নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

“Blogger | Law Student | Human Rights Activist”

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু

লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।

শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু › বিস্তারিত পোস্টঃ

অপারেশন ইকারুস: জেনেভার ছায়া

২৭ শে জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০০



বালি অপারেশন শেষ করে ঢাকায় পিবিআই সদর দপ্তরে যখন আরিয়ান, তানভীর ও বর্ষা ফিরে এলো, তখনো বাইরের আকাশ থমথমে। বালি থেকে উদ্ধার করা ৬০% ডেটায় একটি ভয়ংকর এনক্রিপ্টেড ডিজিটাল সিগনেচার পাওয়া গেছে, যা সরাসরি পিবিআই সদর দপ্তরের কোনো এক শীর্ষ কর্মকর্তার মেইনফ্রেম আইপি নির্দেশ করছে। কিন্তু সেই বিশ্বাসঘাতকের নির্দিষ্ট নাম বা পদবি ডেটাতে লক করা।

সদর দপ্তরের সন্দেহভাজনদের তালিকায় আছেন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (ADG), ফিন্যান্সিয়াল উইংয়ের পরিচালক, এমনকি সাইবার ক্রাইম ইউনিটের প্রধানও। আরিয়ানের মগজ অনিদ্রা আর সন্দেহের এক চাদরে ঢেকে গেল—যাঁদের তিনি প্রতিদিন দেখছেন, ওঁর দীর্ঘদিনের অভিভাবক, তাঁদেরই কেউ একজন রেহানের ইনফর্মার!

স্যার, গত ১৮ মাসে পুরো গ্লোবাল সার্ভারে রেহান আশরাফের কোনো ডিজিটাল ট্রেস পাওয়া যায়নি,” বর্ষা ওঁর ল্যাপটপ থেকে চোখ না সরিয়েই বলল। ওঁর কণ্ঠস্বরে ক্লান্তি।

তানভীর জানালার পাশে দাঁড়িয়ে লোডেড পিস্তলের ম্যাগাজিনটা চেক করতে করতে ফিসফিসিয়ে বললেন, “আমরা কি নিশ্চিত, আমরা একজন জীবিত মানুষকে খুঁজছি স্যার? বালি অপারেশনের পর ও কি সত্যিই বেঁচে আছে, নাকি আমরা কোনো ভূতের পেছনে ছুটছি?

এই প্রশ্নটা আরিয়ানকে কাঁপিয়ে দিল। কোনো অফিশিয়াল প্রোটোকল না জানিয়ে, সম্পূর্ণ আন্ডাররাডার ছুটিতে পিবিআই টিম পৌঁছাল জেনেভায়।


জেনেভার প্রথম রাত। রাত ৩টা। সুইস সেফ হাউসে সবাই ঘুমাচ্ছে। বাইরে নিস্তব্ধ তুষারপাত। হঠাৎ বর্ষার ল্যাপটপের স্ক্রিনটা নিজে থেকেই অন হয়ে গেল। কোনো নোটিফিকেশন সাউন্ড হলো না। বর্ষা ঘুম চোখে উঠে স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে জমে গেল। ওঁর ডেক্সটপে একটা নতুন ফোল্ডার তৈরি হয়েছে, যা কেউ পাঠায়নি, ও নিজেও তৈরি করেনি। ফোল্ডারটির নাম:
VARSHA_OPEN_ME


ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে বর্ষা ফোল্ডারটি ওপেন করল। ভেতরে ছিল হেলিক্স কনসোর্টিয়ামের একটি ছোঁয়াচে ডিরেক্টরি আইপি। হেলিক্স কোনো কাল্পনিক বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রক নয়; এটি মূলত বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ও ধূর্ত অর্থনৈতিক ছায়া-নেটওয়ার্ক । অফশোর ব্যাংকার ও দুর্নীতিগ্রস্ত ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স অফিসারদের এই জোট নিজেদের স্বার্থে কোটি কোটি ডলারের অবৈধ পুঁজি পাচার করে।

বর্ষা ফোল্ডারের ভেতরের ফায়ারওয়াল ভাঙার জন্য একটি এনক্রিপ্টেড ডার্ক-ওয়েব নোড ডিক্রিপ্ট করার চেষ্টা করছিল। ওঁর মনের ভেতর তখনো এক চরম ব্যাকুলতা কাজ করছিল যে, সে রেহানের চেয়ে এগিয়ে যাবে। অতিরিক্ত আত্মবিশ্বাসের কারণে বর্ষা বুঝতে পারল না ওটা রেহানের পাতা একটা সুক্ষ্ম অ্যালগরিদমিক ট্র্যাপ (Honey Pot) ছিল। সে ভুল লোকেশন ডিক্রিপ্ট করে বসলো।

পেয়েছি স্যার! হেলিক্সের জেনেভা ফিন্যান্সিয়াল ব্যাকআপ সেফ হাউসের ঠিকানা ডিকোড হয়েছে!” বর্ষা উত্তেজিত হয়ে বলল।

এই অপারেশনের জন্য তানভীর আগে থেকেই স্থানীয় এক ফরাসি তথ্যদাতা ‘জ্যাক’-কে হায়ার করেছিলেন। জ্যাক ছিলেন বিবাহিত, ওঁর সাত বছরের একটি মেয়ে ছিল। আগের রাতেই জ্যাক আরিয়ানদের ওঁর মেয়ের ছবি দেখিয়ে বলেছিল, “এই মিশন শেষ করে আমি মেয়ের জন্মদিনে প্যারিস ফিরব।

বর্ষার দেওয়া ভুল লোকেশনে জ্যাক পা রাখতেই পুরো ভিলা কেঁপে উঠল। ওত পেতে থাকা হেলিক্সের প্রফেশনাল হিটম্যানরা জ্যাককে আর কোনো সুযোগ দিল না। ওঁর বুকে সরাসরি তিনটি বুলেট এসে বিঁধল। ল্যাপটপের লাইভ ফিডে জ্যাকের নিথর দেহ আর ওঁর হাত থেকে ছিটকে পড়া মেয়ের ছবিটা দেখে বর্ষা চিৎকার করে কেঁদে উঠল। ওঁর একটা ভুলের কারণে আজ একজন নিরপরাধ মানুষের পরিবার ধ্বংস হয়ে গেল। ওঁর নিজের ওপর থেকে সমস্ত আস্থা হারিয়ে গেল।


জ্যাকের মৃত্যুর পর আরিয়ান ও তানভীর যখন ধাওয়া করে হেলিক্সের একজন অপারেটরকে জ্যান্ত ধরলেন, তখন ওঁর পকেট থেকে একটা এনক্রিপ্টেড স্যাট ফোন পাওয়া গেল। ওটার ইনবক্সে মাত্র একটা মেসেজ জ্বলজ্বল করছে:
"The asset is inside Team Icarus."


সেই মেসেজটা দেখার পর সেফ হাউসের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। টিমের ভেতরেই একজন অ্যাসেট? কে সে? ঠিক যে সময় মেসেজটি পাঠানো হয়েছিল, তখন তানভীর সেফ হাউসে ছিলেন না, ওঁর ফোনও নট রিচেবল ছিল। আরিয়ানের চোখ সরু হয়ে এলো তানভীরের দিকে। তানভীর কি তবে আন্ডারকভারের ছদ্মবেশে হেলিক্সের লোক?

তানভীর আরিয়ানের চোখের ভাষা বুঝতে পারলেন। তিনি কোনো অজুহাত দিলেন না, শুধু শান্ত গলায় বললেন, “সন্দেহ মানুষের দৃষ্টি ঝাপসা করে দেয়, স্যার। রেহান এটাই চায়।

নিজেদের ভেতরের এই চরম অবিশ্বাসের মাঝেই বর্ষা জ্যাকের উদ্ধার করা স্যাটেলাইট ফোন থেকে হেলিক্সের একটি অতি পুরোনো ডিরেক্টরি আর্কাইভ ডিকোড করতে সক্ষম হলো। সাল ২০০৬।


ফাইলটি ওপেন হতেই স্ক্রিনে একটা ছবি ভেসে উঠল। তুষারাবৃত আল্পস পর্বতের এক কটেজের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন দুজন তরুণ। একজন আরিয়ানের চিরশত্রু অধ্যাপক রেহান আশরাফ, আর ওঁর কাঁধে হাত দিয়ে হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন আরিয়ানের সেই মৃত মেন্টর!

ওঁর মেন্টর তদন্ত করতে গিয়ে মারা যাননি; তিনি নিজেই ২০ বছর আগে এই ফিন্যান্সিয়াল ছায়া-নেটওয়ার্ক ‘হেলিক্স’-এর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ছিলেন! পরবর্তীতে অনুশোচনায় দল ছাড়তে চাওয়ায় ওনাকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আরিয়ানের পায়ের তলার মাটি সরে গেল। যাঁর সততার গল্প শুনে তিনি বড় হয়েছেন, তিনিও পুরোপুরি নির্দোষ ছিলেন না! ওঁর জীবনের সবচেয়ে বড় মানসিক আঘাতটি উনি পেলেন ওঁর নিজের নায়কের কাছ থেকেই।


মেন্টরের এই অন্ধকার সত্য উন্মোচনের পর আরিয়ান সম্পূর্ণ ভেঙে পড়লেন। ওঁর অনিদ্রা আর মানসিক সংকট চরমে পৌঁছাল। ঠিক তখনই সেফ হাউস পরিবেষ্টন করল হেলিক্সের ভারী অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত একদল স্নাইপার।

তানভীর কোথায়?” আরিয়ান চিৎকার করে উঠলেন, কারণ তানভীর তখনো নিখোঁজ। আরিয়ানের সন্দেহ দৃঢ় হলো—তানভীরই তবে তথ্য লিক করেছে।

কিন্তু ঠিক তখনই সেফ হাউসের পেছনের দেয়াল ভেঙে একটা সাঁজোয়া গাড়ি এসে ঢুকল। ড্রাইভিং সিটে তানভীর! ওঁর শরীর রক্তাক্ত। উনি লিক করেননি, বরং ওঁর আন্ডারকভার সোর্স ব্যবহার করে উনি জানতে পেরেছিলেন যে আসল তথ্য ফাঁস হয়েছে ঢাকা থেকে—পিবিআই-এর সেই অতিরিক্ত মহাপরিচালক (ADG) স্বয়ং এটি করেছেন। তানভীর নিজের জীবন বাজি রেখে স্থানীয় পুলিশকে ডাইভার্ট করে আরিয়ান আর বর্ষাকে বাঁচাতে এসেছেন।

আমরা কেউ মেশিন নই, বর্ষা। ভুল মানুষই করে,” তানভীর গাড়ি থেকে নেমে বর্ষার ল্যাপটপটা ওঁর হাতে তুলে দিলেন। “কিন্তু সেই ভুল শোধরানোর সুযোগ একবারই আসে। গেট আপ!

তানভীরের এই রক্তাক্ত ত্যাগ এবং আরিয়ানের ভেতরের মেন্টরকে হারানোর কষ্ট—সবকিছু এক হয়ে বর্ষার ভেতর এক বিধ্বংসী শক্তির জন্ম দিল। ও চোখ মুছে কিবোর্ডে আঙুল চালাল। এবার ও কোনো ভুল করল না। ও হেলিক্সের আল্পস মেইনফ্রেম সার্ভারের মূল কো-অর্ডিনেট লক করে ফেলল।


জেনেভার কুয়াশাচ্ছন্ন লেকসাইড জেটি। ঝিরঝির করে তুষারপাত শুরু হয়েছে। রেহান বেঁচে আছেন কি না, সেই রহস্যের অবসান ঘটিয়ে কুয়াশার ভেতর থেকে অবশেষে হেঁটে এলেন অধ্যাপক রেহান আশরাফ। ওঁর পরনে কালো ওভারকোট, চোখে সেই শান্ত, হাড়হিম করা চাহনী।

কোনো পিস্তল উঠল না, কোনো মারামারি হলো না। শুধু দুজন মানুষের তীব্র মনস্তাত্ত্বিক সংঘাত শুরু হলো।

তুমি অনেক দূর চলে এসেছ, আরিয়ান,” রেহান শান্ত গলায় বললেন। “কিন্তু তুমি কি জানো তুমি কার বিরুদ্ধে লড়ছ? আমরা কোনো সাধারণ অপরাধী নই। আমরা বৈশ্বিক পুঁজির ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করি।

তুমি নিজের লোভকে দর্শনের আড়ালে লুকাতে পারো না, রেহান,” আরিয়ান ওঁর পিস্তলটা বের করে রেহানের দিকে তাক করলেন, ওঁর হাত কাঁপছে না। “তুমি আমার মেন্টরকে খুন করেছ।

রেহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওঁর চোখে এক সুক্ষ্ম তাচ্ছিল্য ফুটে উঠল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক নারকীয় হাসি । উনি আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে শুধু বললেন:

তোমার পাশে যে দাঁড়িয়ে আছে—তোমার ওই মেন্টর... যাকে তুমি দেবতা ভাবো, তাকে কি তুমি সত্যিই চেনো, আরিয়ান? ওঁর হাতটা আমার চেয়েও বেশি নোংরা ছিল।

রেহান আর কোনো ব্যাখ্যা দিলেন না। ওঁর এই একটিমাত্র বাক্য আরিয়ানের ভেতরের সমস্ত অহংকারকে এক মুহূর্তে অবশ করে দিল। রেহান কুয়াশার মাঝে ওঁর গাড়ির দিকে হেঁটে গেলেন, আর আরিয়ান প্রথমবারের মতো সম্পূর্ণ নীরব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন।


আল্পস পর্বতের চূড়ায় অবস্থিত সেই ছদ্মবেশী গবেষণাগারে আরিয়ান ও তানভীর যখন মেইনফ্রেম সার্ভার রুমে প্রবেশ করলেন, তখন পুরো ক্লাইম্যাক্সের গতি এক ধীর, শ্বাসরুদ্ধকর উত্তেজনায় রূপ নিল। সেন্ট্রাল থিয়েটার স্ক্রিনে এবার একটি নয়, দুটি লাল কাউন্টডাউন টাইমার একসাথে জ্বলতে শুরু করল:

DATA DELETION: 09:58

GENEVA POLICE ARRIVAL: 07:12

ডাবল কাউন্টডাউন, স্যার!” ব্যাকআপ বোট থেকে বর্ষার গলা কাঁপছিল। “ডেটা ডিলিট হওয়ার আগেই সুইস পুলিশ সোয়াত টিম নিয়ে এই প্ল্যাটফর্ম সিল করে দেবে। আমাদের হাতে দশ মিনিটও নেই!

তানভীর দরজার মুখে পজিশন নিয়ে ভারী কভার ফায়ার দিতে লাগলেন। একের পর এক হেলিক্সের গার্ডদের বুলেটে চারপাশের গ্লাস চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে পড়ছিল। টাইমার নেমে এলো 04:30-এ।

ঠিক তখনই বর্ষার স্ক্রিনটা হঠাৎ লাল হয়ে লক হয়ে গেল। অধ্যাপক রেহানের একটা প্রি-রেকর্ডেড স্ক্রিপ্ট ভেসে উঠল স্ক্রিনে। রেহান ওঁর শেষ চালটি চাললেন বর্ষার মগজে। স্ক্রিনে দুটো উইন্ডো ওপেন হলো:

[WINDOW 1: GLOBAL EVIDENCE]

[WINDOW 2: TANVEER's POSITION LOCK (TRIGGER EXPLOSIVE)]

স্পিকারে রেহানের ঠান্ডা কণ্ঠস্বর বেজে উঠল: “চুজ ওয়ান, বর্ষা। যদি গ্লোবাল ডেটা সেভ করো, তবে তানভীর যেখানে দাঁড়িয়ে আছে সেই করিডোরের থার্মাল মাইন অ্যাক্টিভেট হয়ে যাবে। আর যদি তানভীরকে বাঁচাও, তবে হেলিক্সের পুরো ডেটাবেস চিরতরে হাওয়া হয়ে যাবে। তোমার হাতে দশ সেকেন্ড আছে।

১০... ৯... ৮...
বর্ষার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ল। ও হ্যাকিং মগজ বন্ধ করে দিল। ও একজন মানুষ।
৩... ২...
শেষ সেকেন্ডে বর্ষা ওঁর চশমাটা ছুঁড়ে ফেলে তানভীরের পজিশন স্যুটের মেইন জ্যামার কোডটা বাইপাস করে ওঁর লাইফলাইন উইন্ডো-২ সিলেক্ট করল। তানভীরের করিডোরের বোমাটি নিষ্ক্রিয় হয়ে গেল, কিন্তু ওঁর চোখের সামনে গ্লোবাল ডেটার পার্সেন্টেজ ড্রপ করতে শুরু করল।

কিন্তু ঠিক তখনই আরিয়ান নিজের হাত থেকে ওঁর পকেট ওটিজি ড্রাইভটি সার্ভারের মেইন হাবে পাঞ্চ করলেন। বর্ষার এই মানবিক ভুলটি আরিয়ানকে ওঁর ব্যাকআপ রুট ব্যবহার করার সুযোগ করে দিল। মেইনফ্রেমের ফায়ারওয়াল অলরেডি ডাউন থাকায় আরিয়ানের ওটিজি সেকেন্ডের মধ্যে গ্লোবাল ডেটা ক্লোন করে নিল। ঢাকার পিবিআই সদর দপ্তরের এডিজি স্যারের ডিজিটাল আইপি ম্যাপড করে ওঁর এক্সেস চিরতরে ব্লক করে দেওয়া হলো।


সার্ভার স্টেশন থেকে বের হওয়ার সময় রেহানের কালো এসইউভি গাড়িটি তানভীরের নিখুঁত আরপিজি শটে ধাক্কা খেয়ে পাহাড়ি রাস্তার ডিভাইডারে আছড়ে পড়ল এবং এক বিকট বিস্ফোরণে দাউদাউ করে জ্বলতে শুরু করল।

তানভীর ও আরিয়ান গাড়ি থেকে নামলেন। চারপাশ কুয়াশা আর তুষারপাতে ধোঁয়াশাময়। আরিয়ান বরফের ওপর হাঁটু গেড়ে বসে পড়লেন। ওঁর কাঁধ থেকে রক্ত ঝরছে। অবশেষে রেহান শেষ। এক দীর্ঘ ক্লান্তির শ্বাস নিলেন তিনি।

স্যার...” হঠাৎ তানভীরের কণ্ঠস্বর বদলে গেল। ওঁর আঙুলটা সামনের ঝুলন্ত কাঠের ব্রিজের দিকে নির্দেশ করছে। “ব্রিজের দিকে তাকান।

আরিয়ানের পুরো শরীরে কাঁটা দিয়ে উঠল। কুয়াশার ভেতর থেকে দাউদাউ করা গাড়ির আগুনকে পেছনে ফেলে ধীরে ধীরে হেঁটে আসছে একটা ছায়া। অধ্যাপক রেহান আশরাফ। ওঁর ওভারকোটের একপাশ পুড়ছে, শরীর রক্তাক্ত, কিন্তু ওঁর হাতে সেই সাব-কম্প্যাক্ট পিস্তল। ওঁর চশমাটা ভাঙা।

ধাঁই! ধাঁই!

একসাথে দুটো গুলি ফুটল। রেহানের নাইন-এমএম বুলেটের এক তীব্র আঘাত এসে আরিয়ানের বাম কাঁধের জয়েন্ট ও নার্ভ ছিঁড়ে গুঁড়িয়ে দিয়ে চলে গেল। আরিয়ানের হাতের পিস্তলটা ছিটকে পড়ার আগেই ওঁর ট্রিগার আঙুলটি শেষবারের মতো চেপে বসেছিল—ওঁর নিখুঁত শট রেহানের বুকে সরাসরি আঘাত করল।

রেহান ব্রিজের রেলিংয়ে হেলান দিয়ে পড়ে গেলেন। আরিয়ান ওঁর অবশ, অসাড় হয়ে যাওয়া বাম হাতটা চেপে ধরে রেহানের দিকে এগিয়ে গেলেন। ওঁর চোখের সামনে তখন অন্ধকার নেমে আসছে।

রেহান আরিয়ানের দিকে তাকালেন। ওঁর মুখ দিয়ে রক্ত বেরিয়ে আসছে, কিন্তু ওঁর চোখ দুটোতে এক নারকীয় তৃপ্তি। ওঁর শেষ সংলাপটি আরিয়ানের অস্তিত্বকে চিরতরে ধ্বংস করে দিল। রেহান বললেন:

তুমি আমাকে হারাওনি, আরিয়ান। তুমি শুধু আমার জায়গাটা নিয়েছ।

রেহানের শরীরটা ব্রিজের রেলিং গলে পেছনের গভীর গিরিখাতে পড়ে গেল। আল্পসের বরফগলা নদীর প্রবল, তীব্র স্রোত ওঁর দেহটিকে মুহূর্তের মধ্যে ভাসিয়ে নিয়ে অন্ধকার কুয়াশার মাঝে অদৃশ্য হয়ে গেল। রেহানের লাশ আর কোনোদিন পাওয়া গেল না। কিন্তু ওঁর সেই শেষ সংলাপটি আরিয়ানকে এক চরম নৈতিক ধূসরতায় আচ্ছন্ন করে দিল—রেহানকে মারতে গিয়ে আরিয়ান নিজেও কি তবে একজন খুনি আর রেহানের মতোই একটা দানবে পরিণত হলেন?


ছয় মাস পরে...

ঢাকার পিবিআই সদর দপ্তরের ওঁর নিজস্ব অন্ধকার কেবিনে আরিয়ান একা বসে ছিলেন। ওঁর বাম হাতটি চিরতরে কিছুটা দুর্বল হয়ে গেছে। বিশেষ করে শীতকালে যখন ঠান্ডা নামে, তখন ওঁর কাঁধের পুরোনো ব্যথাটা তীব্রভাবে জেগে ওঠে।

টেবিলে ওঁর মেন্টরের সেই ২০ বছর পুরোনো ছবিটা রাখা। সাল ২০০৬, আল্পসের সেই কটেজ। কিন্তু আরিয়ান এবার একটা নতুন জিনিস খেয়াল করলেন। ছবির সেই ডিরেক্টরি ফাইলের নিচে একটি কোড জ্বলছে: FOUNDER_01

আরিয়ান ছবিটার দিকে ভালো করে তাকালেন। ছবিতে মেন্টর এবং রেহান ছাড়াও পাশে আরেকজন তৃতীয় ব্যক্তি দাঁড়িয়ে ছিলেন। কিন্তু ওঁর মুখটি খুব নিখুঁতভাবে এবং ইচ্ছাকৃতভাবে ব্লেড দিয়ে কেটে আলাদা করা হয়েছে। কোনো মুখ নেই। কিন্তু সেই ব্যক্তির ডানহাতের অনামিকায় পরা আছে একটি বিশেষ প্লাটিনামের আংটি, যার ওপর খোদাই করা আছে একটি অদ্ভুত ঈগল পাখির চিহ্ন।

আরিয়ান আংটিটা দেখার সাথে সাথে ওঁর পুরো শরীর পাথরের মতো জমে গেল। ওঁর চোখের মণি স্থির হয়ে এলো। ওঁর চোয়াল হাঁ হয়ে গেল। কারণ—এই আংটিটা আরিয়ানের খুব চেনা। ওঁর খুব কাছের, ওঁর নিজের পিবিআই-এরই এক জীবন্ত কিংবদন্তি এই আংটিটা পরেন!

রেহান প্রধান ভিলেন ছিলেন না, রেহান ছিলেন কেবল অপারেটর। আসল প্রতিষ্ঠাতা তো ওঁর একদম পাশেই বসে আছেন এতকাল ধরে।

হুট করেই ল্যাপটপ স্ক্রিনের কোণায় একটা তীব্র বীপ শব্দ হলো। অন্ধকার স্ক্রিনের মাঝে সাদা অক্ষরে টাইপ হয়ে ভেসে উঠল:

"তুমি হেলিক্সকে হারিয়েছ, আরিয়ান। কিন্তু হেলিক্স তো কখনো পুরো সংগঠন ছিল না। ওটা ছিল একটা স্তর মাত্র। আসল সিন্ডিকেটের দরজা এখন খোলা।"

— The Syndicate

লাইনের নিচে একটি নতুন গ্লোবাল কো-অর্ডিনেট ব্লিংক করতে শুরু করল: ৮২°৫১′ দক্ষিণ, ২৬°৪৭′ পূর্ব — অ্যান্টার্কটিকা।

আরিয়ান ল্যাপটপের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। ওঁর কাঁধের পুরোনো ব্যথাটা আবার একটু চনচন করে উঠল। ওঁর ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে উঠল এক পরম তৃপ্তির, এক নতুন চতুর শিকারীর ভয়ঙ্কর আত্মবিশ্বাসী হাসি। ওঁর চোখের ভেতরের আলো এখন এক চূড়ান্ত জিঘাংসায় রূপ নিয়েছে।

আরিয়ান ওঁর ড্রয়ার থেকে ওঁর সেই চশমা আর ডানহাতে রিভলভারটা বের করে নিলেন। ল্যাপটপের স্ক্রিনটা সজোরে বন্ধ করে ওঁর সেই চিরচেনা গম্ভীর গলায় বললেন, “তানভীর, বর্ষা... আমাদের বরফের জ্যাকেটগুলো রেডি করো। আমাদের পরবর্তী গন্তব্য—অ্যান্টার্কটিকা।

কেবিনের বাইরে তখন ঢাকার আকাশে ঝুম বৃষ্টি শুরু হয়েছে, আর আরিয়ানের চোখের সামনে উন্মোচিত হতে যাচ্ছে সমান্তরাল পৃথিবীর এক চূড়ান্ত, বরফশীতল ও নতুন গোলকধাঁধা।

[ সমাপ্ত ]

মন্তব্য ০ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.