| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মঞ্জুর চৌধুরী
আমি ঝন্ঝা, আমি ঘূর্ণি, আমি পথ-সমূখে যাহা পাই যাই চূর্ণি’। আমি নৃত্য-পাগল ছন্দ, আমি আপনার তালে নেচে যাই, আমি মুক্ত জীবনানন্দ। আমি হাম্বার, আমি ছায়ানট, আমি হিন্দোল, আমি চল-চঞ্চল, ঠমকি’ ছমকি’ পথে যেতে যেতে চকিতে চমকি’ ফিং দিয়া দিই তিন দোল; আমি চপলা-চপল হিন্দোল। আমি তাই করি ভাই যখন চাহে এ মন যা, করি শত্রুর সাথে গলাগলি, ধরি মৃত্যুর সাথে পান্জা, আমি উন্মাদ, আমি ঝন্ঝা! আমি মহামারী আমি ভীতি এ ধরিত্রীর; আমি শাসন-ত্রাসন, সংহার আমি উষ্ন চির-অধীর! বল বীর - আমি চির উন্নত শির!
বিশ্বকাপ খেলা না খেলা নিয়ে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আমার পয়েন্ট অফ ভিউ বলার আগে পরিচিত একজনের ঘটনা বলি। বন্ধুত্ব ভাঙ্গনের ঘটনা। প্রবাস জীবনে খুবই কমন ব্যাপার, আপনাদের অনেকের সাথেও হয়তো ঘটেছে। মিল পাবেন।
তা এই ঘটনার ভদ্রলোকের একটি পুরানো ফ্রেন্ড গ্রূপ ছিল। প্রবাসী জীবনের একদম শুরুর দিকের গ্রূপ। নিয়মিত আড্ডা হতো, মজা মাস্তি সবই চলতো। গ্রূপটির প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এই যে এখানে কোন ফিল্টার ছিল না। যে যার মনের কথা সরাসরি বলতো। একের প্রয়োজনে অন্যজন এসে দাঁড়াতো। আসল বন্ধুদের ক্ষেত্রে যেমনটা ঘটে আর কি। এই গ্রূপটা ভদ্রলোকের কাছে নিজের পরিবারের চেয়েও আপন ছিল।
সময়ের সাথে সাথে গ্রূপে নতুন নতুন সদস্য এলো। গ্রূপ বড় হলো।
এতে সমস্যা হলো এই যে ছোট ছোট সাবগ্রূপ তৈরী হতে শুরু করলো। উদাহরণ দেই, ধরা যাক শুরুতে এই ফ্রেন্ড সার্কেলে পাঁচ বন্ধু ছিল। ষষ্ঠজন এসে তৃতীয় থেকে পঞ্চমের সাথে আলাদা সাবগ্রূপ তৈরী করলো। এই নতুন সাবগ্রূপ বন্ধু ১-২ কে বাদ দিয়ে ৩-৬ মিলে আলাদাভাবে আড্ডা দেয়, আলাদা আলাদা কিছু করে। সোশ্যাল মিডিয়ার কল্যানে সব খবরই জানা যায়, সবই দেখা হয়।
স্বাভাবিক কারণেই বন্ধু ১-২ এর মন খারাপ হয়। ৬ এর উপরে না, ৩-৫ এর উপর, কারন ওরা দেখছে ১-২ কে বাদ দেয়া হচ্ছে, তারপরেও ওরা ৬কে কিছু না বলে উল্টা ১-২ কেই বাদ দিয়ে দেয়। পার্টিতে দেখা হলে কথা বলে না, না দেখার ভান করে, কথাবার্তার টোনও এমন যেন জোর করে ওদেরকে কথা বলতে হচ্ছে।
১-২ এর হাতে তখন দুইটা উপায় খোলা থাকে। হয় নিজেদের আত্মসম্মান বিসর্জন দিয়ে ৩-৬ এর সাথে জোর করে মেশার চেষ্টা করে যাওয়া।
আর নাহলে ওদেরকে সালাম দিয়ে নিজে থেকেই সরে পরা।
পরিবারের চেয়েও আপন বন্ধু সার্কেলকে বিদায় দিতে হবে, কষ্ট হবে। কিন্তু এখানে আত্মসম্মান মূল ইস্যু। যেখানে সম্মান নেই, সেখানে মাটি কামড়ে পড়ে থাকার কোন মানে নেই।
প্রবাসে এইভাবেই বিভিন্ন ফ্রেন্ড সার্কেল ভাঙ্গে। হয়তো দেশেও এখন তাই।
বাংলাদেশ ক্রিকেট দলও সেটাই করেছে।
প্রথমে মুস্তাফিজকে আইপিএলে নিল। বাংলাদেশের সবাই খুবই আনন্দিত হলো। বিজেপির হজম হলো না। ওরা বাংলাদেশ-মুসলিম বিরোধী। ওদের অশিক্ষিত ইতর নেতা শাহরুখ খানকে গালাগালি করলো মুস্তাফিজকে নেয়ার জন্য। দলের অন্যান্য মালিকও কিন্তু আছেন, জুহি চাওলা, উনার স্বামী প্রমুখ - গালিটা খেল শাহরুখ, কারন ধর্মের কারনে ওকে "পাকিস্তানের দালাল" ঘোষণা করা সহজ। জুহিকেতো বলতে পারবেন না পাকিস্তান/বাংলাদেশের দালাল!
বিজেপির অবৈধ সন্তানেরাও অনেক নাচানাচি করলো। ক্রিকেট বোর্ডের উপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এলো। নির্দেশনা এলো মুস্তাফিজকে বাদ দিতে হবে। ওরা নাকি নিরাপত্তা দিতে অক্ষম।
বাদ দেয়াও হলো। অন্যায় হয়েছে? অবশ্যই! কিন্তু আইসিসি চুপ! কারন ইন্ডিয়া থেকেই ওদের সবচেয়ে বেশি রেভেনিউ আসে। আইসিসিকে চালায়ও ইন্ডিয়া। কাজেই কিছু বলার নেই।
আওয়ামীলীগ সাপোর্টাররা বিজেপির অন্যায়কে সাপোর্ট করলেও বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড ঠিকই প্রতিবাদ করলো। যুক্তি একটাই, তোমরা আমাদের একটা প্লেয়ারকে নিরাপত্তা দিতে অক্ষম, তাহলে আস্ত দলের নিরাপত্তা দিবে কিভাবে?
কতটা মুস্তাফিজ তথা ক্রিকেটারদের কারনে আর কতটা সরকারি পর্যায়ে ভারতবিদ্বেষ জড়িত, সেটা ভিন্ন বিষয়।
এখানে কিছু পয়েন্ট আলোচনায় আনা যাক।
১. সবার আগে, যারা বলছেন no matter what, বাংলাদেশের বিশ্বকাপে যাওয়া উচিত ছিল, উনাদের কাছে শুনতে চাই উনাদের মতে আমাদের কি করা উচিত ছিল? সেই ১৯৭১ সালে আমেরিকার বদমায়েশির কারনে আওয়ামীলীগ সরকার মার্কিন সরকারের সাহায্য প্রত্যাখ্যান করেছিল, যার ফলশ্রুতিতে দেশে দুর্ভিক্ষ হয়েছিল, এবং কয়েক লক্ষ মানুষ মারা গিয়েছিল, তখন যদি বলেন "আমরা মরতে রাজি, তবু মাথা নোয়াতে রাজি নই একটি জাতি" "আমাদের নেতা সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন - সবার আগে দেশ!" - তাহলে সামান্য ক্রিকেট খেলার সময়ে সেই পার্সোনালিটি, ডিগনিটি কোথায় গেল? সেখানে মানুষের জন্মমৃত্যু নির্ভরশীল ছিল, এখানে বাংলাদেশ খেললে না খেললে nobody cares. তারচেয়ে বড় কথা, যদি আওয়ামীলীগ সরকার এই পদক্ষেপ নিত, তখন কয়জন একই সুরে কথা বলতেন?
২. যারা দেশের ক্রিকেটের দোহাই দিয়ে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট বোর্ডের অন্যায়কে মেনে নিতে বলছেন, উনাদের যুক্তি মাথায় ঢুকছে না। ক্রিকেটতো এমন কিছু না যে এর উপর আমাদের জাতির জিডিপির উঠানামা নির্ভরশীল। আমেরিকা ক্রিকেটে ঘোড়ার ডিমও না, ওদের জিডিপি তলানিতে চলে যায় নাই। আফগানিস্তান আমাদের চেয়ে ভাল খেলেও ওদের অর্থনীতি বা সার্বিক পরিস্থিতি আমাদের চেয়ে উন্নত না। এখানেও কতটা ক্রিকেটের দোহাই আর কতটা ভারতপ্রেম - সেটা আলোচনায় আনছি না।
৩. যারা দাবি করছেন "ইন্ডিয়া থেকে চাল/পেঁয়াজ ইত্যাদি আনতে সমস্যা নাই - খেলতে গেলেই দোষ!"
উনাদের জ্ঞাতার্থে, ইন্ডিয়া থেকে চাল/পেঁয়াজ ইত্যাদি খয়রাতি আনা হচ্ছে না। নগদ টাকা দিয়ে কিনে আনা হচ্ছে। আমরা কাস্টমার, ওরা বিক্রেতা। চিকিৎসার ক্ষেত্রেও তাই। সবকিছুর বেলাতেও তাই। কাস্টমার মানে Upper hand, এক নাম্বার boss, তারপরেও এদের আচরণ এমন যেন আমাদের দয়া দেখানো হচ্ছে! উল্টো আমরা এই দোকান থেকে পণ্য না কিনলে পেঁয়াজ/চাল ইত্যাদি বিক্রি না করতে পেরে পঁচবে। চ্যালা চামচামি করো, আলাদা কথা - কিন্তু বেহুদা লজিক দিলে মেজাজ খারাপ হয়, তারপরে তোমরা বলো আমি খ্রাপ আচরণ করি।
৪. বাংলাদেশ ছোট দেশ, ক্রিকেট দল হিসেবেও আহামরি কিছু না। কাজেই আমাদের উপস্থিতি অনুপস্থিতিতে কারোরই কিছু যায় আসে না। কেউই আমাদের পাশে দাঁড়ালো না। পাকিস্তান ছিল, কিন্তু পাকিস্তান কতটা বাংলাদেশকে ভালবেসে আর কতটা ইন্ডিয়ার বিরোধিতা করতে দাঁড়িয়েছে, সেটা একটা বিরাট প্রশ্ন। আর একটা দেশও বাংলাদেশের পক্ষে ছিল না। ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে কে যাবে? বাংলাদেশের ক্রিকেট কূটনীতি ব্যর্থ? হতে পারে। কিন্তু তারচেয়ে বড় সমস্যা আইসিসির নিয়ন্ত্রক এখানে ইন্ডিয়া। পাড়ার শক্তিশালী গুন্ডার বিরুদ্ধে যখন প্রতিবাদের সময় আসে, তখন অনেক আপন বন্ধুও পিঠ দেখিয়ে পালায়। আমাদের দেশের কূটনীতি যতই শক্তিশালী হোক না কেন, বড় কোন দল, যেমন ইংল্যান্ড বা অস্ট্রেলিয়া পাশে না দাঁড়ালে ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে কেউই কথা বলবে না।
৫. এখন অনেকেই হাহাকার করছে বাংলাদেশ ক্রিকেট ধ্বংস হয়ে গেল! ইন্ডিয়া/আইসিসির বিরুদ্ধে গিয়ে মোটামুটি চুনোপুটি একটা দল বাংলাদেশ কতদিন টিকতে পারবে?
কথা ঠিক। হয়তো আসলেই আমাদের ক্রিকেট শেষ হয়ে গেল। আমাদের ডমেস্টিক ক্রিকেটের বেহাল অবস্থা, জাতীয় পর্যায়ের ক্রিকেটারদের টেকনিকে সমস্যা, আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আমাদের রেজাল্টও অশ্বডিম্ব, আমাদের ভবিষ্যৎ আসলেই অন্ধকার। সাউথ আফ্রিকা দীর্ঘ ২২ বছর নিষিদ্ধ ছিল, কিন্তু ওদের ভিতরের কাঠামো শক্তিশালী ছিল বলেই ওরা ধ্বংস হয়ে যায়নি। আমরা ছাব্বিশ বছর ধরে টেস্ট খেলেও কোন হাতিঘোড়া মারতে পারিনাই, আগামী পঞ্চাশ বছরেও কিছু করতে পারবো না নিশ্চিত। আমাদের সমস্যা অন্য জায়গায়। সেটাকে টার্গেট করেন। আইসিসি গুলায় খাওয়ালেও আমাদের উন্নতি হবেনা।
এখানে প্রশ্নটা ছিল আত্মসম্মানের।
আমাদের মুস্তাফিজকে অপমান করেই বের করে দেয়া হয়েছে। এইটা কেউ স্বীকার করুক, বা না করুক, এইটা ঘটেছে।
আমরা প্রতিবাদ করলাম, এবং তারপরে মিনমিন করে খেলতে গেলাম। আপনাদের কি ধারণা, ওদের দর্শকরা আমাদের কথা শোনাবে না? সোশ্যাল মিডিয়াতেই কটাক্ষ করতো "খুউবতো বলেছিলে যাবে না, কই শেষ পর্যন্ততো এলে! হু! কোথায় গেল তোমাদের এত বাহাদুরি!"
ওরা ওপেনলি আমাদের "কাংলাদেশ" বলে, শুধু অশিক্ষিত দর্শক না, সিদ্ধু, সেহওয়াগের মতন সাবেক ক্রিকেটাররাও অসম্মান করে কথা বলে, আমাদেরতো খানিকটা ডিগনিটি দেখানো উচিত, নাকি?
মনে আছে বেশ কয়েক বছর আগে এমনই এক পরিস্থিতি হয়েছিল পাকিস্তানের ক্ষেত্রেও। ইন্ডিয়া বলেছিল ওরা পাকিস্তানে খেলতে যাবেনা (খুব সম্ভব এশিয়া কাপ), পাকিস্তানও তখন পাল্টা বলেছিল "আমরাও বিশ্বকাপে যাব না!"
আকাশ চোপড়া তখন বলেছিল "আমি লিখে দিতে পারি, আমরা পাকিস্তান যাবো না, এবং পাকিস্তান আসবে আমাদের এখানে খেলতে।"
হয়েও ছিল তাই। পাকিস্তান নিজের আত্মসম্মান, মান মর্যাদা, মেরুদন্ড সব বিসর্জন দিয়ে ইন্ডিয়ায় খেলতে গিয়েছিল। সেখানে এক হায়দ্রাবাদ ছাড়া অন্যান্য ভেন্যুগুলোতে ওদের খেলোয়াড়দের কি পরিমান অপমান করেছে দর্শকরা সেটাতো সবাই টিভিতেই দেখেছে।
এই যে কিছুদিন আগে ক্রিসমাসে গোটা ইন্ডিয়া জুড়ে নিজের দেশেরই খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের উপর চাড্ডিরা তান্ডব চালালো, বাংলাদেশকে নিয়ে উল্টাপাল্টা অনেক হুমকি ধামকি দিল, এমনই কোন ঘটনা বাংলাদেশের ক্রিকেটার বা দর্শক সমর্থকদের বিরুদ্ধে হবেনা, এর গ্যারান্টি কে দিবে?
সত্যি বলতে আমি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের ভক্ত না। শুধু নিজের দেশ বলেই সাপোর্ট করি। ঘোড়ার ডিমের খেলা খেলে বলে মেজাজও খারাপ করি। কিন্তু ওরা আমার দেশের ছেলে। ওরা আমার ভাই। গালাগালি করি, কিন্তু দিন শেষে ওদের সাফল্যেই খুশি হই। ওদের নিরাপত্তা, ওদের সম্মান আমার কাছে সবার উপরে। ক্রিকেট যদি খেলতে না হয়, ঘোড়ার ডিমের খেলার প্রয়োজন নাই। কিন্তু নিজের সম্মান সবার আগে। প্রয়োজনে দুইবেলা পান্তাভাত খাব, টিনের চালায় থাকবো, তবু কোন গুন্ডা আমাদের কথা শুনিয়ে যাবে, বুলি করে যাবে আর আমি জিহ্বা ঝুলিয়ে লেজ নাড়তে নাড়তে ওর সামনে মাথা নত করবো - এমন জাতিতে আমার জন্ম হয় নাই। এই শিক্ষা নিয়েইতো আমরা বড় হয়েছি, আপনারা হন নাই?
ঐ যে প্রবাসী ভদ্রলোকের ঘটনাটা দিয়ে শুরু করেছিলাম, সেই ঘটনাতেই ফেরত যাই। আত্মসম্মানের চেয়ে বড় পৃথিবীতে আর কিছুই নেই। এর জন্য পরিবারের চেয়েও আপন বন্ধুদের ত্যাগ করা যায়।
©somewhere in net ltd.