| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
শাম্মী নূর-এ-আলম রাজু
লেখালেখির মাধ্যমে আমি নতুন ভাবনা, নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও সৃজনশীল প্রকাশ খুঁজে পাই। আমার লেখার লক্ষ্য পাঠকদের ভাবতে উদ্বুদ্ধ করা এবং একটি অর্থবহ আলোচনা তৈরি করা।
(রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘শেষের কবিতা’ উপন্যাসের প্রেক্ষাপট অবলম্বনে ২০২৬ সালের এক কল্পিত নতুন সংস্করণ)
অমিত রায় সম্পর্কে তার বন্ধু সহিস বলত, "অমিতের বুদ্ধির আলোটা সূর্যের মতো সবাইকে আলো দিতে আসে না, ওটা ডাইনিং টেবিলের শেড দেওয়া মোমবাতির মতো—নিজের চেনা পরিমণ্ডলের ওপর এক অদ্ভুত মায়া তৈরি করে।"
২০২৬ সালেও অমিত রায় একই রকম প্রথাভাঙা। অক্সফোর্ডের ডিগ্রি নিয়ে ফিরে সে কোনো বহুজাতিক সংস্থায় নিজেকে বিকিয়ে দেয়নি। সে ডিজিটাল পৃথিবীর যাযাবর—একাধারে টেক-কনসালট্যান্ট, আধুনিক কাব্যের বিশ্লেষক ও পডকাস্টার।
সোশ্যাল মিডিয়ায় তার হাজার হাজার অনুরাগী। তার ড্রোন-শট, ভ্রমণের ছবি আর শাণিত ক্যাপশনে লাইকের বন্যা বয়ে যায়। কিন্তু কেউ জানে না, এই নিখুঁত ‘স্টাইলি’ ছবিগুলোর আড়ালে অমিতের ভেতরে কী এক গভীর একাকীত্ব কাজ করে। মধ্যরাতে যখন নোটিফিকেশনের কোলাহল থমে যায়, অমিত প্রায়ই তার স্ক্রিনে লেখা আধুনিক কবিতাগুলো একের পর এক মুছে ফেলে। তার মনে হয়, জনমত হলো ফ্যাশনের মতো; প্রতিদিন বদলায়। যা কিছু সস্তা, যা কিছু ভাইরাল—তা ভালোবাসার বস্তু হতে পারে না।
অমিতের বন্ধু সহিস যখন ডেটিং অ্যাপে আঙুল সোয়াইপ করে একের পর এক 'ম্যাচ' খুঁজত, অমিত হেসে বলত, "প্রেম কি এখন অ্যালগরিদমের খেলা হয়ে গেল সহিস? মানুষ এখন হৃদয়ের অনুভূতির চেয়ে অ্যাপের ডেটাবেসকে বেশি বিশ্বাস করে। কিন্তু যে প্রেম সমীকরণে মিলে যায়, তা তো অংক; তা কাব্য নয়।"
২০২৬ সালের বর্ষায় অমিত তার ইলেকট্রিক স্পোর্টস কার আর হাই-রেজোলিউশন ক্যামেরা ড্রোন নিয়ে একা বেরিয়ে পড়ল শিলংয়ের উদ্দেশ্যে।
পাহাড়ি আঁকাবাঁকা রাস্তায় মেঘ আর কুয়াশার চাদর। অমিত পাহাড়ের চূড়ায় তার ড্রোনটি উড়িয়ে দিল। ড্রোনের ৪কে ক্যামেরার ডিসপ্লেতে ফুটে উঠল শিলংয়ের ল্যান্ডস্কেপ। কিন্তু কুয়াশার চিরায়ত সৌন্দর্যের মাঝে অমিত হঠাৎ দেখতে পেল—সবুজ পাহাড়ের গায়ে সারি সারি সোলার প্যানেল আর স্যাটেলাইট ডিশ বসানো।
অমিত গাড়ি থামিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে বিড়বিড় করে বলল, "প্রকৃতির স্বাভাবিক কুয়াশার চেয়েও মানুষের এই প্রযুক্তি আজ শিলংয়ের মুখকে বেশি ঢেকে ফেলেছে। আমরা সবকিছু মেপে দেখতে চাই, সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভুলছি।"
ঠিক তখনই পাহাড়ি মোড়ের ঘন কুয়াশায় ব্রেক কষতেও দেরি হয়ে গেল—অন্য পাশ থেকে আসা একটা ল্যান্ডরোভারের সাথে সংঘর্ষ।
দুটি গাড়িই সামান্য দুমড়ে গেল। অমিত গাড়ি থেকে নেমেছিল ঝগড়া করার মেজাজে। কিন্তু উল্টো দিকের গাড়ি থেকে যখন একটি মেয়ে নেমে দাঁড়াল, অমিতের সব যন্ত্রনির্ভর যুক্তি আর শাণিত মুখস্থ বুলি যেন একমুহূর্তে স্তব্ধ হয়ে গেল।
পরনে সাধারণ একরঙা উলের ওভারকোট, চোখে বুদ্ধির প্রখর দীপ্তি, চুলগুলো খোঁপা করা। মেয়েটির নাম লাবণ্য।
অমিতের গাড়ির কাদা লাগা সেন্সরের দিকে তাকিয়ে লাবণ্য অত্যন্ত শান্ত ও শাণিত ভাষায় বলল, "আপনার গাড়ির আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কি কুয়াশায় কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে, নাকি আপনি রাজপথকে আপনার কবিতার খাতা ভেবে ভুল করেছিলেন?"
অমিত থমকে গেল। অ্যাপসের ভুয়া ভালোবাসা আর কৃত্রিম বুলি শুনে অভ্যস্ত অমিত লাবণ্যের এই খাঁটি, স্পষ্ট এবং কাব্যিক উপস্থিতিতে যেন অ্যালগরিদমের বাইরের কোনো এক বাস্তব মানুষের সন্ধান পেল।
লাবণ্য শিলংয়ের এক নিভৃত কটেজে বসে কাজ করে। সে প্রাচীন বাংলা সাহিত্য ও পাণ্ডুলিপির ডিজিটাল সংরক্ষণ এবং আধুনিক নারীবাদী দর্শনের ওপর স্বাধীন গবেষণা করছে।
অমিত প্রতিদিন সেখানে হাজির হতে লাগল। সেখানে আর দশটা সাধারণ আধুনিক যুগলের মতো সস্তা প্রেম ছিল না; সেখানে ছিল কাব্যের লড়াই, সাহিত্যের আধুনিক ব্যাখ্যা আর রূপকের দ্বন্দ।
একদিন কটেজের কাঠের বারান্দায় গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়ছিল। অমিত তার দামি ক্যানন ক্যামেরাটা বের করে লাবণ্যের দিকে তাক করল। লাবণ্যের চুলে তখন একটা বৃষ্টির ফোঁটা আটকে ছিল, আর তার ঠোঁটের কোণে ছিল মৃদু এক হাসি।
ক্যামেরার শাটার বাজল—ক্লিক।
অমিত ক্যামেরার স্ক্রিনে ছবিটা দেখল। ছবিটা কারিগরি দিক থেকে নিখুঁত, কিন্তু অমিত হতাশ হয়ে ক্যামেরাটা পাশে রেখে দিল।
লাবণ্য ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল, "কী হলো কবি? ছবি পছন্দ হলো না?"
অমিত লাবণ্যের দিকে তাকিয়ে এক গভীর সুর নিয়ে বলল, "ছবিটা নিখুঁত হয়েছে লাবণ্য। কিন্তু তোমার ওই চুলের ফোঁটা আর ঠোঁটের হাসির পেছনে যে গভীর আত্মাটা লুকিয়ে আছে—তা তো এই ক্যামেরার সেন্সরে ধরা পড়ল না। আমি বুঝলাম, প্রকৃতির আর মানুষের কিছু পরম মুহূর্ত প্রযুক্তি দিয়ে ফ্রেমবন্দি করা যায় না; তাকে কেবল হৃদয়ে ধারণ করতে হয়।"
লাবণ্য অমিতের কথার গভীরে লুকানো সেই সত্য বুঝে শান্ত হয়ে হাসল। অমিত লাবণ্যকে ভালোবেসে নাম দিল ‘দ্যুতি’।
অমিত লাবণ্যের হাত ধরে বলল, "লাবণ্য, মানুষ যাকে বিয়ে বলে সংসার শুরু করে, সে তো প্রেমের ইতি টানা। সেখানে প্রতিদিন সকালে উঠে একে অপরের অভ্যস্ত চেহারা দেখতে হয়। তুমি আমার জীবনের সেই ধ্রুবতারা, যাকে প্রতিদিন পকেটে নিয়ে ঘোরা যায় না, কিন্তু যার আলোতে পথ চলা যায়।"
কিন্তু বাস্তব পৃথিবীর দাবি অন্যরকম।
অমিতের ফোনে ক্রমাগত টেক্সট আর ভিডিও কল পাঠাচ্ছিল কেতকী (কেটি)—শহরের গ্লোবাল ফ্যাশন ব্র্যান্ডের ইনফ্লুয়েন্সার, যার ভালোবাসা পরিপাটি লাইফস্টাইল ও সাজানো রুটিনে বাঁধা। অমিত জানত, কেতকী হলো তার দৈনন্দিন জীবনের ‘ঘটি ভরা জল’—যা তৃষ্ণা মেটাতে পারে। কিন্তু লাবণ্য হলো ‘মন-সাগরের জোয়ার-ভাটা’—যা তাকে ঘরছাড়া করে।
বিদায়ের দিন এসে পৌঁছাল। দুজনেই বুঝতে পেরেছিল, এক ছাদের নিচে অভ্যস্ত হয়ে গেলে এই অনুভূতির অপমৃত্যু ঘটবে।
অমিত লাবণ্যের হাতে একটা কাঠের বাক্সে একটি মেমোরি ড্রাইভ আর হাতে লেখা একটা কাগজ তুলে দিল।
ড্রাইভটিতে ছিল অমিতের নিজের কণ্ঠে রেকর্ড করা রবীন্দ্রনাথের সেই অমর পদ্যের ২০২৬-এর রূপান্তর। আর কাগজে লেখা ছিল অমিতের জীবনের ‘শেষের কবিতা’:
"লাবণ্য,
আমার শেষ কবিতাটি হলো আমার শেষ ভালোবাসা। আমি তোমায় কখনো পাইনি বলে, আমি তোমায় চিরকাল পেয়ে যাব।
কেতকীর সাথে আমার যে সম্পর্ক, তা হলো আমার প্রতিদিনের ব্যবহারের পানীয় জল—তা আমার তৃষ্ণা মেটাবে। কিন্তু তোমার সাথে আমার যে সম্পর্ক, তা হলো আকাশ আর সাগরের মেলবন্ধন। তাকে ঘরে তুলে আনা যায় না, কিন্তু তার টানেই আমার কাব্য বেঁচে থাকে। কেতকীকে আমি এনেছি আমার ঘরে, আর তোমাকে আমি রেখে দিলাম আমার চিরকালের মুক্ত আকাশে।"
লাবণ্য কোনো উত্তর দিল না। সে তার কটেজের ল্যাপটপটা খুলে অমিতকে একটি শেষ ডিজিটাল নোট পাঠাল—যার নিচে লেখা ছিল :
"তোমারে যা দিয়েছিনু তা তোমারই দান—
গ্রহণ করেছ যত ঋণী তত করেছ আমায়।
হে বন্ধু, বিদায়।"
২০২৬ সালের কোলাহলপূর্ণ কলকাতার বুক চিরে অমিত রায় আজ আবার তার গাড়িতে চেপে ছুটে চলে।
তার গাড়ির স্ক্রিনে প্রতিনিয়ত রিলস, লাইক, ভিউ আর ডেটিং অ্যাপের মেসেজের ঝড় ওঠে। কিন্তু অমিতের ভেতরের যে মানুষটা শিলংয়ের কুয়াশায় লাবণ্যকে হারিয়ে এসেছিল, সে আজ অন্য এক জগতে বাস করে।
অমিতের কাছে কেতকী তার বাস্তব জীবনের পরিপাটি ঘড়ি, যা সময়মতো চলে। আর লাবণ্য হলো সেই অনন্ত সময়—যাকে কোনো ঘড়ির কাঁটায় বাঁধা যায় না।
প্রেম মানুষকে শৃঙ্খলে বাঁধার নাম নয়; প্রেম হলো এক আত্মিক মুক্তি—যা বিচ্ছেদের রূপকে আরও বেশি চিরন্তন, আরও বেশি মহীয়ান হয়ে ওঠে।
©somewhere in net ltd.