| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
মুবিনুর রহমান
‘শেখ মুজিবকে কাছে থেকে দেখার জন্য তাঁর ৩২ নম্বর ধানমন্ডির বাড়ির সামনে এসে উপচে পড়া ভিড়ের মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলে মানিক’ - উপন্যাসের প্রথম বাক্যেই আবির্ভাব উপন্যাসের নায়কের। ১৯৭১ সালে উত্তাল মার্চে ছাত্র জনতার মিছিলের ¯্রােত যখন পাক খায় বাড়িটিকে ঘিরে সেই ¯্রােত বিক্ষুব্ধ সিন্ধুর ক্ষুদ্র বিন্দু হিসেবে মানিকও উপস্থিত শেখের বাড়ির সামনে, এক নজর কাছে থেকে দেখার প্রত্যাশায়। রংপুরের ছোট্ট গ্রাম রতনপুরের মানুষের কাছে শেখের সাথে সাক্ষাতের ঐতিহাসিক, কিংবদন্তী গল্পগাঁথা শোনানোর লোভই টেনে নিয়ে গেছে মানিককে মিছিলের ¯্রােতে। মানিক শেষ পর্যন্ত মানবিক, রক্তমাংসের মানুষ।
অন্তর্দাহ মঞ্জু সরকারের মুক্তিযুদ্ধের পটভূমিতে লেখা দীর্ঘ উপন্যাস। ১৯৭১ সালে অবরুদ্ধ স্বদেশে মৃত্যুর বিভীষিকা ও অপরাজেয় দেশপ্রেম মুক্তিকামী বাঙালির জীবন যেখাবে আলোড়িত করেছে, তার বিশ্বস্ত রূপায়ণ ঘটেছে এ উপন্যাসের কাহিনীতে। ঐতিহাসিক কালপর্বের প্রেক্ষাপটে রচিত উপন্যাসের বিস্তৃত ক্যানভাসে মূর্ত হয়ে উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের নানা দিক, জনজীবনের চিত্র এবং প্রাপ্ত স্বাধীনতার রূঢ় বাস্তবতাও। আবহমান বাঙালি সংস্কৃতি ও সমাজ সম্পর্কের টানাপড়েনে সৃষ্টি হয়েছে মর্মস্পর্শী কিছু ব্যক্তিচরিত্রের। এই হলো সংক্ষেপে অন্তর্দাহের অন্তর্গত ভাষ্য। কিন্তু বিশাল বিস্তারে অন্তর্দাহ গিয়ে মিশেছে মানবিক চেতনায়।
মঞ্জু সরকারের অন্তর্দাহ বিরাট ক্যানভাসে নানান আলো, ছায়া ও রঙের খেলা। উপন্যাসের পটভূমি মুক্তিযুদ্ধ, কিন্তু পরতে পরতে বেরিয়ে সাজানো মানব জীবনের খুবই সাধারণ দিক - ক্ষুধা, ভয়, ক্রোধ, প্রেম, দহন এবং অবশ্যই পারষ্পারিক সম্পর্কের ভিতর বাহির। মুক্তিযুদ্ধের গল্পের ভিতর দিয়ে বার বার উঠে এসেছে জনজীবনের যুদ্ধ, মানুষের মুক্তির সংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধ মানেই তো মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা ও মনুষ্যত্বের মুক্তির জন্য লড়াই, এ লড়াই নির্দিষ্ট কোন সময়ের, কোন ব্যক্তির কিংবা গোষ্ঠীর নয়। সমগ্র শোষিত মানুষের মুক্তির বার্তা মানিকের উপলব্ধির ভিতর দিয়ে উঠে এসেছে।
জগন্নাথের বিল, জঙ্গল, কালীর থান, তেপথীর বটের তল, হরিপুর হাইস্কুল, রমজান মামুর বাড়ির আশপাশে ঘুরে বেড়ানো মানিক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর ছাত্র ও গণআন্দোলনের উত্তাপের ছোঁয়ায় একটু একটু বদলে যেতে শুরু করে। নামাজ ছেড়ে দিয়ে পাকিস্তান ভাঙ্গার আন্দোলন সমর্থন করে স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পক্ষে জোরালো অবস্থান নেবে এ দৃশ্য নানাজি স্বপ্নেও ভাবেনি। অথচ সেই দুঃস্বপ্নকে বাস্তব করতেই মানিকের রতনপুরে প্রত্যাবর্তন। শৈশবে বাবার সঙ্গে মাখামাখি সম্পর্ক ছিল না, কৈশোরে বাবার দ্বিতীয় বিয়েটা দূরত্ব আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। এখানে তাই একই সঙ্গে দেখি আনন্দের ঝর্ণা, বিদ্রুপের ব্যাঙ্গ কিংবা অন্তরের রক্তক্ষরণ। মানব জীবনের ছোট ছোট অনুভূতি, ভাব ও কল্পনাকে অত্যন্ত হৃদয়গ্রাহী করে তুলেছেন লেখক নিপুণ কুশলতায়।
সর্বহারা মানুষের সাথে পেটি বুর্জোয়াদের যে লড়াই, নিপীড়িত মানুষের সংগ্রাম আর অর্থনৈতিক মুক্তির পথে যাত্রার এক সুনিপুণ কাহিনী অন্তর্দাহ। মানিকদের বাড়ির চাকর বাংটু বক্কর সেই শ্রেণিরই প্রতিনিধি। ঘরে যে শ্রেণিবিভাজন ও বিভক্তির বৈষম্য তা যে দেশের বৃহৎ পরিসরের ক্ষুদ্র সংস্করণ। বাংটুর পরাধীনতার যে গ্লানি তাই যেন পুরো বাংলাদেশে মানুষের গ্লানি হয়ে চিত্রিত হয়েছে। মানিক ও বাংটু কাছাকাছি বয়সের, মানিক শিক্ষিত, জোতদার বাবার সন্তান, বাংটু নিরক্ষর, চাষা, কিছুটা বোকা কিন্তু দুরন্ত, দুর্দান্ত সাহসী। গ্রামের সবার আগে মুক্তিফৌজ হওয়ার পথে বেরিয়ে পড়ে বাংটু। বাংটু যে দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে চলে যায় সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে না দোদূল্যমান মানিক। এ পথে কখনো কমিউন্সিট বন্ধু আরিফ, কখনো মামি সামিয়া, আসমা, মালতী, বাবা, নানা কালে অকালে এসে হাজির হয়। মানিক একই সাথে ধার্মিক আবার দেশপ্রেমিক, ভিতু এবং বোকা, অতি অবশ্যই গোপনে,স্বপনে কামপিয়াসী। অদেখা হবু স্ত্রীর সান্নিধ্য কল্পনায় পুলকিত হয়েছে, অনাবিষ্কৃত নারী শরীর আবিষ্কারের প্রবল আগ্রহ উত্তেজনার মুখে চেনা স্ত্রীকে বিবস্ত্র করতে গিয়ে মামির নগ¦ শরীর দেখে চমকে উঠেছে, দেশের ক্রান্তিলগ্নে বিয়ে, ব্যক্তিগত কামনা-বাসনাও অনৈতিক ও চরম স্বার্থপরতা মনে হয় মানিকের কাছে। প্রায় সমবয়সী কাকি মালতীর আদর আপ্যায়ন ¯েœহ মানিকের কাছে অস্বস্তি বোধ জাগায়, কাকির ¯েœহের চেয়েও নিষিদ্ধ সোহাগ মানিককে তাতায়।
মানিককে কেন্দ্র করে পুরো উপন্যাসের কাহিনী এগিয়ে যায়, আবর্তিত হয় চরিত্র। বাবা কিংবা নানা কারো পক্ষে নয়, মানিক স্বাধীনতার পক্ষে, বাঙালির পক্ষে, সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বার্থে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে থাকতে চায়। একদিকে বিশ্বাস অন্যদিকে অবিশ্বাস। এই দোলাচলে মানিক দিশাহীন। ভিতরে ভিতরে চলতে থাকা এই দহনই চিত্রিত হয়ে নির্মিত হয়েছে মঞ্জু সরকারের অন্তর্দাহ। বীর মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বাধীনতা নিয়ে দেশে ফেরার স্বপ্ন দেখেছিল মানিক। দেশ স্বাধীন হলো কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা হতে না পারার গ্লানি আর পরেশ কাকার বিধবা স্ত্রী মালতীর শ্লীলতাহানির অপরাধ নিয়ে মানিক কোন মুখে ফিরবে গ্রামে, ভেবে না পেয়ে পা বাড়ায় এমএনএ মশিয়ার উকিলের মেয়ে আসমার কাছে ছুট দেয় কলকাতায়। অপমানিত হয়ে ঢাকার পথ ধরে। এ পথেই মানিক খুঁজে পায় তার অভিষ্ট গন্তব্য। মাস্টার দার সাথে কাটানো কয়েক মূহুর্ত বদলে দেয় মানিকের দৃষ্টিভঙ্গি, দর্শন।
মুসলিমলীগার চেয়ারম্যান নানার বাঁধন ছিড়ে মানিক মুক্তিযোদ্ধা হওয়ার ক্যাম্প পর্যন্ত যেতে সমর্থ হলেও হেরে যায় রিলিফচোর সজব ভূঁইয়ার কাছে। যুদ্ধ বিধ্বস্ত দেশ গড়ার স্বপ্নে যখন ব্যস্ত মানিক তখন স্পষ্ট হয়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের ভেতরেও যে শ্রেণিবিভেদ ছিল, বৈষম্য ছিল, অমর্যাদা ছিল সেই বিকট দৃশ্য। বক্কর মুক্তির মা আছিমন যতই ছেলের গর্বে গর্বিত হোক না কেন সজব ভুঁইয়ারা মনে করে ‘মানিক কি বাংটুদের মতো রাইফেল বন্দুক নিয়া ক্ষেত জঙ্গল নদী বিল দাপায় বেড়ানোর জন্য যুদ্ধে গেছে? সে আছে কলকাতায় ... তাদের হুকুমেই মুক্তিবাহিনী যুদ্ধ করছে।’ বক্কর মুক্তি নেমে আসে ক্যাম্পফেরত জোতদার পুত্র মানিকের নিচে। এই সবের পরেও মানিকের দেশপ্রেম আর মালতীর প্রতি ভালোবাসা যেন একাকার হয়ে উঠতে চায়। সমস্ত দ্বিধা দ্বন্দ্ব অপরাধবোধ চাপা দিয়ে ভালোবাসাটা সত্য হয়ে ওঠে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা সমৃদ্ধ বাংলাদেশের কথাসাহিত্যে মঞ্জু সরকারের অবদান স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যে উজ্জ্বল। বৈরি সমাজ বাস্তবতা, গ্রামীণ জনজীবন ও লোক মানসের নিপুণ রূপকার তিনি। স্বাধীনতা উত্তর সামাজিক রূপান্তর, ব্যক্তির ক্ষুধা-প্রেম-ক্রোধ-মুক্তি সংগ্রাম এবং অস্তিত্বের নানা টানাপড়েন জীবন্ত হয়ে ওঠে তাঁর গল্প উপন্যাসে। অন্তর্দাহও এর বাইরে নয়।
এক নজরে - উপন্যাসের নাম অন্তর্দাহ। লেখক মঞ্জু সরকার। ভাষা- বাংলা। প্রকাশক-বেঙ্গল পাবলিকেশন্স। প্রচ্ছদ-কাইয়ুম চৌধুরী। প্রথম প্রকাশ- ফেব্রুয়ারি ২০১৩। পৃষ্ঠা সংখ্যা- ৪০০। দাম -৬৫০ টাকা। আইএসবিএন-৯৭৮-৯৮৪-৯০৪৭০-২-৫।
(১৯ জুলাই ২০১৩ দৈনিক আলোকিত বাংলাদেশ এর শুক্রবার এ প্রকাশিত)
©somewhere in net ltd.