| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু
লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।
সতর্কবার্তা: এটি একটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক ক্রাইম ফিকশন। গল্পের সমস্ত চরিত্র, নাম, স্থান এবং ঘটনা লেখকের কল্পনাপ্রসূত। বাস্তব কোনো জীবিত বা মৃত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান অথবা ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে এর কোনো মিল খুঁজে পাওয়া গেলে তা সম্পূর্ণ কাকতালীয় বলে গণ্য হবে।
রাজধানীর ব্যস্ততম মেইন রোডের ওপর ছয়তলা ভবনটি। নিচে সারি সারি দোকানপাট, জেনারেটরের একটানা আওয়াজ আর মানুষের হট্টগোল। অথচ এই ভরা দুপুরের আলোতেও তিনতলার উত্তর পাশের ফ্ল্যাটটি কেমন যেন থমথমে, নিস্পৃহ।
লিভিংরুমের ভারী পর্দাগুলো সম্পূর্ণ টানা। মেঝের এক কোণে ছড়িয়ে আছে একটা বাচ্চার ভাঙা মাটির ব্যাংক, কিছু খুচরো কয়েন আর ছেঁড়া কাপড়ের টুকরো। ঘরের এই কৃত্রিম অন্ধকার আর ওলটপালট হয়ে থাকা আলমারির ড্রয়ারগুলো দেখেই বোঝা যায়, এখানে কয়েক ঘণ্টা আগে একটা তাণ্ডব চলে গেছে।
পিবিআই-এর স্পেশাল ইনভেস্টিগেটর আরিয়ান ড্রইংরুমের মেঝেতে এক হাঁতু গেড়ে বসে একটা সুতোর টুকরো দেখছিলেন। চারপাশের কোনো অনুভূতিই আজ ওঁর ভেতর পৌঁছাচ্ছে না, একটা অদ্ভুত মানসিক অসাড়তা তাঁকে গ্রাস করেছে। পাশে হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে পরিদর্শক তানভীর। তানভীরের চওড়া কাঁধ আর শক্ত চোয়াল আজ স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি উগ্র দেখাচ্ছে। একটা সাত বছরের বাচ্চাকে ড্রাগ খাইয়ে অজ্ঞান করা হয়েছে—এই একটা তথ্যই তানভীরের ভেতরের রাফ অ্যান্ড টাফ পুলিশ অফিসারটাকে জাগিয়ে তোলার জন্য যথেষ্ট ছিল।
“লোকাল পুলিশ এটাকে সিম্পল ডাকাতি বলছে, স্যার,” তানভীর ওঁর ভারী গলায় বলল, তার বুটের শব্দে ঘরের নিস্তব্ধতা ভাঙল। “তিনজন ছেলে ‘টু-লেট’ দেখার নাম করে ভেতরে ঢুকেছিল। বাড়িওয়ালার মা দরজা খোলার সাথে সাথে ওনাকে মেঝেতে আছাড় মারে। হাত-পা বাঁধে। তারপর বাচ্চাটাকে কোনো কড়া ঘুমের ওষুধ খাইয়ে আলমারি সাফ করে। ঠিক ১২টায় যখন স্কুলশিক্ষিকা মা বাসায় ফেরেন, ওনাকেও দরজার আড়ালে লুকিয়ে থেকে রড দিয়ে মাথায় আঘাত করে মুখ বেঁধে ফেলে। বুয়া চলে আসায় ওরা ব্যাকপ্যাক নিয়ে মেইন রোড দিয়ে পালায়।”
করিডোর দিয়ে হেঁটে ভেতরে ঢুকল বর্ষা। তার বব-কাট ব্রাউন কালার চুলগুলো আজ একটু অগোছালো। ওঁর ধূসর চোখে এক ধরণের চটজলদি সিদ্ধান্তের তাগিদ।
“আরিয়ান, আমি হসপিটাল থেকে আসছি,” বর্ষা সরাসরি আরিয়ানের মুখোমুখি দাঁড়াল। “বাচ্চাটার অবস্থা ক্রিটিক্যাল, ফেনা বমি করছে। আর ওই শিক্ষিকা ভদ্রমহিলার মুখের ভেতর হাত ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল যাতে চিৎকার করতে না পারেন। মাড়ির চামড়া ছিঁড়ে গেছে। এটা লোকাল কোনো প্রফেশনাল ডাকাত দলের কাজ। আমাদের ওই এরয়ার সোর্সদের ওপর প্রেশার ক্রিয়েট করা উচিত।”
আরিয়ান মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ালেন। তিনি বর্ষার দিকে তাকালেন না। ওঁর ডান হাতের তর্জনীটা নিজের বাম হাতের তালুতে মৃদু ছন্দ তুলল।
“তুমি তাড়াহুড়ো করছ, বর্ষা,” আরিয়ান শান্ত গলায় বললেন। “প্রফেশনাল ডাকাতরা কখনো দুপুর বেলা মেইন রোডের ওপর, যেখানে নিচে শত শত দোকানপাট—সেখানে ডাকাতি করতে আসে না। তাছাড়া ওরা ইলেকট্রনিক্স জিনিস বা মোবাইল ফোনগুলো ছোঁয়নি। শুধু ক্যাশ আর গয়না নিয়েছে। ইনফরমেশনটা ইনসাইড। এই ফ্ল্যাটের প্রতিদিনের শিডিউল খুব ভালো করে জানত এমন কেউ লাইনে ছিল।”
বর্ষা ভ্রু কুঁচকে তাকাল, তার আত্মবিশ্বাসে একটু ধাক্কা লাগল। “কিন্তু আমরা সন্দেহভাজন পাবো কোথায়? পুরো বিল্ডিংয়ে ওনাদের আত্মীয়স্বজন থাকে।”
“নিচে দোকানে খোঁজ নাও, তানভীর,” আরিয়ান বললেন। “এই বিল্ডিংয়ে গত এক মাসে কোনো নতুন কর্মচারী, মেকানিক বা পেইন্টার কাজ করেছে কি না।”
বিকেল চারটা। মুগদা থানার একটা ছোট অন্ধকার ঘরে জেরা চলছিল।
টেবিলের ওপাশে বসে আছে একটা বিশ-বাইশ বছরের ছেলে। গায়ে হাফ প্যান্ট আর স্যান্ডো গেঞ্জি, পায়ে সস্তা প্লাস্টিকের স্যান্ডেল। নাম সজীব। এই বিল্ডিংয়ের নিচের একটা মুদি দোকানের ডেলিভারি বয়। একটু আগে সিসিটিভি ফুটেজে তাকে দুপুর ১২টার পর ব্যাকপ্যাক কাঁধে দ্রুত হেঁটে যেতে দেখা গেছে।
তানভীর টেবিলের ওপর ওঁর বিশাল দুই হাত ভর দিয়ে সজীবের দিকে ঝুঁকে পড়লেন। ওঁর চোখমুখ থেকে হিংস্রতা ঝরছে। “সজীব, তোদের ব্যাগে যে গয়নাগুলো পাওয়া গেছে, ওগুলোর রসিদ কোথায়? নাকি বলব মুগদা হসপিটালে যে বাচ্চাটা বমি করছে, ওটার মুখে বিষ তোরা দিয়েছিস?”
সজীব কাঁপছিল, কিন্তু তার চোখে একটা ধূর্ত চাউনি। “স্যার, আমি কিচ্ছু জানি না। আমি দুপুরে ডেলিভারি দিতে ওপরে গিয়েছিলাম। বুয়া যখন চিৎকার দিল, আমি ভয়ে ওনাদের সাথে নিচে নেমে আসি। ব্যাগের গয়না আমার না, ওটা প্রদীপের।”
“প্রদীপ কে?” তানভীর ওঁর কলার চেপে ধরলেন, ওঁর রাফ হ্যান্ডলিং দেখে সজীবের চোয়াল চট করে শক্ত হয়ে গেল।
“প্রদীপ আমাদের ওদিকের বড় ভাই। ওই আমাকে বলেছিল দুপুর ১১টায় তিনতলার ফ্ল্যাটে পানি দিতে যেতে। ওরাই ওপরে কাজ করছিল,” সজীব এবার একটু বানিয়ে বানিয়ে বলতে শুরু করল। “আমি ওপরে গিয়ে দেখি দরজা খোলা, আর প্রদীপরা আলমারি ভাঙছে। আমি ভয় পেয়ে চলে আসতে চাইছিলাম, ওরাই আমার ব্যাগে গয়না গুজে দেয়。”
বর্ষা পাশে দাঁড়িয়ে নোট নিচ্ছিল, সে সজীবের এই ভয় পাওয়ার গল্পটা বিশ্বাস করে আরিয়ানের দিকে তাকাল। আরিয়ান এতক্ষণ ঘরের কোণে চুপচাপ দাঁড়িয়ে একটা প্লাস্টিকের পানির বোতলের ছিপি ঘোরাচ্ছিলেন। ওঁর মুখে কোনো অভিব্যক্তি নেই।
ঠিক তখনই তানভীরের ফোনটা বেজে উঠল। সে ফোনটা কানে নিয়ে ওপাশ থেকে কথা শুনে সজীবের দিকে একটা ঠান্ডা দৃষ্টি ছুড়ল।
“স্যার, আমাদের টিম মমিনহাটা মোড়ের দর্জির দোকানটা ভেরিফাই করেছে। সজীবের বাপের দোকান। ক্রাইম সিনে ভিকটিমের মুখে যে নীল কাপড়টা গোঁজা ছিল, ওটা ওই দোকানেরই ছাঁট কাপড়। কাপড়ের ব্র্যান্ডের সিল মিলে গেছে,” তানভীর ফোনটা পকেটে রাখল।
আরিয়ান ধীর পায়ে সজীবের সামনে এসে বসলেন। আরিয়ানের এই শান্ত ভাবটা সজীবকে আরও বেশি অস্বস্তিতে ফেলে দিল।
“সজীব,” আরিয়ান খুব নিচু, প্রায় ফিসফিসানি স্বরে বললেন। “ভিকটিম শিক্ষিকা ভদ্রমহিলা যখন দরজার স্পাই-হোল দিয়ে দেখছিলেন, তখন ওঁর চেয়েও উঁচু একটা মানুষের অবয়ব দেখেন। তোমার হাইট পাঁচ ফুট দশ ইঞ্চি। সিসিটিভি ফুটেজেও তোমার কাঁধের ব্যাকপ্যাকটা স্পষ্ট। প্রদীপের ঘাড়ে দোষ চাপাচ্ছ কেন?”
সজীবের মুখের শেষ রক্তবিন্দুও উবে গেল। তার বানানো গল্পের তাসের ঘরটা এক মুহূর্তে ভেঙে পড়ল। সে বুঝতে পারল, এই শান্ত অফিসারটি তার পেছনের সব ইতিহাস টেনে বের করে এনেছেন।
সজীব এবার আর কোনো ভালো সাজার চেষ্টা করল না। ওঁর গলার স্বর হুট করে বদলে গেল, এক ধরণের কর্কশ ঠান্ডা ভাব চলে এল ওঁর গলায়।
“টাকা আমাগো দরকার আছিল স্যার। লকডাউনের পর থিকা দোকানে অনেক দেনা। আমরা জানতাম ওই ম্যাডাম ১২টায় আসে। বুড়িটা হুট কইরা চিল্লাইতে গেল, তাই প্রদীপ ওরে আছাড় মারে। আর পোলাটা আমারে চিনে ফেলছিল, ও মুদি দোকানের সজীব ভাই বইলা ডাক দিছিল। এইজন্য ওরে ঠাণ্ডা করার লাইগা কাশির সিরাপের সাথে ঘুমের ওষুধ মিশাইয়া খাওয়াইয়া দিছিলাম। মারার ইচ্ছা আছিল না স্যার, কিন্তু ম্যাডাম যখন হুট কইরা ঘরে ঢুকল, মাথা পুরা নষ্ট হয়া গেছিল আমাগো।”
তানভীর তীব্র ঘৃণায় সজীবের চুল মুঠো করে ধরল। “বাকি দুজন কোথায়?”
“ওরা ফতুল্লার দিকে গেছে স্যার... মাল সব প্রদীপের কাছে।”
রাত আটটা।
মুগদা হাসপাতালের করিডোরে তখনো হালকা ভিড়। বাচ্চার মা, ওঁর মুখে আর মাথায় ব্যান্ডেজ জড়ানো, হসপিটালের বেডের পাশে বসে আছেন। বাচ্চাটার স্যালাইন চলছে, তবে ডাক্তাররা জানিয়েছেন অতিরিক্ত মাত্রার সিডেটিভ দেওয়া হয়েছিল, এখন সে আশঙ্কামুক্ত।
করিডোরের শেষ মাথায় তানভীর আর বর্ষা দাঁড়িয়ে ছিল। আরিয়ান জিপের চাবিটা আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে ওনাদের দিকে এগিয়ে এলেন।
“বাকি দুজনকে নারায়ণগঞ্জ থেকে ট্র্যাপ করা হয়েছে, স্যার,” তানভীর বলল, ওঁর গলায় এতক্ষণে একটা স্বস্তির সুর। “মাল সব রিকভারড। কিন্তু স্যার, একটা চেনা ছেলে স্রেফ কিছু টাকার জন্য একটা পুরো পরিবারকে এভাবে শেষ করতে চাইল?”
আরিয়ান কোনো উত্তর দিলেন না। বর্ষা আরিয়ানের পাশে এসে দাঁড়াল। ওঁর আত্মবিশ্বাসের খুঁতটা আজ ওঁর নিজের চোখেই ধরা পড়েছে, সে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, “আমি ডাকাতদের চেনা ছকে আটকে গিয়েছিলাম। ইনসাইড ক্লু-টা আমি মিস করেছি।”
আরিয়ান বর্ষার দিকে তাকালেন। ওঁর ক্লান্ত চোখে এক মুহূর্তের জন্য এক সূক্ষ্ম ভালোলাগা দেখা দিল, কিন্তু পেশাদারিত্বের দেয়ালটা তিনি ভাঙলেন না।
“ভুল থেকেই তদন্ত নিখুঁত হয়, বর্ষা,” আরিয়ান জিপের চাবিটা পকেটে রাখলেন। “আজকের মতো ডিউটি শেষ। তানভীর, বাড়ি যাও।”
আরিয়ান আর দাঁড়ালেন না। করিডোর ধরে একা হেঁটে পার্কিং লটের দিকে এগিয়ে গেলেন।
জিপের ড্রাইভিং সিটে বসার পর আরিয়ানের নজর গেল ওঁর পাশের ড্যাশবোর্ডের ওপর। ক্রাইম সিন থেকে এভিডেন্স হিসেবে তুলে আনা বাচ্চার ভাঙা মাটির ব্যাংকের একটা লাল মাটির টুকরো সেখানে পড়ে আছে। আরিয়ান টুকরোটা হাতে নিলেন। ওঁর অবশ অনুভূতিগুলো ভেদ করে হুট করে একটা তীব্র প্যানিক অ্যাটাক ওঁর বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল। ওঁর ইনসোমনিয়ার রাতগুলো যে আরও দীর্ঘ হতে চলেছে, ওঁর চশমার কাঁচের ওপারে থাকা চোখ দুটো তার জানান দিচ্ছিল।
©somewhere in net ltd.