নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

মিশু মিলন

মিশু মিলন

আমি বর্তমানে ইস্টিশন এবং সামহোয়্যার ইন ব্লগে লিখি। আমার সকল লেখা আমি এই দুটি ব্লগেই সংরক্ষণ করে রাখতে চাই। এই দুটি ব্লগের বাইরে অনলাইন পোর্টাল, লিটল ম্যাগাজিন এবং অন্য দু-একটি ব্লগে কিছু লেখা প্রকাশিত হলেও পরবর্তীতে কিছু কিছু লেখা আমি আবার সম্পাদনা করেছি। ফলে ইস্টিশন এবং সামহোয়্যার ইন ব্লগের লেখাই আমার চূড়ান্ত সম্পাদিত লেখা। এই দুটি ব্লগের বাইরে অন্যসব লেখা আমি প্রত্যাহার করছি। মিশু মিলন ঢাকা। ৯ এপ্রিল, ২০১৯।

মিশু মিলন › বিস্তারিত পোস্টঃ

দেবদ্রোহ (উপন্যাস: পর্ব- পঁচিশ)

০৮ ই নভেম্বর, ২০২২ বিকাল ৪:৪৯

আঠারো

অনূকা যেদিন নদীর ঘাটে শশীয়তীকে প্রথম দেখে, সেদিনই তার হৃদয়ে প্রেমের মৃদুমন্দ অনুরণন শুরু হয়; তারপর শশীয়তী যখন ওর ছোট ভগিনী শিক্তাকে নিয়ে আশ্রমে আসতে শুরু করে, নিজের আগ্রহেই আশ্রম ঝাঁট দিয়ে ময়লা-আবর্জনা পরিস্কার আর ছোট-খাটো নানা কাজে অনূকাকে সহায়তা করতে শুরু করে, তখন ওর আচার-ব্যবহারে মুগ্ধ হয়ে অনূকার হৃদয়ের মৃদুমন্দ প্রেমের অনুরণন ক্রমশ তীব্র এবং তীব্রতর হয় আর ওর প্রতি রীতিমতো মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ে সে। কিন্তু কিভাবে শশীয়তীকে সে তার ভালোবাসার কথা বলবে তা ভেবে পায় না, তাছাড়া ভালোবাসার কথা বললে শশীয়তী যদি আশ্রমে আসা ছেড়ে দেয়, কেননা অন্তরে পুরুষ সত্ত্বা বিরাজ করলেও শরীরিকভাবে তো সে একজন নারী, তার মতো অর্ধনারী আর অর্ধ পুরুষের প্রতি ওর তো আকর্ষণ নাও থাকে পারে, ওর আকর্ষণ যদি সম্পূর্ণ একজন পুরুষের প্রতি হয়! এইসব ভেবে ভেবে রাত্রের কত যে প্রহর নির্ঘুম কাটে অনূকার, তা জানে কেবল তার পোষ্য বিড়াল বিনু। যে-রাত্রে তার চোখে সহজে ঘুম আসে না, সে-রাত্রে সে গৃহের বাইরের আঙিনায় আসন বিছিয়ে উপবেশন করে রাত্রের আকাশ দেখে, বৃক্ষপত্র চুম্বন করে ভেসে যাওয়া মেঘ দেখে, আর তার কোলের মধ্যে মিউ মিউ করে ডাকা বিনুকে আদর করে।
শশীয়তীর প্রেমে ব্যাকুল হয়ে আনমনা অনূকা কখনো পাহাড়ে কিংবা অরণ্যে একা একা ঘোরে; কখনো সরস্বতী নদীর তীরে, কখনো ঝরনার পাশে, আবার কখনোবা আশ্রমের শীশম বৃক্ষের তলায় বসে বসে শশীয়তীর কথা ভাবে। একদিন সকালে শশীয়তী শিক্তাকে নিয়ে আশ্রমে এলে সে তাকে বলে, ‘শশী, আজ অপরাহ্ণে আশ্রমের আঙিনাটা লেপন করব, একটু আসতে পারবে?’

শশীয়তী সানন্দে সম্মত হয় এবং অপরাহ্ণে চলে আসে আঙিনা লেপনে অনূকাকে সাহায্য করতে, অনূকা বলে, ‘আজ আমার শরীরটা ভালো লাগছে না শশী, আজ থাক, আরেকদিন আঙিনা লেপন করব। তুমি বোসো আমরা গল্প করি।’

দুজনে বসে গল্প করে, শশীয়তী অনূকার গুরুগৃহে থাকার সময়ের গল্প শুনতে চায়, অনূকা তার আশ্রমজীবনের মজার মজার গল্প বলে শশীয়তীকে। অনূকাও শশীয়তীর ভালোলাগা-মন্দলাগার নানা কথা জেনে নেয়।

অনূকা বলে, ‘শশী, শুনেছি তুমি ভালো রন্ধন করতে পারো, মাঝে মাঝে তুমি আমায় রন্ধন শিখিয়ে দেবে। আমি ভালো রন্ধন করতে পারি না।’

শশীয়তী নিজের রন্ধনগুণের প্রশংসা শুনে বলে, ‘আচ্ছা, দেব শিখিয়ে। আমার তো গৃহে খুব বেশি কাজ নেই দিদি, আমি মাঝে মাঝে তোমার জন্য রন্ধন করে দেব।’
অনূকা হেসে বলে, ‘দিও।’

এরপর থেকে শশীয়তীর আশ্রমে আসা এবং অতিবাহিত করার ক্ষণ আরো বেড়ে যায়, কখনো মাতার বকা শুনে মন খারাপ হলে কিংবা নিজের মনের খেয়ালে যখন-তখন সে আশ্রমে আসে, আশ্রমের নানা কাজ করে আর অনূকার জন্য রন্ধন করে দেয়। আবার অনূকার যখন একলা লাগে কিংবা মনটা উদাস হয় তখন নানা ছুতোয় সেও যায় শশীয়তীদের বাটীতে, ওকে ডেকে নিয়ে আসে আশ্রমে, দুজনে গল্প করে দিন গড়িয়ে দেয় গোধূলিতে। একদিন অপরাহ্ণে অনূকা বলে, ‘শশী, তোমার কেশগুলি খুব সুন্দর, দীর্ঘ আর মসৃণ। কেশের যত্ন নেবে। এসো কেশসজ্জা করে তোমাকে সাজিয়ে দেই।’

নিজেই গৃহ থেকে কাঁকুই আর চন্দনের পাত্র নিয়ে এসে আঙিনার শালতলায় শশীয়তীর কেশসজ্জা করতে বসে অনূকা, সজ্জা তো নয়, যেন ওর সুন্দর-মসৃণ কেশরাশি নিয়ে ইচ্ছে মতো খেলা করে সে! কেশ আঁচড়ানোর পর খোঁপা বেঁধে দেয়। তারপর চন্দনপাত্র থেকে আঙুলের ডগায় চন্দন নিয়ে মুখে প্রলেপ দেবার সময় শশীয়তী বলে, ‘দিদি, তোমার এই চন্দনে ভারী সুগ্ধ, দারুণ গন্ধসুখ হয়! আর খুব মসৃণ। আমার মাতা বীতু পণির নিকট থেকে যে চন্দন ক্রয় করে তা তা রূক্ষ, গন্ধসুখ হয় না, আর দেখতেও এমন নয়।’

‘এই চন্দনের নাম তৈলপর্ণিক। পূর্বদিকে বহু যোজন দূরের এক দেশের নাম কামরূপ, সেই দেশের অশোক নামক এক জন্মনে রক্ত-পীত বর্ণের এই তৈলপর্ণিক উৎপন্ন হয়। খুব উৎকৃষ্ট চন্দন, মূল্যও বেশি। আর তোমরা যে চন্দন ব্যবহার করো তা নাগপর্বতে উৎপন্ন, অতিশয় রূক্ষ, শৈবাল বর্ণের।’

‘কোথা থেকে ক্রয় করেছ এই চন্দন?’
‘আমার পতি অতলের হাঁট থেকে আমায় এনে দিয়েছে। এরপর আবার যখন সে অতলের হাঁটে যাবে, বেশি করে আনতে বলব, তোমায় দেব।’

শশীয়তী খুশি হয়, হাসে। সজ্জার পর আশ্চর্য সুন্দর দেখায় শশীয়তীকে। অনূকা মুগ্ধ হয়ে শশীয়তীর মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে, বারবার চিবুক-কপোল স্পর্শ করে। তার ইচ্ছে করে শশীয়তীর সারা মুখে চুম্বনের আলপনা এঁকে দিতে, কিন্তু নিজেকে সে সামলে নেয়। চন্দনের প্রলেপ দেওয়া শেষ হলে আঙিনার পাশের একটা স্থলপদ্ম বৃক্ষ থেকে রক্তিমবর্ণের তিনটে পুষ্প তুলে এনে শশীয়তীর খোঁপায় গুঁজে দেয়। এরপর অলিন্দ থেকে নিচু কানার জলভরা মৃৎপাত্র এনে শশীয়তীর সামনে নামিয়ে রেখে বলে, ‘দেখ তো কেমন হলো?’

শশীয়তী জলের পাত্রের উপরে মুখ নিয়ে জলের মধ্যে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে নিজেই মুগ্ধ হয়ে যায়! এমন নতুন ধরনের কেশসজ্জা সে কখনো করেনি, উৎফুল্ল কণ্ঠে বলে ‘দিদি, তুমি এমন সুন্দর কেশসজ্জা কোথা থেকে শিখলে?’

অনূকা বলে, ‘গুরুগৃহে আমাদের এক মাসিমা ছিলেন, তিনি রন্ধন করতেন আর অপরাহ্ণে অবসর সময়ে আমাদের কেশসজ্জা করে দিতেন। তার কাছেই শিখেছি।’
‘তুমি আমাকে শিখিয়ে দেবে?’
অনূকা মৃদু হেসে বলে, ‘আচ্ছা দেব।’

এরপর থেকে প্রায়ই অপরাহ্ণে শশীয়তীর কেশসজ্জা করে দেয়ে অনূকা, একেক দিন একেক ধরনের কেশসজ্জা করে আর তা দেখে মুগ্ধ হয় শশীয়তী। কেশসজ্জা করার সময় অনূকা মজার মজার নানা কথা ও গল্প বলে, মাঝে মাঝে পিছন থেকে শশীয়তীকে জড়িয়েও ধরে, তাতে দুজনের সম্পর্ক আরো সহজ ও সাবলীল হয়ে ওঠে।

এমনিভাবে নিত্যদিন একটু একটু করে অনূকা শশীয়তীর বুকের কন্দরে প্রবেশ করে। তার সাহচর্যে পূর্বের চেয়ে অধিক পরিপাটী হয়ে ওঠে শশীয়তী; ওর পরিচ্ছদ, সাজসজ্জা সব বদলে যায় আর পূর্বের চেয়ে অধিক সুন্দর দেখায় ওকে। শশীয়তীর সামান্য শরীর খারাপ করলেও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে অনূকা, একদিন আশ্রমে এসে একের পর এক কাশি দিতে থাকে শশীয়তী, কাশি যেন থামেই না। তা দেখে অনূকা বলে, ‘বেশ ঠান্ডা লাগিয়েছে! বসো চুপটি করে, আমি ঠান্ডার ঔষুধ দিচ্ছি।’

আশ্রমের অদূরের ঝোঁপ-ঝাড়ে গিয়ে কিছু পদ্মগুলঞ্চ’র লতা-পাতা নিয়ে আসে অনূকা। শিল-নোড়ায় বেঁটে ক্বাথ তৈরি করে, তারপর সেই ক্বাথের সঙ্গে মধু মিশ্রণ করে খাইয়ে দেয় শশীয়তীকে। পর পর তিনদিন খাওয়ানোর পরই শশীয়তীর কাশি সেরে যায়। পদ্মগুলঞ্চ’র ক্বাথের সঙ্গে মধুর মিশ্রণ কাশির মহৌষধ। বিদূষী ঘোষা শাস্ত্রীয়বিদ্যার পাশাপাশি কিছু কিছু প্রয়োজনীয় ঔষধিবিদ্যারও শিক্ষা দেন তার শিষ্যদেরকে, যাতে জীবনে চলার পথে সর্বদা কাজে লাগে।

একদিন মুখে চন্দনের প্রলেপ দিয়ে সাজিয়ে দেবার পর শশীয়তী অনূকার গলা জড়িয়ে ধরে দুষ্টুমির ছলে গালে চুম্বন করে। অকস্যাৎ শশীয়তীর এই নাবালিকাসুলভ আচরণে অবাক হলেও মনে মনে ভীষণ খুশি হয় অনূকা আর কেমন এক অদ্ভুত ভাবালুতা পেয়ে বসে তাকে!

এরই মধ্যে কখনো কখনো আশ্রমে আসে সত্যবাক, শাস্ত্রমতে অনূকা সত্যবাকের স্ত্রী, সমাজের সকলেও তাই জানে। অনূকা আর সত্যবাক ওদের দুই পরিবারের সবাইকে বোঝাতে সক্ষম হয় যে সংসার আর আশ্রম দুটোই সমানভাবে পরিচালনা করা অনূকার পক্ষে অত্যন্ত কষ্টকর, তাই অনূকা স্বেচ্ছায় সত্যবাককে বিবাহ দিয়ে ঘরে সতীন আনতে চায়, যাতে সে আশ্রমের কাজে পূর্ণ মনোযোগ দিতে পারে। সকলের সম্মতিতে সত্যবাক তাদের গোত্রের বিভূতির কন্যা আশীকে বিবাহ করে।

সত্যবাক আর অনূকা তাদের ভেতরের কথা গোপন রাখে, তারা একত্রে না থাকলেও তাদের মধ্যে সুসম্পর্ক বজায় আছে, অনূকার ভরণপোষণের দায়িত্ব সত্যবাকই পালন করে। সত্যবাক যখনই আশ্রমে আসে অনূকার জন্য যব, মাংস, দুগ্ধ, ছানা ইত্যাদি কিছু না কিছু নিয়ে আসে। আবার অনূকাও প্রায়ই যায় সত্যবাকের বাটীতে। সত্যবাক আসে সাধারণত মধ্যাহ্নে কিংবা অপরাহ্ণের দিকে, দুজনে মুখোমুখি বসে কিছুক্ষণ গল্প করে, তারপর একসময় সত্যবাক নিঃশব্দে দীর্ঘশ্বাস ফেলে চলে যায়। একদিন সত্যবাক অনূকাকে বলে, ‘তোমার হাতটা ছুঁই?’

অনূকা মৃদু হেসে বলে, ‘আমার হাত আশীর হাতের মতোন সুন্দর নয়, আর কোমল তো নয়ই, আমার হাত পুরুষের হাতের মতো শক্ত। তবু তোমার যখন ইচ্ছে হয়েছে, ছোঁও।’

অনূকার রসিকতায় নিজের ইচ্ছে গুটিয়ে নেয় সত্যবাক, ‘না থাক, আমি যাই।’
অনূকা হেসে সত্যবাকের গাল টিপে দিয়ে বলে, ‘খুব অভিমান, না? নাও, ধরো হাত।’

সত্যবাক অনূকার হাত ধরে নিজের গালে ছোঁয়ায়, চুম্বন করে। তারপর বলে, ‘যাই, তোমার কিছু লাগলে কাউকে দিয়ে সংবাদ দিও।’
কিন্তু কখনোই সত্যবাকের কাছে কিছু চায় না অনূকা, তার যা প্রয়োজন সত্যবাক নিজে থেকেই দিয়ে যায়। কেবল সত্যবাক নয়, অনূকার পিতা-মাতা এবং নৃপতি বেণও তাকে নানান প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠায়।

আবার কোনোদিন হয়ত বিদায়বেলায় সত্যবাক অনূকাকে বলে, ‘তোমায় একবার আলিঙ্গন করি?’
অনূকা মৃদু হেসে দু-হাত বাড়িয়ে দেয় সত্যবাকের দিকে, সত্যবাক তাকে আলিঙ্গনাবদ্ধ করলে সে সত্যবাকের কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে, ‘আলিঙ্গনের চেয়ে বেশি কিছু তোমায় দিতে না পারার জন্য সত্যিই আমি দুঃখিত, আমায় ক্ষমা করে দিও।’

বেশ কিছুক্ষণ পর অনূকাকে আলিঙ্গনমুক্ত করে ভারাক্রান্ত মন নিয়ে চলে যায় সত্যবাক, অনূকা সত্যবাকের গমন পথের দিকে তাকিয়ে থাকে, তারও খারাপ লাগে সত্যবাকের জন্য, সে জানে যে দ্বিতীয় স্ত্রী আশীর সঙ্গে সংসার করলেও তাকেই বেশি ভালবাসে সত্যবাক, তার সঙ্গই বেশি করে চায়।

একদিন মধ্যাহ্নে গৃহের সামনে বসে গাছের শিকড় জাতীয় এক প্রকার পদার্থ বেঁটে মণ্ড করে ছোট্ট মৃৎপাত্রে রাখে অনূকা, তারপর শরীরের নিবি খুলে অনাবৃত ঊর্ধ্বাঙ্গে ও মুখমণ্ডলে সেই মণ্ড মাখতে থাকে। মাথার কেশরাশি চূড়ো করে বাঁধা, পরনে বাস। প্রায় সারা শরীরে মণ্ড এমনভাবে মাখে যে তাকে আর চেনা যায় না! হঠাৎ মানুষের পায়ের শব্দ পেয়ে সে চমকে যায় আর হাতদুটো আড়াআড়ি বুকের ওপর রেখে স্তনযুগল ঢাকার চেষ্টা করে। সে ভেবেছিল এই মধ্যাহ্নে আর কে-ই বা আসবে আশ্রমে, তাই সে ঊর্ধ্বাঙ্গ অনাবৃত করেই অঙ্গে মণ্ড মাখছিল। পরে বামদিকে ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দেখে শশীয়তী, কোনো পুরুষ যে নয় এই ভেবেই সে স্বস্তিবোধ করে। শশীয়তীও প্রথমে অনূকাকে দেখে চমকে যায়, তারপর কৌতুক বোধ করে হেসে গড়িয়ে পড়ে আর কী!

শশীয়তী হাসির রেশ রেখেই বলে, ‘এ কী মেখেছ সারা অঙ্গে দিদি? তোমায় ঠিকমতো চেনা যাচ্ছে না, আর কী অদ্ভুত দেখাচ্ছে!’
অনূকা মৃদু হেসে বলে, ‘এর নাম হরিদ্রা, একপ্রকার গাছের শিকড়। শিল-নোড়ায় বেঁটে অঙ্গে মেখেছি।’

‘এরকম অদ্ভুতভাবে অঙ্গে হরিদ্রা মাখলে কী হয়?’
‘হরিদ্রা এক যাদুকরী জিনিস! কুথান কাকাশ্রীর মুখে শুনেছিলাম যে অনার্যরা এই হরিদ্রার নানারকম ব্যবহার করে থাকে, অনার্য বৈদ্যরা নানা রোগ সারাতে হরিদ্রা ব্যবহার করে। হরিদ্রা অঙ্গে মাখলে ত্বকের রঙ অধিক উজ্জ্বল হয়, চর্মরোগ প্রতিরোধ হয়, চুলকানি হলে বা ত্বকে ক্ষত হলে দ্রুত সেরে যায়।’

‘কোথায় পেলে তুমি এই হরিদ্রা?’

‘পিতাশ্রীকে বলেছিলাম একদিন, তিনি সেদিন অনার্যদের হাটে গিয়েছিলেন দরকারী পণ্য ক্রয় করতে, হরিদ্রা পেয়ে আমার জন্য নিয়ে এসেছেন। অনার্যরা নাকি রন্ধনেও এটা ব্যবহার করে, এটা আহার করলে নাকি পেটের অনেক রোগ নিরাময় হয়। মাখবে তুমি?’
একটু ইতস্তত বোধ করে শশীয়তী, আবার প্রবল কৌতুহলও জাগে, শেষে কৌতুহলের কাছে হার মেনে বলে, ‘হ্যাঁ, মাখবো।’
‘বেশ মাখো।’

শশীয়তী অশঙ্কোচে ঊর্ধ্বাঙ্গের নিবি খুলে অলিন্দের বাঁশের আড়ে রেখে এসে অনূকার মুখোমুখি বসে, অনূকা মুগ্ধ দৃষ্টিতে ওর অনাবৃত অঙ্গের দিকে তাকিয়ে ভাবে- সদ্য তৈরি মাখনের ন্যায় কী বিস্ময়কর সুন্দর দেহবল্লরী, দৃষ্টি নিবিষ্ট করা কী মায়াময় স্তনযুগল, আর কাম-উস্কানিমুলক কী নিখুঁত নাভীমুল!

শশীয়তী মৃৎপাত্র থেকে হরিদ্রার মণ্ড হাতে নিয়ে চোখ-মুখ কুঁচকে মুখমণ্ডলে মাখতে মাখতে বলে, ‘গন্ধটা তো বেশ!’

‘হুম।’ অনূকার দৃষ্টিতে মুগ্ধতার ঘোর।

এরপর শশীয়তী গলায় ও সারা ঊর্ধ্বাঙ্গে হরিদ্রার মণ্ড মাখতে থাকে। লতার ন্যায় সবুজ বর্ণের একপ্রকার সর্প যেমনি সবুজ বৃক্ষের সঙ্গে মিশে থাকে, তাকে বৃক্ষের অংশ ভেবে নিশ্চিন্তে সর্পের আশপাশে ঘোরাঘুরি করে পোকামাকড়, আর বর্ণচোরা সর্প বাগে পেয়ে শিকার পোকাকে ভক্ষণ করে; তেমনি নারী অঙ্গধারী বর্ণচোরা পুরুষ অনূকাও বুভুক্ষের ন্যায় শশীয়তীর অঙ্গের সৌন্ধর্য অবলোকন করতে থাকে, কিন্তু সর্পের ন্যায় অসংযমী হয় না সে, তার ভেতরে যত চঞ্চলতাই থাকুক, নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখে।

দুজনেই অঙ্গে হরিদ্রা মেখে গল্পে মেতে ওঠে, তারপর হরিদ্রা শুকিয়ে গিয়ে যখন অঙ্গ থেকে গুঁড়ো ঝরে পড়তে শুরু করে তখন তারা দুটো চাদরে অঙ্গ আবৃত করে আশ্রম থেকে কিছুটা দূরের ঝিরির উদ্দেশ্যে যাত্রা করে স্নান করার জন্য। জলে অঙ্গ ভিজিয়ে সুন্দর করে মার্জন করে হরিদ্রা তুলতে হবে, এজন্য তারা সরস্বতী নদীতে না গিয়ে ঝিরির পথ ধরে, কেননা বহির্ষ্মতীর অধিকাংশ মানুষ সরস্বতী নদীতে স্নান করে, ফলে ওখানে মানুষের সামনে অঙ্গ অনাবৃত করে মার্জন করতে পারবে না। বহির্ষ্মতীর মানুষ পানীয় জল ঝরনা এবং ঝিরি থেকে সংগ্রহ করে, বেশ কয়েকটি ঝরনা ও ঝিরি আছে বহির্ষ্মতীতে, সবগুলো ঝিরি-ই পাহাড় থেকে এসে মিলিত হয়েছে সরস্বতী নদীর সঙ্গে। ওরা যে ঝিরির উদ্দেশ্যে যাত্রা করে, সেটির অবস্থান বহির্ষ্মতীর দক্ষিণদিকে এবং বসতবাটী থেকে কিছুটা দূরে হওয়ায় জল সংগ্রহের জন্য মানুষ এখানে তেমন আসে না, এখানে তৃষ্ণা মিটাতে আসে কেবল পশু-পাখিরা।

দুজন ঝিরির কাছে পৌঁছে ভালো করে দেখে নেয় যে আশপাশে কোথাও কোনো মানুষ আছে কি না, নেই দেখে অঙ্গের চাদর খুলে পাথরের ওপর রেখে ঝিরির জলে নামে ওরা, জল কোথাও কোমর সমান, কোথাওবা কোমরের নিচে। কোমরজলে দাঁড়িয়ে ওরা ডুব দিয়ে উঠে প্রথমে হাতের মার্জনে মুখমণ্ডল ও অঙ্গের হরিদ্রা ধুয়ে ফেলে, জলে ছড়িয়ে পড়ে হরিদ্রার আদুরে রঙ। তারপর ভেড়ার লোম দিয়ে বুনন করা মার্জনী দিয়ে মার্জন করে অঙ্গ থেকে হরিদ্রার রঙ তোলে, একে অন্যের পিঠ মার্জন করে দেয়। শশীয়তীর পিঠ, কাঁধ, ঘাড় মার্জন করে দেবার সময় ওর শরীরের স্পর্শে অনূকার শরীরের ভেতরে যেন বিজলী চমকায়! মার্জনী ডাঙায় ছুড়ে রেখে হাতের আঁজলায় জল তুলে শশীয়তীর শরীরের রঙ ধুয়ে ফেলে ঘাড়ের কাছে নাক নিয়ে গন্ধ শোকে, হরিদ্রার গন্ধ মিশ্রিত অঙ্গের আশ্চর্য গন্ধ যেন কামনার তীর হয়ে অনূকার বেঁধে রাখা সংযমের রজ্জু কেটে দেয়! সে পিছন থেকে দু-হাতে জড়িয়ে ধরে শশীয়তীকে, গালে গাল ঘষে আর চুম্বন করে। শশীয়তী বাহুবন্ধনে থেকেই ঘুরে দাঁড়িয়ে অনূকার চোখের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসে, সে হয়ত ভাবে যে ছোট ভগিনী হিসেবে তাকে আদর করছে তার দিদি। অনূকা শশীয়তীর মুখের দিকে কয়েক নিমেষ তাকিয়ে থাকার পর কপালে চুম্বন করে, এরপর শশীয়তীর মাথাটি নিজের আরো কাছে টেনে এক হাতে মুখমণ্ডল আরেক হাতে ভেজা কেশরাশি মুঠো করে ধরে ঠোঁট চুম্বন করতে থাকে। এবার শশীয়তী বিস্মিত হয়ে যায়, হয়ত কিছুটা অস্বস্তিও বোধ করে, কিন্তু অনূকার হাত থেকে নিজেকে ছাড়িয়েও নিতে পারে না। অনূকার শ্বাস-প্রশ্বাস ঘন হয়, তার তপ্ত নিশ্বাস ছড়ায় শশীয়তীর মুখে। বেশ কিছুক্ষণ পর শশীয়তীর ঠোঁট থেকে নিজের ঠোঁট সরিয়ে চোখের দিকে তাকিয়ে অনূকা বলে, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি শশী। একজন পুরুষ যেমনি একজন নারীকে ভালোবাসে, আমিও তোমাকে তেমনি ভালোবাসতে চাই।’
শশীয়তী আরো অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে অনূকার মুখের দিকে, তার মুখ দিয়ে কোনো কথা বের হয় না। অনূকা এবার দুই হাতে শশীয়তীকে নিজের বুকের সঙ্গে জড়িয়ে ধরে, মাথায় আলত চুম্বন করে আর বলে, ‘আমি তোমার সঙ্গে সংসার করতে চাই শশী, তোমার সঙ্গে বাঁচতে চাই।’

নির্জন ঝিরিতে সকল মানুষের অগোচরে একটি নারীঅঙ্গ আরেকটি নারী অঙ্গ জাপটে ধরে রাখে বেশ কিছুক্ষণ। তারপর অনূকা যখন শশীয়তীকে ছেড়ে দেয় তখন শশীয়তী চটজলদি জলে কয়েকটি ডুব দিয়ে উপরে উঠে পাথরের ওপর থেকে চাদর নিয়ে অঙ্গে জড়িয়ে দৌড়তে শুরু করে। অনূকা ছড়ার কোমর জলে দাঁড়িয়ে শশীয়তীকে ডাকতে থাকে, কিন্তু শশীয়তী একবারের জন্যও পিছন ফিরে তাকায় না, সে দৌড়তেই থাকে।

বাটী ফেরার সময় শশীয়তী সরস্বতী নদীতে আবার স্নান করে, তার কী করা উচিত সে ভেবে পায় না, কেবল গৃহের মধ্যে গোপনে কাঁদে। রাত্রে চোখে ঘুম আসে না, তার মনে ভয় জাগে- কোনো অশুভ শক্তি কি দিদির শরীরে ভর করেছে!

পরপর দু-দিন শশীয়তী আশ্রমে না আসায় অনূকা গভীর হতাশায় ডুবে যায়, শশীয়তীর সঙ্গে দেখা করার জন্য তার ভেতরটা ছটফট করে, কিন্তু সাহস করে ওদের বাটীতে যেতে পারে না, শশীয়তী যদি সকলের সামনে তাকে অপমান করে! তবে শিক্তা নিত্যদিনের মতোই আশ্রমে আসায় সে এই ব্যাপারে নিশ্চিত হয় যে শশীয়তী বাটীতে গিয়ে কাউকে কিছু বলেনি, বললে শিক্তা আশ্রমে আসত না। আশ্রমে সে শিক্ষার্থীদেরকে শিক্ষা দেয়, কিন্তু বড্ড উদাসীনভাবে। তার এই উদাসীনতা কোনো কোনো শিক্ষার্থীর চোখেও ধরা পড়ে। কোনো কোনো দিন সময়ের আগেই শিক্ষার্থীদের ছুটি দিয়ে দেয়। সে নিজের কাজ করে, নিদ্রায় যায়, কিন্তু তার শ্রবণেন্দ্রিয় যেন উদগ্রীব থাকে শশীয়তীর পায়ের শব্দ আর কণ্ঠস্বর শোনার জন্য। সে আশা করে যে শশীয়তী আসবে, এতদিন যে স্নেহ এবং ভালোবাসা সে ওকে দিয়েছে, সেই স্নেহ-ভালোবাসার টানেই তার কাছে আসবে। কিন্তু তিনদিন পেরিয়ে গেলেও শশীয়তী আর আসে না। চতুর্থদিনে আশ্রম ছুটির পর সে সরস্বতী নদী থেকে স্নান করে এসে পোশাক বদলে কেশ আঁচড়ানোর জন্য সবে কাঁকুই হাতে তুলে নিয়েছে এমন সময় গৃহের বাইরে কারো পায়ের শব্দ শুনতে পায়, সে দ্রুত দ্বারের কাছে গিয়ে বাইরে তাকায়।

‘শশী!’ বলেই ওর কাছে ছুটে যেতে গিয়েও থমকে দাঁড়ায় অনূকা, আবেগ সংবরণ করে। কেবল নীরবে তাকিয়ে থাকে শশীয়তীর মুখের দিকে, কিভাবে শশীয়তীর সঙ্গে কথা শুরু করবে বুঝে উঠতে পারে না।

‘পুষ্পবৃক্ষগুলোতে জল দাওনি কেন? চেহারা দেখে তো মনে হচ্ছে নিজেও ঠিকমতো আহার-পানীয় গ্রহণ করোনি।’ শশীয়তী এমন শাসনের স্বরে কথাগুলো বলে যেন তাদের মধ্যে কিছুই ঘটেনি! কথা বলতে বলতে অলিন্দে উঠে আসে সে।

অনূকাকে একই ভাবে নীরবে তাকিয়ে থাকতে দেখে শশীয়তী বলে, ‘অমন হাঁ করে তাকিয়ে আছ কেন!’
‘বোসো শশী।’ শান্তস্বরে বলে অনূকা।

‘বসার সময় কোথায়, কাজ তো বাড়িয়ে রেখেছ! পুষ্পবৃক্ষগুলোতে জল দিতে হবে। এসো আগে কেশ আঁচড়ে দিই।’
শশীয়তীর ব্যবহারে অনূকা স্বস্তিবোধ করে, মৃদু হেসে ওর হাতে কাঁকুই দিয়ে অলিন্দে উপবেশন করে বলে, ‘গত তিনদিন আসোনি কেন, আমার ওপর খুব রাগ হয়েছিল শশী?’
‘রাগ হলে কী আর আসতাম!’ কেশে কাঁকুই চালনা করতে করতে বলে শশীয়তী।
‘তাহলে আসোনি কেন?’

‘ঋতুস্রাব হলে বুঝি কোনো প্রেয়সী তার প্রিয় পুরুষের কাছে আসে!’
‘শশী!’ বলেই ঘুরে বসে শশীয়তীর চোখে চোখ রাখে অনূকা, ‘আমায় তুমি পুরুষ বলছ!’

শশীয়তী বলে, ‘সেদিন তো ঝিরিতে খুব পুরুষের মতো কাণ্ড করে বললে- একজন পুরুষ যেমনি একজন নারীকে ভালোবাসে, আমিও তোমাকে তেমনি ভালোবাসতে চাই।’

আনন্দে উল্লসিত হয়ে অনূকা শশীয়তীর কপালে-গালে চুম্বন করে ওকে আলিঙ্গন করে, আনন্দে কেঁদে ফেলে। তারপর শশীয়তীকে আলিঙ্গনমুক্ত করে চিবুকে হাত রেখে বলে, ‘তুমিই প্রথম আমাকে পুরুষের স্বীকৃতি দিলে শশী। সারাজীবন আমি তোমার পুরুষ হয়ে থাকব শশী।’

শশীয়তী অনূকার চোখের অশ্রু মুছে দিয়ে কপালে কপাল স্পর্শ করে বলে, ‘বেশ, তাই থেকো।’

অনূকা বলে, ‘গত তিনদিন তোমাকে না দেখে আমার ভীষণ কষ্ট হয়েছে।’ কয়েক নিমেষের বিরতি দিয়ে আবার বলে, ‘সেদিন ঝরনায় হরিদ্রার ঔজ্জ্বল্যে উদ্ভাসিত তোমাকে দেখে আমি আমার ভালোবাসার কথাটি আর গোপন রাখতে পারিনি। পরে ভেবেছিলাম তুমি নিশ্চয় আমার আচরণে কষ্ট পেয়েছ, আমি তোমাকে পাগলের ন্যায় ভালোবাসি এটা সত্য, কিন্তু তোমারও তো ইচ্ছে-অনিচ্ছে আছে, আমার প্রতি তোমার কোনো আকর্ষণ নাও থাকতে পারে। তাই কিছুটা ভয়ে আর শঙ্কায় ছিলাম, ভেবেছিলাম তুমি খুব রেগে আছো আমার ওপর, যেভাবে ঝরনায় আমাকে একা ফেলে চলে গেলে!’

‘ঝরনায় সেই মুহূর্তে আমার মনে হয়েছিল তোমার ওপর কোনো অশুভ শক্তি ভর করেছে!’

হি হি শব্দে হেসে গড়িয়ে পড়ে অনূকা, হাসতে হাসতেই বলে, ‘অশুভ শক্তি নয়, আমার ওপর মদনদেব ভর করেছিল!’

দুজনেই শব্দ করে হেসে ওঠে। তারপর শশীয়তী বলে, ‘পরে উপলব্ধি করেছি তোমার ভালোবাসা। তোমার শরীরের গন্ধ, আলিঙ্গন, চুম্বনের নোনা স্বাদ আমায় তীব্রভাবে টানছিল! আমি অপেক্ষা করছিলাম ঋতুকাল অতিক্রান্ত হবার।’

সেই শুরু ওদের দু-জনের গোপন প্রণয়যাত্রার, এখন দুজন দুজনকে একটি দিনও না দেখে থাকতে পারে না। শিক্তাকে গৃহে পৌঁছে দিয়ে মধ্যাহ্নের পূর্বেই আবার আশ্রমে ছুটে আসে শশীয়তী, অনূকার জন্য রন্ধন করে, দুজনে বসে গল্প করে, দুজন দুজনের কেশসজ্জা করে, চন্দন দিয়ে সাজিয়ে দেয়, গীত গায়, সমপ্রণয়ের সরোবরে ডুবে কখনো কখনো সমকামেও লিপ্ত হয়।

একদিন মধ্যাহ্নে গৃহের শয্যায় শুয়ে অনূকার বুকে মুখ গুঁজে শশীয়তী বলে, ‘অনূ, আমরা কি পাপে ডুবেছি?’

অনূকা শশীয়তীকে আদর করে শশী বলে ডাকে আর দুজনের মধ্যে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠার পর থেকে শশীয়তী অনূকাকে অনূ বলে ডাকে, অনূকাই ওকে বলেছে এই নামে ডাকতে। অবশ্য মানুষের সামনে দিদি-ই ডাকে।

‘কেন শশী, একথা বলছ কেন?’
‘এই যে আমরা দুটি কন্যা হয়েও একে অন্যকে ভালবেসেছি।’
‘ভালোবাসায় পাপ হবে কেন শশী! ভালোবাসায় কোনো পাপ থাকে না। আমরা তো কারো কোনো ক্ষতি করছি না, সমাজেরও কোনো ক্ষতি করছি না।’

‘মনুর বিধানে দুজন নারীতে কিংবা দুজন পুরুষে ভালোবাসা নিষিদ্ধ, মনুর বিধান অমান্য করলে কঠিন শাস্তি পেতে হয়।’

‘আমি পরোয়া করি না মনুর বিধান! শরীর আমার, মনও আমার; আমার শরীর-মন কী চায় তা মনু জানবেন কী উপায়ে, ভূ-মণ্ডলের তাবৎ মানুষের শরীর-মনের আকাঙ্ক্ষার কথা তো মনুর জানার কথাও নয়! প্রেম-ভালোবাসা প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব ব্যাপার, অযথা মানুষের ব্যক্তিগত বিষয়ে নিজের মনগড়া বিধান কেন দেবেন মনু!’

‘মনু কেন যে এমন বিধান দিয়েছেন!’

‘বর্তমান মনু এই বিধান দেননি, অতীতের কোনো মনু হয়ত ব্রাহ্মণদের প্ররোচনায় এই অর্বাচীন চিন্তা প্রসব করেছেন! কেন করেছেন সেটাও আমার কাছে পরিস্কার, দুজন কন্যা কিংবা দুজন পুরুষে ভালোবাসলে কিংবা বিবাহ করলে তো আর সন্তান হবে না, দ্রুত বংশ বৃদ্ধি পাবে না, বংশ বৃদ্ধি ব্যহত হবে, তাই মনু এমন প্রকৃতিবিরুদ্ধ ও হৃদয়বিরোধী বিধান দিয়েছেন।’

‘যদি মনু এমন অদ্ভুত বিধান না দিতেন, তাহলে আমরা দুজনে বিবাহ করে সংসার করতে পারতাম, কী যে ভালো হতো!’

‘শুধু কী আমরা দুজন? আরো কত কন্যাযুগল এবং পুরুষযুগল বিবাহ করে সংসার করত! এখন মনুর বিধানের ভয়ে অনেকে বাধ্য হয়ে বিপরীত লিঙ্গের মানুষকে বিবাহ করে জীবন পার করছে, কিন্তু আমি নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, তারা সুখে নেই।’

‘আমাকে যদি আমার পিতামাতা জোর করে পুরুষের সঙ্গে বিবাহ দেয়?’

শশীয়তীর ঠোঁটে আঙুল চাপা দেয় অনূকা, ‘অমন কথা বোলো না শশী, তার আগেই আমি তোমায় নিয়ে পালিয়ে যাব। কুথান কাকাশ্রীর মুখে কত অনার্য নগরের কথা শুনেছি, সেইসব নগরের কোনো একটিতে আমরা দুজন চলে যাব, সকলের কাছে পরিচয় দেব যে আমরা দুজন সহোদরা।’

অনূকাকে আরো দৃঢ়ভাবে জড়িয়ে ধরে শশীয়তী বলে, ‘তোমাকে ছেড়ে কোনো পুরুষকে বিবাহ করতে হলে আমি সত্যিই সুখী হবো না।’
‘অমন কু-ভাবনা মাথায় এনে এমন সুন্দর মুহূর্ত জলাঞ্জলি দিও না শশী, উপভোগ করো। যেটুকু সময় তোমাকে আমি এমন নিরালায় পাই, প্রাণভরে তোমায় আদর করতে চাই, ভালোবাসতে চাই, সময়টুকু উপভোগ করতে চাই।’

বলেই শশীয়তীর মুখটা নিজের বুকের কাছ থেকে টেনে তুলে কপালে-কপোলে চুম্বন করার পর ওষ্ঠে চুম্বন করতে থাকে। তারপর দুজন-দুজনের নিবি ও বাস খুলে নগ্ন হয়, অনূকা দু-হাতে শশীয়তীকে ধরে শয্যায় শয়ন করিয়ে দেয়, তারপর আবারও গভীর চুম্বনে লিপ্ত হয়।
হঠাৎ বাতায়নের কাছে এসে দাঁড়ায় একটি মানব অবয়ব, যার ছায়া পড়ে মৈথুনরত অনূকা-শশীয়তীর অঙ্গে, কিন্তু কাম সরোবরে ডুবে ওরা তা লক্ষ্য করে না।



(চলবে........)

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.