নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মারূফ আহমেদ পারভেজ

মারূফ আহমেদ পারভেজ › বিস্তারিত পোস্টঃ

আমার কল্পনা, বাস্তবে এমন যেন কখনো না হয়

২২ শে আগস্ট, ২০১৩ সন্ধ্যা ৬:৫৪

আকাশটা আজ বেশ মেঘলা ।

নিজের প্রিয় আরামকেদারায় বসে আছেন খোরশেদ সাহেব । পরনে সাদা পান্জাবি আর পায়জামা ।



চোখের ভারি চশমাটা বাম হাতে ধরে আছেন। ডান হাতের তর্জনী নিয়ে ঠোট স্পর্শ করে আছেন তিনি।



আজকে চারিদিকে কেমন যেনো একটা গুমোট ভাব । আকাশের আজকে মনে হয় ভিষন মন খারাপ ! যে কোন সময় কেঁদে দেওয়ার কুবুদ্ধি করছে ।



খোরশেদ সাহেব এলাকায় সুপরিচিত । পাচঁ ওয়াক্ত নামাজ তিনি জামাতের সহিত মসজিদে গিয়ে আদায় করেন ।



জীবন যুদ্ধে অসম্ভব সফল একজন ব্যাক্তি । বাবা মারা যাওয়ার পর ৮ ভাইবোনের দায়ভার অনেক কষ্টে বহন করেছেন ।



অত্যন্ত কঠিন মানসিকতার মানুষ খোরশেদ সাহেব । তারচোখ দিয়ে কখনো পানি পরেছেকিনা সন্দেহ আছে ।



তার বাসায় তেমন কেউ আসে না । আগের মতো আর জমজমাট নেই । মেয়ে দুটোকে উপযুক্ত বিয়ে দিয়েছেন । একমাত্র ছেলেটা আর্মি অফিসার ।



মেয়ে দুটো মাঝে মাঝে আসে তাকে দেখতে । ভালই লাগে তখন । ছেলেটা ২ বছর ধরে মিশনে ।

খোকাকে আজকে অনেক মনে পরছে তার ।



নিজের কাছেও কারনটা পরিষ্কার নয় । অতীত নিয়ে ঘাটাঘাটি করাটাপছন্দ করেন না তিনি ।

কিন্তু আজ কেনো জানি অতীতের কিছু স্মৃতি বারবার মনে পরে যাচ্ছে তার ।



মনে পরে যাচ্ছে রাশিদা বেগমকে বউ করে ঘরে আনার স্মৃতি । ছেলেমেয়েগুলোর জন্ম , তাদের মিষ্টি দুষ্টমিগুলোর কথা ।



ভাবতে ভালই লাগছে খোরশেদ সাহেবের । নিজের অজান্তেইঠোটে একটু হাসি খেলা করে গেলো তার ।



ছেলেটার কথাই বেশি মনে পরছে তার । খোকাটা চরম দুষ্টু ছিলো । সারাক্ষন দৌড়াদৌড়ি করতো ।



"বাবা , বাবা" চিত্‍কার করে ছুটে আসতো খোরশেদ সাহেবের কাছে । বড় হওয়ার সাথে সাথে ছেলেটা আস্তে আস্তে লাজুক হয়ে গেলো । ছেলেকে কড়া শাষনে রাখতেন খোরশেদ সাহেব ।



খোকাকে প্রচুর আদর করেন তিনি । তার জন্য বুকে ভালবাসার সাগর তার । কিন্তু কখনো প্রত্যাক্ষভাবে খোকাকে তার আদরটুকু দেখাননি তিনি।

স্মৃতিগুলো এখনো নতুন লাগছে তার কাছে ।



হটাত্‍ "বাবা" ডাক শুনে যেনো বাস্তবে ফিরে এলেন খোরশেদ সাহেব । পাশে ফিরেদেখলেন বড় মেয়ে দাড়িয়ে আছে । মেয়েটাকে দেখে অবাক হলেন তিনি ।



মেয়েটার চোখ লাল আর ভিশন ফোঁলা । অনেক্ষন কেঁদেছে বোঝা যায়।



কান্নার কারনটা জিজ্ঞেস করতে চাইলেন তিনি ।



কিন্তু তার আগেই মেয়ে বলে উঠলো "বাবা , যোহরের নামাজের সময় হয়ে গেছে ।"



বলেই দৌড়ে চলে গেলো সে ।

মাথার সফেদ সাদা চুলগুলোতে হাত বুলালেন খোরশেদ সাহেব । ইদানিং সবকিছুই ভুলে যাচ্ছেন তিনি ।



চশমাটা চোখে লাগিয়ে , পান্জাবির পকেট থেকে টুপিটা বের করে এনে মাথায় চাপালেন । তারপর স্তিমিত পায়ে এগিয়ে চললেনমসজিদের দিকে ।



মসজিদে ঢুকে অবাক হলেন তিনি । অনেক মানুষ । সাধারত যোহরের নামাযে এতো মানুষ থাকে না । জামাআত শুরু হয়ে গেছে ।

নিয়ত করে দাড়িয়ে গেলেন তিনি ।



নামায শেষ হলো । ইমাম সাহেব এগিয়ে এলেন খোরশেদ সাহেবের দিকে । আস্তে আস্তে খোরশেদ সাহেবের কানে বললেন "চাচা । জানাজা শুরু করবো ? লাস তো এসে গেছে ।"



খোরশেদ সাহেব আবারও অবাক হলেন । ঘাড় কাত করে সায় দিলেন ।



ইমাম সাহেব তাকে ধরে মসজিদের পাশে নিয়ে গেলেন । খোরশেদ সাহেব দেখলেন , সেখানে অনেক মানুষ ।



মাঠের মাঝখানে একটা আর্মি ট্রাক । কয়েকজন আর্মি একটা কি যেনো ঘিড়ে আছে ।



কাছাকাছি এগিয়ে গেলেন খোরশেদ সাহেব । দেখতে পেলেন জাতীয় পতাকা মোড়া একটা কফিন ।



ইমাম সাহেব কফিনটার সামনে দাড়ালেন । তারপর সবাইকে কাতার করতে বললেন । খোরশেদ সাহেব কিছুই বুঝতে পারছেন না । কিছুই তার মাথায় ঢুকছে না ।



একটা ঘোরের মধ্যে আছেন যেনো তিনি ।

চুপচাপ জানাজা পড়া শেষ করলেন । তারপর দেখতে পেলেন আর্মিরা আবার কফিনটার সামনে দাড়িয়ে আছে। সামরিক কায়দায় সম্মান প্রদর্শন করলো ।



একজন আর্মি এগিয়ে গিয়ে কফিনের ডালাটা সরিয়ে দিলো। ডুকরে কেদেঁ উঠলো কয়েকজন ।



খোরশেদ সাহেব লাসের মুখ দেখতে পারছেন না মানুষের জন্য ।

বৃষ্টি পরা শুরু করেছে তখন । টিপ টিপ করে পরেই যাচ্ছে । খোরশেদ সাহেবকে কফিনের কাছে নিয়ে গেলো তার ছোট ভাই ।



কফিনে সাদা চাদরে ঢাকা খোরশেদ সাহেবের খোকার দেহ। খোরশেদ সাহেব নিষ্পলক চোখে চেয়ে আছেন খোকার মুখটার দিকে ।



তার মনে হচ্ছে খোকা ঘুমিয়ে আছে । ধাক্কা দিলেই ছোটবেলার মতো একটু নাড়াচাড়া দিয়ে বিরক্ত গলায় বলবে "উফ্ বাবা ! একটু ঘুমাতে দাওনা !"



খোকার মুখে বৃষ্টির পানি পরছে ।কাছে গিয়ে রুমাল দিয়ে মুছে দিলেন তিনি ।



লোকজন কফিনটাকে ঘাড়ে তুলেনিলো । খোরশেদ সাহেবের ছোটভাই তাকে ডাক দিয়ে কফিনের একটা কোনা ধরার জন্য বলল ।



এগিয়ে গিয়ে কফিনটা কাঠে নিলেন খোরশেদ সাহেব । কফিনের ওজনটা অনেক বেশি লাগছে তার কাছে । অনেক বেশি । কাধে রাখতে কষ্ট হচ্ছে তার ।



সূরা পড়তে পড়তে কবরস্থানের দিকে এগিয়ে যেতে থাকলো সবাই ।



সদ্য খোঁড়া একটা কবরের কাছে এসে সবাই থামলো । কফিন থেকে লাসটাকে সাড়ে তিন হাত মাটির গর্ভে সঁপে দিলো সবাই । একমুঠ একমুঠ করে মাটি দিয়ে ঢেকে দিতে লাগলো কবরটা ।



কবর দেয়া হয়ে গেলো । সবাই তাড়াতাড়ি দৌড়ে সেখান থেকে চলে যেতে লাগলো । বৃষ্টির বেগ বেড়ে গেছে ।



খোরশেদ সাহেব চুপচাপ কবরের মাথার দিকে পরম মমতায় হাত বুলাচ্ছেন ।



বৃষ্টি মুষুলধারে পরতে আরম্ভ করলো । সদ্য দেয়া কবরের মাটি কাদাঁ কাদাঁ হয়ে গেলো ।



কবরের মাথার কাছে উপুর হয়ে আছেন খোরশেদ সাহেব । পুরোনো স্মৃতির কথা মনে পরে গেলো তার ।



খোকাকে স্কুল থেকে আনার সময় যখন এরকম বৃষ্টি হতো ,তখন তিনি একটা ছোট্ট ছাতাধরে রাখতেন খোকার মাথার উপরে । দুজন জায়গা হতো না ছাতার নিচে । তাই নিজে ভিজতেন ।



হাতড়ে হাতড়ে ছাতাটা খুঁজলেন তিনি কবরের কাছাকাছি । খুঁজে পেলেন না ।



তার চোখ দিয়ে অঝোরে পানি পরছে । তার খোকা বৃষ্টিতেভিজে যাচ্ছে । তিনি এটা সহ্য করতে পারছেন না ।

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.