| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক ঃ নয়া দিগন্তের পথে যাত্রা
মুক্তা রহমান
লেখাটি শুরু করতে চাই , সাম্প্রতিককালে ভারতের জাতীয় নির্বাচনে অসাধারন ভাবে জয়ী হয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করা প্রধানমন্ত্রী , মহামান্য নরেন্দ্র মোদিকে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানানর মধ্য দিয়ে... যিনি নিজেকে ভারতের একজন প্রধান্মন্ত্রি হিসেবে নয় , পরিচয় দিতে ভালবাসেন , ভারত মাতার একজন সেবক হিসেবে...গত জুন মাসে বাংলাদেশ সফর করেন ভারতের বিদেশ মন্ত্রী সুস্বমা স্বরাজ । ভারতের বিদেশ মন্ত্রী হিসেবে এটাই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর৷ তিনি সফর শেষে বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রকাশিত বাংলা দৈনিক প্রথম আলোকে এক সাক্ষাতকারে বলেছেন , "ভারতের নবনির্বাচিত সরকারের তরফ থেকে বন্ধুত্বের বারতা নিয়ে এসেছিলাম৷ এ সফরে আমি বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ নেতৃত্বের সঙ্গে ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করেছি৷ বাংলাদেশের নেতাদের সঙ্গে আমার আলোচনা অত্যন্ত ফলপ্রসূ হয়েছে৷ আন্তরিক ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে আমাদের আলোচনা হয়েছে, এ আলোচনা থেকে আমরা ভবিষ্যৎ সহযোগিতার িভত রচনা করতে পারি৷ আমাদের আলোচনার ভিত্তিতে দুই দেশের বাণিজ্য, সংযোগ, বিদ্যুৎ খাতের সহযোগিতা ও জনগণের সঙ্গে জনগণের আরও যোগাযোগ বাড়বে বলে আশা করছি৷আমার মনে হয়, ভারত-বাংলাদেশ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি গুণগত পরিবর্তন আনার সময় এসেছে৷ আমরা এ অঞ্চলে যেসব সমস্যার মুখোমুখি হই, সে প্রেক্ষাপটে কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভারত-বাংলাদেশ সহযোগিতা আরও দৃঢ় হওয়া উচিত: দারিদ্র্য দূরীকরণ, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, সন্ত্রাস, চরমপন্থা ও মৌলবাদ মোকাবিলা"।
বিদেশ মন্ত্রীর সফর দিয়েই আনুষ্ঠানিক ভাবে শুরু হল , ভারত- বাংলাদেশের সম্পর্কের নয়া দিগন্ত ।বিদেশ মন্ত্রি আশা ব্যক্ত করেছেন , ভারত- বাংলাদেশের ভিতর অমিমাংসিত বিষয় গুলো ছাড়াও দারিদ্র্য দূরীকরণ, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, সন্ত্রাস, চরমপন্থা ও মৌলবাদ মোকাবিলা সহ দুই দেশের জনগণের সঙ্গে জনগণের সম্পরক - বন্ধুত্ব দৃঢ় হবে । তার আশা গুলোর সাথে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের মানুষ একমত । বাংলাদেশ বিশ্বাস করে বিশ্বের নানা প্রতিকুলতা থেকে দক্ষিন এশিয়াকে সুরক্ষিত করে একটি সঙ্ঘবদ্ধ দক্ষিন এশিয়া গঠন করতে ভারতের নেত্রীত্ব সবচেয়ে উপযোগী । এই দুর্গম যাএায় তারা থাকতে চায় , ভারতের একজন বিশ্বস্ত , সহযোগী বন্ধু হিসেবে ভারতের পাশে ।।
জনগণ-জনগণ পর্যায়ের সম্পর্ক জোরদার করাটাই বর্তমানে ভারত-বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ । ইতিমধ্যে দুই দেশের ভিতর প্রশিক্ষণ, সক্ষমতা সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়নসংক্রান্ত দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ক্ষেত্রে প্রভূত উন্নতি হয়েছে৷ এর সাথে আরো যুক্ত করা যেতে পারে , নানা ধরনের সমাজকর্মমুলক সংগঠন । এই সব সংগঠন বাংলাদেশের প্রান্তিক জনগনের কাছে ভারত , ভারতের সংষ্কৃতি , মূল্যবোধকে ইতিবাচক ভাবে তুলে ধরতে সক্ষম হবে । আর এভাবেই জনগন-জনগন সম্পর্ক দৃঢ় করা সম্ভব । আমাদের দেশে একটা কথা প্রচলিত আছে , বনের বাঘে খায় না , মনের বাঘে খায় । এই মনের বাঘ দূর করতে সমাজকর্মমুলক সংগঠনের কোন বিকল্প নেই ।
ইতিমধ্যে ভারত জনগণের মধ্যকার সম্পর্ক জোরদার করতে আমরা তরুণদের মধ্যকার ভাবনা বিনিময়, ব্যবসা-বাণিজ্য, সাংস্কৃতিক আদান-প্রদান, সংবাদকর্মীদের আসা-যাওয়া, সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের আসা-যাওয়া অব্যাহত রেখেছে । তার পরেও দুই দেশের ভিতর আরো কিছু করার সুযোগ রয়েছে। যেমন - বাংলাদেশে নারীর ক্ষমতায়নে সহায়তা করতে ভারত বাংলাদেশের নারী ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা গঠনে সহায়তা দিতে পারে । বাংলাদেশে ভারতীয় টিভি চ্যানেল গুলি খুবি জনপ্রিয় । তবে হতাশার কথা এই যে , বাংলাদেশের টিভি চ্যানেল প্রতিষ্ঠান গুলো , নাট্য নির্মাতারা সহ সাংস্কৃতিক জগতের কলাকুশলিরা এর বিরধিতা করে আসছে বহু বছর ধরে । এর ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের বর্তমান সরকার পর্যায়েও আলোচিত বিষয় বাংলাদেশে প্রচারিত ভারতীয় টিভি চ্যানেল । আমার মতে , বন্ধুত্বের নিদর্শন স্বরুপ , ভারত- বাংলাদেশ যৌথ টিভি চ্যানেল , যৌথ বাংলা ও ইংলিশ পত্রিকা থাকতে পারে । এই উদ্যোগ দুই দেশকে আরো গভীর বন্ধনে খুব সহজেই বাধতে পারবে । ভারত চলচ্চিত্র ও মঞ্চ নাটকে বাংলাদেশের কাছে আদর্শনীয় । আমরা সব সময়েই দেখে থাকি , দুই দেশের ভিতর যৌথ উদ্যোগে চলচ্চিত্র নির্মান । এর আরো বেশি করে বিকাশ ঘটানো , সাথে যৌথ উদ্যোগে মঞ্চ নাটক প্রযোজনাও করা যেতে পারে ।
বাংলাদেশে অনলাইন এক্টিভিষ্ট অত্যন্ত সক্রিয় একটি মাধ্যম । এরা দেশ - দেশের বাইরের যেকোন রাজনৈতিক , সামাজিক ইস্যুতে নানা মতামত তুলে ধরে জনমত তৈরিতে গুরত্বপুর্ন ভুমিকা রেখে থাকে । এক্ষেএে আমি উল্লেখ করতে চাই , ভারতের ইদানিংকালের ভয়াবহ সামাজিক সমস্যা - নারী ধর্ষন ইস্যুতে বাংলাদেশি অনলাইন এক্টিভিষ্টরা নানা মতামত প্রকাশ করে তাদের অনলাইনের ভারতীয় বন্ধুদের পাশাপাশি সেই সব ধর্ষিত নারীর প্রতি সহমর্মিতা প্রকাশ করেছে। ভারতীয় অনলাইন এক্টিভিষ্টদের সাথে বাংলাদেশি অনলাইন এক্টিভিষ্টদের ভিতর যৌথ উদ্যোগে বন্ধুত্বপুর্ন কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে । বাংলাদেশে অনলাইন ব্যবহারকারি মানুষের সংখ্যা প্রায় এক কোটি । এই যৌথ কার্যক্রম দুই দেশের মানুষকে আরো নৈকট্যে নিয়ে আসতে সক্ষম হবে ।
বাংলাদেশের প্রতি ভারত সরকারের কিছু পদক্ষেপ , বাংলাদেশ সরকারের ভারতের প্রতি কিছু দায়িত্ব পালন করা নিয়ে বাংলাদেশের সাধারন মানুষের মনে আছে নানা রকম মতভেদ , ভয়-শঙ্কা-সন্দেহ , কিংবা বলা যায় মতবিরোধ । এই রকম কিছু স্পর্শকাতর বিষয় হল , ভারতের পণ্য বাংলাদেশের জনগণকে না জানিয়ে , বাংলাদেশের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে পার হয়ে ভারতেরই আরেক অঞ্চলে নেওয়ার জন্য নানা ব্যবস্থা করেছে বাংলাদেশ সরকার । এর জন্য বাংলাদেশের কী লাভ, কী ক্ষতি—সে সম্পর্কে সরকার জনগণকে পরিষ্কারভাবে কিছু জানায়নি। ভারতের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বাংলাদেশ অবকাঠামো প্রস্তুত করছে। অথচ বাংলাদেশের তিন দিকে কাঁটাতারের বেড়া দিয়েছে ভারত সন্ত্রাসীদের ঠেকানোর নামে। এর কারন সম্পর্কে বাংলাদেশের জনগনের ভিতর নানা বিভ্রান্তির জন্ম হয়েছে । ফারাক্কা বাঁধের কারণে বাংলাদেশের ক্ষতি বহু দূর বিস্তৃত হয়েছে। এর জন্য বাংলাদেশের মানুষের মনে ক্ষোভের শেষ নেই । এখন আবার টিপাইমুখ বাঁধ দেওয়ার কথা ভাবছে ভারত । এটা নিয়েও বাংলাদেশে শুরু হয়েছে নানা মত প্রকাশ । এর কোনটা টিপাইমুখের পক্ষে , কোনটা বিপক্ষে। বাংলাদেশ ও ভারতের অভিন্ন ৫৪টি নদী নিয়ে এখনো কোনো চুক্তি হয়নি, উদ্যোগও নেই , তার উপর তিস্তা নদী নিয়ে বিরোধ ঝুলে আছে। ভারত থেকে বাংলাদেশে আইনি পথে যেসব পণ্য আসে, তার চেয়ে বেশি আসে বেআইনিভাবে। কিন্তু বাংলাদেশ থেকে ভারতে আইনিভাবে পণ্য নিতে গেলেও শত অশুল্ক বাধা। এইসব স্পর্শকাতর বিষয় গুলোতে বাংলাদেশের মানুশষের ক্ষোভকে ভারতবিরোধী বিদ্বেষীরা বা মৌলবাদীরা তাদের স্বার্থে ব্যবহার করে থাকে ।তাতে যে অবিশ্বাস ও বিদ্বেষের রাস্তা দিন কে দিন ভারত-বাংলাদেশের ভিতর প্রশস্ত হচ্ছে তা দুরীকরনে বাংলাদেশে -ভারতের অনলাইন এক্টিভিষ্ট বন্ধুরা স্বক্রীয় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে । এ ইতিবাচক পদক্ষেপ দুই দেশের জন্যই সুফল বয়ে আনবে ।
বাংলাদেশ সব চেয়ে বেশি দূর্ভোগ ভোগ করে থাকে , প্রকৃতির বিরুপতায়... আজ বহু বছর ধরেই শুকিয়ে যাচ্ছে আমাদের নদী গুলো । ইতিমধ্যে শুকিয়ে ধু ধু বালুর মাঠে রুপান্তরিত হয়ে গেছে এমন নদীর সংখ্যাও কম নয় । বাংলাদেশের মানুষ প্রকৃতির সন্তান , নদী গাছ আমাদের বাচিয়ে রেখেছে আজো । সারি-সারি বৃক্ষের সারি , আর একে বেকে চলা নদী গুলোতেই আকা রয়েছে আমাদের আনন্দ, বেদনা, মিলন, বিরহ আর সংকটের কাব্য গাথা । তাদের দেয়া প্রানস্পন্দনের বাণী আমাদের ভাবনাকে করে জাগ্রত। শাণিত হয় আমাদের বাংলা ভাষা। এ থেকেই আমাদের ভিতর জন্ম নেয় প্রেম , বন্ধুত্বের মতন নির্মল অনুভব গুলোর.। আমরা কেউ হয়ে উঠি কবি , গীত কবি , গল্পকার , চিত্রকর ।
বাংলাদেশ একটি নিম্নভূমির ব-দ্বীপ এলাকা, যা হিমালয় থেকে নেমে আসা গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা—এই তিন পরাক্রমশালী নদীর টেনে আনা পলিমাটি দিয়ে গঠিত। ৫৭টি আন্তর্জাতিক নদী বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে গেছে। এর মধ্যে ৫৪টি ভারতের সঙ্গে এবং তিনটি মিয়ানমারের সঙ্গে যুক্ত। ভারত ও বাংলাদেশের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ৫১টি নদী গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকায় অবস্থিত। এই তিন পরাক্রমশালী নদীর অববাহিকার আয়তন ১৭২ মিলিয়ন বর্গ কিলোমিটার, যার মাত্র ৭ শতাংশ বাংলাদেশের মধ্যে পড়েছে। বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষের জীবন ও জীবিকা বহু প্রাচীন কাল থেকেই এই নদীগুলো ঘিরে আবর্তিত হয়। অর্থনীতি, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারবিষয়ক জাতিসংঘ কমিটি তাদের সাধারণ প্রস্তাবে পানি প্রাপ্তিকে মানবাধিকার হিসেবে ঘোষণা দেয়। পানি ছাড়া অনেক মৌলিক মানবাধিকারকে পুরোপুরি উপলব্ধি করা সম্ভব নয়। এই ঘোষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পানির ওপর মানুষের অধিকার সুরক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ আইিন পদক্ষেপ ছিল। কিন্তু আইনগতভাবে সবাই এ ঘোষণা মেনে চলতে বাধ্য ছিল না।৬০ শতাংশ স্বাদু পানির উৎস এই আন্তর্জাতিক নদীগুলো। বিশুদ্ধ পানির চাহিদা কেবল বাংলাদেশ নয়, সব দেশেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। শত শত কোটি মানুষের খাওয়ার পানি, খাদ্য, জ্বালািন ও শিল্প উৎপাদনের জন্য অভিন্ন এই পানির উৎসের ওপর ক্রমান্বয়ে চাপ বেড়ে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে মানুষের চাহিদা, পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখার জন্য খুব কম পানিই পাওয়া যাবে, আর প্রায়ই সেটা হবে নিম্নমানের।
সম্মিলিত প্রচেষ্টায় পানিসম্পদের উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত, নেপাল ও ভুটানে। এই অঞ্চলের সমৃদ্ধির চাবিকাঠি হলো সমন্বিত পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার নীতিমালা অনুসরণ করে নদীর অববাহিকা ধরে উন্নয়ন। পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার জন্য অবিলম্বে প্রয়োজন যুগোপযোগী পদক্ষেপ। এ অঞ্চলের দেশগুলোর সরকারের এখন পারস্পরিক সমঝোতা ও ছাড় দেওয়ার মানসিকতা নিয়ে বিস্তৃত পরিসরে আঞ্চলিক সহযোগিতার বিষয়ে সম্মত হওয়া দরকার। এখন প্রয়োজন হলো সহযোগিতার কূটনীতি। একটি আন্তর্জাতিক নদীর একই অববাহিকায় অবস্থিত দেশগুলোর জন্য পানিসম্পদের বণ্টন সাম্প্রতিক সময়ে খুব গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
হিমালয় অঞ্চলের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে পানিসম্পদের সর্বোচ্চ উন্নয়ন ও ব্যবস্থাপনার ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে।এ অঞ্চলের দেশগুলো সম্মিলিত উদ্যোগের মাধ্যমে কাজটি করতে পারে। ভবিষ্যতের এই সম্ভাবনার কথা মাথায় রেখেই সম্ভবত বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ১৯৭২ সালের ১৯ মার্চ স্বাক্ষরিত ভারত-বাংলাদেশ মৈত্রী সহযোগিতা ও শান্তি চুক্তির আওতায় যৌথ নদী কমিশন নামে একটি দ্বিপক্ষীয় ‘ওয়ার্কিং গ্রুপ’ গঠন করেন। দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থ রক্ষা, পানিসম্পদের বণ্টন, সেচ, বন্যা ও সাইক্লোনের ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার জন্য উল্লেখিত চুক্তি অনুযায়ী এই কমিশন গঠন করা হয়।
হিমালয় অঞ্চলের দেশগুলোর সম্মিলিত উন্নয়ন উদ্যোগ এখানকার মানুষের জন্য নানামুখী সুবিধা বয়ে আনতে সক্ষম। যেমন জলবিদ্যুৎ এবং শুষ্ক মৌসুমে নদীর পানির প্রবাহ বৃদ্ধি। এর ফল হিসেবে সেচের সম্প্রসারণ ঘটবে, মাছের উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে।উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, নেপালে জলাধার গড়ে তোলার বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে, যা শুষ্ক মৌসুমে গঙ্গার পানিপ্রবাহ প্রায় এক লাখ ৮৮ হাজার ৫০০ কিউসেক পর্যন্ত বাড়িয়ে দিতে পারে। নেপালে বাঁধ দিয়ে পানি ধরে রাখা হলে সেখান থেকে ৮৩ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এখানেই শেষ নয়, এই জলাধার বন্যার ক্ষয়ক্ষতি কমিয়ে আনা, সেচ-সুবিধার সম্প্রসারণ ও নদীর নাব্যতা বৃদ্ধি করে নৌযান চলাচলের পথ সুগম করার ক্ষেত্রেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
ভুটানেরও ৩০ হাজার মেগাওয়াট জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এই পরিমাণ জলবিদ্যুৎ শুধু নেপাল-ভুটানের বিদ্যুতের চাহিদা মেটাবে এমন নয়, এর মাধ্যমে বাংলাদেশ ও ভারতের বিদ্যুতের চাহিদাও মিটবে।হিমালয় অববাহিকার দেশগুলোর মধ্যে আঞ্চলিক সহযোগিতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে জনসচেতনতা বাড়াতে বিশ্বব্যাংকের উল্লেখযোগ্য সহায়তায় ২০০৬ সালে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়। আবুধাবি ডায়ালগ গ্রুপ হিসেবে পরিচিত (এডিডিজি) এই গ্রুপটি হিমালয় অঞ্চলের সাতটি দেশ তথা আফগানিস্তান, বাংলাদেশ, ভুটান, চীন, ভারত, নেপাল ও পাকিস্তানের সমন্বয়ে গঠিত। এই গ্রুপটি যত দূর সম্ভব আটটি বৈঠক করেছে। ২০০৭ সালের জুলাই মাসে ব্যাংককে অনুষ্ঠিত গ্রুপের দ্বিতীয় বৈঠকে ‘দক্ষ ব্যবস্থাপনার আওতায় রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে একটি সমন্বিত ও জ্ঞানভিত্তিক অংশীদারি এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি, শান্তি, সামাজিক সাদৃশ্য ও টেকসই পরিবেশের স্বার্থে উৎস থেকে সাগর পর্যন্ত হিমালয় থেকে নেমে আসা নদীগুলোর উন্নয়ন’ শীর্ষক একটি দীর্ঘমেয়ািদ ‘স্বপ্নকল্প’ গৃহীত হয়।
আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনার বেশ কিছু উজ্জ্বল সাফল্যগাথা রয়েছে। যেমন, ১. মেকং রিভার কমিশন (কম্বোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনাম); ২. কনভেনশন অ্যান্ড প্রটেকশন অব দ্য রাইন (ইউরোপীয় ইউনিয়ন কাঠামোর আওতায় এতে আছে জার্মানি, ফ্রান্স, লুক্সেমবার্গ, দ্য নেদারল্যান্ডস ও সুইজারল্যান্ড); ৩. িনল বেসিন ইনিসিয়েটিভ (মিসর, সুদান, ইথিওপিয়া, উগান্ডা, কেনিয়া, তানজানিয়া, বুরুন্ডি, রুয়ান্ডা, কঙ্গো, ইরিত্রিয়া) পর্যবেক্ষক; এবং ৪. সেনেগাল রিভার বেসিন ওয়াটার অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্ট প্রজেক্ট (গিনি, মালি, মৌরিতানিয়া ও সেনেগাল)।
প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ বাংলাদেশের একটা বড় আকুতির জায়গা। আর এই বিদেশি বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাংলাদেশে নিকটতম প্রতিবেশী ভারত অনেক পিছিয়ে আছে। বলা যায়, বাংলাদেশে মোট বিদেশি বিনিয়োগের ৫ শতাংশও ভারত থেকে আসে না। কিংবা ভারতীয় বিনিয়োগ আকৃষ্ট করতে পারছে না বাংলাদেশ।অথচ নিকটতম প্রতিবেশী এবং এশিয়ার তৃতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ ভারত থেকে বাংলাদেশে বিনিয়োগ হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ আছে। গত পাঁচ বছরে প্রায় ১৭ কোটি ডলারের প্রকৃত ভারতীয় বিনিয়োগ এ দেশে এসেছে। এ থেকেই বোঝা যায় যে ভারতীয় ব্যবসায়ী-উদ্যোক্তারা বাংলাদেশে বিনিয়োগ করতে এখনো তেমন আগ্রহী হয়ে ওঠেননি। প্রাথমিকভাবে সম্ভাবনা দেখে প্রস্তাব নিয়ে অনেকেই আসছে, যা কিনা বিনিয়োগ বোর্ডে নিবন্ধিত হচ্ছে। পরবর্তীকালে কাজ করতে গিয়ে নানা প্রতিকূলতায় বেশির ভাগই পিছিয়ে যাচ্ছে।অবশ্য বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যত বিদেশি বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছে, তার সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছিল ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকেই। ২০০৫ সালে টাটা শিল্পগোষ্ঠী বাংলাদেশে ৩০০ কোটি ডলার (প্রথমে ছিল ২০০ কোটি ডলার) বিনিয়োগ করার আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়। আর ২০০৪ সাল থেকেই বিষয়টি নিয়ে আলোচনা চলছিল। টাটা ২৪ লাখ টন ইস্পাত, ১০ লাখ টন সার ও এক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য তিনটি কারখানা স্থাপন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। টাটার প্রস্তাব নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়। সরকারের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক হয় বিনিয়োগের শর্ত ও প্রণোদনা নিয়ে। শেষ পর্যন্ত সস্তা দরে গ্যাসপ্রাপ্তির নিশ্চয়তা নিয়ে মতবিরোধে ২০০৬ সালে টাটা তাদের প্রস্তাব স্থগিত এবং ২০০৭ সালে প্রত্যাহার করে নেয়। আসলে অতীতে কখনো এত বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগ প্রস্তাব যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনার অভিজ্ঞতা না থাকায় বিষয়টি বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য ছিল বিরাট চ্যালেঞ্জ। এরপর বড় বিনিয়োগ প্রস্তাবটি আসে ২০১২ সালে সাহারা ইন্ডিয়া পরিবারের কাছ থেকে। গোষ্ঠীটি বাংলাদেশে আবাসন খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের প্রস্তাব নিয়ে আসে। পরবর্তীকালে খোদ ভারতেই সাহারার বিরাট অনিয়ম-কেলেঙ্কারি ধরা পড়ে। বিষয়টি ভারতের সর্বোচ্চ আদালত পর্যন্ত গড়ায়। শেষ পর্যন্ত আদালত সাহারার কর্ণধার সুব্রত রায় সাহারাকে জেলে পাঠানোর আদেশ দেন। অবশ্য বাংলাদেশের জাতীয় ক্রিকেট দলের স্পনসর হিসেবে জায়গা করে নিতে সাহারার সমস্যা হয়নি। ভারতীয় বিনিয়োগ নিয়ে বাংলাদেশে হতাশা থাকলেও বর্তমানে ২০১২-১৩ অর্থবছরে সার্ক অঞ্চলে বাংলাদেশ ভারতের বৃহত্তর বাণিজ্য সহযোগীতে পরিণত হয়েছে৷ আগের বছরের তুলনায় এ বছর বাংলাদেশ থেকে ভারতে রপ্তানির পরিমাণ ১৩ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬৩ দশমিক ৯৬ মিলিয়ন ডলারে৷ এতা খুবি আশার কথা । তারপরেও ভারতের সরকারের কাছে বিনিয়োগে পুনর্বিবেচনা আশা করছি। প্রধান্মন্ত্রি মোদি ভারতের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে রেড ফোর্টের ভাষনে তার প্রতিবেশিদের কথা উল্যেখ করেছেন । ভারত সহ পুরো দক্ষিন এশিয়ার প্রধান সমস্যা দারিদ্রতা ,যা দূরীকরনে আমরা যৌথভাবে উদ্যোগ নিতে পারি ।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারত সবচেয়ে বড় দেশ। সুতরাং প্রতিবেশীদের প্রতি তাদের দায়িত্ব বেশি। সহযোগিতার ডালি নিয়ে তাদেরই এগিয়ে আসার কথা। তারা এগিয়ে এসেছেও , এটা বড় আশা ও আনন্দের কথা । ভারতের একসময়কার প্রধানমন্ত্রী প্রয়াত ইন্দর কুমার গুজরাল প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি তাঁদের ভূমিকা সম্পর্কে পাঁচ দফার একটি ঘোষণা দিয়েছিলেন। এর নীতিগুলো সমন্বিতভাবে গুজরাল ডকট্রিন নামে পরিচিত। এর প্রথম দফাটাই হচ্ছে ভারত তার প্রতিবেশীকে যতটুকু পারে দিয়ে যাবে। এর জন্য পারস্পরিক লেনদেনের কোনো বিষয় থাকবে না। ভারত জেভাবে সহযোগিতা করছে , তার থেকে আর বেশি আশা করে বাংলাদেশ নামের ছোট দেশের সহজ -সরল মানুষ গুলো । অবশ্য এই সহযোগিতায় আমরা ছোট প্রতিবেশী হয়েও পারস্পরিক লেনদেনের ধার না ধেরেই যতটুকু পারি তা করে যাচ্ছি। গুজরাল ডকট্রিনের দ্বিতীয় তত্ত্বটি হচ্ছে, কোনো দক্ষিণ এশীয় দেশ তার ভূখণ্ডকে অন্য রাষ্ট্রগুলোর পক্ষে ক্ষতিকারক কোনো কাজে ব্যবহার করতে দেবে না। অতীতে যা-ই হোক, ২০০৯ সাল থেকে বাংলাদেশ অবিচলভাবে এ নীতি অনুসরণ করছে।এখন শুরু প্রয়োজন প্রতিবেশির প্রতি প্রতিবেশির রৃদ্ধতা , ভালবাসা । প্রতিবেশির সমস্যাকে , বিপদকে নিজের সমস্যা , বিপদ হিসেবে দেখার মানসিকতা । এই দৃষ্টিভঙ্গিই বন্ধুত্বের একটি রোল মডেল হিসেবে বাংলাদেশ-ভারতকে সারা বিশ্বের কাছে পরিচিতি এনে দিতে পারে , পারে নুতন দক্ষিন এশিয়া সারা বিশ্বকে উপহার দিতে ।যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের চেয়েও কার্যকরী ভুমিকা রাখতে পারবে বলেই আমার বিশ্বাস । সবশেষে সুষমা স্বরাজের কথাই পুনরাবৃত্তি করি , যা তিনি ভারতের প্রধান্মন্ত্রির পক্ষে থেকে বাংলাদেশের মানুষের কাছে পৌছে দিয়েছিলেন , এই বছরের জুন মাসের বাংলাদেশ সফরে- 'বন্ধুতা, বিশ্বাস, সহযোগিতা এবং সুপ্রতিবেশীসুলভ আচরণ'-হোক আমাদের অঙ্গিকার ।
©somewhere in net ltd.