাঁধে ফেলে দিলেন। আগেকার দিনে ডাকাতেরা ফাঁস নামের এক ধরনের অস্ত্র ব্যবহার করত। গামছার এক মাথায় ছোট এক পাথর বাঁধা। মাথার উপর অনেক ক্ষণ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে লক্ষ্যের দিকে ছেড়ে দিত। কখনও শিকারের মাথায় বাড়ি লাগত, কখনও গলায় পেঁচিয়ে যেত আর কখনও পায়ে আটকে মুখ থুবড়ে পড়ে যেত।
তার ডান হাতে গামছা ছুড়ে মারাটা সেইরকমই লাগলো।
দুই হাতে চায়ের কাপটা ধরে উষ্ণতা পেতে পেতে মুখ খুললেন হরেন। নি:সন্দেহে তিনি আমার বাবার চাইতে বড়, সবার বড় জেঠুর বয়সী। বাবার ছোট ভাইকে কাকা আর বড় ভাইকে জেঠু বললেও আমি তাকে দাদু বলে ডাকা শুরু করলাম। কারণ কাকা-ভাতিজা সম্পর্কের চাইতে দাদা-নাতিতে খুব তাড়াতাড়ি সহজ হওয়া যায়। যেমন অনেক অপরিচিত দোকানদাররা জুটি দেখলে ভাইয়া-ভাবি ডেকে দোকানের সওদা গছিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনায় থাকে। কারণ ভাবি সম্পর্কটা বেশ রসালো। মেপে মেপে কথা বলার কিছু থাকে না, হঠাৎ বেঁফাস কিছু বলে ফেললেও হেসে উড়িয়ে দেওয়া যায়।
"লতুন এয়েছেন বুঝি এলাকায়? আগে কখনো আসেননি? "
কথায় বাংলাদেশের টান নেই। অন্তত যে এলাকায় ছিলাম সে এলাকার আঞ্চলিকতার বাইরে একটা টান রয়ে গেছে।
সিলেটে আমার পরিচিত এক দর্জিকে দেখেছিলাম যিনি খুব সুন্দর বাংলা বলতেন, এমনকি আঞ্চলিতার টানও স্পষ্ট। একদিন নিজের ছেলেকে শাসানোর এক পর্যায়ে উর্দু বলে ফেলেছিলেন। সেদিনই বুঝলাম তিনি যুদ্ধের সময় এদেশে আটকে পড়াদের একজন। ক্যাম্পের ঠিকানা বদলে এদিকে চলে এসেছেন, জীবন গড়তে! কথায় কথায় চা শেষ হয়ে যাওয়ার আগেই হঠাৎ দৌড়ে দোকানে ঢুকলো বছর পনেরোর এক কিশোর। মুখে বাদামি দাড়ি -গোঁফ কালো হয়ে উঠছে, শহরের ছেলে পেলে হলে এদ্দিনে সেভ করে নানা ডিজাইনের দাড়ি রাখতো, কিন্তু গ্রামের ছেলে নিজে করার ঝুঁকি নিচ্ছে না কেটে একাকার করে ফেলতে পারে।, আবার নাপিতের কাছেও যেতে পারছে না। গ্রামের নাপিতেরাও মুরুব্বি। ছোট থেকে চুল কাটায়, এখন দাড়ি কাটতে গেলে রস-রসিকতা না করে ছাড়বে না। হয়তো অন্যজনকে ডেকে বলবে, " দেখেছিস লো, অমুকের বিটা সিয়ান হয়ে গিইয়েছে। মোকের কাছে দাড়ি খসাবে বলে এইয়েছে। সেই কোলেত্থিকে বড় কইরেছি, এখন তো বিবাহ করান লাগিবেরে। "
"তুমি বুইসেছ, অদিক সাদাবুড়ো খুঁজি খুঁজি ছাদনাতলায় গেলে গো। দড়ি পাকাতে লাকি বুইলেছিল কালিকে সন্ধ্যায়? " মাথার এক ঝাঁকড়া উস্কোখুস্কো চুল থেকে বৃষ্টির জল ঝাড়তে ঝাড়তে ছেলেটির কথার জবাবে হরেন দাদু বললো,
"যাইচ্ছি রে বাপ।"
বলেই ধুতির খুঁট থেকে কয়েকটা খুচরো পয়সা আর আধা ছেঁড়া নোট দোকানির হাতে দিয়ে বললো, বাকি থাকলে ওদের থেকে লিও। ওরা মেহমান, আপ্যায়ন করতে পারেনি সে। তাই এ অনুরোধ।
কিছু বুঝে ওঠার আগেই আগেকার মত হাত জোড় করে বললো "লমস্কার, আমি হরেন। হরেন তালুকদার। ভুল-তুরুটি ক্ষেমা করে দ্যেন। ভাগ্যে থাইকলে দেখে হইবে। খাতির কইরতে পারিনিগো, আক্ষেপি হইয়েছি।"
আমরা হেই হেই করতে করতেই ছেলেটিকে সাথে নিয়ে ধনুক থেকে ছোঁড়া তীরের মতোই বেরিয়ে গেল হরেন দাদু।
এই ঘটনায় দোকানির হে হে হাসিতে আরও রহস্য ঘনীভূত হল। বাইরে বৃষ্টির রাজত্ব, ভিতরে গরম চা- নরম সাদা বিস্কুট। দোকানিকে চেপে ধরলাম হরেন দাদুর পরিচয় বলতে।
"হরেনকে চিলবে না এরকম কেউ নেইগো ইখানে।" বলতে বলতে দুই জায়গায় ছিঁড়ে যাওয়া স্যান্ডো গেঞ্জিটা পেটের উপরে তুলে লুঙ্গিটা একটু কষে বাঁধতে লাগলো। দোকানি। বছর পঞ্চাশেক, মাথার সামনের অংশে চুল কম, গলায় কালো সুতায় বাঁধা কয়েকটা তাবিজ, ডান হাতে কালো প্লাস্টিকের বাতের একটা চুড়ি।
এইটুকু বলে আরেক দফা চা বানাতে চুলার কাছে চলে গেল। নিজের জন্যও একটা চা বানিয়ে এনে আমাদের উল্টোদিকে, যেখানে হরেন দাদু বসেছিল; সেখানেই বসল।
"মোকের ল্যাংটা কালে হরেনের কোলেই পেশাব কইরেছি গো।" বলেই গরম চায়ে শব্দ করে একটা চুমুক দিলেন। তাদের ছোটবেলায় হরেন তাগড়া জোয়ান, কাঁধ ভর্তি বাবড়ি চুল। নাকের নিচে মোটা গোঁফ। কুস্তি খেলতো। সংগ্রামের আগের কথা। মানে মুক্তিযুদ্ধের আগেকার দিকে দোকানির জন্ম যখন, তখনকার কথা। সাদা ধুতি দুই প্যাঁচ করে পরলেও হাঁটার সময় উরুর মাংসপেশীর থক থক কাঁপুনি দেখা যেত। সাদা শরীরটাতে বুকের কাছে একগোছা বাদামি লোম রোদে ঝিলিক দিত। এলাকায় ভারি কোনো কাজ থাকলে ডাক পড়তো হরেনের। একবার নাকি হাতি টেনে তুলেছিল গর্ত থেকে। যদিও বাচ্চা হাতি ছিল, পাহাড়ি ঢলে ভেসে এসে নদীর চরায় গর্তে আটকা পড়ে। হরেন দড়ি বেঁধে তাকে টেনে তুলেছিল।
চায়ের অর্ধেক শেষ করে দোকানি নিজের কাপে চিনি আনতে উঠে গেলেন। আবার ফিরে এসে শুরু করলেন হরেনের গল্প।
আমরা ধবধবে পরিষ্কার কাপের গরম চায়ে চুমুক দিতে দিতে শুনছিলাম, একটা লোকের জীবন জীবিতাবস্থায়ই যখন অন্যের কাছে গল্প হয়ে যায়!
---
তখন ভারত ভাগের সময়। বাংলা ভেঙে দুটি টুকরো হয়ে যাচ্ছে, '৪৭'র সময়টা ইতিহাসবিদদের কাছে বেদনার আর রাজনীতিবিদদের কাছে পটপরিবর্তন। সমধিকার, উন্নয়ন ইত্যাদির একটা ধাপ বলেও মন্তব্য করেছিলেন কিছু কিছু লোক। তাদের চোখের সামনে দিয়ে আর কিছু লোক ঘটি-বাটি-বদনা নিয়ে পাড়ি জমিয়েছিল এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায়। হেঁটে, গরুর গাড়িতে বা একটু স্বচ্ছলরা ট্রেনে বা যান্ত্রিক গাড়িতে করে ভিসা-পাসপোর্ট ছাড়াই স্থানান্তর হয়েছিল এক বাংলা থেকে আরেক বাংলায়।
হরেনের বাবাও তেমনি বছর পাঁচেকের হরেন আর তার দুই ভাইবোন সহ চলে এসেছিলেন এখানে। নিজের বাপ দাদার ভিটে ছেড়ে কেন এসেছিল সেটা সবার জানা থাকলেও জানার বাইরেও কিছু ঘটনা থেকে যায়, কিছু চোখের জল থেকে যায়। যে চোখের জল কোনোদিন প্রকাশ পায়নি অন্যদের কাছে। ভাঙা নোনা ধরা পাঁচিলটার পাশেই এক টুকরো জমি খুব সস্তা দরে কিনেছিলেন হরেনের বাবা। সব মিলে কাঠা দুয়েক হবে। যারা বিক্রি করছিলেন তারাও বাপ দাদার ভিটে ছেড়ে পাড়ি জমাচ্ছেন ভাগ হয়ে যাওয়া অন্য বাংলায়। নিজেদের স্বজাতি পেয়ে খুব দরাদরি না করেই দিয়ে দিয়েছিলেন।
দেশ ভাগ হলো, সম্পত্তি পরিত্যক্ত হল, হরেনদের মতো লোকেরা এক ভিটে ছেড়ে অন্য ভিটেয় গেলেও পায়নি স্বচ্ছলতা। বানভাসি মানুষদের মতো কাজের সন্ধানে থাকতে থাকতে একদিন হঠাৎই মারা গেলেন হরেনের বাবা। হরেন তখন বছর সতেরোর মাত্র। কেবল গোঁফ-দাড়ি মোটা হওয়া শুরু করেছে। গ্রামে ঠিকা কাজের পাশাপাশি পালোয়ানি শিখতে লাগল। তাগড়াই শরীর আর চওড়া কাঁধের হরেনের ডাক পড়তে লাগল গ্রামে গ্রামে। লাকড়ি কাটতে। পেশীবহুল শক্তিশালী শরীরে খুব দ্রুত অনেক গাছ কেটে লাকড়ি করতে পারে।
এরপর একটা সময় স্বাধীনতার আভাস শুরু হল। ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ‘৬৮ এর উত্তাল রাজনৈতিক রাজপথ, ‘৬৯ এর গণ অভ্যুত্থানে লুকিয়ে লুকিয়ে শহরে গিয়েছে হরেন। লেখাপড়া তেমন না থাকলেও খুব টান ছিল। মুক্তিযুদ্ধেও যোগ দিয়েছিল। ট্রেনিং নিয়ে সম্মুখ যুদ্ধেও অংশ নিয়েছিল। কিন্তু স্বাধীনতার পর পর একদিন ডাকাতদল হরেনের বাড়িতে হামলা চালায়। তেমন কিছু না পেয়ে বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। গ্রামের বেঁচে যাওয়া এক রাজাকার দূর এলাকা। থেকে এ ডাকাতদের ডেকে এনেছিল। বলছিলেন চা দোকানী।
পোড়াভিটেতে তাকিয়ে কী বলেছিল হরেন সেটা এক রহস্য বটে, কিন্তু বোঝা গিয়েছিল পরে। ততোদিনে সন্তানাদির বাপ, মাথায় অনেক চিন্তা। শহরের এর ওর কাছে গ্রামের বিভিন্ন সমস্যা, এলাকার দেনদরবার সমাধান করা শুরু করল। আগে থেকেই কিছু রাজনীতিবিদদের সাথে পরিচিত ছিল সেটা কাজে লাগল। এলাকায় বিজলী বাতি জ্বালানোর খুব ইচ্ছে ছিল হরেনের। কথা বলতে বলতে বৃষ্টি বেশ কমে এল। আমাদের খুঁজতে বরযাত্রীদের লোক এসেছিল দোকানটিতে। তাকে বসিয়ে রেখে আবার এক দফা চায়ের অর্ডার দিলাম। এবার দোকানি খুব তাড়াতাড়ি কাহিনী শেষ করে দিল।
কিন্ত কোনোভাবেই কিছু করতে পারেনি। শেষমেশ তার এক রাজনৈতিক বন্ধু বলেছিল তার নির্বাচনী প্রচারণা করতে। ভোটে জিতলে গ্রামে ইলেক্ট্রিসিটির ব্যবস্থা করবে। এলাকায় সুনাম থাকায় তার কথায় অনেক ভোট আসলো। সেই বন্ধু মন্ত্রী হলেও বিদ্যুৎ আসলো না। পরেরবার আবার ভোটে জিতিয়ে দিল
হরেন। কিন্তু এবারও আসলো না। তবে হরেনের বোধ আসলো। সে অভিমান আর আক্ষেপে সব ছেড়ে দিল।
৮০' র দশকের দিকে পুরোপুরি ঘরের কাজে মন দিল। ছেলে মেয়েগুলো তদ্দিনে পড়ালেখার বয়স হারিয়ে ফেলেছে। খুব ইচ্ছে হচ্ছিল তাদের পড়ালেখা করানোর। কিন্তু পারেনি হরেন।
শেষমেশ ছেলেদের কাছে মাফ চেয়ে ব্যবসা করতে উপদেশ আর মেয়েগুলোর অল্প বয়সেই বিয়ে দিয়ে দিল। এলাকার লোকজন না করলেও কারও কথা শোনেনি। এর পর থেকে নিজেও টুকটাক ক্ষেত খামারের দিকে মন দিল। এর ওর জমি বর্গা শুরু করল। বলার বাইরে সোনা ফলতে শুরু করল। অন্যান্য লোকদের চাইতে তার জমিতে ফসল ভাল হত। এমনকি গেরস্থ নিজে যে জমিতে ধান করেছে একই জমি বর্গা নিয়ে পরের বছর হরেন ধান করল। কিন্তু ফসল ফলল তিনগুণ। বছর পাঁচেক পর স্বচ্ছলতা ফিরল হরেনদের। বাপবেটা সবাই উপার্জন করে। ছেলেদের বিয়েও দিল। কিন্তু বদলে গেল হরেন। আর মানুষের উপকারে স্বেচ্ছায় এগিয়ে আসে না। কেউ ডাকতে গেলে পেটব্যথার অজুহাতে এড়িয়ে যায়। নিচতলার মানুষ হয়ে উপকারের নেশায় উপরতলার মানুষদের কাছে গেলে তাদের আচরণ এতোটাই ব্যথিত করেছিল নিজেকে এখন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবেও পরিচয় দেন না।
তবে জীবন যাপন খুব সাধারণ। সবার সাথেই মিল রেখে চলেন। ইদানীং বাজারেও আসেন কম। সকালে আসলে দুইদিন পর আবার আসে। আসলেও মাঝে মাঝে বিজলীবাতির আক্ষেপ শুনি আমরা। ঘরে ফ্যান চালিয়ে ঘুমানোর খুব শখ ছিল তার, আর একটা লাল রঙের একশো ওয়াটের বাল্ব!
--
এরপর অনেকদিন হয়ে গেছে। সেই এলাকাটায় আর যাওয়া হয়নি। অডিটের চাকরির সুবাদে বছর দশেক পরে গেলাম। অনেক বদলে গেছে। প্যাকেট কফি কিংবা গরম কোক সবই পাওয়া যায় সেই বাজারটিতে। সৌরবিদ্যুৎ আছে কিন্তু ইলেক্ট্রিসিটির ব্যবস্থা হয়নি এখনও। আগের চেয়ে বড় হয়েছে বাজারটা। খুঁজে খুঁজে সেই দোকানির দোকানে চা খেতে গেলাম। দোকানি বেশ বুড়িয়ে গেছেন এ কয় বছরে। একটা ছেলে চা বানায়, আর তিনি ক্যাশে বসে থাকেন। সৌরবিদ্যুত দিয়ে টিভিতে সারাদিন বাংলা সিনেমা চলে। না হলে নাকি কাস্টমার আসে না। পরিচয় দিতে চিনলেন। হরেনের কথা জিজ্ঞেস করলাম। কেমন আছেন জিজ্ঞেস করতেই বললেন ভালো নেই হরেন। শয্যাশায়ী। হাতে সময় থাকায় দেখা করতে সিদ্ধান্ত নিলাম। দোকানি কিশোর বয়সের একজনকে ডেকে বললেন হরেনের বাড়ি নিয়ে যেতে।
বাজার থেকে বেরোতেই একটা সেগুন গাছের বাগান, সেটা পেরিয়ে মোটা আল ধরে এগিয়ে চললাম। কয়েকটা জোড়া তালগাছ আর নারিকেল গাছের ভেতর দিয়ে রাস্তাটা থেমেছে হরেনের উঠানে।
অপরিচিত আমাদের দেখে বাড়ির অন্যরা একটু সন্ত্রস্ত হল। ছোট ছেলেটা বাড়িতে ছিল। উঠানে চেয়ার পেতে দিলে বসলাম। কথায় কথায় আমাদের উদ্দেশ্য জানালাম। এরপর যা শুনলাম তাতে বেশ অবাক হওয়ার মতোই। আজ প্রায় চার পাঁচ মাস ধরে হরেন দাদু শয্যাশায়ী। হঠাৎ একদিন পড়ে গিয়ে ব্যথা পান কোমরে আর পায়ে। এরপর আস্তে আস্তে ঘর-বৈঠক হয়ে যান। চোখেও ছানি পড়া শুরু করে। এখন চোখে তেমন একটা দেখেন না। তাই ঘর থেকেও বের হন কম।
আমাদের অনুরোধে হরেন দাদুর দুই পুত্রবধু তাকে উঠানে নিয়ে আসলেন। আমাদের দিকে আবছা বড় বড় চোখে তাকালেন। অনেক করে পরিচয় দেওয়ার পরও মনে করতে পারলেন না। শুধু এক পুত্রবধূর দিকে তাকিয়ে একটা কথাই বললেন, "মাগো, এরা কী বাতির নোক? "
মানে আমরা তাঁর বাড়িতে ইলেক্ট্রিসিটি দিতে এসেছি কী না!
আমরা মাথা চুপ করে দিয়ে বসে রইলাম। এক সময় দেখলাম ছানি পড়া চোখ দিয়ে তিনি সটান তাকিয়ে আছেন সূর্যের দিকে। হয়তো এটাই তার কাছে বিজলীবাতি মনে হচ্ছিল।
অনেক রূপ দেখে আসা চোখগুলো আজ ঝাপসা মলিন।
যেন আমাদেরই কোটি মানুষের সম্মিলিত এক জোড়া চোখ!

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.