| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
প্রাচ্যবিদ্যা : পরিভাষা বিশ্লেষণ
ড. ফতহুল্লাহ যিয়াদী
অনুবাদ : কাউসার খালিদ
প্রাচ্যবিদ্যা, সন্দেহ নেই, একটি গুরুত্বপূর্ণ বিস্তৃত এবং মোটামুটি জটিল বিষয়। ক্রমশ বিষয়টি নিয়ে আমি বিশদ আলোচনা করব। তবে মূল আলোচনায় প্রবেশ করার পূর্বে আমাদেরকে, আমি মনে করি, এ সংক্রান্ত পরিভাষাগুলো নিয়ে আলোচনা করতে হবে। প্রাচ্যবিদ্যা সম্পর্কে আমরা যদি একটা স্বচ্ছ জ্ঞানবোধ লাভ করতে চাই তাহলে আমাদের জন্য যেটা অপরিহার্য সেটা হচ্ছে শুরুতে প্রাচ্যবিদ্যা এবং তাতে ব্যবহৃত পরিভাষাগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট ও দ্ব্যর্থহীন ধারণা লাভ করা। বক্ষ্যমাণ নিবন্ধে তাই আমি الإستشراق বা 'প্রাচ্যবিদ্যা' পরিভাষাটি নিয়ে আলোচনা করেছি।
পরিভাষার বিষয়টি, ব্যাপকভাবে, জ্ঞানগত ও শাস্ত্রীয় যে কোন ক্যাসিক্যাল আলোচনাতেও অসাধারণ গুরুত্ব পেয়েছে। সমকালিন তাত্ত্বিক বৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলোও পরিভাষার বিষয়টির প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে। পরিভাষা বিজ্ঞানের বিকাশে মুসলিম চিন্তার অবদান উল্লেখ করার মত। ক্ল্যাসিক্যাল মুসলিম শাস্ত্রীয় গ্রন্থগুলো ঘাঁটলে দেখা যাবে তাতে, যে কোন বিষয়ে লেখা এমন কোন গ্রন্থ নেই যা উক্ত গ্রন্থে আলোচিত শাস্ত্রের সংজ্ঞা দিয়ে শুরু হয় না। মুসলিম জ্ঞান কাণ্ডের এক সমৃদ্ধ আবিষ্কার মানতেক। এই শাস্ত্রের একটি বিশাল অংশ জুড়ে আছে পরিভাষা, সংজ্ঞায়নের মূলনীতি, পরিগঠন নিয়মাবলি সংক্রান্ত বিশদ আলোচনা। মানতেক শাস্ত্রকে পরিভাষা বিজ্ঞানের জনক বলা যেতে পারে। ক্যাসিক্যাল মুসলিম লেখকদের অনেক সময় সংজ্ঞা নিয়ে ব্যাপক আলোচনা করতে দেখা যায়। তবে তাদের সাধারণ নিয়ম হচ্ছে, মূল আলোচনায় প্রবেশ করা। সন্দেহ নেই এই ট্রাডিশানের প্রশংসা পাওয়ার অনেক কিছু আছে। কারণ কোন শাস্ত্রের পদ্ধতি এবং তাতে ব্যবহৃত পরিভাষা ও মৌলিক শব্দমালা সম্পর্কে কারো যদি সূক্ষ্ম স্পষ্ট ধারণা থাকে তাহলে তার জন্য উক্ত শাস্ত্রে প্রবেশ করা অনেক সহজ হয়ে যায় এবং লেখকও পাঠকদের তার বিষয়বস্তু এবং ল্য সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা দিয়ে অনেক অযথা প্রশ্ন থেকে নিরাপদ থাকতে পারেন।
পরিভাষা নিয়ে মস্তক ঘর্মাক্ত করার আরেকটি কারণ আছে। সম্প্রতি দেখা যাচ্ছে পরিভাষা বিকৃতি একটি সাধারণ ব্যাপার হয়ে উঠছে এবং ক্রমশ তা ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে। প্রাচ্যের যে সব গবেষক ইসলাম, মুসলমান, মুসলিম চিন্তা নিয়ে কাজ করেছেন এবং করছেন তাদের অনেককে দেখা যায়, ইসলাম সংক্রান্ত আলোচনায় তারা অনেক সময় বিভিন্ন শব্দ ও পরিভাষার সচেতন এবং উদ্দেশ্যপূর্ণ বিকৃতি ঘটিয়ে থাকেন। উদাহরণত: এই ধারার গবেষকগণ তাদের আলোচনায় অনেক সময় 'ইসলাম' শব্দটি ব্যবহার করেন মুসলিম বা নির্দিষ্ট কোন মুসলিম জনগোষ্ঠী বুঝানোর জন্য। 'আমেরিকায় ইসলাম' 'মিশরে ইসলাম' অহরহ আমরা এই ধরনের শিরোনামের বিভিন্ন গ্রন্থ বা নিবন্ধের মুখোমুখী হই। ইসলামের সংজ্ঞা দেওয়ার কোন প্রয়োজন নেই। কারণ সেটা এক জানা ও স্পষ্ট বিষয় এবং এইসব প্রবন্ধগুলোতে সেই নির্দিষ্ট অভিন্ন ইসলাম সম্পর্কেই আলোচনা করা হয়েছে। কারণ একটি নির্ধারিত, অভিন্ন এক নির্ধারিত উৎস অর্থাৎ কুরআনের উপর নির্ভর করে গড়ে উঠা এক মতাদর্শ ও জীবন ব্যবস্থার নাম ইসলাম। স্থান ভেদে তার কোন পরিবর্তন হয় না। কিন্তু এই সব আলোচনায় প্রবেশ করলে দেখব ইসলাম নয়, তাতে আলোচনা করা হেচ্ছ সেই নির্ধারিত ভূ-ভাগে বসবাসরত নির্দিষ্ট কোন মুসলিম জনগোষ্ঠী নিয়ে। ইসলাম আর মুসলিম জনগোষ্ঠী কি এক কথা? এই কালে, এইসব এলাকার মুসলিমরা কি নিখুঁতভাবে ইসলামের প্রতিনিধিত্ব করছেন যে, তাদের নিয়ে আলোচনা করা আর ইসলাম নিয়ে আলোচনা করা একই ব্যাপার? এই সব শিরোনামগুলোর সঠিক রূপ কি এমন হওয়া দরকার ছিল না, 'আমেরিকার মুসলিমরা' 'মিশরের মুসলিমরা'?
'ইসলাম' পরিভাষার এই অশুদ্ধ, বিকৃত ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তারা যা করতে চান তা হচ্ছে মুসলিমদের যাপন, আচরণকে ইসলাম হিসেবে হাজির করা। উদ্দেশ্য স্পষ্ট : ইসলাম সম্পর্কে অশুদ্ধ নেতিবাচক ধারণা ছড়ানো। কিন্তু, আমরা_ তথাকথিক শিক্ষিতরা_ পাশ্চাত্য লেখকদের অনুকরণে নির্দ্বিধায় এই শব্দগুলো ব্যবহার করি, ছাপি, লিখি এবং বেমালুম ভুলে যাই পরিভাষার এই বিকৃত ও অস্পষ্ট ব্যবহার কি ভয়াবহ ফলাফল তৈরি করতে পারে।
পাশ্চাত্যের ইসলাম গবেষকদের পরিভাষা বিকৃতির আরেক উদাহরণ ইসলাম অর্থে mohammedanism শব্দটির ব্যবহার, আমাদের সম্মানিত গবেষকরা যার অনুবাদ করেন محمدية (মুহাম্মাদিয়া)। বরং অনেক সময় তারা নিজেরাও দীনে ইসলাম অর্থে এই শব্দটি ব্যবহার করেন। কখনো কখনো এই স্থানে তারা الدين المحمدي (মুহাম্মাদী দীন) শব্দটিও ব্যবহার করে থাকেন। মূলত ইংরেজি Ism শব্দটি ব্যবহার করা হয় কোন তন্ত্র বা মতবাদকে বুঝানোর জন্য। যেমন Nationalism قومية (জাতীয়তাবাদ) Secularism علمانية (ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ) Comunism إشتراكية (সমাজতন্ত্র)। এইভাবে ইসলামের ক্ষেত্রে যদি শব্দটি ব্যবহার করা হয় এবং নবী মুহাম্মাদের নামের শেষে Ism যোগ করা বলা হয় mohammedanism (মুহাম্মাদীবাদ) তাহলে খুবই সম্ভব যে, ধীরে ধীরে ইসলামের ঐশিত্ব ঘুচে যেতে থাকবে এবং এমন ভুল ধারণা জন্ম নিবে যে, ইসলাম কোন ঐশী ব্যাপার নয়, তা মূলত এক ঐতিহাসিক ব্যক্তির প্রবর্তিত মতবাদ। আমার এই আশঙ্কা নিশ্চয়ই অযৌক্তিক নয়। পাশ্চাত্যের লেখকরা এই শব্দটি ব্যবহার করে মূলত তাই করতে চেয়েছেন এবং তার পরিণতি সম্পর্কে অসচেতন থেকে, অনেক সময় ভাল নিয়তে, আমাদের শিতি লোকেরা_ চিন্তা নায়কেরা শব্দটি ব্যবহার করেছেন, করছেন।
উপরের আলোচনা থেকে আমরা এই উপসংহারে উপনীত হতে পারি যে, যে কোন গবেষণার সফলতার জন্য, বিশেষত আমাদের এই সময়ে, পরিভাষার বিশ্লেষণ, স্পষ্টিকরণ একটি অপরিহার্য বিষয়। কোন শাস্ত্র সম্পর্কে স্পষ্ট, সঠিক ধারণা লাভের জন্য সর্ব প্রথম যা দরকার তা হচ্ছে উক্ত শাস্ত্রের পরিভাষাগুলো সম্পর্কে স্পষ্ট এবং সঠিক ধারণা থাকা। শাস্ত্র আলোচনার এটিই সঠিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি।
الإستشراق প্রাচ্যবিদ্যা
الإستشراق বা প্রাচ্যবিদ্যার সংজ্ঞা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এই এলাকার গবেষকদের মতপার্থক্য রয়েছে। মূলত প্রাচ্যবিদ্যা সম্পর্কে ভিন্ন ভিন্ন দার্শনিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের কারণেই তারা তার সংজ্ঞায়নে বিভিন্ন অবস্থান নিয়েছেন। কোন কোন গবেষক মনে করেন প্রাচ্যবিদ্যা একটি জ্ঞান-তাত্ত্বিক এবং একাডেমিক বিষয়। অর্থাৎ নির্দিষ্ট এক ধরনের গবেষণা ও তত্ত্ব চর্চার নাম প্রাচ্যবিদ্যা। কেউ কেউ মনে করেন এটি বিভিন্ন ল্য নিয়ে গড়ে ওঠা একটি পশ্চিমা প্রতিষ্ঠান। অনেক গবেষকের অভিমত হচ্ছে, এটি একটি প্রাকৃতিক ফেনোমেনা, যার জন্ম প্রাচ্য প্রতীচ্য বা আরো সংক্ষিপ্ত ও নির্দিষ্টভাবে বললে ইসলাম ও খৃষ্টবাদের, পরস্পর দ্বন্দ্বের গর্ভে। এখানে আমি প্রাচ্যবিদ্যার কয়েকটি সংজ্ঞা উল্লেখ করছি। এগুলো বিশ্লেষণ করলেই আমরা জানতে পারব এই সব সংজ্ঞার নির্ধারকরা প্রাচ্যবিদ্যা সম্পর্কে কী অবস্থান নিয়েছেন।
১. প্রাচ্যবিদ্যা মানে প্রাচ্য জগৎ সম্পর্কিত বিদ্যা। শব্দটি ব্যাপক এবং বিশেষ দুই ধরনের অর্থ দিতে পারে। ব্যাপক অর্থে শব্দটি, নিকট-প্রাচ্য-মধ্যপ্রাচ্য-দূরপ্রাচ্য অর্থাৎ প্রাচ্যের যে কোন স্থান এবং ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি-ধর্ম প্রাচ্যের ইত্যাদি যে কোন বিষয়ে পাশ্চাত্যের গবেষণা ও তত্ত্বকে বুঝায়। শব্দটির বিশেষ অর্থ হচ্ছে, ইসলামী প্রাচ্য এবং তার ভাষা-ইতিহাস-বিশ্বাস সম্পর্কে পাশ্চাত্যের গবেষকদের গবেষণা ও তত্ত্ব।
২. প্রাচ্যবিদ্যা একটি প্রতীচ্যীয় প্রতিষ্ঠান, যা নতুন এক প্রাচ্য গঠন এবং তার উপর পশ্চিমা আধিপত্য নিশ্চিত করার ল্যে প্রাচ্য নিয়ে কাজ করে।
৩. বিচ্ছিন্নভাবে প্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চল নিয়ে পড়াশোনা এবং প্রাচ্যের সাহিত্যিক ও আধ্যাত্মিক শক্তির_মানবীয় সভ্যতা_সংস্কৃতি নির্মাণে যার ভূমিকা অপরিসীম_ সাধনা-চর্চা- এই দুয়ের মাঝে সমন্বয় সাধন। প্রাচ্যবিদ্যা প্রাচীন সভ্যতাগুলোর পরস্পর আদান_প্রদানও বটে। কিংবা প্রাচ্যবিদ্যা মানে মধ্যযুগীয় সভ্যতার নির্মাণকারী পরিগঠকগদের বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন।
৪. প্রাচ্যকে পাঠ, ব্যাখ্যা, পুনর্গঠন এবং তার উপর আধিপত্য বিস্তারের পশ্চিমা পদ্ধতির নামই হচ্ছে প্রাচ্যবিদ্যা।
৫. প্রাচ্যবিদ্যা মানে আরব জগৎ, সভ্যতা, ভাষা, সমাজ সম্পর্কে বিশেষ জ্ঞান। এই বিষয়ের বিশেষজ্ঞ একাডেমিক গবেষক ও অধ্যাপকরা হলেন প্রাচ্যবিদ।
৬. প্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চল ও জাতি যেমন ভারতীয়, পারসিক, চাইনিজ, জাপানী, আরবী এবং তাদের সভ্যতা-সংস্কৃতি-ভাষা-ধর্ম ইত্যাদি বিভিন্ন বিষয়ে যে সব গবেষক কাজ করেন তাদেরকেই বলা হয় প্রাচ্যবিদ।
৭. প্রাচ্যবিদ মানে পশ্চিমা গবেষক যিনি ইসলামী চিন্তা এবং ইসলামী সভ্যতা নিয়ে লেখালেখি করেন।
উল্লেখিত সংজ্ঞায়নে বিভিন্ন ধারার গবেষকদের উক্তিগুলোর প্রতিটিতে যে জিনিসটা হাজির তা হচ্ছে, প্রাচ্যবিদ্যায় দুটি বিষয় থাকবে : প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য। এর মধ্যে অধিকাংশের মত হচ্ছে প্রাচ্যবিদ্যা একই সাথে জ্ঞান-তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক ব্যাপার। প্রাচ্যবিদ্যা মানে ব্যাপকভাবে প্রাচ্যের যে কোন দেশ ও জাতির সভ্যতা সংস্কৃতি এবং বিশেষভাবে ইসলাম ও আরব সম্পর্কে পশ্চিমের পড়াশোনা, জানা এবং তার মধ্য দিয়ে তার উপর পশ্চিমের রাজনৈতিক আধিপত্যের পথ সুগম ও নিশ্চিত করা। প্রাচ্যবিদ্যা সম্পর্কে এই ধারণা উনিশ শতক পরবর্তী বিশ্ব-রাজনৈতিক ঘটনাবলী দ্বারা প্রত্যভাবে প্রভাবিত।
আরবী শব্দ কাঠামো সম্পর্কে যাদের ধারণা আছে তারা জানেন أ س ت যুক্ত ক্রিয়াপদ মূলত উক্ত ক্রিয়ার কামনা নির্দেশ করে। সুতরাং সেই হিসেবে الإستشراق শব্দের অর্থ হচ্ছে প্রাচ্যকে কামনা করা। সুতরাং শাব্দিকভাবে শব্দটি ব্যাপক অর্থবোধক। প্রাচ্য ভ্রমণ, প্রাচ্য নিয়ে পড়াশোনা- গবেষণা-লেখালেখি করা এবং প্রাচ্য উপনিবেশ গড়া_ সবই ইসতেশরাক। আমাদের মনে রাখতে হবে 'ইসতেশরাক' নিছক কোন শব্দ নয়। তা একটি পরিভাষা হয়ে উঠেছে। সুতরাং শব্দটির আভিধানিক অর্থের সাথে সাথে আমাদেরকে নির্দিষ্টভাবে তার পরিভাষিক অর্থও জানতে হবে।
প্রাচ্যবিদ্যা শব্দটি প্রথমত এবং মূলত একটি নির্দিষ্ট ভূ-গোলকে নির্দেশ করে। তবে শব্দের পারিভাষিক ব্যবহারে সেটা বিবেচ্য নয়। তাছাড়া দিকনির্ভর কোন ভূ-গোলের নিজস্ব কোন অস্তিত্ব নেই, নির্ধারকের অবস্থান অনুসারে তা নির্ধারিত হয়। জার্মানে অবস্থিত এক ব্যক্তির নিকট যেটা প্রাচ্য, জাপানে অবস্থানকারীর নিকট সেটা নিশ্চয়ই প্রাচ্য নয়।
সুতরাং শব্দটি বিচার করতে হবে ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে। ইতিহাসে আমরা দেখতে পাই, প্রাচীন কাল থেকে বিশ্ব শক্তি সবসময়, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য, প্রধানত এই শিবিরে বিভক্ত ছিল। প্রাচীন রোম-পারস্যের দ্বন্দ্ব, অত:পর রোম-মুসলমানদের দ্বন্দ্ব অত:পর মুসলমান_ক্রুসেডারদের দ্বন্দ্ব এরপর উসমানী-ইউরোপিয়ানদের দ্বন্দ্ব_ ইতিহাসের নানা পর্বে এই দুই শক্তি বিকশিত হয়েছে এই রূপে। বর্তমান কালে এসে পরস্পর প্রতিপ এই শিবির ভাগ হয়েছে যেই রূপে তাতে প্রথম শিবির অর্থাৎ পাশ্চাত্যের শিবিরে রয়েছে ইউরোপ আমেরিকা এবং দ্বিতীয় শিবির অর্থাৎ প্রাচ্যে রয়েছে এশিয়া ও আফ্রিকা।
সুতরাং শব্দটির অর্থ করতে পারি এইভাবে : ইসতেশরাক মানে পাশ্চাত্য কর্তৃক প্রাচ্যকে কামনা করা। অর্থাৎ প্রাচ্য পাশ্চাত্যের সম্পর্ক। এই সম্পর্কের কর্তা হচ্ছে পাশ্চাত্য।
কিন্তু এই সম্পর্কের ধরণ কি এবং সম্পর্ক পাতানোর ক্ষেত্রে কর্তার মনে কি খায়েশ কাজ করে? প্রাচ্যবিদ্যাকে যারা একাডেমিক, জ্ঞান-তাত্ত্বিক জায়গা থেকে বিচার করেন তারা বলেন : পশ্চিমা পণ্ডিতদের প্রাচ্য পাঠ, প্রাচ্যকে জানা, প্রাচ্যের ইতিহাস_সভ্যতা_সংস্কৃতি নিয়ে গবেষণার নামই প্রাচ্যবিদ্যা। আর যারা বিষয়টি বিচার করেন রাজনৈতিক জায়গা থেকে তারা বলেন : প্রাচ্যবিদ্যা মানে, জ্ঞানগতভাবে পশ্চিমের প্রাচ্যকে আত্মস্থ করণ এবং তার মধ্য দিয়ে তার উপর আধিপত্ব বিস্তার।
আমি মনে করি প্রাচ্যবিদদের প্রাচ্য নিয়ে কাজগুলো আমাদেরকে প্রাচ্যবিদ্যা বুঝতে সহযোগিতা করতে পারে। প্রাচ্যবিদদের কর্ম বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে তারা সমগ্র প্রাচ্য নয়, সর্বাধিক মনোযোগ দিয়েছেন প্রাচ্যের একটি বিষয়ের দিকে, সেটা হচ্ছে আরব এবং ইসলাম।
প্রাচ্যবিদ্যার এই দিকটির প্রতি লক্ষ্য রেখেই কোন কোন গবেষক প্রাচ্যবিদ্যাকে দুই ভাগে ভাগ করেছেন : ব্যাপক এবং বিশেষ। ব্যাপাক প্রাচ্যবিদ্যা কাজ করে ব্যাপকভাবে প্রাচ্যের সভ্যতা-সমাজ-সংস্কৃতি-ভাষা-সাহিত্য-ধর্ম-সমাজ-অর্থনীতি নিয়ে। আর বিশেষ প্রাচ্য বিদ্যা কাজ করে প্রাচ্যের একটি বিশেষ অংশ অর্থাৎ আরব সভ্যতা ও ইসলাম নিয়ে। পরবর্তীতে আমরা দেখব এই বিশেষ প্রাচ্যবিদ্যা নানাভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
আরব সভ্যতা ও ইসলাম নিয়ে প্রাচ্যবিদদের লেখা গবেষণাগুলো পড়লে দেখা যায়, নিছক জ্ঞান অর্জনের আগ্রহে বা অন্য কোন সদিচ্ছা নিয়ে তারা ইসলাম নিয়ে কাজ করেননি। মূলত এই প্রাচ্যবিদরা শুরুতেই আরব সভ্যতা ও ইসলাম সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব নিয়েই কাজ শুরু করেন এবং সচেতন ও পরিকল্পিতভাবে বিভিন্ন দিক থেকে তার বিরুদ্ধে কাজ করেন। বর্তমানে ইসলাম সম্পর্কে প্রচলিত ভুল বিকৃত ধারণাগুলোর অধিকাংশের জন্ম এই প্রাচ্যবিদ্যার গর্ভে। ধর্ম সচেতন মুসলিমরা যে প্রাচ্যবিদ্যা সম্পর্কে নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করতে শুরু করেছেন, তার উৎস এই দু:খজনক বাস্তবতা। বিভিন্ন মুসলিম দেশে জাগ্রত নানা ইসলামী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যখন, ইসলামী শিক্ষা ও আধুনিক পাশ্চাত্যীয় শিক্ষায় শিক্ষিত এক নতুন প্রজন্মের বিকাশ ঘটল তখন মুসলিম সমাজে প্রাচ্যবিদ্যা সম্পর্কে এই নেতিবাচক ধারণা আরো সচেতন ও সংঘটিত বিকাশ লাভ করে। এই প্রজন্ম প্রাচ্যবিদ্যার চরিত্র, প্রাচ্যবিদদের ল্য এবং ইসলাম সম্পর্কে প্রাচ্যবিদদের লেখা গ্রন্থ পাঠের বিপদ সম্পর্কে মুসলিম সমাজকে সচেতন করে তুললেন। ফলে ইসলামী বিশ্বে প্রাচ্যবিদ্যা গ্রহণযোগ্যতা হারাল। 'প্রাচ্যবিদ্যা' ও 'প্রাচ্যবিদ' শব্দগুলো পরিণত হল ঘৃণ্যতম শব্দে। এই সময়েই আমরা দেখতে পাই পশ্চিমা প্রচার মাধ্যম নতুন দুটি শব্দ তৈরি করল, 'মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা' 'মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ'। আরব, ইসলাম নিয়ে গবেষণা হয়ে উঠল 'মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা' এই বিষয়ের পশ্চিমা গবেষক, 'প্রাচ্যবিদ' বাদ দিয়ে নতুন নাম গ্রহণ করলেন : 'মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ'। বলাবাহুল্য প্রাচ্যবিদ্যার বিষয় ও ল্য কিন্তু অভিন্নই থাকল। বদলে গেল শুধু তার নাম। 'প্রাচ্যবিদ্যা' ও 'মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা' মূল স্বভাবে এবং রাজনৈতিক ল্যে একই বস্তু।
'মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা' নতুন এই পরিভাষাটির উদ্ভব ঘটে পঞ্চাশের দশকের পর থেকে। শব্দটি জন্মদাতা যুক্তরাষ্ট্রের মিডিয়াগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন সংগঠনই পরিকল্পিতভাবে তৈরি করে বিভিন্ন বিষয়ের 'মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞদের'।
'প্রাচ্যবিদ' শব্দটির সর্ব প্রথম ব্যবহার ল্য করা যায়, প্রাচ্যের এক চার্চ সদস্যের ক্ষেত্রে, ১৬৩০ সালে। এরপর ১৬৯০ এ স্যামুয়েল ক্লার্ক প্রাচ্যের কয়েকটি ভাষা শিখে 'প্রাচ্যবিদ' হিসেবে বিখ্যাত হয়ে উঠেন।
শব্দটি ইংরেজি ডিকশনারিতে প্রবেশ করে ১৭৭৯ সালে। ফরাসী একাডেমির শব্দকোষে ঢুকে ১৮৩৮ সালে।
الاستغراب و المستغرب পাশ্চাত্যবিদ্যা ও পাশ্চাত্যবিদ স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন হতে পারে الاستشراق (প্রাচ্যবিদ্যা)-এর মত الاستغراب (পাশ্চাত্যবিদ্যা) বলে কোন কিছুর অস্তিত্ব আছে?_ শাব্দিকভাবে অবশ্যই আছে। الاستشراق এর বিপরীত শব্দ হতে পারে الاستغراب । الاستشراق এর মানে যদি হয় প্রাচ্যের ইতিহাস-সভ্যতা-সাহিত্য-সংস্কৃতি ধর্ম নিয়ে প্রতীচ্যীয় গবেষণা তাহলে তার বিপরীত শব্দ হবে الاستغراب যার মানে হবে পাশ্চাত্যের ইতিহাস-সভ্যতা-ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্পর্কে প্রাচ্যীয় গবেষণা।
©somewhere in net ltd.