নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মঞ্জুর চৌধুরী

আমি ঝন্ঝা, আমি ঘূর্ণি, আমি পথ-সমূখে যাহা পাই যাই চূর্ণি’। আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ, আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ। আমি হাম্বার, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল, আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’ পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’ ফিং দিয়া দিই তিন দোল; আমি চপলা-চপল হিন্দোল। আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা, করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পান্জা, আমি উন্মাদ, আমি ঝন্ঝা! আমি মহামারী আমি ভীতি এ ধরিত্রীর; আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ন চির-অধীর! বল বীর - আমি চির উন্নত শির!

মঞ্জুর চৌধুরী › বিস্তারিত পোস্টঃ

"তুই একটা good for nothing, তোকে দিয়ে কিছু হবে না।"

১৯ শে নভেম্বর, ২০১৪ রাত ১:১২

স্বপ্ন দেখে মন
- মঞ্জুর চৌধুরী

১.

"স্যার ভাল আছেন?"
প্রথম দেখায় ছেলেটিকে চিনতে পারলাম না। ভুরু কুঁচকাতে হলো। রোগা টিংটিংয়ে একজন যুবক। বয়স আঠারো-কুড়ি হবে। 'স্যার' যেহেতু ডাকছে, সেহেতু আমার কোন ছাত্র হবার তীব্র সম্ভাবনা। এমন নয় যে আমি কোন স্কুল কলেজে মাস্টারি করতাম, শয়ে শয়ে ছাত্র পড়িয়েছি। আমার দৌড় ঐ তিন চারটা টিউশনি পর্যন্তই। প্রায় প্রত্যেকের চেহারাই আমার এখনও মনে আছে। দুই চারজনের সাথেতো নিয়মিত যোগাযোগ আছে। তাহলে একে চিনতে পারছি না কেন?
ছেলেটার চেহারায় আগ্রহ দেখে বুঝা যাচ্ছে যে সে আশা করে বসে আছে, আমি তাকে চিনতে পারবো। তাকে হতাশ না করতেই উৎফুল্ল স্বরে বললাম,
"হ্যা ভাল আছি। তুমি কেমন আছো? এখানে কী করো?"
আমার ছলনায় কাজ হলো। ছেলেটা খুশি হলো। বলল, "স্যার, এইটাতো আমারই এলাকা। আমার এখানেই থাকার কথা। আপনি কবে দেশে ফিরলেন?"
'তার এলাকা' বলাতে আমি আরেকটু বিপদে পড়ে গেলাম। আমি দাঁড়িয়ে আছি কাকরাইল মোড়ে। সিদ্ধেশ্বরীতে এসেছিলাম ছোটবেলার কিছু বন্ধুর সাথে দেখা করতে। এখন যাচ্ছি ফুলবাড়িয়ার দিকে। দেশে এসে হাজির বিরিয়ানি না খেলে আমি ঠিক মতন নিঃশ্বাস নিতে পারিনা। গত দুইদিন ধরে দম আটকে বসে আছি। এখন সমস্যা হচ্ছে, আমি কখনও কাকরাইল, শান্তিনগর, সিদ্ধেশ্বরী এইসব এলাকায় টিউশনি করেছি বলেতো মনে পড়ে না। আমার টিউশনির দৌড় খুবই সীমিত। গুলশান আবাসিক এলাকা। তাও যদি আরও নির্দিষ্ট করে বলতে হয়, তবে গুলশান এক নম্বর। দুই নম্বরেও কাউকে পড়াতে যাইনি।
একবার বনানীর দিকে এক পরিবারের সাথে কথা বলে পাকা করে এসেছিলাম, তখনই অ্যামেরিকান ভিসা লেগে গেল। হলো না টিউশনি করা।
বুদ্ধি খাটিয়ে আন্দাজেই ঢিল ছুড়লাম, "এইতো গত পরশু দেশে ফিরেছি। তা তোমরা গুলশান ছেড়েছ কবে?"
"সেটা প্রায় দুই বছর হতে চলল। অনেকদিন পরে এলেন তাই না স্যার?"
"হ্যা। চার বছর। তা এখন তুমি কী নিয়ে পড়ছো?"
"কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রাইভেট ইউনিভার্সিটিতে।"
ছেলেটা কথা শেষ করার সাথে সাথেই আমি তাকে চিনতে পারলাম। তার নাম ফারুক, ফারুক ইফতেখার। আমি তাকে ডাকতাম 'নগর বাউল' নামে। নগর বাউল জেমসের আসল নাম ফারুক মাহফুজ আনাম, সেখান থেকেই তাকে এই নামে ডাকতাম।
কী গুব্দু গাব্দু টাইপের মোটাসোটা এক ছেলে ছিল সে! এখন তার এ কী হল! পুরাই আদনান সামির কাহিনী! অনেকদিন পর দেখা হওয়ায় চিনতেই পারিনি।
"তোমার এ কী হাল? এত শুকালে কী করে?"
সে লজ্জিত হাসি হেসে মাথা চুলকায়। আমি বললাম, "ফ্রী আছো?"
"কেমন ‘ফ্রী’ স্যার?"
"আমার সাথে বিরিয়ানি খেতে যাবে?"
দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার ফল। বিরানিকে 'বিরিয়ানি' ডাকার অভ্যাস হয়ে গেছে।
"বিরানি খেতে কই যাবেন স্যার?"
"পুরান ঢাকা। হাজির বিরিয়ানি। যাবে?"
"হাজির বিরানিতো এখন অনেক লোকেশনে পাওয়া যায় স্যার। কষ্ট করে পুরান ঢাকা যেতে হয়না।"
"আমার কিছু নষ্টালজি কাজ করে ঐ লোকেশনে। তাই যাওয়া আর কি।"
ফারুক বলল, "না স্যার। এখন অতদূর যেতে পারবো না। আপনি বাসায় আসুন না। আম্মু খুব খুশি হবে।"
"আমি অবশ্যই আসব। পারলে আজকেই। তোমার নতুন বাসার অ্যাড্রেসটা দাও।"
ফারুক আমাকে ঠিকানা বলল, ফোন নম্বর বলল। আমি সেল ফোনে সব টুকে নিলাম। তারপর একটা সি.এন.জি ট্যাক্সি খুঁজে নিজেকে খাঁচায় বন্দী করে ফেললাম। বিদায় নেবার সময়ে ফারুক বলল, "আসবেন কিন্তু স্যার।"
আমি বললাম "অবশ্যই।"
আমাকে অবশ্যই তার বাড়িতে যেতে হবে। সে যে শুধুশুধু 'স্লিম'হয়নি সেটা আমি তার চোখ দেখেই বুঝতে পেরেছি। বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরুর আগে থেকেই আমি ঢাকায় এসেছি। নেশাখোরদের সাথে আমার অনেক মেলামেশা হয়েছে। চোখ দেখলেই তাদের চিনতে পারি।
তারচেয়েও ভয়ংকর ব্যপার সে আমাকে মিথ্যে করে বলেছে যে সে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করছে। মানুষ মিথ্যা বলার সময়ে যা যা করে (দৃষ্টি ফিরিয়ে নেয়া, খানিকটা সময় নিয়ে চিন্তা করা, ব্রেইনে অক্সিজেনের অভাবে চোখ সামান্য ঘোলাটে হওয়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া ইত্যাদি) সব লক্ষণই তার জবাবে ছিল। সে কী তবে পড়াশোনাও ছেড়ে দিয়েছে?
আমার একজন ছাত্র মাদকের শিকার হবে, আর আমি বসে বসে বিরিয়ানি খাব, সেটা কী হতে দেয়া যায়? আমি আজকেই তার মায়ের সাথে দেখা করতে যাব। অবশ্যই যাব।

২.

আন্টিই দরজা খুলে দিলেন। আমাকে দেখে সত্যিকারের আনন্দিত স্বরেই বললেন, "আরে বাবা তুমি? কবে দেশে এসেছো?"
আমি দরজার বাইরে দাঁড়িয়েই বললাম, "জ্বী আন্টি গত পরশু। আপনি ভাল আছেন?"
"আল্লাহ ভালই রেখেছেন। জুতা খুলতে হবে না বাবা! এসো এসো।"
তিনি মানা করার পরেও জুতা খুলেই ভিতরে এলাম। দামী মার্বেলের মেঝে পাড়িয়ে নোংরা করতে মন খুঁত খুঁত করে।
"ঠিকানা পেলে কোথায়?"
"ফারুকের সাথে দুপুরে দেখা হয়েছিল। সেই দিল।"
ছেলের নাম শুনে আন্টি একটু যেন উদাস হলেন।
আমি বললাম, "হঠাৎ গুলশান ছেড়ে কাকরাইল চলে এলেন যে?"
আন্টি বললেন, "গুলশান কী আর আগের মতন আছে? ওখানে মতিঝিলের চেয়েও বেশি জ্যাম হয়। গুলশান দুই থেকে এক নম্বরে যেতেই এখন এক ঘন্টার বেশি সময় লাগে।"
কথা সত্যি। এইবার এসে দেখলাম এমন কোন ব্যাংক নেই যার শাখা গুলশানে খোলা হয়নি। সেই সাথে অন্যান্য অফিস, রেস্টুরেন্ট হোটেল ইত্যাদির কারণে আগের সেই ছিমছাম ভাবটা আর নেই। সেইদিক দিয়ে বরং ধানমন্ডি এখনও অনেক নিরিবিলি আছে।
"তোমার আঙ্কেলের অফিসে পৌছাতে দেরী হয়ে যেত বলেই এখন কাছাকাছি বাসা নিয়ে শিফট করেছি। তোমার কথা বলো। তুমি দেখি একদমই বদলাওনি, ঠিক আগের মতই আছো!"
"জ্বী আন্টি, চেহারা পাল্টাতে ইচ্ছা করেনা। মানুষ যদি শেষে চিনতে না পারে।"
" হাহাহা। সেদিন টেলিভিশনে তোমার নাটক দেখলাম। ঐ যে শহীদুজ্জামান সেলিমের সাথে করেছিলে? ভালই লেগেছে।"
আমি লজ্জায় পড়ে গেলাম। ডালাসে থাকতে একটা টিভি নাটকে অভিনয় করেছিলাম। সেটা যে এত মানুষ দেখবে ভাবতে পারিনি।
"তা তুমি এখন নাটক ফাটক করোনা?"
মাথা নিচু করেই বললাম "মঞ্চ নাটক করা হয় মাঝে মাঝে, তবে 'ফাটক' জাতীয় কিছু করা হয়না।"
আন্টি রসিকতাটা ধরতে পেরে হেসে দিলেন।
"আঙ্কেল বাড়িতে নেই?"
"না, তোমার আঙ্কেল বেলজিয়াম গেছেন, কনফারেন্সে।"
"ও আচ্ছা। আগে জানলে কিছু চকলেট আনাতাম তাঁকে দিয়ে।"
"হাহাহা। কোন সমস্যা নেই। আজকে ফোনে বলে দিব। তুমি কতদিন আছো দেশে? উনি নেক্সট শুক্রবারেই চলে আসবেন।"
আমি প্রায় প্রতিবাদ জানিয়ে উঠলাম, "না না আন্টি, কিছু বলতে হবে না। আমার তেমন চকলেট প্রীতি নেই। এমনিই বললাম। আমরা ডালাসে বসেই বেলজিয়ান চকলেট পাই।"
"হ্যা, অ্যামেরিকায়তো এই সুবিধা। দুনিয়ার যা কিছু আছে সব সেখানে পাওয়া যায়। বাংলাদেশী মসলা লাগলে সেটাও পাওয়া যায়, আবার কুমিরের মাংস খেতে চাইলে সেটাও পাওয়া যায়। ক্যালিফোর্নিয়ার এক চাইনিজ দোকানে দেখেছিলাম গরুর রক্ত, সাপ এইসব হাবিজাবি সব বিক্রি হচ্ছে। ঘেন্নায় গা গুলিয়ে উঠেছিল।"
"জ্বী, তবে উটের মাংস পাওয়া যায় না। অনেক আরব দোকানে খোঁজ নিয়েছি। উটের মাংস পাইনি। খাবার খুব শখ ছিল। বাহরাইনে গিয়ে একদিন ছিলাম, কারফিউ ছিল বলে বেরোতে পারিনি।"
আন্টি চোখ বড় বড় করে বললেন, "ও আল্লাহ। আমরা মাঝে মাঝে ঢাকাতেই উটের মাংস পাই। দেখি এইবার পেলে তোমাকে দাওয়াত দিয়ে খাওয়াব। তা কবে যাবে তুমি?"
"দুই সপ্তাহের ছুটিতে এসেছি আন্টি। এর বেশি ছুটি পাওয়া হয়না। প্রফেশনাল জবে ঢুকে ধরা খেয়ে গেছি।"
"হ্যা, সেটা ঠিক। সেই দেশে সব আছে, কিন্তু জীবনটা কেমন যেন যান্ত্রিক যান্ত্রিক লাগে আমার কাছে। কাজ করো, কাজ করো, কোন ছুটি নেই।"
আমার দুঃখে আন্টিকে খুব দুঃখিত মনে হলো। তাঁর দুঃখ দূর না করে জিজ্ঞেস করলাম, "ফারুকের কী অবস্থা? ও পড়াশোনা ছেড়েছে কত বছর হলো?"
আন্টি একটু চমকিত হলেন। তারপরে নিজে নিজে কি বুঝলেন সেটা তিনিই জানেন, বললেন, "তিন বছর ধরে পড়াশোনা করছে না।"
"ও লেভেল শেষ করেছেতো?"
আন্টি দুপাশে মাথা নাড়েন। আমি খুবই দুঃখিত হয়ে নিজের ঠোঁটে চিমটি কাটতে লাগলাম।
ফারুক কখনই মেধাবী ছাত্র ছিল না। তাকে অনেক জোর করে পড়াতে হতো। আমার মনে আছে, তাকে পড়ানোর আগে আমাকে নানান ফন্দি করতে হতো। ম্যাথে ইন্টারেস্ট জাগানোর জন্য বিভিন্ন প্যারাডক্সের ব্যবহার করতাম। হিস্ট্রি পড়াতাম গল্পের ছলে। তারপরেও বিশেষ লাভ হতো না। পরীক্ষার রেজাল্ট বেরোলে আঙ্কেল তাকে দিয়ে আমাকে রিপোর্ট কার্ড দেখাতেন। আঙ্কেলের ভাবভঙ্গি ছিল খুবই আক্রমণাত্মক। বাজে রেজাল্ট করায় তিনি তাঁর ছেলেকে যেমন দায়ী ভাবতেন, আমাকেও তেমনি দায়ী মনে করতেন। উনার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখলে উনি তেমন ভুলও ছিলেন না। শিক্ষক হিসেবে ছাত্রের ব্যর্থতার দায় আমাকেইতো নিতে হবে।
"কিছু বুঝলে? কি করলে সে এইরকম ফেলটুস মার্কা রেজাল্ট করবে না বল দেখি?"
আমি মিনমিনে স্বরে বলতাম, “আমি ওর খাতা দেখেছি। ও যেসব প্রশ্নের উত্তর ভুল করেছে, সেসব উত্তর সে আসলে পারতো। কেন সে এমন ভুল করে আমি বুঝতে পারছি না। Silly mistakes!"
আঙ্কেল বলেন, "বেত ব্যবহার করলে এইসব “Silly mistakes” আর করবে না। আপনাকেতো বলেইছি, আপনি ইচ্ছা করলে মেরে হাড্ডি গুড়ো করে দিবেন, কোন সমস্যা নেই। এইসব ইংলিশ মিডিয়াম স্কুলগুলোর এক ঢং! ছাত্র পেটানো অ্যালাউড না। আরে, গাধা না পেটালে মানুষ হয়?"
আমি আর বলি না যে ছাত্র পেটানোতে আমারও বিশ্বাস নেই। এমনিতেই যে পড়ালেখায় অমনোযোগী, মার খেলে সেতো আরও দূরে সরে যাবে।
মাথা নত করে দাঁড়িয়ে থাকা ফারুকের সামনেই আঙ্কেল বলেন, "সামনের বার এইরকম রেজাল্ট করলে একদম পিটিয়ে ছাতু বানিয়ে দিবেন!"
সামনের বারও একই দৃশ্য মঞ্চস্থ হয়। একটিও সংলাপ এদিক ওদিক হয়না।
আমি বললাম, "তার খেলাধুলা কেমন হচ্ছে?"
আন্টি আরেকটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলেন, "সেটাও বন্ধ। পরীক্ষায় বাজে রেজাল্ট করায় তোমার আঙ্কেল তার ব্যাট বল পুড়িয়ে ফেলেছিলেন। বলেছিলেন এইগুলোই হচ্ছে সব সর্বনাশের কারন।"
আমি হায় হায় করে উঠলাম। খেলাধুলায় ফারুক অসম্ভব প্রতিভাবান এক ছেলে। আমি নিজে তার সাথে খেলেছি। ও সেই বয়সেই যেভাবে ব্যাটিং করতো আমরা সবাই তাজ্জব হয়ে যেতাম। আমার বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া বন্ধুরাও তাকে বল করতে গিয়ে বেধরক পিটুনি খেয়েছে, সে তখন মাত্রই ক্লাস সেভেনের ছাত্র ছিল।
ক্রিকেট ছিল তার একমাত্র ভালবাসা। আমার কাছে পড়তে বসলেও সে ব্যাট বল নিয়ে একা একাই জাগলিং করতো। ওর স্বপ্ন ছিল কোন ক্লাবের হয়ে জাতীয় পর্যায়ে ক্রিকেট খেলা। ওর স্বপ্ন ছিল একসময়ে জাতীয় দলের হয়ে ব্যাট করা। আমার আস্থা ছিল, একদিন সে পারতই।
"আমার ধারনা আঙ্কেল ভুল করেছেন। মারাত্মক ভুল করেছেন। ওর যেহেতু খেলাটার প্রতি আগ্রহ ছিল, আমার মনে হয় তাকে খেলতে দেয়া উচিৎ ছিল। আমাদের দেশতো এখন ক্রিকেটে ভালই করছে। ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার এখন খুবই ভাল ক্যারিয়ার।"
আন্টি একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, "সেটা তোমার আঙ্কেল বিশ্বাস করেন না। তাঁর বিশ্বাস পড়ালেখা না করলে জীবন বৃথা। খেলাধুলা একটা নির্দিষ্ট বয়স পর্যন্ত করা চলে।"
নেশার প্রসঙ্গটা তুলবো কিনা তা নিয়ে আমি ইতস্তত করতে লাগলাম।
আন্টিই বললেন, "এখন বুঝতে পারছি না ওকে নিয়ে আমরা কী করবো! পড়ালেখা ছাড়ায় এখন কারও কথাই কানে তুলে না। অনেক আজে বাজে অভ্যাস হয়েছে। বাইরে বাইরে ঘুরে বেড়ায়। বাড়িতে থাকলে আমার জানে অন্তত শান্তি আসে এইভেবে যে, ‘যাক বাড়িতে আছে।’ বাইরে থাকলে সারাক্ষণ টেনশন কাজ করে। তুমিতো বুঝতেই পারছো, ইয়ং বয়সে ছেলেদের যেসব বাজে অভ্যাস হয় আর কি।"
আমি এবারে সরাসরিই প্রশ্ন করলাম, "ইয়াবায় আসক্ত হয়ে গেছে?"
আন্টি ওপাশ ফিরে হ্যা সূচক মাথা নাড়লেন। এক বিন্দু অশ্রু তাঁর গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো। আমি একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়লাম। তাঁকে কী বলে সান্তনা দিব বুঝতে পারছি না।
"আপনি যদি কিছু মনে না করেন, তাহলে আমি বলবো, ওকে খেলতে দেয়া উচিৎ। যে বিষয়ে তার আগ্রহ, যেখানে তার অসম্ভব প্রতিভা, সেটা ঠিকমত এক্সপ্লোর করা উচিৎ। আর তাছাড়া খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকলে তার এইসব আজেবাজে অভ্যাসও ছুটে যাবে।"
আন্টি ছোট নিঃশ্বাস ফেলে বললেন, "তোমার আঙ্কেল সেটা মানবেন না। কিছুতেই না।"
"ছেলের মাদকাসক্ত হয়ে হারিয়ে যাওয়ার চেয়ে কী এই ভাল না যে সে খেলাধুলায় মেতে থাকুক? কালকে যদি সে বাংলাদেশের হয়ে ব্যাটিং করতে নামে, আঙ্কেল কী পুরো অফিসের লোকজনকে নিয়ে তার খেলা দেখবেন না?"
আন্টি বললেন, "তোমার আঙ্কেলকে কে বুঝাবে বল?"
আঙ্কেলের সাথে আমার তেমন কোন পরিচয় নেই। ঐ পরীক্ষার রিপোর্ট দেখানোর সময়েই যা একটু কথা হতো, মানে আমাকে ধমক শুনতে হতো আর কি। এরপর তাঁর সাথে যখনই দেখা হতো, আমি চোরের মতন মুখ লুকিয়ে কোনরকমে স্থান ত্যাগ করতাম। তাঁর সামনে দাঁড়াবার সাহস কখনই ছিল না আমার। এখন অবশ্য ভয়ের কিছু নেই, কিন্তু যেহেতু পরিচয়ের গন্ডি সীমিত, সেক্ষেত্রে তাঁর ছেলের ভবিষ্যত নিয়ে জোরালো তর্ক করার মত অবস্থানে আমি নেই।
"আপনি বুঝাবেন। আপনাকেই বুঝাতে হবে আন্টি। এইটা আপনার ছেলের জীবন মরণের ব্যপার। আজকে সে ডিপ্রেশনে ড্রাগস নিচ্ছে, কালকে আল্লাহ না করুক আরও অনেক খারাপ কিছু করে ফেলতে পারে। সুইসাইডও যদি করে, তাহলেও অবাক হবো না।"
আন্টি ভয়ার্ত চোখে আমার দিকে তাকালেন।
"খুব বেশি দেরী হবার আগেই কিছু একটা করার দরকার আছে আন্টি। বিশ্বাস করেন, এখনও কিছুই হয়নি।"
আন্টি বিরবির করে কিছু একটা বললেন, শুনতে পেলাম না। তবে তাঁর চেহারায় বুঝতে পারলাম, তিনি আঙ্কেলের সাথে কথা বলবেন।

৩.

বাংলাদেশে বেড়াতে গেলে সবচেয়ে বিরক্তিকর যা লাগে, তা হচ্ছে এখানে সময় অত্যন্ত দ্রুত চলে। দিনের অর্ধেকটাই রাস্তার ট্রাফিক জ্যামে নষ্ট হয়ে যায়। চার পাঁচটা কাজ নিয়ে ঘর থেকে বেরুনোর পর দেখা যায় একটা কাজ করার আগেই সময় প্রায় শেষ।
আসতে না আসতেই যাবার দিন চলে আসে। আমি ঠিক মতন নড়াচড়াও করতে পারিনি, ছুটি প্রায় শেষ হয়ে এলো। আগামী পরশু আমার ফ্লাইট।
সেই সময়ে ফারুকের ফোন এলো।
"স্যার, আমি ফারুক।"
"হ্যা চিনতে পেরেছি, কেমন আছো?"
"আপনাকে 'থ্যাংক ইউ' বলতে ফোন করেছি স্যার।"
"তাই? কিসের জন্য থ্যাঙ্কস দিচ্ছো?"
"বাবা আমাকে খেলার পারমিশন দিয়েছে স্যার। প্রথমে রাজি হচ্ছিলেন না, আম্মু অনেক বুঝানোর পরে আজকে গিয়ে রাজি হয়েছেন। শর্ত একটাই, আমাকে সব বাজে অভ্যাস ছেড়ে দিতে হবে।"
"গ্রেট! তা তুমি কী বললে?"
সে হেসে বলল, "এই সুযোগ হাতছাড়া করার মতন পাগল এখনও হইনি, স্যার। বাবা এখন আমাকে নিয়ে স্টেডিয়াম মার্কেটে এসেছেন ব্যাট কিনে দিতে।"
আমার বুকটা একদম হালকা হয়ে গেল।
"তাই? আঙ্কেল নিজে এসেছেন তোমাকে ব্যাট কিনে দিতে?"
"জ্বী স্যার, একদম ছোটবেলার মতন। একটা কুকাবুরা ব্যাট পছন্দ হয়েছে। প্যাড গ্লাভস, হেলমেট সব কিনে দিবেন আজকে। এখন দাম দর করছেন, আমি এই ফাঁকে আপনাকে থ্যাঙ্ক ইউ জানাতে বেরিয়ে এসেছি।"
"আমাকে এখন থ্যাংকস না জানালেও চলবে। তুমি আপাতত বাবার পাশে থাকো। দাম দর করতে সাহায্য কর। আর শোন, খুব মন লাগিয়ে খেলবে কিন্তু। নেক্সট টাইম দেশে আসলে যেন তোমার অটোগ্রাফ নিতে হয়, এমন বিখ্যাত কেউ যেন হয়ে যাও। ঠিক আছে?"
ফারুক, আমার "নগর বাউল" হেসে দিল।
"ঠিক আছে স্যার। আমি জান লাগায়ে দিব। আই প্রমিজ।"
ফোনে তার হাসি শুনতে ভাল লাগছে। সামনাসামনি সেই হাসি দেখতে পেলে আরও ভাল লাগতো।
চেষ্টা করবো আজকে সন্ধ্যায় তাদের বাড়িতে গিয়ে বিদায় নিয়ে আসতে। আঙ্কেলের সামনে 'চোরের মত' মুখ লুকিয়ে রাখার দিন ফুরিয়েছে - সেইটা অন্তত সেলিব্রেট করা উচিৎ!
যেতে পারবো কিনা নিশ্চিত জানিনা। সময় বড় কম। বাঁধানো সময়ে কত কাজ যে আমাদের করার থাকে! অসম্পূর্ণ কাজ রেখে বিদায় নিতে কারই বা ভাল লাগে?

আরও লেখা পড়তে: https://www.facebook.com/groups/canvasbd/

মন্তব্য ১০ টি রেটিং +৪/-০

মন্তব্য (১০) মন্তব্য লিখুন

১| ১৯ শে নভেম্বর, ২০১৪ রাত ১:৫০

ডি মুন বলেছেন:
এভাবেই যার যেখানে প্রতিভা সে বিষয়ে তাকে অনুপ্রেরণা দেয়া উচিত। জোর করে কিছু চাপিয়ে দেয়াটা মোটেই কাম্য নয়।

গল্প ভালো লেগেছে।

++++++++++++ লেখককে শুভেচ্ছা।
ভালো থাকা হোক।

১৯ শে নভেম্বর, ২০১৪ রাত ২:০৭

মঞ্জুর চৌধুরী বলেছেন: ধন্যবাদ! :)

২| ১৯ শে নভেম্বর, ২০১৪ ভোর ৫:০১

রাখাল রাাজু বলেছেন: ভালো লাগল

১৯ শে নভেম্বর, ২০১৪ রাত ৯:১৬

মঞ্জুর চৌধুরী বলেছেন: :)

৩| ১৯ শে নভেম্বর, ২০১৪ সকাল ৮:০২

ভিটামিন সি বলেছেন: ভালো লাগলো আপনার লেখা।

১৯ শে নভেম্বর, ২০১৪ রাত ৯:১৭

মঞ্জুর চৌধুরী বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ!

৪| ১৯ শে নভেম্বর, ২০১৪ রাত ১১:১৭

কলমের কালি শেষ বলেছেন: আমাদের দেশে এইটার খুবই অভাব যার যেদিকে মনযোগ তাকে সে দিকে যেতে দেওয়া হয় না । :(

সুন্দর বাস্তব উদাহরনের গল্পটা ভালো লাগলো ।

২০ শে নভেম্বর, ২০১৪ রাত ৯:৩০

মঞ্জুর চৌধুরী বলেছেন: ধন্যবাদ!

৫| ২১ শে নভেম্বর, ২০১৪ রাত ১১:৩২

বোকা মানুষ বলতে চায় বলেছেন: চমৎকার সাবলীল বর্ণনার গল্প একটানা পড়ে গেলাম... লাইক উইথ ++++++

গল্পের শিক্ষকের জায়গায় নিজেকে যেন দেখতে পাচ্ছিলাম। মন ছোঁয়া গল্প উপহার দেয়ার জন্য ধন্যবাদ আপনাকে।

শুভ কামনা রইল।

১২ ই ডিসেম্বর, ২০১৪ ভোর ৬:০৩

মঞ্জুর চৌধুরী বলেছেন: ধন্যবাদ! :)

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.