| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সিলেটে যুদ্ধাপরাধ
অপূর্ব শর্মা
যুদ্ধপরাধ বলতে যা বোঝায় তার প্রতিটি অপরাধই মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত হয়েছে সিলেট অঞ্চলে। পাকহানাদার বাহিনীর পাশাপাশি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও শান্তি কমিটির সদস্যরা এই অঞ্চলের মুক্তিকামী মানুষের ওপর যে বিভীষিকা চালিয়েছে তা রীতিমতো আঁতকে ওঠার মতো। স্বাধীনতার শত্রুরা গণহত্যা, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট চালিয়েছে যুদ্ধের পুরো ৯টি মাস। এমনকি হাসপাতালের রোগী, ডাক্তার কেউই রেহাই পায়নি বর্বরদের হাত থেকে।
স্বাধীনতা অর্জনের পর সারাদেশের ন্যায় সিলেটের দালালদেরও তালিকা তৈরি হয়। শুরু হয় যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে অভিযুক্তদের বিচার। কিন্তু ১৯৭৩ সালের ৩০ নবেম্বর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দিলে, এই ঘোষণাকে কৌশলে কাজে লাগিয়ে তৎকালীন সময়ে গ্রেফতারকৃত অনেক দালাল-রাজাকার মুক্তি লাভ করে। যদিও সেই ঘোষণায় গণহত্যা, নারী নির্যাতন, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের জন্য সুনির্দিষ্ট অভিযোগে অভিযুক্ত দালালদের ক্ষমা করা হয়নি। তারপরও অপ্রত্যাশিতভাবে ঘটে নানা ঘটনা। ১৯৭৫ সালে সপরিবারে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিহত হওয়ার পর শক্তিশালী হয়ে ওঠে দালালরা। খন্দকার মোশতাক ও জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ক্রমান্বয়ে প্রায় সব দালালই ছাড়া পেয়ে যায়। অসংখ্য দালালকে পুনর্বাসিত করা হয়। বিভিন্ন স্থানে দালালরাই চলে আসে ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে। যার ফলে মানবতা বিরোধীরা চলে যায় আইনের আওতার বাইরে।
হাসপাতালে হত্যাযজ্ঞ, হার মেনেছে সকল বর্বরতা
আন্তর্জাতিক নিয়ম অনুযায়ী যুদ্ধকালীন সময়ে হাসপাতাল নিরাপদ স্থান। কিন্তু পাক পশুর দল কোনো রীতিনীতি মানেনি। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে হিটলারের বাহিনীর চেয়েও বর্বর হয়ে ওঠে তারা।
১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল ভোর থেকে সিলেট শহরে মুক্তিবাহিনীর সাথে পাকবাহিনীর প্রচ- যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের দামামায় কেঁপে ওঠে পুরো শহর। এক পর্যায়ে মুক্তিবাহিনীকে লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালায় পাকবাহিনী। এতে আহত হয় অসংখ্য সাধারণ মানুষ। তারা চিকিৎসা নিতে ছুটে আসে সিলেট সদর হাসপাতালে। প্রাণ বাঁচাতেও হাসপাতালে এসে আশ্রয় নেয় অনেকে। সবার ধারণা ছিল হাসপাতালে আসবে না হানাদাররা। কিন্তু সকলের ধারণা মিথ্যে প্রমাণিত করে সকাল ১১টায় হাসপাতালটি চারপাশ থেকে ঘিরে ফেলে পাক আর্মি। এ সময় আহত রোগীদের চিকিৎসায় ব্যতিব্যস্ত ছিলেন অধ্যাপক ডা. শামসুদ্দিন আহমদ ও ডা. শ্যামল কান্তি লালাসহ অন্য চিকিৎসকরা। গুলির শব্দে ওয়ার্ড থেকে বের হয়ে আসেন ডা. শামসুদ্দিন, শ্যামল কান্তি লালাসহ অন্যরা। রেডক্রসের ব্যাজ পরিহিত ডাক্তাররা পাকবাহিনীর কাছে জানতে চান আক্রমণের কারণ। কিন্তু তাদের কোন কথা না শুনে অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল দিয়ে তাদের ঘেরাও করে তারা। ৭ জন রোগীকেও আটক করে। এরপর চালায় হত্যাযজ্ঞ। গুলিতে ঝাঝরা হয়ে যায়, ড. শামসুদ্দিন, শ্যামল কান্তি লালা, হাসপাতালের গাড়ি চালক কোরবান আলী, ওয়ার্ডবয় মুখলেছুর রহমান ও মাহমুদুর রহমান এবং ৭ জন রোগীর প্রাণ। সেই বর্বরতায় নেতৃত্ব দিয়েছিল পাক মেজর রিয়াজ।
১৬০ স্পটে গণহত্যা
সিলেট বিভাগের ১৬০টি স্পটে গণহত্যা সংঘটিত হয় একাত্তরে। এসব গণহত্যায় পাক বাহিনীর পাশাপাশি রাজাকার এবং আলবদরদের ভূমিকা ছিল মুখ্য। অনেক স্থানে রাজাকাররাই হত্যাযজ্ঞে নেতৃত্ব দিয়েছে। তাদের নিক্ষিপ্ত বুলেটে প্রাণ হারিয়ে নিরস্ত্র নিরপরাধ মানুষ।
সিলেটে গণহত্যা বইয়ে গবেষক তাজুল মোহাম্মদের ভাষ্য অনুযায়ী, সিলেট অঞ্চলে পাকবাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসরদের নির্মমতায় প্রাণ হারায় প্রায় ৫ হাজার ৫শ’ ৭ জন মানুষ। তন্মধ্যে সিলেট জেলায় ২ হাজার ৪৪৫ জন, সুনামগঞ্জ জেলায় ৭৪০ জন, মৌলভীবাজারে ১৩৬১ জন এবং হবিগঞ্জে প্রাণ হারায় ৯৫২ জন মানুষ। এই পরিসংখ্যানের বাইরেও অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারিয়েছে। এসব মানুষকে হত্যা করা হয়েছে বধ্যভূমিতে। যার ফলে এই অঞ্চলের ঠিক কত মানুষ আত্মোৎসর্গ করেছে স্বাধীনতার বেদিমূলে তার সঠিক পরিসংখ্যান বের করা দুরূহ ব্যাপার। এখানে কয়েকটি গণহত্যার বর্ণনা দেয়া হলো। এ থেকে সহজেই অনুমিত হবে দেশের-উত্তর পূর্বাঞ্চলের চার জেলায় কতটা নৃশংসভাবে বাঙালী নিধনযজ্ঞ চালিয়েছিল হানাদার ও তাদের এ দেশীয় দোসররা।
কৃষ্ণপুরে মহালয়ায় মহাপ্রলয় : সিলেট বিভাগের যে কয়টি স্থানে সংঘটিত গণহত্যার কথা স্মরণ করে আজও মানুষ চোখের জলে বুক ভাসায় তার মধ্যে হবিগঞ্জের লাখাই থানার কৃষ্ণপুর অন্যতম। ১৯৭১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর ভাটি বাংলার যোগাযোগ অনুন্নত এই গ্রামে হানা দিয়ে রক্তের হলি খেলায় মেতে ওঠে হানাদাররা। তাদের হাতে প্রাণ হারায় ১২৭ জন মুক্তিকামী বাঙালী। তাদের লাশ ভাসিয়ে দেয়া হয় নদীর জলে।
কৃষ্ণপুর, লাখাই উপজেলার শেষ সীমানা বলভদ্র নদের তীরে প্রত্যন্ত ভাটি এলাকায় অবস্থিত একটি গ্রাম। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর প্রায় ৬ মাস এই থানার মানুষজন স্বাভাবিক জীবন যাপন করে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানী সৈন্যরা হবিগঞ্জ থেকে লাখাই এলেও, কৃষ্ণপুরের দিকে তাদের নজন পড়েনি। হবিগঞ্জ মহকুমাসহ ভাটি অঞ্চলের বিভিন্ন দিকে পাকিস্তানীরা আগস্ট মাসে হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামগুলো আক্রমণ করে নানা জায়গায় গণহত্যা সংঘটিত করে। সেপ্টেম্বর মাসে পরিস্থিতির উন্নতি হতে থাকে। ভাটি অঞ্চলে তাদের অপারেশন নেমে আসে প্রায় শূন্যের কোটায়।
দীর্ঘদিন পাকিস্তানী হানাদারদের অত্যাচার থেকে মুক্ত থাকায়, কৃষ্ণপুরের লোকজন ভয়ে ভয়ে জীবন যাপন করলেও তাদের সদরে যাতায়াত ছিল অবাধ। ১৯৭১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর কৃষ্ণপুরের কয়েকজন গিয়েছিল থানা সদরে। তাদের ফিরতে সন্ধ্যা হয়ে যায়। বর্ষার পানিতে তখনও হাওড় পূর্ণ। তাই তারা ফিরছিল নৌকা করে। পথে গদাইনগরের পিছনে, চ-িপুর চকবাজারের কাছে তারা প্রত্যক্ষ করে কয়েকটি নৌকা। নৌকাগুলোতে লোকজন ছিল। কিন্তু অন্ধকারে কোন কিছু ঠাহর করার উপায় ছিল না। নৌকাগুলো স্থানীয় ছিল না। এগুলো এসেছিল নিকটবর্তী ধলেশ্বরী নদীর ওপারের অষ্টগ্রাম থানা থেকে। মহালয়ার কীর্তন হচ্ছিল সেদিন গ্রামজুড়ে। পরদিন ১৮ সেপ্টেম্বর, ঐদিন ছিল মহালয়া। লাখাই সদর থেকে যারা ফেরার পথে অচেনা নৌকাগুলোকে দেখেছিল, তারা কীর্তন ও আসন্ন মহালয়ার আনন্দে, সে কথা গ্রামের লোকদের জানাতে ভুলে গিয়েছিল।
রাতভর কীর্তন শুনেও অনেকে ঘুম থেকে অভ্যাসমতো উঠেছিল ভোর বেলা। তাদের কেউ কেউ রেডিও দিয়ে আকাশবাণী আগরতলা থেকে শুনছিল মহালয়ার বয়ান। ভোরবেলা অন্যদের সাথে উঠেছিলেন প্রিয়তোষ রায়, অমলকৃষ্ণ রায়, সুনীল চন্দ্র দাষ, হরিদাস রায়, ভূষণ সূত্রধর, বনবিহারী রায়। রাতের কীর্তনে অংশ নিয়েছিলেন তাঁরাও। প্রভাতে উঠেছিলেন মহালয়ার সূর্যোদয় দেখার বাসনায়। কিন্তু তাদের দেখতে হলো এক মহাপ্রলয়।
পাকিস্তানীরা রাতেই গ্রামের চারদিকে রাজাকার বোঝাই নৌকাগুলোকে মোতায়েন করে নিঃশব্দে। দূরে দূরে ছিল নৌকাগুলো; যাতে কেউ সন্দেহ না করে যে গ্রাম ঘেরাও করা হচ্ছে। সকালে অষ্টগ্রাম থেকে দুটো স্পিডবোটে দু’দল পাকিস্তানী সৈন্য গ্রামে এসে হাজির হয়। গ্রামে প্রবেশ করার সাথে সাথেই শুরু হয় চারদিক থেকে গুলিবর্ষণ। একটা স্পিডবোট গ্রামে ভিড়িয়ে একদল পাকিস্তানী সৈন্য ডাঙ্গায় উঠে, আর একটা টহল দিতে থাকে গ্রামের চারপাশে। আর্মিদের মধ্যে কয়েকজন ছিল ড্রেস পরা, কয়েকজনের গায়ে ছিল গেঞ্জি। এর মধ্যে রাজাকারদের ২০/২৫টা নৌকাও গুলিবর্ষণ করতে করতে শুকনো জায়গায় এসে দাঁড়ায় এবং সশস্ত্র অবস্থায় তারা গ্রামে প্রবেশ করে লুটপাট শুরু করে। ঘরে ঘরে প্রবেশ করে একে ওকে ধরে নির্যাতন চালাতে থাকে এবং টাকা পয়সা সোনা-দানা বের করে দিতে বলে। ভয়ে সবাই যার যা কিছু ছিল তুলে দেয় যমের মূর্তি ধরা রাজাকারদের হাতে। সামান্য টালবাহানা দেখতে পেলেই তারা গুলিবর্ষণ করেছে। লুটপাটের পর শুরু হয় গণহত্যা। প্রতিটি পাড়া থেকে রাজাকাররা খোঁজে বের করে পুরুষদের, এনে তাদেরকে লাইন করে দাঁড় করায় এবং গুলি করে হত্যা করে। লালচানপুর পাড়ার মধু নমঃশূদ্রের বাড়িতে জড়ো করে প্রায় ৪০ জন গ্রামবাসীকে। রাজাকাররা তাদেরকে লাইন করে দাঁড় করিয়ে তল্লাশির নামে প্রথমেই লুট করে তাদের সাথে থাকা টাকা পয়সা। তারপর গুলি করে হত্যা করে সবাইকে। এর মধ্যে দু’একজন কৌশলে আত্মগোপন করে গ্রামের সন্নিকটস্থ আমন জমিতে। গোকুলনগরে চলে একই অবস্থা। সেখানে যদুরায়ের বাড়িতে লাইনে দাঁড় করে সবাইকে একযোগে হত্যা করে রাজাকার ও পাকিস্তানী সৈন্যরা। লুটপাট, হত্যার মাঝে নারী নির্যাতনও চলতে থাকে সমান তালে।
গ্রামের মাঝে ছিল অনেক পুকুর, কাছেই ছিল নদী ও ধানী জমি। গোলাগুলির আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে লুকানোর জন্য সবাই ছুটে যায় সে সব জায়গায়। কিন্তু সবার ভাগ্য সেদিন সমান ছিল না। পাকিস্তানীদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আশপাশ ও দূরদূরান্তের গ্রাম থেকে অনেক সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের লোক নিরাপত্তার আশায় আশ্রয় নিয়েছিল কৃষ্ণপুরে। তারা বিপদে কোথায় আশ্রয় নিতে হবে, তা জানত না। ফলে তাদের হতে হয় আক্রমণের সহজ শিকার। শুধুমাত্র চ-িপুরপাড়ায় বসত ছিল ১৬টি পরিবারের। তার মধ্যে কেবল হরিপদ, গোপাল রায় ও সুকোমল রায় প্রাণ বাঁচাতে সক্ষম হন, অন্য সবাইকে পাকিস্তানী সৈন্য ও রাজাকাররা লাইনে দাঁড় করিয়ে গুলিবর্ষণ করে হত্যা করে। ঐ গ্রামটি এখনও পরিত্যক্ত এবং বসবাসের অনুপযোগী। চ-িপুরের মতো গকূলনগরে বেঁচে যান প্রিয়তোষ, ভিস্ম ও নাম না জানা আরেকজন। এখন তারা কালের সাক্ষী। রাজাকার ও পাকিস্তানী সৈন্যরা সারাদিন গ্রামে উন্মত্ত খুন, লুটপাট ও নারী নির্যাতন চালিয়ে বিকেলে গ্রাম ছেড়ে চলে যায়।
চ-িপুরে সংঘটিত ঐ হত্যাকা-ে কতজন প্রাণ দিয়েছিলেন, তার সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা যায়নি। তবে যারা চ-িপুর গ্রামের বাসিন্দা তাদের মধ্যে নিহত হন মোট ৪৫ জন। গ্রামের নৃপেনকৃষ্ণ রায় জানান, তাদের গ্রামের অঞ্জন রায় গুনে গুনে ভিন্ন গ্রামের ১২৭টি লাশ ভাসিয়ে দিয়েছিলেন নদীর জলে। তবে প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, চ-িপুরে দুই শতাধিক লোক নিহত হন সেদিন। প্রকৃতপক্ষে সেদিন কত লোক নিহত হয়েছিল সেই তালিকা তৈরি করা সম্ভব হয়নি আজও।
মাকালকান্দিতে রক্তে একাকার হয় পূজার ফুল : হবিগঞ্জের মাকালকান্দি। একটি প্রত্যন্ত গ্রাম। এই গ্রামের লোকেরা হিটলারের নাম শুনেছেন। তার নাৎসি বাহিনীর নাম শুনলে শুনেও থাকতে পারেন। তবে নাৎসি বাহিনীর ভয়াবহতার লোমহর্ষক কাহিনী এসব গ্রামীণ মানুষদের কাছে একেবারেই অজানা। অথচ কে জানত, একদিন এই গ্রামীণ খেটে খাওয়া মানুষদের ওপরই নেমে আসবে নাৎসি বাহিনীর চেয়েও ভয়ঙ্কর এক বাহিনীর ভয়াল নির্যাতন!
’৭১ সালের ১৮ আগস্ট সকাল বেলা গ্রামের চ-ি মন্দিরে মনসা ও চ-ি পূজার প্রস্তুতি নিচ্ছিল হিন্দু অধ্যুষিত গ্রামের বাসিন্দারা। এ সময় ৪০/৫০টি নৌকাযোগে পাকবাহিনী এসে গ্রামে হামলা চালায়। পূজারত নারী-পুরুষকে চ-ি মন্দিরের সামনে দাঁড় করিয়ে ব্রাশ ফায়ার করে। এতে একই পরিবারের ১১ জনসহ ৮৫ গ্রামাবাসী প্রাণ হারান। গ্রামবাসীর রক্তে লাল হয় পূজার ফুল। হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে পাক বাহিনী স্থানীয় রাজাকারদের সহায়তায় ভাটি বাংলার শিক্ষা-দীক্ষা, খাদ্য ভা-ারে সমৃদ্ধশালী গ্রাম মাকালকান্দি থেকে কোটি টাকার সম্পদ লুটে করে। নারীদের ওপর চালায় পাশবিক অত্যাচার। যাবার সময় পেট্রোল ঢেলে পুড়িয়ে দেয় বাড়িঘর।
হবিগঞ্জের বানিয়াচং উপজেলা সদর থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন ভাটি অঞ্চলে দ্বীপের মতো অবস্থান কাগাপাশা ইউনিয়নের মাকালকান্দি গ্রামটির। সনাতন ধর্মাবলম্বী অধ্যুষিত, শিক্ষা-দীক্ষা ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে সমৃদ্ধশালী গ্রামটিতে মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকবাহিনী হানা দেবে তা গ্রামের লোকজনের ছিল ভাবনার অতীত। তারা নিশ্চিন্তে অতিবাহিত করছিলেন অস্থিতিশীল সময়। স্থানীয় শান্তি কমিটির নেতা সৈয়দ ফয়জুল হক তাদেরকে অভয় দিয়েছিল রক্ষার। সেই ফয়জুল হকই পাকবাহিনীকে পথ দেখিয়ে মাকালকান্দি গ্রামে নিয়ে আসে। নিরস্ত্র গ্রামবাসীর ওপর চলে নারকীয়তা। এমনকি চারদিনের শিশু পর্যন্ত রেহাই পায়নি তাদের হাত থেকে। মায়ের কোল থেকে কেড়ে নিয়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করা হয় তাকে। শিশুটির মা দুঃসহ সেই স্মৃতি নিয়ে বেঁচে আছেন। সেদিনের কথা বলতে গিয়ে মিনতি রানী চৌধুরী (৭৬) কান্নায় ভেঙ্গে পড়ছিলেন। বলছিলেন, আমার করার কিছুই ছিল না। চোখের সামনে আমার চারদিনের ছেলেকে হত্যা করে পশুরা। তাদের পায়ে পড়েছিলাম কিন্তু কোন লাভ হয়নি। সেদিন আকস্মিকভাবে বেঁচে গেছি।
গুলিবিদ্ধ হয়েও সেদিন প্রাণে রক্ষা পান কংশ মোহন দাশ (৮৫)। তিনি জানান, সারিবদ্ধ অবস্থায় আমাদেরকে গুলি করে পাঞ্জাবীরা। গুলিবিদ্ধ হয়ে আমিও পড়ে যাই। যখন জ্ঞান ফিরে আসে তখন নিজেকে লাশের স্তূপে আবিষ্কার করি। দীর্ঘদিন চিকিৎসার পর সুস্থ হলেও পঙ্গুত্ব ঘোচেনি।
পাকিস্তানীদের হাতে সেদিন যারা প্রাণ হারিয়েছিলেন তাদের মধ্যে যাদের পরিচয় নিশ্চিত হওয়া গেছে তারা হলেনÑ কর্ণমোহন চৌধুরী, কৃপেন্দ্র চৌধুরী, কানু চৌধুরী, গিরিন্দ্র চৌধুরী, ধীরেন্দ্র চৌধুরী, নকুল দাশ, প্রমোদ চৌধুরী, অন্নদা চৌধুরী, মীরালাল চৌধুরী, জহরলাল দাশ, গুনেন্দ্র দাশ, হরেন্দ্র চৌধুরী, ক্ষীরেন্দ্র চৌধুরী, গুরুচরণ চৌধুরী, রবীন্দ্র চৌধুরী, ফণিলাল দাশ, ইন্দ্রলাল দাশ, সরীন্দ্র দাশ, সূর্যমণি দাশ, অভিনয় চৌধুরী, গিরিষ চৌধুরী, জ্যোতিষ চৌধুরী, খোকা চৌধুরী, কুমেদ চৌধুরী, নৃপেন্দ্র দাশ, লবুরাম দাস, তরণী দাশ, দীনেশ দাশ, ঠাকুরচান দাশ, মনোরঞ্জন দাশ, খতন দাশ, সদয়চান দাশ, কুমোদিনী চৌধুরী, সরলাবালা চৌধুরী, ছানুবালা চৌধুরী, মিনুবালা চৌধুরী, তমাল রানী চৌধুরী, সুশীলা সুন্দরী চৌধুরী, নিত্যময়ী চৌধুরী, মুক্তলতা চৌধুরী, স্বপ্না রানী চৌধুরী, ললিতা রানী চৌধুরী, মিলু রানী চৌধুরী, পিলু রানী চৌধুরী, উজ্জ্বলা রানী দাশ, সত্যময়ী দাশ, উন্মাদিনী দাশ, হেমলতা দাশ, সুচিত্রা বালা দাশ, ব্রহ্মময়ী দাশ, শুসীলা বালা দাশ, চিত্রাঙ্গ দাশ, বিপদনাসিনী চৌধুরী, সোহাগী বালা দাশ, শৈলজ বালা দাশ, শোভা রানী বালা দাশ, অঞ্জু রানী দাশ, মরীরানী দাশ, লক্ষ্মী রানী দাশ, সোমেশ্বরী দাশ, চিত্রময়ী চৌধুরী, শ্যামলা চৌধুরী, তরঙ্গময়ী চৌধুরী, সরস্বতা চৌধুরী ও সরুজনী চৌধুরী।
দিনের আলোতেও লাল হয়ে উঠেছিল শ্রীরামসীর আকাশ : ১৯৭১ সালে ৩১ আগস্ট সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুর থানার শ্রীরামসীতে হানা দেয় হায়নার দল। শ্রীরামসী বাজারে পৌঁছেই উপস্থিত লোকদের ঘিরে ফেলে তারা। স্কুলে মিটিংয়ের কথা বলে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের। সে সময় পাক ক্যাপ্টেন সরফরাজ খানের নির্দেশে রাজাকার কমান্ডার আহমদ আলী গ্রামের লোকজনকে মাইকিং করে জানিয়ে দেয় স্কুলে আসার জন্য; অন্যথায় তাদের অসুবিধা হবে। তাদের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে পালাবার পথ ছিল না। একমাত্র যাতায়াতের পথে শত্রুদের কড়া পাহারা থাকায় যারাই নৌকাঘাটে গেছে তাদেরকেই ধরে নিয়ে আসা হয়েছে স্কুলে। সব মিলিয়ে আটক করা হয় প্রায় দুই শতাধিক লোককে।
স্কুল ঘরের নবম শ্রেণীর পাঠকক্ষে জড়ো করা হয় সবাইকে। পাক সেনাদের নেতৃত্বে সরফরাজ খান। শ্রেণীকক্ষে দু’জন করে পিঠাপিঠি হাত বেঁধে ফেলা হয় সকলের। ভয়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন আটককৃতরা। অভয় দেয় বিশ্বাসঘাতক পাক সেনারা। বলে- ‘ভয় পাওয়ার কিছু নেই। জগন্নাথপুর নিয়ে গিয়ে সবার বিচার হবে। তারপর সবাইকে ছেড়ে দেয়া হবে।’ বাধা পড়া লোকদের কেউই জানেন না- কেন তাদের বাধা হয়েছে, বিচারই বা কিসের হবে! এমন সময় রাজাকার কমান্ডার আহমদ আলী এসে কক্ষে প্রবেশ করে কথা বলে সরফরাজের সাথে। মুক্তিকামী মানুষের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করে সে। এরপর সেখান থেকে পশুর মতো টেনে হিঁচড়ে বেঁধে রাখা লোকজনকে নিয়ে যাওয়া হয় নৌকাঘাটে। দুটি নৌকাতে করে দু’দিকে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের। (২৩-এর পাতায় দেখুন)আহমদ আলীর নিকটাত্মীয় মছরব উল্লার বাড়ির পুকুরপাড়ে গিয়ে থামানো হয় একটি নৌকা। একে একে নৌকা থেকে নামানো হয় হাত বাঁধা লোকদের। এসেম্বলির লাইনের মতো লাইন করে দাঁড় করানো হয় সবাইকে। তারপর শ্রীরামসী শুনল টানা গুলির শব্দ। এই পুকুরপাড়েই এক সাথে হত্যা করা হলো ৪৬ জনকে।
অন্যদিকে নিয়ে যাওয়া নৌকাগুলোকে স্থানীয় আব্রু মিয়ার বাড়ির সামনে দাঁড় করানো হয়। এরপর পাক সেনারা পুকুরের পাশেই দাঁড় করা নৌকার ওপর হত্যাযজ্ঞ চালায়। সেখান থেকে কেউই পালাতে পারেননি। একেএকে গুলি করে হত্যা করা হয় ৯৩ জন মুক্তিকামীকে।
শুধু হত্যাযজ্ঞ চালিয়েই ক্ষান্ত হয়নি পাক সেনা আর তাদের দোসররা। এরপর বাজার ও ধনাঢ্য ব্যক্তিদের বাড়িতে চালানো হয় লুটপাট। লুটপাটের কাজটি শেষ হলে কেরোসিন ঢেলে বাজার ও গ্রামে আগুন ধরিয়ে দেয়া হয়। আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হয় বাজার-গ্রাম। দিনের আলোতে লাল হয়ে ওঠে শ্রীরামসীর আকাশ।
রানীগঞ্জে নদীর জলে ভেসে যায় শহীদদের লাশ : ১৯৭-এর ১ সেপ্টেম্বর জগন্নাথপুর উপজেলার রানীগঞ্জে আসে হায়েনার দল। তারা বাজারে জড়ো হওয়া লোকজনদেরকে শান্তি কমিটি গঠনের কথা বলে কুশিয়ারার তীরবর্তী একটি হোটেলে নিয়ে যায়। সেখানে নিয়ে যাওয়ার পর পাকিস্তানীদের নির্দেশ অনুযায়ী দেশীয় দালালরা মুক্তিকামী প্রায় দুই শ’ বাঙালীকে বেঁধে ফেলে। গ্রুপভিত্তিক বাঁধা হয় লোকজনদেরকে। প্রথমে সারিবদ্ধভাবে ৫-১০ জন করে বাঁধা হয় তরুণদের। এরপর তাদের নিয়ে দাঁড় করানো হয় নদীর একেবারে তীরে। পর্যায়ক্রমে গুলি করে হত্যা করা হয় অসংখ্য নিরপরাধ বাঙালীকে। হত্যার পর লাশ ফেলে দেয়া হয় নদীতে। অসংখ্য লাশ ভাসিয়ে নিয়ে যায় স্রোতস্বিনী কুশিয়ারা। সে কারণে রানীগঞ্জে মোট কতজন লোককে হত্যা করা হয় এর সঠিক সংখ্যা নিরূপণ করা সম্ভব হয়নি। এর পেছনেও অন্য একটি কারণ ছিল। তা হচ্ছেÑ যাদেরকে হত্যা করা হয় তাদের মধ্যে স্থানীয়দের চেয়ে অস্থানীয়দের সংখ্যাই ছিল বেশি। স্থানীয়ভাবে ৪০ জনের লাশ শনাক্ত করা সম্ভব হয়। আর সেই লাশগুলোকে আত্মীয়-স্বজনরা পারিবারিক অথবা গ্রামের কবরস্থানে নিয়ে দাফন করেন। রানীগঞ্জ হত্যাযজ্ঞের পাকিস্তানীদের নেতৃত্বে ছিল পাক ক্যাপ্টেন সরফরাজ খান। আর স্থানীয় দালালদের মধ্যে যারা উপস্থিত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে তারা হচ্ছে- আছাব আলী, আহমদ মিয়া, মনোহর আলী, আবদুর রাজ্জাক।
নারী নির্যাতন
মুক্তিযুদ্ধ শুরুর পর থেকেই পাকহানাদার বাহিনী যেভাবে নিরীহ মুক্তিকামী বাঙালী হত্যাযজ্ঞে মেতে ওঠে তেমনি নারীদের ওপর চালাতে থাকে নারকীয়তা। প্রায় প্রতিটি গণহত্যাস্থলেই ধর্ষিত হয়েছেন মা-বোনেরা। শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধা, কেউই রেহাই পাননি পাক পশুদের হাত থেকে। অন্তঃসত্ত্বা, প্রসূতি যাকেই পেয়েছে তাকেই তারা বানিয়েছে ভোগের সামগ্রী। সিলেটের তিনদিকে ভারত সীমান্ত থাকায় নির্যাতিতদের অনেকেই সে সময় দেশ ছেড়ে ওপারে পাড়ি জমিয়েছেন চিরদিনের জন্য। সে কারণে বীভৎসতার পুরোপুরি চিত্র উঠে আসেনি। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সামাজিক বাস্তবতায় নারী নির্যাতনের অধিকাংশ ঘটনা ছাইচাপা পড়েছে। তারপরও যে সকল ঘটনা কালের গহ্বরে হারিয়ে যায়নি সেগুলোও কম নয়। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সিলেট অঞ্চলে ধর্ষিত হয়েছেন এমন নারীর সংখ্যা ২ হাজার ১২৮ জন। তন্মধ্যে সিলেট জেলায় ৬৯৩ জন, সুনামগঞ্জে ২০৫ জন, মৌলভীবাজারে ৮৫০ জন এবং হবিগঞ্জ জেলায় ধর্ষিত হয়েছেন ৩৮০ জন নারী।
১৯৭১ সালে পাক হানাদাররা যে সকল স্থানে ক্যাম্প স্থাপন করেছিল এর প্রায় প্রত্যেকটিতেই নারী নির্যাতনের জন্য নির্ধারিত কক্ষ ছিল। সিলেট মডেল হাইস্কুলেও শত শত নারীকে ধরে এনে তারা পাশবিক অত্যাচার চালিয়েছে। সিলেট বিভাগজুড়েই চলে হায়নাদের ঘৃণ্য অপতৎপরতা। এমনকি চা বাগানের কৃষ্ণাঙ্গ যুবতী, মহিলা, বৃদ্ধা কেউ রেহাই পায়নি তাদের হাত থেকে। যাকে সামনে পেয়েছে তাকেই তারা বানিয়েছে লালশার সামগ্রী। কোথাও বা পিতা-মাতার সামনে সন্তানের ওপর, কোথাও বা স্বামীর সামনে স্ত্রীর ওপর চালিয়েছে বীভৎসতা।
মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী সময়ে অনেক নারীর করুণ উপাখ্যান জনসম্মুখে আসে। চা বাগানগুলোতে পাশবিকতার শিকার হওয়া নারীদের মধ্যে যাদের পরিচয় পাওয়া গেছে তারা হচ্ছেÑ বিন্দু নায়েক, সুরোধনী নায়েক, শান্তি ভৌমিক, যশোধা নায়েক, রাজ্যেশ্বরী ঘোষ, লক্ষ্মী রানী লামা, আফেজা বেগম, অহল্যা চাষা, ধনী কর্মকার, জ্যোৎস্না বেগম, বুধুনী উরাং, রেবতী মাহালী, শুভদ্রা বাউরী, তারাভানু, মন্দ তাঁতী, যমুনা ভূমিজ, শনকালীয়া নায়েক, পারকৃষ্ণ গোয়ালা, বাতাসিয়া রুহিদাস, জানকী তাঁতী প্রমুখ।
পাক সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতিত হওয়া বাঙালী নারীদের মধ্যে গুটিকয়েকজন ছাড়া বাকি সবাই নিজেদের দুঃখজাগানিয়া ঘটনাকে বুকের মধ্যে পাথরচাপা দিয়ে রেখেছেন। তারা তা প্রকাশ করতে চান না। তবে, নিজেদের পরিচয় লুকিয়ে রাখতে চাননা এমন নারীর সংখ্যাও কম নয়। প্রভা রানী মালাকার, আরিনা বেগম, এশনু বেগম, জ্যোৎস্না বেগম, প্রবাসী মালাকার, সাফিয়া খাতুন, পুষ্প রানী, সাবিত্রী নায়েক, সন্ধ্যা রানী, ছাবেদা, মনোয়ারা এবং হীরামনির নির্যাতন ভাষ্য শুনলে এ অঞ্চলে নারী নির্যাতনের ভয়াবহতার চিত্র পাওয়া যায়।
অগ্নিসংযোগ, লুটপাট
পাকহানাদার বাহিনী ও তাদের এদেশীয় পদলেহনকারীরা প্রতিটি গণহত্যার পর পরই লুটপাট চালিয়ে নিজেদের আখের গুছিয়েছে। লুটপাট শেষে আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে ছারখার করেছে গ্রামের পর গ্রাম। মুক্তিকামী মানুষকে মাথাগোঁজার ঠাঁইহীন করার জন্যই এমন ঘৃণ্য পন্থা অবলম্বন করেছিল পশুর দল। সিলেটে গণহত্যা বইয়ে এই অঞ্চলে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের যে পরিসংখ্যান পাওয়া যায় তা চমকে ওঠার মতো। পরিসংখ্যান অনুযায়ী সিলেট বিভাগের চার জেলায় ৫ হাজার ১৪৮টি অগ্নি সংযোগের ঘটনা ঘটে। আর লুটপাটের ঘটনা ঘটে ৫ হাজার ২১৭টি। তার মধ্যে সিলেট জেলায় ৭৬৯টি, সুনামগঞ্জ জেলায় ৪৩৫টি, মৌলভীবাজার জেলায় ২ হাজার ৭৯টি, হবিগঞ্জে ১২৩৫টি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। আর সিলেট জেলায় ৬২০টি, সুনামগঞ্জ জেলায় ৩৭০টি, মৌলভীবাজার জেলায় ২ হাজার ৮৯৭টি এবং হবিগঞ্জে ১৩৩০টি লুটপাটের ঘটনা ঘটে। এসব অগ্নিসংযোগ আর লুটপাটের ফলে সর্বস্বান্ত হয়েছে মানুষ।
আলোচিত কতেক যুদ্ধাপরাধী
সিলেট অঞ্চলে গণহত্যা, জাতিগত নিধন, ধর্ষণ, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের ঘটনায় পাকিস্তানী ১২ জন সেনা সদস্য নেতৃত্ব দিয়েছে। তাদের তত্ত্বাবধানেই পরিচালিত হয়েছে এই অঞ্চলের সকল অপকর্ম। ওয়ার ক্রাইমস ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির গবেষণা অনুযায়ী সিলেটে যুদ্ধাপরাধের দায়ে যেসব পাকিস্তানীকে অভিযুক্ত করা হয়েছে তারা হচ্ছে, জেনারেল নিয়াজী, সরফরাজ খান, ক্যাপ্টেন ইউসুফ, ক্যাপ্টেন গোলাম রসুল, ক্যাপ্টেন নুরুউদ্দিন খান, মেজর আজিজ খটক, ক্যাপ্টেন রফিক, সুবেদার লাল খান, কর্নেল সরফরাজ মালিক, মেজর আজিজ, ব্রিগেডিয়ার ইফতেখার রানা, ব্রিগেডিয়ার আল ফালা। এইসব যুদ্ধাপরাধীদের সহায়তা করেছে এদেশীয় রাজাকার আলবদর, আলশামস এবং শান্তিকমিটির সদস্যরা। তারাই মুক্তিকামীদের তালিকা তৈরি করে হত্যা করিয়েছে স্বাধীনতাকামী বাঙালীদের। এই অঞ্চলে যাদের কারণে পাকিরা ভয়াবহতা চালিয়েছিল একাত্তরে তাদের মধ্যে উল্লেযোগ্য কয়েকজন সম্পর্কে আলোকপাত করা হলো এখানে।
আহমদ আলী : মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে আহমদ আলী ছিল এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম। সুনামগঞ্জ জেলার জগন্নাথপুরের মুক্তিযোদ্ধা থেকে শুরু করে তৎকালীন সময়ের প্রায় সকলেই আহমদ আলীকে কুখ্যাত রাজাকার হিসেবেই জানে। একাত্তরের ৩১ আগস্ট জগন্নাথপুরে শ্রীরামসীতে যে হত্যাযজ্ঞ সংঘটিত হয় তার আয়োজন করেছিল কুখ্যাত রাজাকার আহমদ আলী। গণহত্যায় প্রাণ হারিয়েছিল নিরস্ত্র অন্তত দু’শ’ মুক্তিকামী বাঙালী।
সাত্তার মিয়া : পাক বাহিনী বৃহত্তর সিলেটের মধ্যে প্রথম অপারেশন চালায় সুনামগঞ্জের তেঘরি গ্রামে। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্ম তারিখে সুনামগঞ্জে প্রবেশ করে পাক সেনারা। সাত্তার মিয়াই সিলেট থেকে সুনামগঞ্জে নিয়ে যান পাক সেনাদের।
মুক্তিযুদ্ধের সময় এমন কোন অপরাধ নেই যা করেনি সাত্তার। মুক্তি সংগ্রামের বিভীষিকাময় দিনগুলোতে সে সুনামগঞ্জের লক্ষ্মণশ্রী, জয়কলস পাগলা, বীরগাঁও, পাথারিয়া, মোহনপুর, শিমুলবাক ইত্যাদি ইউনিয়নের শত শত গ্রামের ওপর তার গু-াবাহিনী নিয়ে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। তার নেতৃত্বে শত শত ঘরবাড়ি পুড়িয়েছে রাজাকাররা। তার কারণে প্রাণ হারিয়েছে অগণিত মানুষ, ধর্ষিত হতে হয়েছে অনেক মা বোনকে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর তার বিরুদ্ধে ২০৫টি মামলা হয়। ধরাও পড়ে সে। কিন্তু বিচারের মুখোমুখি হতে হয়নি তাকে।
আছাব আলী : মুক্তিযুদ্ধের সময় আছাব আলী ছিল জগন্নাথপুর শান্তি কমিটির আহ্বায়ক। সে কারণে একাত্তরে জগন্নাথপুরে সংঘটিত হত্যা, লুটতরাজ-সবকিছুতেই তার ইন্ধন ছিল। ’৭১-এর সাহসী যোদ্ধা সাজ্জাদ হোসাইন দাবি করেন, আছাব আলীর ইন্ধনেই শ্রীরামসী ও রানীগঞ্জের গণহত্যা পরিচালনা করে পাক হানাদাররা। এই দুটি হত্যাযজ্ঞেই মদদ যুগিয়েছিল সে। তার সাথে ছিল রাজাকার কমান্ডার আহমদ আলী, আবদুর রাজ্জাক, এহিয়া, ছুফি মিয়া ও তফজ্জুল গংয়।
জগন্নাথপুরে বাড়িঘর জ্বালানো, ধ্বংস ও লুটপাটের অভিযোগে স্থানীয় শান্তি কমিটির সদস্য, রাজাকার ও দালালদের বিরুদ্ধে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারি জগন্নাথপুর থানায় একটি এজাহার দায়ের করেন মীর্জা আবদুল খালেক। এতে পাক আর্মীসহ মোট ১৪০ জনকে আসামি করা হয়। এই মামলার দেশীয় আসামিদের তালিকায় ২ নম্বরে ছিল আছাব আলীর নাম। কিন্তু বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি তাকে।
মাহতাব চৌধুরী : মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া শহরতলির পুষাইনগরে ১৯৭১ সালের চৈত্র মাসের ২৫ তারিখে শান্তি কমিটি গঠনের কথা বলে রাজাকার মাহতাব চৌধুরী ও বাতির মেম্বার সাধারণ জনগণকে একত্রিত করে। অসহায় মানুষের পক্ষে তাদের নির্দেশ অমান্য করা সম্ভব ছিল না। পুষাইনগরের নরেশ ঘোষের বাড়িতে বিকাল ৪টায় যাদের জড়ো করা হয় তাদের অধিকাংশই ছিল হিন্দু সম্প্রদায়ের। সূর্য তখন পশ্চিমদিগন্তে ডুবু-ডুবু অবস্থায়। নরেশ ঘোষের বাড়ি চতুর্দিক ঘেরাও করে পাকবাহিনী। অত্যাচার চালিয়ে হয় অর্ধশতাধিক ব্যক্তির ওপর। কিছু বুঝে ওঠার আগেই ১৪ জন নিরীহ লোকের হাত-পা ও চোখ বেঁধে ফেলা হয়। সন্ধ্যার দিকে চিকিৎসার কথা বলে তাদের বস্তাবন্দী করে ট্রাকে ওঠানো হয়, নিয়ে আসা হয় কুলাউড়া হাসপাতালে। তারপর রাত আটটায় শুরু হয় হত্যাযজ্ঞ। মাহতাব চৌধুরী ও বাতির মেম্বার গংয়ের ইশরায় নৃশংসভাবে হত্যা করা হয় একে একে ১৩ জনকে। ৭১ এর রাজাকার মাহতাব চৌধুরী এখন কুলাউড়ার বিশিষ্ট সমাজপতি।
মিছির উল্লাহ : একাত্তরে মৌলভীবাজারের কুখ্যাত রাজাকার মিছির উল্লাহ’র ইঙ্গিতে মনু নদীর ব্রিজের ওপর হত্যা করা হয় দুই নিরপরাধ ব্যক্তিকে। তাদের ‘মৃত্যুদ-’ ঘোষণা করে মাইকিং করা হয় শহরে। হত্যাদৃশ্য অবলোকন করতে বাধ্য করা হয় এলাকার অসহায় জনগণকে।
১২ মে সকাল বেলা মিছির উল্লাহ ও তার সহযোগীদের ইঙ্গিতে শহরতলির হিলালপুর গ্রাম ঘিরে ফেলে পাক সেনারা। ঘর থেকে এরা ধরে নিয়ে যায় মোঃ উস্তার, সিরাজুল ইসলাম ও তাঁর বৃদ্ধ পিতা আব্দুল মান্নানকে। মোঃ উস্তার মোস্তাফাপুর ইউপি কমিটির একজন বলিষ্ঠ কর্মী ছিলেন। সিরাজুল ইসলাম ছিলেন পুলিশ বিভাগের সাবেক কর্মকর্তা। এই তিনজনকে মৌলভীবাজার শহরে ধরে এনে তাদের ওপর দিনভর নির্যাতন চালানো হয়। রাতের বেলা তাদের জেলহাজতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। ১৩ মে ভোরে তাদের হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয় পাকবাহিনী। সকালে মোঃ উস্তার ও সিরাজুল ইসলামকে মনু ব্রিজের রেলিংয়ের পাশে নিয়ে দাঁড় করানো হয়। প্রথমে মোঃ সিরাজুল ইসলামকে লক্ষ্য করে পাক ক্যাপ্টেন ইউসুফের নির্দেশে মনু ব্রিজের দুই পাড়ে দাঁড়িয়ে থাকা শত শত জনতার সামনে দুই রাউন্ড গুলি এবং মোঃ উস্তারের ওপর তিন রাউন্ড গুলি ছোড়া হয়। সঙ্গে সঙ্গে দু’জনই মনু নদীর ব্রিজের ওপর ঢলে পড়েন। খুনীরা তাঁদের লাশ মনু নদীতে ফেলে দেয়। মনু নদীর প্রবল স্রোতে ভেসে যায় মোঃ উস্তার ও সিরাজুল ইসলামের লাশ। রক্তে লাল হয় মনু নদীর পানি। মোঃ উস্তারের পিতা মন্নানকে নিষ্কৃতি দেবার কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত পাকিঘাতকরা কথা রাখেনি। তারা শহরের পার্শ্ববর্তী বড়বাড়ি পাহাড়ে নিয়ে বৃদ্ধ মন্নানকেও হত্যা করে। শুধু এদেরকে হত্যাই নয়, মিছির উল্লাহর দেখিয়ে দেয়া পথ ধরেই একাত্তরে মৌলভীবাজারে নিধনযজ্ঞ চালিয়েছে হানাদাররা।
বোরকা হাজী : মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন হায়েনাদের পদলেহনকারীদের মধ্যে বিয়ানীবাজারে সবচেয়ে ভয়ানক ছিল বোরকা হাজী। এমন কোন অপকর্ম নেই যা সে করেনি।
উপজেলার তিলপাড়া ইউনিয়নের মাথিউড়া গ্রামের হাজী সুরুজ আলীর পুত্র জামিল রেদওয়ান ওরফে বোরকা হাজী মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তিকামী মানুষের কাছে ছিল এক মূর্তিমান ত্রাসের নাম। হত্যা, নারী নির্যাতন, লুণ্ঠন ঘরবাড়ি পোড়ানো ও রাজাকারদের সংগঠিত করায় তার ভূমিকা ছিল মুখ্য।
মুক্তিযুদ্ধের সময় বিয়ানীবাজার থানায় প্রায় আড়াই শতাধিক মানুষকে পাক জল্লাদেরা হত্যা করে। সেই সময়ে বোরকা হাজী বিয়ানীবাজার থানা কনভেনশন মুসলিমলীগের আহ্বায়ক হিসেবে এই এলাকায় ত্রাস ও বিভীষিকার সৃষ্টি করে। বোরকা হাজীর নাম শুনলে মানুষের অন্তরাত্মা কেঁপে উঠত। সে তিলপাড়া ইউনিয়ন শান্তি কমিটির সেক্রেটারি ও রাজাকার সংগঠক হলেও অপকর্মে তার বিচরণ ছিল বিয়ানীবাজারের সর্বত্র। পল্লী কবি কমর উদ্দিন হত্যাকা-ের সাথেও জড়িত ছিল এই কুখ্যাত রাজাকার।
ভাতৃদ্বয়ের ত্রাস : ভাটির জনপদ হিসেবে পরিচিত সুনামগঞ্জের দিরাই উপজেলায় মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে আপন দু’ভাই বদরুজ্জামান ও গিয়াস উদ্দিন ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করে। মুক্তিকামী মানুষের কাছে তারা ছিল আতঙ্কের নাম। রক্তপিপাসা মিটানোর জন্য এই দু’জন ৬ জন মুক্তিযোদ্ধাকে তুলে দিয়েছিল হায়েনাদের হাতে। এখানেই তারা ক্ষান্ত হয়নি। নিজ হাতে খুন করে মুক্তিকামী তৎকালীন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানীকে।
১৯৭১ সালের ২ নভেম্বর বর্বর পাক সেনাদের সহযোগিতায় তারা স্থানীয় চেয়ারম্যান গোলাম রব্বানীকে ধরে লঞ্চে নিয়ে গিয়ে সেখানে তার ওপর অমানুষিক নির্যাতন চালায়। চেয়ারম্যানের হাত বেঁধে কান কেটে গলায় বেয়নেট চার্জ করে তাকে অমানুষিকভাবে হত্যা করে তারা। এরপর তার লাশ লাথি দিয়ে নদীতে ফেলে দেয়। হত্যার ৩ দিন পর নদীতে রব্বানীর লাশ ভেসে উঠে। সেখান থেকে তার লাশ উদ্ধার করে আত্মীয়-স্বজনরা কবর দেন। এই দালাল ভাতৃদ্বয় শুধু এই চেয়ারম্যানকে হত্যা করে ক্ষান্ত হয়নি, তারা আরও অনেক নিরীহ মানুষকে হত্যা করেছে এবং করিয়েছে। তারা কুলঞ্চ গ্রামের এক মুক্তিযোদ্ধার বাড়ি জ্বালাতে গিয়ে পুরো গ্রামই ভস্মীভূত করে দেয়। মুক্তিযুদ্ধপরবর্তী সময়ে গিয়াস উদ্দিন ধরা পড়লেও পরবর্তীতে ছাড়া পেয়ে যায়।
সিরাজুল ইসলাম : ১৯৭১ সালে আজমিরীগঞ্জ ছিল একেবারেরই পশ্চাৎপদ এলাকা। কিন্তু যোগাযোগ ক্ষেত্রে অনুন্নত আজমিরীগঞ্জে পাকিস্তানের অনুচররা ছিল ঠিকই। তারা মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাক আর্মিকে আমন্ত্রণ করে নিয়ে যায় আজমিরীগঞ্জে। তাদের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে পাক আর্মি আজমিরীগঞ্জে নিধনযজ্ঞ চালায়। শুধুমাত্র জলশুকা গ্রামেই তারা হত্যা করে ১২ জন সনাতন ধর্মাবলম্বীকে। আর এক্ষেত্রে মুখ্য ভূমিকা পালন করে রাজাকার সিরাজুল ইসলাম।
হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জে পাকিস্তানী হানাদাররা যতটা না ভয়ঙ্কর ছিল তার চেয়ে বেশি ভয়ানক ছিল সিরাজুল ইসলাম। মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সে আজমিরীগঞ্জে ত্রাসের রাজত্ব কায়েম ।
’
২|
১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১২ সকাল ১০:২০
তানভীর চৌধুরী পিয়েল বলেছেন: তথ্যবহুল পোস্ট
৩|
১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১২ দুপুর ১:২৯
দলছুট শুভ বলেছেন: তানভীর চৌধুরী পিয়েল বলেছেন: তথ্যবহুল পোস্ট
©somewhere in net ltd.
১|
১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১২ সকাল ১০:১১
Ashish বলেছেন: অসাধারণ পোস্ট।