| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
গ্রামবাসীরা আবেদ আলীর মৃত্যুটাকে শেষ পর্যন্ত অপঘাত বলেই মেনে নিল। আড়াই দিন ঘরের মানুষ ও গ্রামবাসীদের অনেক ভাবিয়ে আবেদ আলী ডুলপুই বিলের পুর মাথায় দুই হাতের মুঠোতে কিছু ঘাস আঁকড়ে ধরে উপুর হয়ে ভেসে ছিল। পরনের লুঙ্গি, গায়ের গেঞ্জি, কোমরের গামছা, হাত-পা-নাক-মুখ সবই জায়গা মতোই ছিল শুধু বাঁ চোখটা ছাড়া। এই দু-দিনেই চোখের গর্ত হয়ে উঠেছে মাছেদের আবাস। তাকে গোসল করানোর সময় নাকি ঐ গর্ত থেকে একটা চিংড়ি মাছ পাওয়া যায়। আবেদের এই মৃত্যুর জন্য গ্রামবাসীরা হা-হুতাশ ছাড়াও তার একরোখা স্বভাবকে দোষলো। বত্রিশ বছরের তাগড়া আবেদের মৃত্যু গ্রামবাসীদের শুধু হতাশই করেনি আফসোসের কারণও হয়ে দাঁড়িয়েছে। "মাছের বড় নেশা ছিল ছেলেটার"। হ্যাজাক জেলে নৌকার মাথায় বেঁধে কোঁচ নিয়ে বেরিয়ে পড়তো রাত বিরেতে। ঘরের বউটার কথা মনে থাকতো না সে সময়। ডুলপুই, লালচাপরা সব বিলই চষে ফেলতো মাছের সন্ধানে। সঙ্গী বলতে থাকতো একমাত্র মনসুর। বাপ মা মরা ছেলেটা নিজের ঘর রেখে সারাদিন পরে থাকতো আবেদের ঘরে। আর কেন যে কী সম্পর্কে আবেদ মনুসুরের দায়িত্ব একমতো নিজের ঘাড়ে তুলে নিয়েছিল তা আজও গ্রামবাসীর কাছে রহস্য হয়েই থাকলো। মনসুরের নাওয়া-খাওয়া ঘুম সব চলতো আবেদের বাড়িতে; আর রাতে নাও নিয়ে বের হতো মাছের নেশায়। সারারাত কাটিয়ে ফিরতো ফজরে। নাও ভরা সব চকচকা মাছ। আবেদ আর মনসুর বর্ষা এলেই প্রতিরাতে নাও নিয়ে মাছ ধরতো। কোন কোন দিন মনসুরের কি যেন হতো; মাছ মারতে যাওয়ার সময় তাকে খুজে পেত না আবেদ। বেশ কিছুক্ষণ হাঁক ডাকের পর আবেদ একাই বেরিয়ে যেত। যাওয়ার সময় বউকে বলে যেত "জইবন মনসুইর্যা ফিরলে কইস আমি তারে খুঁজছি।"
আবেদ আলীর আড়াই দিনব্যাপী নিরুদ্দেশের সময় মনসুরও ছিল নৌকায়। সেইদিন যাওয়ার সময় মনসুর উধাও হয়ে যায়। কিন্তু আবেদ তাকে খুঁজতে থাকে। আজ একটু দুরে যাবে। গভীর পানির মামলা। একা যাওয়া ঠিক না। অনেক খুঁজাখুঁজির পর বড় দিঘির পাড়ের হিজল গাছটার নিচথেকে মনুসরকে ধরে আনে আবেদ। আর মনে মনে ভাবে পোলাডারে জ্বিনে ধরলো নি?
মনসুর অবশ্য আড়াইদিন নিরুদ্দেশ থাকেনি। অপঘাতের পরদিন সেই হিজল গাছের নিচে অজ্ঞান অবস্থায় তাকে আবিষ্কার করে গ্রামের কেউ একজন। পরনে কোন কাপড় ছিলনা। পিঠে লাল লাল দাগ মাছের আঁশের মতো। অজ্ঞান অবস্থায় কাটায় দেড় দিন। আবেদ আলীকে পাওয়ার ঘণ্টা খানেক পূর্বে জ্ঞান ফিরে মনসুরের। জইবন মনসুরকে দেখে আর আবেদের জন্য বিলাপ করতে থাকে। একটু দূরে মাটিতে চুপচাপ বসে জইবনের বোন শইরফ। চোখ মুখ লাল হয়ে আছে। জইবন হঠাৎ বিলাপের সুরে সুরে তেড়ে যায় শইরফের দিকে "হারামজাদি রাক্ষসী তুই শেষ পর্যন্ত আমার কাল হইলি।" কেউ একজন জইবনকে ফেরায়। "আহা! পাগল অইলিনি"। কেউ বলে "কি করবো বেচারী! হাজার হউক নিজের সোয়ামি হারাইছে"। আবার দুই-একজনের ভিতর ফিসফিসানিও শোনা যায়। আর এই কোলাহলের মধ্যে উঠে বসে মনসুর। ঝড়ে বিপর্যস্ত কোন বসতির মতো লাগে মনসুরকে। কেউ একজন এরই মধ্যেই জিজ্ঞেস করে "মনসুর ঘটনা কি হইছে?" মনসুর কথা বলে না। আবার মেঝেতে শুয়ে চোখ বন্ধ করে। শইরফ এসে তার মাথার কাছে বসে বাতাস করতে থাকে।
শইরফ তার বোনের বিয়ের পর থেকেই এসংসারে থাকে। বাবা-মা না থাকায় ভাই ভাবীর সংসারে চেয়ে বোন দুলাভাইয়ের সংসাররেই বেশি স্বাচ্ছন্দ বোধ করলো সে। তারপর থেকে সে এ সংসারেই একজন। দুলাভাই আবেদ আলীর কটু কথা কিংবা বক্রোক্তি যে তাকে শুনতে হয়নি তা নয়। বরং সবসময়ই অনেক বেশিই শুনতে হয়েছে। তবে মাঝেমাঝে কার কি যে হতো বোঝা যেতো না। যে আবেদ মাঝরাতে সকল ডর-ভয় ফেলে মাছের নেশায় অতল পানিতে ভাসতো সে কিনা শইরফকে ভয় পেতো। এমনও সময় গেছে ঘোর অমবস্যায় আবেদ মাছের নেশায় নাও-হ্যাজাক নিয়ে তৈরি। পাড়া প্রতিবেশি তো দূর জইবনের নিষেধও শুনছে না। অথচ সেই সময় শইরফের মুখ তোলে একবার চাহনিতেই সব বাদ দিয়ে দিল। তারপর একদিন সময় করে আবেদ জইবনকে বলে মনসুরের সাথে শইরফের বিয়ের কথা তোলে। মনসুরও মনে মনে এতে সায় দেয়। কিন্তু বিয়ের কথা শুনার পর থেকেই শইরফ কেমন হয়ে যায়। চুপ চাপ একা একা। এরপর একদিন হাসি খুশ যুবক মনসুরও কেমন যেন উদাস হয়ে যায়। গ্রামের লোকজন শইরফের বাতাসে। লোকজন আবেদকে মাঝে মাঝে বলতো "এই দুইটার বিয়া দিয়া এইবার মনসুররে তার ভিটাত পাঠাও। আর কত ভূতের বোঝা?" আবেদ হাসতো। কিছু বলতো না। মনসুরের সাথে কথা বলে আবেদ আসছে আশ্বিনে শইরফের বিয়ে ঠিক করে। অথচ ভাদ্রের শুরুতেই অপঘাতটি ঘটলো।
আবেদের লাশ পাওয়া পর্যন্ত মনসুর অজ্ঞান ছিল। চোখে মুখে একটু পানির ঝাপটা দিয়ে বারান্দার বাঁশের পিঠ লাগিয়ে বসে ছিল। কেউ একজন কিছু খাবার এনে দেয়। কিছুই মুখে নেয়নি সে। আবেদের দাফনের পর ধীরে ধীরে মনসুরকে ঘিরে লোকজন বাড়তে থাকে। আড়াই দিন আগের সেই মাঝরাতে ডুলপুই বিলে কি ঘটেছিল তা জানবে বলে চোখ মুখ চকচক করতে থাকে সবার। চারিদিকে একটু দেখে নেয় মনসুর। তারপর একটু পানি চেয়ে শইরফের দিকে তাকায়। শইরফ এক গ্লাস পানি দেয়। এক চুমুকে পানি শেষ করে শুরু করে মনসুর। "তহন মাঝ রাইত। অন্যদিন এমন সময় রাইজ্যের মাছ উঠতো কিন্তুক আবেদ ভাই কোনমাছ তহনও পায় নায়। আমারে ডাইনে বাওয়ে দেহায় আর আমি পিছে বইয়া নাও টানি। আবেদ ভাই একটার পরে একটা বিড়ি টানে, কোন কথা কয় না। আমি কই, ভাই চলেন ফিইরা যাই। ভাই আমার দিকে চায়, কয় এই জীবনে আবেদন কোনদিন মাছ ছাড়া খালি হাতে বাড়ি ফিরে নাই। আর ফজরেরতো অহনও রাইজ্যের দেরি, অহনেই অত পাগল হইছস কেরে। চুপচাপ নাও বা। আমি আর কোন কথা কইনা। আচকাই আবেদ ভাই ঘাও দেয়। কিন্তুক লাগে না। আমি যতদিন আবেদ ভাইয়ের সাথে যাই এই পইলা কোন ঘাও বিফল হইতে দেখলাম। মনে মনে আমিও তাজ্জব হইয়া যাই। আবার কই, আবেদ ভাই চলেন ফিইরা যাই। আমার কথার কুনু জবাব না দিয়া ডুলপুইয়ের উত্তরের হিজল গড়ার দিকে ইশারা দিয়া কয় শব্দ ছাড়া চালা। আমি আবার কই, আবেদ ভাই জায়গাডা ভালা না। আজইরা। চলেন ফিইরা যাই। কিন্তু আবেদ ভাই আমার কথা কানও না লইয়া যেডা কই হেইডা কর। উল্ডা কথা কইছনা। আমি চালাইতে থাকি। মনে মনে আল্লারে ডাকি। আবেদ ভাই ঘাও দেয় আচকাই। একটা কাইলা লাগে। কিন্তুক নাও থইতেই ফাল মাইরা পইলা যায় পানিতে। আবেদ ভাই বিড়ির একটা নয়া বান্ডিল খুলে। হেরপর আমারে শ্মশান গড়ার পুবে যাইতে ইশারা করে। আমি কথাও কইনা, নাওও বাইনা। চুপচাপ বইয়া থাকি। আবেদ ভাই আস্তে আস্তে আমার বারাত আয়, কয় ডাইছস। নে একটা বিড়ি খা। আমি বিড়ি টানি আর ভাই আস্তে আস্তে বইয়া নাও টানতে থাকে। আচকাই একটা মাছ বিরাট উসা দেয় ঠিক নাওয়ের সামনে। দুইজনেই চমকাইয়া উঠি। অত বড় উসা আমি জীবনে দেখছি না। আবেদ ভাই বৈঠাডা আমারে দিয়া কোঁচটা লইয়া নাওয়ের সামনে খাড়া অয়। আমারে ইসারায় ডাইনে বামে দেখাইতে থাকে। মাছের নিশায় দুইজনের কেওরেই কুনু হুস আছিন না। দেখি নাও তো শ্মশানে বায় যায়। আমি আবেদ ভাইরে কই। হে কয় হাচাইতো। নাও ঘুরা। আকের বায় দেখি। যেই নাওড়া ঘুরানি শুরু করছি তখনি মাছটা আরেকটা উসা দেয় আর সাথে সাথে আবেদ ভাইও ঘাও চালায়। ঘাওয়ে সাথেই পানির মাছে বিশাল আগুনের মতো দেখি আর আবেদ ভাই কোঁচ ছাইড়া দিয়া আমারে জোরে জোরে নাও বাইতে কয়। আমি জানের জোরে নাও চালাইতে থাকি। আবেদ ভাই চিল্লাইতে থাকে আরেরা জোরে চালা আরো জোরে, এইডা মাছ না; এইডা শ্মশানে আজইরাডা। আমি পিছবায় একবার চাই দেখি আমরার নাওয়ের পিছে লাগা নাওয়ের চেয়ে বড় কালা একটা পিঠ, পিঠে কোঁচটা লাগাইল। সামনে চাইয়া না চাইয়া নাও টানতে থাকি কিন্তুক আজইরাডার সাথে আর পারি না। হেইডা আমরার নাওয়ের সাথে সমান অয়। হেরপর লেঙ্গুরডা দিয়া একটা বাড়ি দেয়। আমি একটা হিজল গাছে বাড়ি খাই আর হেরপরে কিছু কইতে পারিনা।" জইবন, শইরফ সহ সকল গ্রামবাসীরা মনসুরের কথা মনযোগ দিয়ে শুনে। আবার বিভিন্ন রকম মন্তব্য শুরু হয়ে যায়। এরমাঝ জইবন কাঁদতে কাঁদতে জোরে বলতে থাকে "সব মিছা কথা, সব মনসুইর্যার বানাইল কথা"। কিন্তু জইবনের এই কথাকে সবাই শোকের প্রলাপ ভেবে তাকে বলে "আইচ্ছা কও তো মনসুর মিছা কথা কইব কেরে, আর বানাইয়াই কইব কেরে, এছাড়া পোলাডার পিডে মাছের আইছলার মতো দাগড়ি দেহছনা।"
একদিন সময়ের সাথে আস্তে আস্তে গ্রামবাসীদের ভিড় ও কৌতুহলের মতো জইবনের কান্নাও কমে যেতে থাকে। মনসুর কয়দিন পরই জইবন ও শইরফের আহার বস্ত্রের প্রযোজন মিটানোর দায়িত্ব গ্রহণ করে। সেই হয়ে উঠে এই সংসারের কর্তা। শইরফের সাথে মনসুর তার বিয়েটা ভেঙে দেয়। কিন্তু শইরফ এনিয়ে কোন কথা বলে না। জইবনের ঘন ঘন আকুতির পরও মনসুরের শইরফকে বিয়েতে রাজি হয় না। যেমনি রাজি হয় না জইবন, শইরফ কিংবা গ্রামবাসীর নিষেধ মেনে গভীর রাতে মাছ ধরা ছাড়তে। আর এখনও বাইষ্যার শুরু থেকে শেষ ষব সময় প্রতি রাতেই হ্যাজাক জ্বেলে কোঁচ নিয়ে নাওয়ে উঠে মনসুর।
প্রতিরাতের মতোই আজ আবার হ্যাজাকে পাম্প দিতে থাকে মনুসর। জইবন এসে মনসুরকে বলে "আইজ থাইক্যা ভাদ্রমাসের শুরু, এই মাসটা বিলে না গেলে হয় না।" মনসুর কিছু না বলে হ্যাজাক ধরাতে থাকে। "আমার কথা কানে যায় না, পাপের কথা মনে হইয়া একটুও ডর লাগে না" ফুঁসতে ফুঁসতে বলে জইবন। জ্বালানো হ্যাজক হাতে নিয়ে নৌকার দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে বলে "দোষ খালি আমার, হেই সময় মনে আছিন না।" জইবন কোন কথা বলে না। চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে ঘরে। আর চেয়ে চেয়ে দেখে নাওয়ে উঠার সময় ঘাটের অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে শইরফ ভুল করে ফেলে আসা কোঁচটা মনসুরের দিকে নিঃশব্দে এগিয়ে দেয়।
২|
০৫ ই মার্চ, ২০০৯ বিকাল ৪:৪৮
মুহম্মদ জায়েদুল আলম বলেছেন: গল্পটা বেশ ভালো হয়েছে। এক নিঃশ্বাসে পড়লাম এরকম আরো লেখা চাই।
৩|
০৫ ই মার্চ, ২০০৯ বিকাল ৪:৫৪
আহসানুল কবীর তুহিন বলেছেন: এক নিঃশ্বাসে পড়লাম, কিন্তু শ্যাসে কিছুই বুঝলাম না।
৪|
০৫ ই মার্চ, ২০০৯ বিকাল ৫:০৪
আহমেদ রাকিব বলেছেন: অসাধারন। পড়তে পড়তে পদ্মা নদীর মাঝির কথাও মনে পড়ে গেল। অসাধারন হয়েছে। আরো চাই।
৫|
০৫ ই মার্চ, ২০০৯ বিকাল ৫:০৬
মরুবিজয় বলেছেন: ভাল্লাগলো
৬|
০৬ ই মার্চ, ২০০৯ সন্ধ্যা ৬:৪৪
আনাড়ী বলেছেন: চমৎকার গল্প। পেলাচ।
৭|
২৭ শে জুন, ২০০৯ দুপুর ২:১৫
মাজুল হাসান বলেছেন: মনসুরের নিজমুখে ঘটনার বর্ননার ঢঙ কেমন খাপছাড়া মানে অই টেনশনটা ঠিক আসলো না মনে হয়।
কিন্তু গল্পটার পট.. ফ্রেমিঙ, চমক সব ভাল লেগেছে।
শুভেচ্ছা।
©somewhere in net ltd.
১|
০৫ ই মার্চ, ২০০৯ বিকাল ৪:৩২
সব্যসাচী প্রসূন বলেছেন: অন্য রকম একটা স্বাদ পাওয়া গেল...