| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
লায়ন মীর আব্দুল আলীম
লেখা লেখি করি। জাতীয় দৈনিক ও আন্তর্জাতীক পত্রপত্রিকায় আমার লেখা কলাম নিয়মিত ছাপা হচ্ছে। পেয়েছি জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক পাদকও। তবুও সাংবাদিকতা আর লেখালেখি কোনটাই আমার পেশা নয়। আমি একজন ব্যাবসায়ী। বাড়ি নারায়নগঞ্জের রূপগঞ্জে। রাজধানী ঢাকায় বসবাস করি। আমার পরিবোরে মা-বাবা, স্ত্রী আর দু’ সন্তান রয়েছে । সময় সুযোগ পেলে ছবি আঁকি, পাহাড়ে ছুটে যায়। সমুদ্রও টানে মাঝে মাঝে।
মীর আবদুল আলীম :
পরিবেশবাদী আইনজীবী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানকে এ রাষ্ট্র সুসংবাদ দিতে পেরেছে। তার স্বামীকে তার কাছে ফিরিয়ে দিয়েছে। নানা গুম-অপহরণের মাঝে একজনকে তো এ রাষ্ট্র তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে পেরেছে, এজন্য এ দেশের ১৬ কোটি মানুষের পক্ষ থেকে সরকার ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য। প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দৃষ্টি, তদারকি, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের আপ্রাণ চেষ্টায়ই মুক্তি মিলেছে এবি সিদ্দিকের। সেজন্য প্রধানমন্ত্রী কৃতজ্ঞতা পেতে পারেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীও আম জনতার বাহবা পেতে পারেন। কিন্তু বিস্মিত হতে হয় যে, দেশে চৌকস আইনশৃঙ্খলা বাহিনী থাকতেও একটি অপহরণ ঘটনার উদ্ধার অভিযান তদারক করতে হয় খোদ প্রধানমন্ত্রীকে। দেশে অহরহই অপহরণের ঘটনা ঘটছে। রাজনীতিক, ছোট-বড় ব্যবসায়ী, চাকরিজীবী, ছাত্র, নানা পেশার, নানা বয়সের মানুষ অপহৃত হচ্ছে। কারও বেলায় মুক্তিপণ চাওয়া হচ্ছে, কেউবা হয়ে যাচ্ছেন একেবারেই নিখোঁজ অথবা পাওয়া যাচ্ছে লাশ। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্যানুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মার্চ পর্যন্ত ২৬৮ জন অপহৃত হয়েছেন। এর মধ্যে ৪৩ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে, ফিরে এসেছেন ২৪ জন এবং নিখোঁজের সংখ্যা ১৮৭। সেক্ষেত্রে রিজওয়ানার স্বামী এবি সিদ্দিক ভাগ্যবান ব্যক্তি নিঃসন্দেহে। তিনি জীবিত ফিরে এসেছেন। কিন্তু যারা লাশ হয়েছেন? যারা এখনও জীবিত আছেন না মারা গেছেন কোনো হদিস পাওয়া যাচ্ছে না, তাদের স্বজন-পরিজনের জন্য সান্ত্বনার ভাষাটা কী?
রিজওয়ানার স্বামী অপহরণের পর একটা বিষয় স্পষ্ট যে, সরকার, প্রশাসন এবং মিডিয়া চাইলে অনেক কিছুই করতে পারে। সম্মিলিত প্রয়াসেই এবি সিদ্দিক অক্ষত অবস্থায় তার পরিবারের কাছে ফিরে এসেছেন। কিন্তু কোথায় লুকিয়ে রাখা হয়েছে বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীকে? ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৫৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর চৌধুরী আলমই বা কোথায় আছেন? সাবেক সংসদ সদস্য এবং লাকসাম বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম ও পৌর বিএনপির সভাপতি হুমায়ুন কবির এখন কোথায়? ২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল রাজধানীর বনানী থেকে নিখোঁজ হন তৎকালীন বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালক। দুই বছরের বেশি সময় পার হলেও এখনও ইলিয়াস আলী ও তার গাড়িচালকের কোনো খবর মেলেনি। বিএনপির আন্দোলন ও সিলেটবাসীর অবরোধের পরেও ফিরে আসেনি বিএনপির এ নেতা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা গোয়েন্দা সংস্থার কেউই এ ঘটনার কোনো কিনারা করতে পারেনি। দুই বছর পার হয়ে গেলেও আজও রহস্যের আবর্তে বন্দি রয়ে গেছে সারা দেশে আলোড়ন তোলা ইলিয়াস আলীর গুমের ঘটনা। ইলিয়াস আলীর স্ত্রী ও সন্তানরা এখনও অপেক্ষায় আছে। রিজওয়ানার স্বামী সিদ্দিক ফিরে আসায় তাদের মনেও আশার সঞ্চার হয়েছে। হয়তো একদিন তিনিও (ইলিয়াস) ফিরে আসবেন। চৌধুরী আলম ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৫৬নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিলেন। বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্যও ছিলেন তিনি। ২০১০ সালের ২৫ জুন রাত সাড়ে ৮টার দিকে রাজধানীর ফার্মগেট ইন্দিরা রোডের এক আত্মীয়ের বাসা থেকে প্রাইভেটকারযোগে ধানমন্ডি যাওয়ার পথে তিনি নিখোঁজ হন। পরে পরিবারের তরফ থেকে রাজধানীর শেরেবাংলা নগর থানায় একটি অপহরণ মামলা দায়ের করা হয়। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ফার্মগেট থেকে সাদা পোশাকধারী একদল লোক নিজেদের আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়ে চৌধুরী আলমকে তুলে নিয়ে যায়। অদ্যাবধি তারও কোনো হদিস মেলেনি। তিনি জীবিত না মৃত তারও কোনো হদিস নেই। ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর কুমিল্লা থেকে ঢাকায় আসার পথে কে বা কারা তুলে নিয়ে যায় সাবেক সংসদ সদস্য ও লাকসাম বিএনপির সভাপতি সাইফুল ইসলাম এবং পৌর বিএনপির সভাপতি হুমায়ুন কবিরকে। চার মাস পেরিয়ে গেলেও তাদের খোঁজ মেলেনি। তারা কি জীবিত, না হত্যা করা হয়েছে এ খবর রাষ্ট্রের কারও কাছেই নেই। এভাবে দেশে অসংখ্য গুম ও অপহরণের ঘটনা ঘটেছে, এখনও ঘটছে। যারা গুম হচ্ছেন, অপহৃত হচ্ছেন তাদের স্বজনরা এখনও পথ চেয়ে দিন কাটাচ্ছেন। এ অপহৃতদের পরিবারও অপহৃত ব্যক্তি ফিরে আসার মতো সুসংবাদ চায়। ওদেরও সহসা সুসংবাদ দিন। ওদের স্বজনদের ওদের কাছে ফিরিয়ে দিন।
বাংলাদেশের নাগরিক জীবনে নিরাপত্তাহীনতা ও নতুন আতঙ্কের নাম অপহরণ বা গুম। এটি এখন বাংলাদেশের রাজনীতির অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। আর বছরের পর বছর গুম ব্যক্তির অপেক্ষায় থাকার পরে মেলে না কোনো সন্ধান। গুমের ঘটনার তদন্তের কোনো অগ্রগতি হয় না। বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ফাইল চাপা পড়ে যায় গুমের ঘটনা। পরে আবার যখন আলোচিত কোনো ব্যক্তি গুমের শিকার হন, তখনই উঠে আসে পুরনো নানা ঘটনার প্রসঙ্গ। এখন যখন-তখন যে কোনো স্থান থেকে যে কেউই গুম হয়ে যাচ্ছেন; অপহরণ হয়ে যাচ্ছেন। এসব ঘটনার শিকার অনেকেই আর কখনও ফিরে আসেন না। যেমনটি হয়েছে সিলেটের বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী বা রাজধানীর বিএনপি নেতা চৌধুরী আলমের ক্ষেত্রে। বিরোধী দলের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা ছাড়াও ব্যবসায়ী, ছাত্র, শিক্ষক, শ্রমিক, নারী এমনকি শিশুরাও আজ অপহরণ বা গুমের শিকার হচ্ছেন। ফলে একটা সার্বক্ষণিক আতঙ্কে দিন কাটাতে হচ্ছে সমাজের প্রায় প্রতিটি পরিবারকে। অপহরণ বা গুমের ঘটনায় সর্বশেষ শিকার হয়েছেন বিশিষ্ট পরিবেশ আইনজীবী ম্যাগসাইসাই বিজয়ী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসানের স্বামী আবু বকর সিদ্দিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও শাহবাগ গণজাগরণ মঞ্চের সক্রিয়কর্মী আজিজুল হক। এর আগের অপহরণগুলোর যদি বিচার হতো তাহলে আজ আর আবু বকর সিদ্দিককে অপহৃত হতে হতো না। আমরা আর কোনো মানুষের অপহরণ চাই না। যে রাষ্ট্রে নাগরিকদের জীবন নিরাপদ নয় সে রাষ্ট্রে বসবাস করা সব নাগরিকের জন্যই বিপজ্জনক।
আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে অপহরণ। চলতি বছরের প্রথম তিন মাসেই অপহরণ ও গুমের শিকার হয়েছেন অন্তত ৩৮ জন। এদের কয়েকজন জীবিত উদ্ধার হলেও মরদেহ পাওয়া গেছে পাঁচজনের। বাকিরা এখনও নিখোঁজ। কেন হচ্ছে অপহরণ ও গুম? কারা করছে? বিচারহীনতার সংস্কৃতিই অপহরণ ও গুমের ঘটনা বাড়ার মূল কারণ। ভাবনার বিষয় এই যে, অপহরণ ও গুমের ঘটনা বাড়লেও দু-একটি ছাড়া কমছে তদন্তের অগ্রগতি। পুলিশ সদর দফতরের ৫ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে গুম আর অপহরণের ঘটনায় ৪ হাজার ২৫০টি মামলা ও জিডি হয়েছে। এসব ঘটনায় সরকার ও দায়িত্বপ্রাপ্ত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তদন্ত কমিটি গঠন করলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। বছরের পর বছর গুম আর অপহরণের ঘটনার তদন্তের নামে কালক্ষেপণ করা হচ্ছে। এগুলোর অর্ধেকেরও তদন্ত শেষ হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর গুম ও অপহরণের মতো অপকর্ম জোরেশোরে শুরু হলেও তা পূর্ণমাত্রা পায় সরকারের গত মেয়াদের শেষ সময়ে। একের পর এক রাজনৈতিক গুম-অপহরণ রাজনৈতিক অঙ্গন ছেড়ে তা এখন সাধারণের মনেও আতঙ্কের সৃষ্টি করেছে। শুধু বিরোধী রাজনৈতিক দলেই নয়, হালে এ আতঙ্ক ছড়িয়েছে সরকারি দলের নেতাকর্মীদের মধ্যেও। মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, ২০১০ থেকে ২০১৪ সালের মার্চ পর্যন্ত সারা দেশে ২৬৮ জন অপহরণের শিকার হয়েছেন। এদের মধ্যে ৪৩ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে। অপহরণের পর ছেড়ে দেয়া হয় ২৪ জনকে। পরে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হয় ১৪ জনকে। কিন্তু ১৮৭ জনের কোনো খোঁজই নেই। তারা বেঁচে আছেন, নাকি মরে গেছেন সেটি আজও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি পরিবার ও রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে। এছাড়া বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে গিয়ে গুম করে ফেলার ঘটনা ও বিচারবহির্ভূত হত্যার ঘটনা প্রতিনিয়তই ঘটছে। অনেকেই আবার অভিযোগ করেন, নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাই কোনো কোনো গুমের সঙ্গে জড়িত। ফলে দেশের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে শান্তি ও নিরাপদে ঘরে ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে দেখা দিয়েছে অনিশ্চয়তা। আম জনতা জানে না, কোথায়, কীভাবে তাদের জন্য ওতপেতে আছে গুম ও অপহরণ চক্র। মানুষের এমন ভয়াল জীবনের দায়ভার অবশ্যই বর্তমান সরকারকেই নিতে হবে। কেননা রাষ্ট্রজনদের সার্বিক নিরাপত্তা দেয়া রাষ্ট্রের একান্ত দায়িত্ব।
নিখোঁজ, অপহরণ ও গুমের ঘটনা নতুন নয়। অতীতের সরকারগুলোর ধারাবাহিকতার বহির্প্রকাশ ঘটার উদাহরণ। কখনও হার্টঅ্যাটাক, ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার, বন্দুকযুদ্ধ ইত্যাদি কথিত সাজানো গল্পের অবসানেরই আরেক রূপ নিয়েছে নিখোঁজ, অপহরণ ও গুম ঘটনার ভয়ঙ্কর বীভৎসতার গল্প। গণতান্ত্রিক সরকারের কাছে আইনের শাসনের প্রত্যাশী প্রতিটি নাগরিক ও প্রতিষ্ঠান এ গল্প থেকে মুক্তির আকুতি জানাচ্ছে। রাজনৈতিক দলগুলো, মানবাধিকার সংগঠন, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, সুশীল সমাজ, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবীসহ সর্বস্তরের মানুষ ও ভুক্তভোগীদের পরিবারের পক্ষ থেকে জানানো এ আকুতি-মিনতি, আবেদন-নিবেদন কোনো কাজেই আসছে না। এতে আতঙ্ক ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে উদ্বেগের পথ ধরেছে। যখন যে সরকার আসে তখন সে সরকারের কাছেই ঘৃণিত, নিন্দিত, মানবাধিকার লঙ্ঘনের এসব বিকৃত পথ থেকে মুক্তি চাওয়া হচ্ছে। তার পরেও কেন এ বিষবৃক্ষের শেকড় উপড়ানো হচ্ছে না, তা রহস্যজনক বলেই মনে হচ্ছে। আমরা এ পরিস্থিতির সন্তোষজনক উত্তরণ চাই।
* মীর আবদুল আলীম
সাংবাদিক ও কলাম লেখক।
©somewhere in net ltd.