| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ভাবতে চাই
সুখ দুঃখের সাগরে আমি এক মাঝি.... আশার ভেলায় পথ চলে দুঃখটাকে সঙ্গী করে সুখের পথ খুঁজি.....
"আব্বা আমারে একটা বানর আইন্না দেওনা......আমি বানর পালমু"-এই কথাটি বাবা নামক অন্যতম নির্ভরযোগ্য একজনকে বলার সময় রাজ্যের স্বপ্ন(যাকে আমরা বলি দিবাস্বপ্ন) এসে
তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ুয়া ছেলেটির চোখে ধরা দিল। স্নেহাশীষ বাবা তখন ছেলের এই আবদার শুনে প্রথমে একটু ঘাবড়ে গেলেও ছেলের এই বানরপ্রীতি-কে মনে মনে প্রশংসাই করলেন আর সাথে সাথে
ছেলেকে কথা দিলেন তার এই আবদার অতিস্বত্তর পূরণ করা হবে। কিন্তু তা শুনেও হাতের কাছে না পাওয়ার আগে ছেলেটির মন বিশ্বাস করতে চাইলনা। "আব্বা কী আমারে সত্যিই আইন্না দিব?"-নিজের
মনের কাছে এই প্রশ্ন করে আপাতত কোন উত্তর না পেয়ে তার নির্ভরতার পরীক্ষা করতে লাগল।
কিন্তু তার এই আব্দার-এর কথা পরম নির্ভরযোগ্য বাবা-টি ছাড়া আর কেও জানলনা।
অপেক্ষা অপেক্ষা আর অপেক্ষা......সাথে সঙ্গী হল প্রথম সাময়িক পরীক্ষা...। শেষ পরীক্ষা-টা দিয়ে যখন ছেলেটি বাসায় গেলো তখন বাবার অসময়ে বাসায় উপস্থিতি-কে একটু অস্বাভাবিকই মনে হল।
"আইজ তোমার কাম(কাজ) নাই? অহনাই(এখনি) বাইত(বাড়িতে) আইছ কে(কেন)? " -কথাগুলো শুনে যখন উত্তর আসলো বাবার এক বন্ধুর বাসায় বেড়াতে যাবার কথা তখন বরাবরের মতো
ভ্রমণ-বিমুখ
ছেলেটির মাথায় যেন বাজ(বজ্রপাত) পড়ল। কিন্তু যখন বলা হল শুধুমাত্র সেই ছেলেটি আর তার বাবা ছাড়া আর কেও যাচ্ছেনা তখন সেই বাজ আরও ঘনীভূত হল এবং মুখ দিয়ে
"আমি যামুনা!!" -এই
বাক্যটি বুলেটের গতিতে বের হয়ে গেলো। বুঝা গেলনা সেই বুলেটটি কার কর্ণকুহরে আঘাত করল !!!
আঘাত করলেও তখন সবার কর্ণকুহর ছিল বুলেটপ্রুফ !!! তাই অনেক তালবাহানা করেও কোন লাভ
না হওয়ায় অগত্যা বাবার সাইকেলের পিছনে উঠে রওনা হল।
সারাটা রাস্তা কোন কথা নেই......... এই সুযোগে রাগ আর অভিমানদ্বয় এসে ছেলেটির মস্তিষ্কে তাদের জায়গা পাকাপোক্ত করে নিচ্ছে !!!
হঠাৎ একটা
বাড়ির সামনে এসে দ্বিচক্রযান-টি তার যাত্রাভঙ্গ করলো এবং তারা বাড়ির ভিতরে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়াল । যখন তারা বাসার ভিতর ঢুকল তখন সেই বাসার ছোট্ট ডালিম গাছটি ছেলেটির দৃষ্টিকে
তার দিকে টেনে নিয়ে গেলো। বিশেষ করে ডালিম গাছের নিচের ১ বর্গফুট জায়গায় তার দৃষ্টির সবটুকু ঢেলে দিল।
"আরে !!! এইডা কী? আব্বা...অইযে দেহ(দেখ)" কথাগুলো বলার সাথে সাথে
"এইডা তোমার লাইগা" উত্তরটা যেন আকাশের চাঁদ হাতে দিয়ে গেলো(ঐসময় হাতের মুঠোয় আকাশের চাঁদও এতটা খুশি এনে দিতে পারত কিনা তা নিয়ে সন্দেহ আছে!!) আর রাগ-অভিমান কে
ঝেঁটিয়ে বিদায় করলো !!!
ছেলেটি খুশিতে দৌড় দিয়ে বানরটির কাছে গেল এবং কিছুক্ষণ পর বাবাকে ধন্যবাদ দেওয়ার পরিবর্তে বিস্ময় প্রকাশ করলো, "অহনাও(এখনও) আব্বা আমার কতা মনে রাক্ছে(রাখছে) !!!!"।
তখন ছেলেটি তার বাবাকে খুশিতে জড়িয়ে ধরল, তখন বাবার মুখের এক চিলতে হাসি ছেলেটির আনন্দ আরও বহুগুণে বাড়িয়ে দিল । ততক্ষণে বাবার বন্ধুটি তাদেরকে ঘরে নেওয়ার জন্য ঘর
থেকে বের হয়ে উঠানে চলে আসছে। তারপর সেই বাড়ির মেহমানদারী শেষ করে ফিরে যাবার পালা...সাথে নিয়ে যাবে চির প্রতীক্ষিত আনন্দের মূল বিষয়বস্তুটিকে।
কোথায় করে নিয়ে যাওয়া হবে তা ঠিক করা হল। যাবে ছেলেটির কাঁধে উঠে(যদিও প্রথমবার বানর কাঁধে উঠবে তবুও ছেলেটির মোটামুটি সাহস ছিল!!) ।
বানরটি ভদ্র শিশুর মতো ছেলেটির কাঁধে উঠে তাদের বাসায় চলে আসলো। আশ্চর্যের বিষয় হলেও সত্যি
ছিল-পুরোটা রাস্তা বানরটি একদম নড়াচড়া করেনি, সুবোধ বালকের মতো কাঁধে দুই পায়ে ভর দিয়ে আর সামনের দুই পা দিয়ে মাথার চুল ধরে দিব্যি ভ্রমণটাকে উপভোগ করেছে ।
বাসায় গিয়ে ছেলেটির আনন্দ আর দেখে কে !!! সবাইকে সে দেখায় এবং এতক্ষণে যে তার সাথে বানরটির খুব ভাল বন্ধুত্ব হয়ে গেছে তা তাদেরকে প্রমাণ করে দেখায় !!!
প্রথমদিকে বানরটিকে শিকলে বেঁধে রাখতে হত। কিন্তু কিছুদিন যাওয়ার পর আর তার প্রয়োজন পড়েনি। তখন সে পরিবারের আর একজন সদস্যের মতই থাকে। তার জন্য পুরো বাড়ি খোলা,
যখন যেখানে ইচ্ছা তখনি সেখানে যেতে পারা, যা খাওয়ার ইচ্ছা হয় তা খেতে পারা, যখন যেটা করতে মন চায় সেটা করা ছিল তার স্বাধীনতার লক্ষণ। আর সবচেয়ে বড় কথা হল ছেলেটির
সবচেয়ে কাছের বন্ধু হওয়া । ও...আর একটি কথা বলা হয়নি, বানরটির নাম ছিল "আবীর"।
নামটি অবশ্য ছেলেটির-ই দেওয়া !! সন্ধ্যায় যখন ছেলেটির মা রান্না করতে বস্ত তখনও আবীর মার কাছাকাছি থাকত। যখন ছেলেটি কোথাও যেত আবীরও তার সাথে যেত। শুধুমাত্র স্কুলে যাওয়ার সময়
তাদের মধ্যে দীর্ঘ বিরহ চলত !!! আবীর হঠাৎ একদিন মুরগীর বাসা থেকে ডিম চুরি করে তা ভেঙ্গে ফেলে, তারপর তাকে শাস্তি হিসেবে কানমলা উপহার দেওয়ার পর আর ভুলেও কখনো ডিমের দিকে
হাত বাড়ায়নি !!! প্রায় সন্ধ্যায় হাঁস-মুরগীর থাকার ঘরের দরজার শিকল খুলে দেওয়া ছিল আবীরের অন্যতম একটি আশ্চর্যজনক কাজ !! এইভাবে প্রায় ৮ মাস কেটে গেলো।
হঠাৎ একদিন ছেলেটি দেখতে পেল, আবীর অস্বাভাবিকভাবে বসে আছে । তখন সে আবীরকে ডাক দিল তার কাছে আসার জন্য কিন্তু আবীর আসলোনা। ছেলেটি যখন আবীরের কাছে গেল তখন আবীরের
আর চলার শক্তি নেই। তখন তাদের বাড়িতে কোন মোবাইল ফোনও ছিলনা। অগত্যা ছেলেটির বাবা আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হল। ততক্ষণে আবীরের অবস্থা ভয়ানক খারাপ। বাবা এসে আবীরকে
দেখে গ্রামের হাতুড়ে ডাক্তারকে(তখন রাত হয়ে গিয়েছিল,তাই পশু হাসপাতালে নেওয়া যায়নি) ডেকে নিয়ে আসলে সে যা বলল তাতে ছেলেটির পিলে চমকে উঠল । আবীরের পায়ের উপরের অংশ
কেটে গিয়ে সেখানে ঘা-এর সৃষ্টি এবং সেই ঘা থেকে কাঠখোট্টা নামের(ছেলেটি রোগের নামটি বুঝেনি) একটি রোগের সৃষ্টি এবং সেই রোগের ফলাফল...আবীর ছেলেটিকে ছেড়ে চিরদিনের জন্য না
ফেরার দেশে পাড়ি দিচ্ছে...... !!!
ডাক্তার যেসব ঔষধপত্র দিয়েছিলেন সেগুলো রাতে খাওয়ানো হল। সেদিন অনেক রাত পর্যন্ত ছেলেটি জেগে ছিল !! হঠাৎ তার চোখে ঘুম পাওয়ায় ঘুমিয়ে গেল কিন্তু সকালে উঠে যা দেখল সেটি ছিল তার
এই ছোট্ট জীবনে ঘটে যাওয়া কষ্টকর স্মৃতিগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশী কষ্টের !!! আবীর আর নেই !!!! আর কখনও সে আবীরের সাথে ঘুরতে পারবেনা। আবীর আর কখনও তার মাথায় উঠে তার চুলগুলো
ধরে টানবেনা, আবীর আর কখনও কানমলা খাবেনা......ছোট্ট মস্তিষ্কে এই ভাবনাগুলোই শুধু উঁকি দিচ্ছিল তখন !!! আর এদিকে পরিবারের অন্যান্যদের নিকটও মনে হচ্ছিল যেন তাদের কোন আপনজন
হারিয়ে গেছে !! ছেলেটিকে নিয়ে তার বাবা আবীরকে মাটি দিয়ে এলেন...তখনও ছেলেটি কাঁদতেছিল !!! ছেলেটি সারা সকাল, দুপুর,বিকেল না খেয়ে শুধু কান্নাকে সঙ্গী করে কাটিয়ে দিল। তারপর আস্তে
আস্তে প্রাকৃতিক নিয়মে ছেলেটির মনে আবীরের বিয়োগ-দুঃখ হাল্কা হয়ে আসে। এখন ছেলেটি অনেক বড় হয়ে গেছে । কিন্তু কখনো কখনো এত প্রকটভাবে আবীরের কথা ছেলেটির মনে পড়ে...তখন চোখের
পানি আটকে রাখার মতো দুঃসাহস তার হয়না !!!
©somewhere in net ltd.