নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

সোজা কথা , সহজ করে বলি, সোজা পথে চলি

আবু মান্নাফ খান

সরল, সহজ, চিন্তার মানুষ

আবু মান্নাফ খান › বিস্তারিত পোস্টঃ

স্মৃতির পাতা থেকে ( পর্ব-১)

২৮ শে ডিসেম্বর, ২০১২ রাত ৩:১৯

আমি দাঁড়িয়ে আছি দাদি বাড়ির কল পারে। একটু আগে যোহর এর নামাজ এর আজান দিয়েছে। আমি উদম গায়ে দাঁড়িয়ে একটু ফোপাচ্ছি। একে আসলে কান্না বলে না। আমার এই উদম গায়ে দাঁড়িয়ে থাকার কারন, একটু পর আমাকে ছেলা হবে। আমড়াওয়ালা যেমন আমড়া বিক্রির সময় বলে “ছিল্লা কাইটা লবন লাগায়ে দিমু” ব্যাপার টা ঠিক সেই রকমই।

কল পারটতে একটি টিউবয়েল আর তার নিচে চারকোনা যায়গা ইট দিয়ে বাধান। সিমেন্ট এর ব্যাবহার হয়নি সেখানে। তারই এক পাশ দিয়ে পানি চলে যাওয়ার ড্রেন আমরা যাকে নালা বলি। ইট গুলোর খাজ গুলো ভরে আছে সবুজ শেওলায়। উপরটা একটু ক্ষয়ে যাওয়া। এ কলপারটি খোলা। বাড়ির মেয়েরা সাধারনত বাড়ির ভিতরের টি ব্যাবহার করে।

যা হোক আমি ফোপাচ্ছি আর অ্যাঁ অ্যাঁ করে একটু পর পর শব্দ করছি। আর ফুপু আম্মা আমাকে ছেলার যাবতীয় সরঞ্জামাদির ব্যাবস্থা করছেন। ইনি আমার সেজ ফুপু। আমার পাঁচ ফুপুর মাঝে ৩য়। অন্যান্য ফুপুদের শুধু ফুপু ডাকলেও এনাকে তার সাথে যোগ করে আম্মা ডাকি কারন তিনি একই সাথে আমার ফুপু আবার মায়ের মত। মা চাকরি করেন তাই ত্যানা বেলা থেকেই আমাকে এই ফুপুর কাছে বড় হইতে হইছে। ফুপু আম্মা বেশ হাসি হাসি মুখ করে ছেলার যাবতীয় বস্তু কল পারে আনতে আনতে বলছেন,

“ সারা গায়ে মোষের মত ময়লা আর সে গোসল করবি না, আজ ছিলে সাদা বানায়ে দিব। আহ্লাদ হয়ে গেছে”

তার হাসি মুখের কপট রাগে অ্যাঁ অ্যাঁ শব্দ টা আরও বেরে যায়। তার হাসি মুখের কারন আমাকে এখানে ধরে আনার আগে তাকে আমার সাথে যুদ্ধ করতে হয়েছে। যখনি বলেছে সে আজ গোসল করে দেবে অমনি দে ছুট। আর সেও তক্কে তক্কে ছিল। পুকুর পারের রাস্তা পার হয়ার আগেই আমাকে ধরে ফেলেছে। আমিত চিৎকার চেচামেচি করে ছুটে যেতে চাই আর তিনি আমাকে ধরে রাখেন। শেষ মেস না পেরে আমার কান ধরেছেন, সাথে সাথে আমার লাফালাফি বন্ধ। কান ধরে কল পারে এনে প্যান্ট খুলে শুধু একটা ছেড়া গামছা জরিয়ে দিয়ে গেছেন, যাতে আমি না পালাই। ছেড়া গামছা কতটুকু ছেড়া তা বর্ননা আমি দিতে পারবনা। ( ছোট বেলার কথা লিখছি তাই বলে শরম লজ্জা ত আছে) যুদ্ধ জয়ের হাসি লেগে আছে তার মুখে।

হাতে তার কসকো সাবান, গা ঘসার জন্য খসখসি। ঝিঙ্গে বুড়ো হয়ে গেলে উপরটা শুকিয়ে ভেতরের জালের মত যে বস্তুটি থাকে সেট দিয়ে গা ঘসা হত। এখনকার মত নরম মোলায়েম গা ঘসার জিনিস তখন দেখিনি। উনি কল পারে সেগুলো রেখে আমাকে একটু ধমক দিলেন,

“ ফোপানির কি আছে? আহ্লাদ না... চুপ......”

আমি ভয়ে ভয়ে ফোপানি বন্ধ করি কিন্তু নাক টানতে থাকি। উনি আবার বাড়ির ভিতর চলে গেলেন ফিরলেন গরম পানির পাতিল নিয়ে। সেটা দেখে আমার নাক টানা আরো বেড়ে গেল। পানি বাল্টিতে ঢেলে তাতে কল চেপে ঠান্ডা পানি দিলেন। এরপর গায়ে পানি ঢেলে দিতে দিতে বলেন,

“ তুমি আমার বাবা হও না, কান্দ ক্যান? দেখ শরীরে কত ময়লা, এ ময়লা থাকলে ত কনিকা তোমাকে বিয়ে করবে না”

কনিকা হল আমার পাশের বাসার আপু। তার কাজ ছিল সারাদিন আমাকে কোলে করে নিয়ে থাকা। আর আমি বলতাম আমি তাকে বিয়ে করব। তার কোলে ঘুমাব।

আমি একটু প্রশ্রয় পেয়ে বলি,

“তাহলে আসতে আসতে ঘষে দিতে হবে”

উনি বলেন,

“আস্তে আস্তেই ত দিব”।

আমি অভিযোগ করি, “ সেবার ত অনেক জোরে দিছলেন”

উনি বলেন, “ঠিক আছে এবার ওরকম করে দিব না”।

আমি বলি,

“তাহলে দুপুর এ আমাকে ঘি এর কেকরি দিয়ে ভাত দিতে হবে সাথে ডিম বড় করে ভাজা”।

ফুপু জানালেন “রাজ হাঁস ডিম পেড়েছে সেটা আজ ভেজে দেব”।

মনে মনে একটু খুশি হই। ফুপু এর মাঝে খসখসিতে সাবান ডলে নিয়ে আমার গায়ে লাগাতে শুরু করলেন। একটু লাগিয়ে মাথায় সাবান ঘষে, হাত পা পিঠ সবখানে খসখসই দিয়ে ডলতে শুরু করলেন। আমি চিৎকার দিয়ে উঠি

“লাগছে ত”।

উনি বলেন, “ময়লা গুলো চামরার সাথে লেগে আছে সেগুলো তুলতেত একটু লাগবেই”।

আমি চোখ চেপে ধরে পানি পানি বলে চিৎকার করি সাবান ঢুকেছে চোখে, ওহ সেকি জলুনি।

উনি চোখে পানি ঢেলে দিয়ে ঘাড় ঘসতে শুরু করেন, আর বলেন,

“ গলায় ত ময়লার গোডাউন হয়ে আছে, কাল শিরকা পরে গেছে, এভাবে থাকলে কনিকা তোমাক বিয়াই করবি না”।

আমি আবার নাক টানতে শুরু করি।

শরীরে ময়লা হওয়ার যথেষ্ট কারন ছিল সেসময়। এখনকার বাচ্চা দের মত আমাদের বাসায় বসে খেলার সরঞ্জাম কম ছিল। আর বিকাল মানেই আশপাশের সবাই মিলে মাঠে খেলা। দারিয়াবান্ধা, বৌ-ছি বা কখন ফুটবল, বম্ব বাস্টিং, সাত চাকা আরো কত কি। তবে সব খেলা যেমনি হোক মাটিতে গড়াগড়ি দেয়া লুটোপুটি খাওয়া টা ছিল কমন। কখন সাতার শিখতে গিয়ে কাদার মাঝে মাছ ধরা আর কাদা মেখে জীবন্ত মুর্তি হয়ে পানিতে লাফালাফি করা ত খুবই মজার খেলা। কেউ বাড়ি করার জন্য বালি কিনে উঁচু করে রেখেছে ত আমাদের আর পায় কে। সেই বালির ঊপর উঠে নিচে লাফ দেয়া, বালিতে পা ঢুকিয়ে মুরগীর ঘর বানানো সব কিছুতেই যেন আলাদা মজা। আর সব খেলাই ধুলোবালি মাখা।

এভাবে চিৎকার চেচামেচি করে গোসল শেষ হয়। ফুপু খুব যত্ন করে ডিম ভাজি আর ঘি এর কেকরি দিয়ে আমাকে আর ফুপুর মেয়ে সোনালী আপু যে কি না আমার আপন জনের থেকেও বেশি কিছু তার সাথে খেতে দেন। দুজনের বেশ নকশা করা স্টিলের থালা। ফুপু তরকারি মেখে দুজনের থালায় ভাত ভাগ করে দেন। বলে দেন এই ভাগ বাবা র, এই ভাগ চাচা র, কারোটা যদি না খাই সে কষ্ট পাবে। এভাবে খাওয়া হয়।

খাওয়ার আগে গায়ে সরিষার তেল মাথায় নারকেল তেল দিয়ে মাথা আঁচড়িয়ে ফিট বাবু করে দেন। ততক্ষনে আমার ঘাড় লাল হয়ে গেছে। একটু একটু জলছেও। আমার এ দুরবস্থা দেখে সোনালী আপু মিটি মিটি হাসে। ওর হাসি দেখে রাগ হয়, “ বলি তোমাকে যেদিন নেরা করে দিবি সেদিন কি করবা”?

ও মুখ ভেল্টায়, বলে, “ আমি নেড়া করব না”।

আমি রাগ করে ফুপুর কাছে নালিশ করি,

“ফুপু আম্মা আপু আমার দিকে দেখে হাসতিছে”।

ফুপু আম্মা একটু কপট রাগ করে বলেন।

“এই হাসিস না, আমার বাবা টার দিকে দেখে”

খাওয়া দাওয়া শেষ করেই ফুপুআম্মার কড়া হুকুম,

“ঘুমুতে যাও”।

আমি আর আপু দুজনে ঘুমুতে যাই, তবে ঘুমানোর আগে অদ্ভুত সব গল্প করি। এক সময় ঘুমিয়ে যাই অজানতেই।

মাটির গন্ধ মাখা হাসি কান্নার শৈশব হঠাৎ করে কখন হারিয়ে গেল বুঝিনি। আগে ফুপু আম্মা রাজ্যের গল্প বলে খাওয়াতেন। আর এখন তার রান্না খাওয়ার জন্য চাতক পাখির মত চেয়ে থাকি। বাড়িতে থাকলে কখন বা চুলার পাশে তার পাশে গিয়ে বসে আবদার করি ভাত মেখে দেন। আহামরি কোন মেনুর দরকার হয়না আলু ভর্তা হলেও সেটা আমার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ খাবার। দেখতে দেখতে মনে হয় অনেকটাই বড় হয়ে গেছি, মাঝে মাঝে ফুপু আম্মা ঘাড় দেখে বলেন “ঘারে ত ময়লার গোডাউন”। আমি তাকে বলি হবেইত আপনি ত আমাকে আর ছিলে গোসল করিয়ে দেন না”। ফুপু আম্মা হাসে। কনিকা আপুর বিয়ে হয়ে এখন প্রায় সে দু সন্তানের জননি। সে এখনও আমাকে দেখে বলে “কি বিয়ে করবে না আমাকে”? লজ্জা পাই তার কথায়।

সময় গুলো যেন কেড়েনিয়েছে অনেক কিছু। মাটির গন্ধ মাখা দিন গুলো হারিয়ে গেছে। সেখানে দেয়া নেয়ার আশ্চর্য এক সময় শুরু হয়েছে। এখানে কেউ আদর করে পরম মমতায় ডাকে না বাবা বলে। না খেলে কেউ ভাত মেখে খেতে ডাকে না। কেউ গা ছিলে গোসল করিয়ে দেয় না। কথা গুলো ভাবতে গেলে ভালোলাগা আর হারানোর দুঃখ এ দুই রকম অনুভূতিতে চোখ ছল ছল করে।

অনেক কথাই বলতে চাই আমার ফুপু আম্মা কে, কিন্তু কি এক লজ্জা আর অসীম শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে যায় তার কাছে গেলে। কখন বলা হয় না ফুপু আম্মা আপনাকে আমি কতটা ভালোবাসি। সত্যিকারের ভালোবাসা গুলো আসলে কখন মুখ ফুটে বলা হয় না বা বলতে হয় না।

মন্তব্য ৪ টি রেটিং +৫/-০

মন্তব্য (৪) মন্তব্য লিখুন

১| ২৮ শে ডিসেম্বর, ২০১২ দুপুর ২:৪৩

টুকরো কাগজ বলেছেন: ভালো লাগা রইল।

২৮ শে ডিসেম্বর, ২০১২ রাত ৮:৫২

আবু মান্নাফ খান বলেছেন: ধন্যবাদ

২| ২৯ শে ডিসেম্বর, ২০১২ সকাল ৯:৫৭

অপূর্ণ রায়হান বলেছেন: ++++++++++++++++++ একই কাহিনী আমারও আছে ভাই :)


ভালো থাকবেন সবসময় :)

৩০ শে ডিসেম্বর, ২০১২ রাত ৩:৩২

আবু মান্নাফ খান বলেছেন: আপনার কাহিনী শোনার অপেক্ষায় থাকলাম।
ধন্যবাদ ভাই।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.