নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

লন্ডন থেকে

লন্ডন থেকে › বিস্তারিত পোস্টঃ

দোষী হলে জামায়াত নিষিদ্ধ ও সম্পদ বাজেয়াপ্ত

১৯ শে ফেব্রুয়ারি, ২০১৩ সকাল ৮:২৬

একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে যেসব সংগঠন বা রাজনৈতিক দল জড়িত ছিল তাদের বিচার এবং বাদী ও সরকারের আপিলের সুযোগ রেখে আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) (সংশোধনী) বিল ২০১৩-তে গতকাল সোমবার স্বাক্ষর করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান। এখন গেজেট প্রকাশের অপেক্ষা। এর ফলে ব্যক্তির পাশাপাশি অপরাধী সংগঠনের বিচার করার ক্ষমতা পেলেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল। আইনমন্ত্রী, অ্যাটর্নি জেনারেলসহ আইনজ্ঞরা বলছেন, সংশোধিত এ আইনের আওতায় মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত সংগঠনের বিচার করা যাবে। বিচারে সংগঠন দোষী সাব্যস্ত হলে তা নিষিদ্ধের পাশাপাশি এর সম্পদ বাজেয়াপ্ত ঘোষণার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। একই সঙ্গে সংগঠনকে সাজা দেওয়া হলে এর পরিচালনাকরীদেরও সমপরিমাণ সাজা দেওয়া যাবে।

এ বিষয়ে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, সংশোধিত ট্রাইব্যুনাল আইনে ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠনের বিচার করার ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালকে। আইন অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত সংগঠনকে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা বিচারকদের দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, কম্পানি আইন ও আয়কর অধ্যাদেশে প্রতিষ্ঠান বা কম্পানিকে সাজা দেওয়ার বিধান আছে। সেখানে কম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে পরিচালনাকারীদের সাজা দেওয়া হয়। কারণ কম্পানি বা প্রতিষ্ঠানের সাজা কার্যকর করার সুযোগ নেই। সে জন্যই এ ব্যবস্থা। একইভাবে ট্রাইব্যুনাল আইনে সংগঠনকে সাজা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। এখানেও সংগঠন যেহেতু সাজা ভোগ করতে পারে না, সে জন্য সংগঠনের পরিচালনাকারীদের সাজা দেওয়ার সুযোগ আছে। মন্ত্রী বলেন, দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের পর নাৎসি বাহিনীকে সাজা দেওয়া হয়। এ বাহিনীকে অবৈধ ঘোষণা করে তাদের পরিবর্তে বাহিনীর নেতাদের সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তিনি আরো বলেন, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে ৪৭(৩) অনুচ্ছেদে ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠনকে বিচারের আওতায় আনার সুযোগ সৃষ্টি করা হয়েছে।

এ বিষয়ে রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, আইন অনুযায়ী দোষী সাব্যস্ত সংগঠন নিষিদ্ধ হতে পারে। এমনকি সংগঠনের পক্ষে পরিচালনাকারীদেরও শাস্তি দেওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

আইন কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শাহ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, আইনে আগে সংগঠনের বিচার করার সুযোগ ছিল না। নতুন সংশোধনীর মাধ্যমে সে সুযোগ হয়েছে। তিনি বলেন, নুরেমবার্গ ট্রায়ালে নাৎসি বাহিনীর বিচার হয়েছে। সেই বিচারের রায়ে নাৎসি বাহিনীকে অবৈধ ও নিষিদ্ধ ঘোষণার পাশাপাশি সংগঠনটির সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা হয়। এমনকি নাৎসি বাহিনী পরিচালনাকারীদেরও সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হয়। তিনি আরো বলেন, ট্রাইব্যুনাল আইনের ২০(২) ধারায় সাজা দেওয়ার বিধান রয়েছে। ট্রাইব্যুনাল দোষী ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড অথবা অন্য যেকোনো সাজা দিতে পারেন। সংশোধিত আইনে ব্যক্তির পাশাপাশি সংগঠনকেও এ ধরনের সাজা দিতে পারবেন ট্রাইব্যুনাল।

গত ৫ ফেব্রুয়ারি কাদের মোল্লার মামলার রায় দেওয়ার পর রাজধানীর শাহবাগসহ সারা দেশে যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসির দাবিতে গণজাগরণ সৃষ্টি হয়। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সরকার আইন সংশোধনের সিদ্ধান্ত নেয়। গত রবিবার সংসদে আইনটি পাস হয়। আইনটি সংশোধন করায় গোলাম আযমের নেতৃত্বাধীন জামায়াতে ইসলামী, মাওলানা ফরিদউদ্দিন আহমেদের নেতৃত্বাধীন নেজামে ইসলামী পার্টি, সবুর খানের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ, ফজলুল কাদের চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন কনভেনশন মুসলিম লীগ ও খাজা খয়ের উদ্দিনের কাউন্সিল মুসলিম লীগ বিচারের আওতায় আসতে পারে। এ ছাড়া জামায়াতের তৎকালীন ছাত্র সংগঠন ছাত্রসংঘ তো রয়েছেই।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর ২০১০ সালের ২৫ মার্চ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা হয়। এরই মধ্যে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে ফরিদপুরে বাচ্চু রাজাকার নামে খ্যাত সাবেক জামায়াতের রুকন মাওলানা আবুল কালাম আযাদ ও জামায়াত নেতা আবদুল কাদের মোল্লার বিচার সম্পন্ন হয়েছে। রায়ে বাচ্চু রাজাকারকে ফাঁসি ও কাদের মোল্লাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়। দুটি রায়েই উল্লেখ করা হয়, জামায়াতে ইসলামী রাজাকার, আলবদর, আলশামস বাহিনী গঠন করে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটন করেছে। পাকিস্তান সেনাবাহিনী ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ অপারেশন সার্চলাইট নামে নিধনযজ্ঞ শুরু করে। এরই ধারাবাহিকতায় নিরস্ত্র মানুষ, হিন্দু সম্প্রদায়, আওয়ামী লীগ ও মুক্তিযুদ্ধের সমর্থক, বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করা হয়। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অপকর্মে সহযোগী বাহিনী হিসেবে জামায়াতের গড়া রাজাকার, আলবদর ও আলশামস মানবতাবিরোধী অপরাধে সংশ্লিষ্ট থাকে।

এসব বাহিনী পাকিস্তানিদের সঙ্গে মিলে ও পৃথকভাবে বাঙালি নারী-পুরুষের ওপর নির্যাতন চালায়। হত্যা, ধর্ষণ, লুটপাট, অগ্নিসংযোগে সহযোগিতা করে। আবার নিজেরাও এসব কাজ করে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের দেশত্যাগে বাধ্য করে, ধর্মান্তরিত করতে বাধ্য করে।

রায়ে আরো বলা হয়, জামায়াতে ইসলামী, তার ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ, নেজামে ইসলামী, মুসলিম লীগ, পাকিস্তান ডেমোক্রেটিক পার্টি, কাউন্সিল মুসলিম লীগ পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর দালালি করে পাকিস্তান বাহিনীকে সহযোগিতা করে।

দুটি রায়ে পাকিস্তানপন্থী এসব দলের ভূমিকা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হলেও আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্ট, ১৯৭৩-এ যুদ্ধাপরাধে অভিযুক্ত দলগুলোর বিরুদ্ধে শাস্তি দেওয়ার বিধান ছিল না। এ জন্য বিভিন্ন সংগঠনসহ সাধারণ মানুষ দাবি করে জামায়াত-শিবির নিষিদ্ধ করার। এরই পরিপ্রেক্ষিতে মানবতাবিরোধী অপরাধের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত সংগঠন বা দলকে বিচারের আওতায় আনতে সংসদ সদস্য রাশেদ খান মেনন আইন সংশোধনের জন্য গত রবিবার জাতীয় সংসদে একটি প্রস্তাব উত্থাপন করেন। প্রস্তাবটি সর্বসম্মতভাবে পাস হলে এটি সংশোধিত আইনে পরিণত হয়। এখন আর মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত সংগঠন বা দলগুলোর বিচারে বাধা নেই।

কিভাবে বিচার : এক বা বিভিন্ন ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলে ট্রাইব্যুনাল বা যেকোনো আদালত তাদের আইনানুযায়ী বিচার করতে পারেন। কিন্তু সংগঠন বা দলের বিচার কিভাবে হবে সে সম্পর্কে আইন বিশেষজ্ঞদের মত হলো, যদি কোনো দল বা সংগঠন মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত ছিল মর্মে ট্রাইব্যুনালের কাছে প্রমাণ হয়, তবে ওই দলের ওই সময়কার নেতাদের শাস্তির আওতায় আনা যাবে। সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে।

বাংলাদেশে প্রচলিত আয়কর আইন, কারখানা আইন, শ্রম আইন, পরিবেশ আইন, নেগোশিয়েবল ইনস্ট্রুমেন্ট অ্যাক্টসহ বেশ কিছু আইনে ব্যক্তির পাশাপাশি তাদের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও মামলা করা যায়। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা বা সাজা দেওয়ার অর্থ ওই প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বা পরিচালনা পর্ষদের সদস্যদেরও শাস্তি দেওয়া। আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনালস) অ্যাক্টে দল বা সংগঠনের বিচার করলে এ ক্ষেত্রে দলের কারা আইনের আওতায় আসবে তার একটি ব্যাখ্যা প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করেন আইনজ্ঞরা। সে জন্য আবারও আইনটি সংশোধন করা হতে পারে।

ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনালের খোঁজে বাংলাদেশ : সরকার অবশ্য আইনটি পাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর নাৎসি যুদ্ধাপরাধের জন্য জার্মানির নুরেমবার্গের ঐতিহাসিক ট্রাইব্যুনালে যে ২১ জন শীর্ষস্থানীয় যুদ্ধাপরাধীর বিচার হয়েছিল সেই মামলার রায়ের কপি সংগ্রহের চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে। ওই ২১ জনের পাশাপাশি যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে সাতটি সংগঠনেরও বিচার করা হয়েছিল। নাৎসি পার্টি, গেস্টাপো, এসএস, এসডি, এসএ, রিচ ক্যাবিনেট ও জার্মান আর্মড ফোর্সেস নামের এই সাতটি সংগঠন এখনো ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নিষিদ্ধ। এদের বিচার কিভাবে করা হয়েছিল, তারই নথি ও রায়ের খোঁজ করছে সরকার। এরই মধ্যে বাংলাদেশ আইন কমিশনকে ওই রায় সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়ার জন্য আইন মন্ত্রণালয় থেকে বলা হয়েছে। ন্যুরেমবার্গ ট্রায়ালের রায় পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ। নুরেমবার্গ ট্রায়ালের মতো আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়েও জামায়াত-শিবিরসহ যুদ্ধাপরাধে জড়িত অন্যান্য দলও বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হতে বাধা থাকবে না বলে মনে করেন অনেকে।

গতকাল বিকেলে এ বিষয় নিয়ে নিজ কার্যালয়ে আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ জাতীয় মানবাধিকার কমিশন চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান ও আইন কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক শাহ আলমের সঙ্গে বৈঠক করেন।

রাষ্ট্রপতির স্বাক্ষর : সংসদ সচিবালয়ের গণসংযোগ শাখার উপপরিচালক মোহাম্মদ নাজমুল হুদা কালের কণ্ঠকে জানান, গত ১৭ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদে পাস হওয়া আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) (সংশোধন) অ্যাক্ট-২০১৩ গতকাল সকালে রাষ্ট্রপতির দপ্তরে পাঠানো হয়। রাষ্ট্রপতি দুপুরেই ওই বিলে স্বাক্ষর করেন। এখন ওই আইনের গেজেট প্রকাশের উদ্যোগ নিয়েছে সংসদ সচিবালয়। দ্রুতই গেজেট প্রকাশ হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

সংসদে পাস হওয়া নতুন আইনটি ২০০৯ সালের ১৪ জুলাই থেকে কার্যকর দেখানো হবে। সংশোধিত আইন অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে সরকার, বাদী ও বিবাদীপক্ষ শুধু আপিল করতে পারবে। এ ছাড়া রায়ের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল এবং ৬০ দিনের মধ্যে সেই আপিল নিষ্পত্তির সময় ধরে দেওয়া হয়েছে।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.