নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

রাজ কুশল

রাজ কুশল › বিস্তারিত পোস্টঃ

প্রাণপ্রতীম

১০ ই ডিসেম্বর, ২০১৪ সকাল ৯:৫৬

আজ নিউইয়র্ক টাইমস এর প্রথম পৃষ্ঠায় এক বাঙ্গালী চিত্রশিল্পীর নাম এসেছে, গত বছরের অক্টোবর মাসের ম্যাগাজিনে উনার আঁকা শিমুল গাছের চিত্র সমগ্র পৃথিবীবাসীর মনে বিস্ময় সৃষ্টি করেছিলো, উনার জীবনের সর্বশেষ চিত্রকর্ম ছিলো এই শিমুল গাছ।

উনার নাম এস আর খান, পূর্ণরূপে শফিকুর রেজা খান। এই বছরের শুরুতেই উনি না ফেরার দেশে চলে গেছেন, এর পর থেকেই মানুষের মনে শুরু হয়েছে কৌতূহল!


১৯৭৭ সালে বিশ বছর বয়সী শফিক পিতামাতার সাথে চলে আসে এই নিউইয়র্কের রোচেস্টার শহরে। ছেলের আঁকাআঁকির শখ দেখে, পিতা রেজা খান ছেলেকে রোচেস্টার আর্ট স্কুলে ভর্তি করেন শিক্ষাজীবন শেষ করার পর হঠ্যাৎ করেই অনেকটা ঘরমুখী হয়ে যান তিনি , পিতার মৃত্যুর পর মা দেশে ফিরে যান কিন্তু ছেলে শফিক এই রোচেস্টার শহরেই থেকে যায়।

পিতার রেখে যাওয়া বাড়িটির ঘরভাড়া দিয়েই দিন চলে যেত শফিক সাহেবের । গেলো দুবছর ঘর থেকেই বের হন নি তিনি, দেশ থেকে মায়ের মৃত্যুর খবর পেয়েও দেশে ফিরে যান নি। সারাদিন ঘরে বসে ছবি আঁকতেন। রোনাল্ড গঞ্জালেস নামে উনার এক বন্ধু ছিলো। ভদ্রলোক মাঝে মাঝেই উনাকে দেখতে আসতেন, পেশায় উনি একজন লেখক। উনি দেখতেন সমগ্র ঘরে শিমুল গাছের ছবি, সবই উনার আঁকা,দেখতেন আর ভাবতেন। একই গাছের ছবি কেন? জানতে চাইলে শফিক সাহেব কখনো এর উত্তর দিতেন না। শেষ যেবার রোনাল্ড সাহেব উনার বাসায় গিয়েছিলেন তখন রফিক সাহেব উনার হাতে একটি ছোটো ডায়েরী ধরিয়ে দিয়েছিলেন। ডায়েরীটি বেশ পুরোনো, কাচা হাতে বাংলায় লেখা, বাঙ্গালী বন্ধুর সাথে থেকে ভালো বাংলা রপ্ত করেছিলেন রোনাল্ড সাহেব।ডায়েরীর কিছু গুরুত্বপূর্ণ লেখা ছিলো -

১৩ অক্টোবর ১৯৭২

আজ বাবা আমাকে একটি শিমুলের চারা উপহার দিয়েছেন,আমি এর নাম দিয়েছি প্রানপ্রতীম।

১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৭৩

প্রানপ্রতীম অনেক বড় হয়েছে, শাখাপ্রশাখা গজিয়েছে ওর পড়ন্ত বিকেলের সূর্যের আলোতে ওকে মনে হয় যেন এক অপূর্ব মহিমায় দাড়িয়ে আছে।

২৩ ডিসেম্বর ১৯৭৪

প্রানপ্রতীম এর পাতা ঝরতে শুরু করেছে, কেনো জানি খারাপ লাগছে মনে হচ্ছে ও কান্না করছে।

২৭ জানুয়ারি ১৯৭৫

কে জানি কাল রাতে প্রানপ্রতীম এর ডাল ভেঙে দিয়েছে, সকালবেলা ঘুম থেকে ওর রক্ত ঝরতে দেখেছি, আজ অনেক কেঁদেছি আমি।

১৫ সেপ্টেম্বর ১৯৭৭

আজ আমরা দেশ ছেড়ে চলে যাবো, কিন্তু আমার প্রাণকে নিতে পারবো না। মন কাঁদছে , একটু পরে আমরা বের হয়ে যাবো। প্রানপ্রতীম বুঝতে পারছে তাইতো একের পর এক পাতা ঝরছে ওর শরীর থেকে, গেলাম বন্ধু।

কলমটা এখানেই থেমে গেলো। রোনাল্ড সাহেবের চোখের কোণে অশ্রু জমা হয়েছে। উনি ঠিক করেছেন সামনের মাসে বাংলাদেশ যাবেন। ভিসা হয়ে গেলো কিছুদিনের ভিতরেই রোনাল্ড সাহেব রওনা হলেন বাংলাদেশের উদ্দেশ্যে , ভালোভাবেই পৌছালেন বাংলার মাটিতে। এতদিন শফিক সাহেবের মুখে শুনতেন রূপসী বাংলার রূপের কথা, আজ যেনো এর প্রমাণ হাতে পেলেন।


অনেক কষ্টের পর খুজে বের করলেন শফিক সাহেবের জন্মভিটা , বাড়িটি অনেক আগের, বাড়ির আশেপাশে আগাছা জন্মিয়েছে । বাড়ির আঙিনার দক্ষিণ পাশেই মাথা উচু করে দাঁড়িয়ে আছে একটি শিমুল গাছ। বেশ অবিভূত হলেন! কি করে সম্ভব? শফিক সাহেবের আকা ছবিটির হুবহু দেখতে একটি জীবন্ত গাছ কিন্তু উনি ১৯৭৭ এর পরে এই গাছটিকে আর কখনো দেখেনই নি। একজন মানুষের মনের দৌরাত্ম্য এতবেশী! কিছু সময়ের জন্য নীবর হয়ে গাছটির দিকে তাকিয়ে রইলেন এই আমেরিকান লেখক,গাছের প্রতিটি ডালপালা শফিক সাহেবের আঁকা ছবির সাথে মিলে যাচ্ছে। এও কি সম্ভব! চোখের সামনে ডায়েরীর লেখা ভেসে উঠছে , একজন মানুষের সাথে একটি গাছের এতো সখ্যতা হয়ে উঠতে পারে! বিস্ময়কর।

আজকের নিউইয়র্ক টাইমসের প্রথম পৃষ্ঠায় চিত্রশিল্পী শফিকুর রেজা খানকে নিয়ে লিখা লেখাটি রোনাল্ড গঞ্জালেসেরই ছিলো।

"একজন শিল্পী যখন ছবি আঁকে, তখন মনে রাখতে হবে এটা শুধু ছবি নয় একটি ইতিহাস, যা জানতে হলে আপনাকে শিকড়ে যেতে হবে ঠিক যেমনটি গিয়েছিলেন রোনাল্ড গঞ্জালেস।






মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.