| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বলপূর্বক গুম মানবাধিকার লঙ্ঘনের সবচেয়ে ভয়াবহ ও গুরুতর অপরাধগুলোর একটি, যা আন্তর্জাতিক আইনে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবেও বিবেচিত। এই অপরাধ তখন আরও বিপজ্জনক হয়ে ওঠে, যখন রাষ্ট্র নিজেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে এর সঙ্গে যুক্ত থাকে। কারণ রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো নাগরিকদের জীবন, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা রক্ষা করা; কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, নিরাপত্তা বাহিনী বা ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক নেতৃত্ব যদি গুমের মতো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, তাহলে সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রের প্রতি আস্থা ভেঙে যায় এবং সমাজে গভীর ভয়, অনিশ্চয়তা ও দায়মুক্তির সংস্কৃতি সৃষ্টি হয়। গুম হওয়া ব্যক্তির পরিবার শুধু তাদের প্রিয়জনের অনুপস্থিতির যন্ত্রণা বহন করে না, বরং তারা সত্য জানা, বিচার পাওয়া এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রেও দীর্ঘদিন ধরে নানা বাধার মুখোমুখি হয়। এই বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে জাতিসংঘ ২০০৬ সালের ২০ ডিসেম্বর ‘বলপূর্বক অন্তর্ধান থেকে সকল ব্যক্তির সুরক্ষার জন্য আন্তর্জাতিক কনভেনশন’ গ্রহণ করে, যা ২০১০ সালের ২৩ ডিসেম্বর কার্যকর হয়। এই কনভেনশনের মূল উদ্দেশ্য হলো গুম প্রতিরোধ করা, অপরাধীদের জবাবদিহির আওতায় আনা এবং ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারকে ন্যায়বিচার ও প্রতিকার নিশ্চিত করা।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার শাসনামলে বাংলাদেশে বলপূর্বক গুম রাজনৈতিক দমন-পীড়নের একটি কার্যকর অস্ত্রে পরিণত হয়। রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী, বিরোধী দলীয় নেতা-কর্মী, সমালোচক, মানবাধিকারকর্মী এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের লক্ষ্য করে গুমের ঘটনা সংঘটিত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ঘটনার পেছনে শুধু বিচ্ছিন্ন অপরাধী বা নিচু পর্যায়ের কর্মকর্তাদের ভূমিকা ছিল না; বরং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতা, দায়মুক্তির সংস্কৃতি, অকার্যকর বিচারব্যবস্থা, নিরাপত্তা বাহিনীর ক্ষমতার অপব্যবহার এবং স্বাধীন তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার দুর্বলতা এই অপরাধকে টিকিয়ে রাখে। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা ও শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার নিয়মিতভাবে সীমিত করা হয়, যার ফলে ভিন্নমত ও বিরোধী রাজনীতি দমনের একটি বিস্তৃত কাঠামো তৈরি হয়। প্রতিবেদনটি আরও ইঙ্গিত করে যে, বৈশ্বিক “ওয়ার অন টেরর” বা সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধের ভাষ্য বাংলাদেশে রাজনৈতিক দমন-পীড়নকে বৈধতা দেওয়ার হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। সন্ত্রাস দমনের নামে রাষ্ট্রীয় সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনকে আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রতিবেদনটির কাঠামো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বিভক্ত। প্রথম অধ্যায়ে বলপূর্বক গুমের পটভূমি এবং কমিশনের কর্মপদ্ধতি ব্যাখ্যা করা হয়েছে। দ্বিতীয় অধ্যায়ে আইনগত কাঠামো বিশ্লেষণ করা হয়েছে, যেখানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে কমান্ড বা উচ্চপদস্থ দায়বদ্ধতার ওপর। কারণ প্রতিবেদনের যুক্তি হলো, গুমের ঘটনা এমনভাবে প্রাতিষ্ঠানিক ও সংগঠিতভাবে পরিচালিত হয়েছে যে শুধুমাত্র মাঠপর্যায়ের সদস্যদের দায়ী করলে প্রকৃত জবাবদিহি নিশ্চিত হবে না। তৃতীয় অধ্যায়ে গুমের প্রক্রিয়াগত দিক—যেমন লক্ষ্য নির্বাচন, নজরদারি, অপহরণ, গোপন আটক, নির্যাতন, হত্যা বা মুক্তি—বিশ্লেষণ করা হয়েছে। চতুর্থ অধ্যায়ে ভুক্তভোগী, নারী, শিশু, পরিবার এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ওপর গুমের প্রভাব আলোচনা করা হয়েছে। পঞ্চম অধ্যায়ে দশটি মামলা উপস্থাপনের কথা থাকলেও তা প্রকাশ করা হয়নি, সম্ভবত তদন্তের স্বার্থে। ষষ্ঠ অধ্যায়ে ন্যায়বিচার, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বাধ্যবাধকতা বাস্তবায়নের জন্য সুপারিশ দেওয়া হয়েছে। সামগ্রিকভাবে প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য হলো, যারা নীতিনির্ধারণ, নির্দেশনা ও তদারকির অবস্থানে ছিলেন, তাদের জবাবদিহিই বিচার প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে থাকা উচিত।
বাংলাদেশের ইতিহাসে বলপূর্বক গুম নতুন ঘটনা নয়; তবে শেখ হাসিনার শাসনামলে এর মাত্রা, পদ্ধতি ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ অতীতের তুলনায় অনেক বেশি বিস্তৃত বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের স্থানীয় সহযোগীরা বহু মানুষকে অপহরণ ও গুম করে, বিশেষ করে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড সেই সময়ের এক ভয়াবহ উদাহরণ। স্বাধীনতার পরও বিভিন্ন রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সংকটের সময় গুমের ঘটনা ঘটেছে। জহির রায়হান, সিরাজ শিকদার ও কল্পনা চাকমার মতো ব্যক্তিদের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে দীর্ঘ বিরতির পর ২০০৯ সাল থেকে গুম পুনরায় একটি নিয়মিত ও প্রাতিষ্ঠানিক কৌশল হিসেবে দেখা দেয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এই পুনরুত্থানের কারণ হিসেবে আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবিরোধী রাজনীতি এবং বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনৈতিক বাস্তবতাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
২০০৪ সালে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন বা র্যাব গঠনের পর বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি স্বাভাবিকীকরণের একটি পথ তৈরি হয়। পরবর্তী সরকারগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও সন্ত্রাস দমনের ভাষ্য ব্যবহার করে নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর কর্মকাণ্ডকে রাজনৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য করার চেষ্টা করে। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর বিচারবহির্ভূত হত্যার কারণে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক মহলে সমালোচনা বাড়ে। একই সময়ে বাংলাদেশ জাতিসংঘের সর্বজনীন পর্যায়ক্রমিক পর্যালোচনা বা ইউপিআর প্রক্রিয়ায় অংশ নেয়, যেখানে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণ বৃদ্ধি পায়। ফলে সরকার প্রকাশ্যে বিচারবহির্ভূত হত্যার বিরুদ্ধে “শূন্য সহনশীলতা” নীতির কথা বলে। কিন্তু প্রতিবেদন অনুযায়ী, সমস্যার প্রকৃত সমাধান না করে সরকার কৌশল পরিবর্তন করে। প্রকাশ্য হত্যার বদলে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের অদৃশ্য করে দেওয়ার পদ্ধতি হিসেবে বলপূর্বক গুম ব্যবহৃত হতে থাকে। এতে বাহ্যিকভাবে আন্তর্জাতিক মানদণ্ড মেনে চলার ভান বজায় রাখা সম্ভব হয়, কিন্তু রাষ্ট্রীয় সহিংসতা নতুন রূপে অব্যাহত থাকে।
গুমের ঘটনা বিশেষভাবে বেড়ে যায় রাজনৈতিক সংকট ও জাতীয় নির্বাচনের আগে-পরে, বিশেষ করে ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনী সময়ে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব সময়ে গণগ্রেফতার, রাজনৈতিক সংঘর্ষ, বিরোধী নেতা-কর্মীদের ওপর দমন-পীড়ন এবং অপহরণের ঘটনা বৃদ্ধি পায়। ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রধানত বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা ছিলেন। হাজার হাজার মানুষ গুমের শিকার হয়েছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, যা গুমকে রাজনৈতিক দমন-পীড়নের প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ারে পরিণত করে। একই সঙ্গে শেখ হাসিনা সরকার ধারাবাহিকভাবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। যদিও বাংলাদেশ ২০১০ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের রোম সংবিধি অনুমোদন করে, যেখানে গুম মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে বিবেচিত, তবু সরকার বলপূর্বক গুমের অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করে। ইউপিআরের বিভিন্ন চক্রেও সরকার অভিযোগ অস্বীকার করে এবং গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক কনভেনশন অনুমোদনে অনীহা দেখায়। কমিশনের মতে, এই অস্বীকার ভুক্তভোগীদের কষ্টকে আরও গভীর করেছে।
কমিশনের কর্মপদ্ধতি ছিল প্রাথমিক ও মাধ্যমিক উভয় উৎসের ওপর ভিত্তি করে। প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে ভুক্তভোগী, গুম হওয়া ব্যক্তিদের পরিবার, মানবাধিকার রক্ষাকারী, ক্ষেত্রসমীক্ষা, গভীর সাক্ষাৎকার এবং অভিযোগপত্রের মাধ্যমে। ১৯৫৬ সালের তদন্ত কমিশন আইনের অধীনে ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠার পর থেকে কমিশন ১,৬৭৬টিরও বেশি অভিযোগ পেয়েছে এবং প্রায় ৭৫৮টি অভিযোগের প্রাথমিক যাচাই সম্পন্ন করেছে। সরকারি সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও অভিযোগ জমা পড়তে থাকায় কমিশন ধারণা করে যে প্রকৃত গুমের সংখ্যা প্রাপ্ত অভিযোগের চেয়ে বেশি হতে পারে। কমিশন ‘অধিকার’, ‘আইন ও সালিশ কেন্দ্র’, ‘মায়ের ডাক’ এবং ‘হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি’র মতো মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে কাজ করেছে। অভিযোগ গ্রহণ করা হয়েছে সরাসরি, ডাকযোগে ও ইমেইলের মাধ্যমে, যাতে বিভিন্ন শ্রেণির ভুক্তভোগী অংশ নিতে পারেন। ঢাকার বাইরে বিভাগীয় পর্যায়েও পরামর্শ সভার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কমিশন শুধু ভুক্তভোগী ও পরিবারের সঙ্গে নয়, সাংবাদিক, অধিকারকর্মী, একাডেমিক, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অংশীজনদের সঙ্গেও আলোচনা করেছে। পাশাপাশি সন্দেহভাজন ব্যক্তি ও বাহিনীর সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে, যাতে শেখ হাসিনার দীর্ঘ শাসনামলে গড়ে ওঠা ‘গুম সংস্কৃতি’র প্রকৃত কাঠামো বোঝা যায়। কমিশন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করেছে, যাতে অভিযোগের মুখোমুখি ৪২ জন ব্যক্তি তদন্ত চলাকালে দেশত্যাগ করতে না পারেন। কমিশন জাতিসংঘের বলপূর্বক বা অনিচ্ছাকৃত অন্তর্ধানবিষয়ক ওয়ার্কিং গ্রুপ, শ্রীলঙ্কা ও মালদ্বীপের তদন্ত কমিশনের সাবেক সদস্য এবং ঢাকায় জাতিসংঘের আবাসিক সমন্বয়কারীর কার্যালয়ের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও আলোচনা করেছে। এসব যোগাযোগ কমিশনের কাজকে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা ও তুলনামূলক দৃষ্টিভঙ্গির মাধ্যমে সমৃদ্ধ করেছে। এতে বোঝা যায়, বলপূর্বক গুম মোকাবিলায় শুধু দেশীয় তদন্ত নয়, আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ।
তবে কমিশন তার কাজ করতে গিয়ে নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে। নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ততা ও তথ্য সংগ্রহ কঠিন ছিল। একই সঙ্গে ভুক্তভোগীদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও সহজ ছিল না। অনেক ব্যক্তি, যারা গুমের শিকার হয়ে পরে ফিরে এসেছেন, তারা প্রতিশোধের ভয়ে নিজেদের অভিজ্ঞতা প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক ছিলেন। কেউ কেউ কমিশনের কার্যালয়ে যাওয়ার আগে মোবাইল ফোন বাড়িতে রেখে আসতেন, যাতে কল রেকর্ড বা অবস্থানগত তথ্য থেকে তাদের উপস্থিতি শনাক্ত না হয়। অনেকে ফোনে কথা বলতে চাইতেন না, ফলে কমিশনকে তাদের সরাসরি ঢাকায় আসার জন্য অপেক্ষা করতে হয়েছে। অভিযোগ দায়েরের আগে কিছু ভুক্তভোগী অভিযুক্তদের দ্বারা হয়রানির শিকার হয়েছেন বলেও জানিয়েছেন। এমনকি একটি ক্ষেত্রে ভয়ভীতির কারণে অভিযোগ দায়ের দুই মাস বিলম্বিত হয়। আবার বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগী এখনও কারাগারে থাকায় তাদের সাক্ষ্য গ্রহণের ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে। এসব বাধা সত্ত্বেও কমিশন ১৫০ জনেরও বেশি ব্যক্তির সাক্ষাৎকার নিয়েছে।
আইনগত দিক থেকে প্রতিবেদনে বলপূর্বক গুমের চারটি মূল উপাদান উল্লেখ করা হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক কনভেনশনের ২ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রথমত, ব্যক্তিকে স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত করা; দ্বিতীয়ত, রাষ্ট্রীয় বাহিনী বা কর্তৃপক্ষের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা বা প্ররোচনা; তৃতীয়ত, আটক ব্যক্তির অবস্থান, ভাগ্য বা আটক-সংক্রান্ত তথ্য গোপন রাখা; এবং চতুর্থত, ভুক্তভোগীকে আইনি সুরক্ষার বাইরে রেখে দেওয়া। কমিশনের কাছে আসা অধিকাংশ অভিযোগ এই মানদণ্ড পূরণ করে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। যেসব অভিযোগে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সম্পৃক্ততা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত করা যায়নি, সেগুলো তদন্তের জন্য পুলিশের কাছে পাঠানো হয়েছে। প্রতিবেদনে জোর দিয়ে বলা হয়েছে, বলপূর্বক গুম শুধু অপরাধ নয়, বরং এটি একাধিক মৌলিক অধিকার একসঙ্গে লঙ্ঘন করে। এর মধ্যে রয়েছে জীবন, স্বাধীনতা, আইনের সুরক্ষা, ন্যায়বিচার, মতপ্রকাশ, চলাচল, সংগঠন, চিন্তা, বিবেক ও ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার।
বাংলাদেশের বিদ্যমান ফৌজদারি আইনে বলপূর্বক গুমকে আলাদা অপরাধ হিসেবে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়নি। তবে দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এ বেআইনি বাধা, বেআইনি আটক, অপহরণ, দাসত্ব ও জোরপূর্বক শ্রমের মতো অপরাধের বিধান রয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধি, ১৮৯৮ এসব অপরাধের তদন্ত ও বিচারের প্রক্রিয়া নির্ধারণ করে। কিন্তু প্রতিবেদনের মতে, এসব সাধারণ বিধান বলপূর্বক গুমের প্রাতিষ্ঠানিক, সংগঠিত ও মানবতাবিরোধী চরিত্র মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট নয়। ২৯ আগস্ট ২০২৪ বাংলাদেশ বলপূর্বক গুমবিরোধী আন্তর্জাতিক কনভেনশনে যোগ দেওয়ায় এখন রাষ্ট্রের ওপর নতুন বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশকে গুমকে দেশীয় আইনে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, দায়মুক্তি বন্ধ করতে হবে, যথাযথ তদন্ত নিশ্চিত করতে হবে, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার দিতে হবে এবং তাদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও প্রতিকার দিতে হবে। প্রতিকারের মধ্যে পুনঃপ্রতিষ্ঠা, পুনর্বাসন, মর্যাদা ফিরিয়ে দেওয়া এবং পুনরাবৃত্তি রোধের নিশ্চয়তা অন্তর্ভুক্ত।
প্রতিবেদনে বিশেষভাবে কমান্ড বা উচ্চপদস্থ দায়বদ্ধতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কমিশনের মতে, বাংলাদেশে গুমের ব্যবস্থা এমনভাবে পরিকল্পিত হয়েছিল যাতে দায় নির্ধারণ কঠিন হয়। অপহরণ, আটক, নির্যাতন ও হত্যা বা মুক্তির কাজ বিভিন্ন দলের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হতো। নিরাপত্তা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের এখতিয়ারগত ওভারল্যাপ, অপারেশনাল বিভাজন, চোখ বেঁধে রাখা, আটক স্থানের তথ্য গোপন রাখা এবং বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে ভূমিকা বিভাজনের মাধ্যমে গুমের প্রক্রিয়া অস্পষ্ট করা হয়। তবে কমিশনের পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, এই পদ্ধতিগুলো আকস্মিক বা বিচ্ছিন্ন ছিল না; বরং একটি কেন্দ্রীয় পরিকল্পনা ও তদারকির ইঙ্গিত বহন করে। বিভিন্ন র্যাব ইউনিটের আটককক্ষের অবস্থান ও নকশাগত সাদৃশ্য, যেমন অস্ত্রাগারের কাছাকাছি গোপন আটককেন্দ্র, কেন্দ্রীয় নির্দেশনার সম্ভাবনা নির্দেশ করে। নিম্নপদস্থ সদস্যরা প্রায়ই জানতেন না কাকে আটক করা হচ্ছে, কিন্তু কমান্ডারদের হাতে কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ ছিল বলে সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে।
আন্তর্জাতিক আইনে কমান্ড দায়বদ্ধতার নীতি অনুযায়ী, কোনো সামরিক বা বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যদি জানতেন বা জানার কথা ছিল যে তার অধীনস্থরা অপরাধ করছে, এবং তিনি তা প্রতিরোধ বা শাস্তির ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থ হন, তাহলে তাকেও ফৌজদারি দায় বহন করতে হবে। বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ধারা ৪ এই নীতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুমের মতো প্রাতিষ্ঠানিক অপরাধে শুধুমাত্র মাঠপর্যায়ের অপহরণকারী বা আটককারীকে দায়ী করলে প্রকৃত বিচার হবে না। কারণ কমান্ড কাঠামোর ভেতরে থাকা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা সরাসরি ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকলেও তারা অপরাধ সম্পর্কে জানতেন বা জানার কথা ছিল। তারা যদি তা বন্ধ না করেন, তদন্ত না করেন বা অপরাধীদের শাস্তি না দেন, তাহলে তাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এই কারণেই প্রতিবেদনে ১৯৫২ সালের সেনা আইনের পরিবর্তে ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন প্রয়োগকে বেশি কার্যকর ও আইনগতভাবে প্রয়োজনীয় বলা হয়েছে।
১৯৫২ সালের সেনা আইন গুম বা অপহরণকে মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে না এবং কমান্ড দায়বদ্ধতার স্পষ্ট স্বীকৃতিও দেয় না। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন, ১৯৭৩ মানবতাবিরোধী অপরাধ, অপহরণ ও কমান্ড দায়বদ্ধতার মতো বিষয়কে বিচারযোগ্য করে। এই আইনের ধারা ২৬-এ non obstante ধারা রয়েছে, যার অর্থ হলো সাংঘর্ষিক অন্য কোনো আইন থাকলেও এই আইন অগ্রাধিকার পাবে। তাই মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের ক্ষেত্রে সেনা আইনসহ অন্যান্য আইনের ওপর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের প্রাধান্য থাকবে। প্রতিবেদনে যুক্তি দেওয়া হয়েছে, কর্মরত সামরিক কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও এই আইনের অধীনে বিচার চালানো সম্ভব, কারণ গুমের মতো অপরাধ মোকাবিলায় সেনা আইনে প্রয়োজনীয় কাঠামো নেই। ফলে গুমের বিচার এমন আদালতে হওয়া উচিত, যেখানে গুমকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা যায়, কমান্ড দায়বদ্ধতা প্রয়োগ করা যায় এবং চলমান অপরাধের ধারণা গ্রহণযোগ্য।
বলপূর্বক গুমকে প্রতিবেদনে একটি চলমান অপরাধ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে। অর্থাৎ ভুক্তভোগীর অবস্থান, ভাগ্য, দেহাবশেষ বা সত্য প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত অপরাধটি শেষ হয় না। প্রতিদিন ভুক্তভোগীকে আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত রাখা নতুন লঙ্ঘন সৃষ্টি করে। এই ধারণা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অনেক সময় ভুক্তভোগীকে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন স্থানে আটক রাখা হয় এবং সময়ের সঙ্গে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বদলে যায়। কেউ কেউ বলতে পারেন, তারা প্রাথমিক অপহরণে অংশ নেননি, শুধু পরে দায়িত্ব পেয়েছেন। কিন্তু চলমান অপরাধের ধারণা অনুযায়ী, আটক অব্যাহত রাখার প্রতিটি দিন অপরাধের অংশ। ফলে যারা আটককালীন সময়ে কমান্ড বা নিয়ন্ত্রণের অবস্থানে ছিলেন, তাদেরও দায় বহন করতে হবে। এতে দায়বদ্ধতার শৃঙ্খল অক্ষুণ্ণ থাকে এবং কর্মকর্তা বদল বা দায়িত্ব পরিবর্তনের অজুহাতে অপরাধীরা দায় এড়াতে পারে না।
প্রতিবেদনে বিদেশে পালিয়ে দায় এড়ানোর বিষয়টিও আলোচনা করা হয়েছে। উচ্চপদস্থ অভিযুক্তরা অন্য দেশে আশ্রয় নিয়ে মনে করতে পারেন যে বিদেশি বিচারব্যবস্থায় তাদের বিচার কঠিন হবে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, কিছু অভিযুক্ত ইতোমধ্যে বিদেশে চলে গেছেন বলে কমিশনের ধারণা, যার মধ্যে শেখ হাসিনার নামও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে বিদেশে অবস্থান করলেও জবাবদিহি পুরোপুরি অসম্ভব নয়। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রে এক সাবেক সিরীয় কারা কর্মকর্তার মামলার কথা বলা হয়েছে, যেখানে মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত থাকার তথ্য গোপন করার কারণে তাকে অভিবাসন জালিয়াতির অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়। নাগরিকত্ব বা অভিবাসন আবেদন করার সময় অপরাধমূলক অতীত গোপন করা নিজেই দণ্ডনীয় অপরাধ হতে পারে। এ ধরনের আইনি পথ ব্যবহার করে বিদেশে থাকা অপরাধীদের বিরুদ্ধে পরোক্ষ জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব। বাংলাদেশের গুম-ভুক্তভোগীদের জন্যও এটি একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
সবশেষে প্রতিবেদনের মূল বক্তব্য হলো, বলপূর্বক গুম কেবল বিচ্ছিন্ন অপরাধ নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, বিচারহীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতার সম্মিলিত ফল। এই অপরাধ ভুক্তভোগীর জীবন ও স্বাধীনতা ধ্বংস করে, পরিবারকে দীর্ঘস্থায়ী অনিশ্চয়তায় ফেলে এবং সমাজে ভয় ও নীরবতার সংস্কৃতি তৈরি করে। গুম মোকাবিলার জন্য শুধু কয়েকজন নিচু পর্যায়ের সদস্যকে শাস্তি দেওয়া যথেষ্ট নয়; বরং পরিকল্পনাকারী, নির্দেশদাতা, তদারককারী এবং নীতিগত অনুমোদনদাতাদের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য গুমকে দেশীয় আইনে স্পষ্ট অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের যথাযথ ব্যবহার, কমান্ড দায়বদ্ধতার প্রয়োগ, ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন, সত্য উদ্ঘাটন, প্রতিষ্ঠান সংস্কার এবং ভবিষ্যতে পুনরাবৃত্তি রোধের নিশ্চয়তা জরুরি। প্রতিবেদনের মতে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, আইনি সংস্কার, স্বাধীন বিচারব্যবস্থা এবং মানবাধিকারের প্রতি বাস্তব অঙ্গীকার ছাড়া বলপূর্বক গুমের মতো গুরুতর অপরাধের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
©somewhere in net ltd.