নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

জ্ঞান মনের জানালা খুলে দায় এবং সেই খোলা জানালা দিয়ে না জানা বিষয় গুলো দেখি যা বাংলাদেশের সীমা ছাড়িয়ে সারা পৃথিবী দেখতে সাহায্য করে ।

এইচ এন নার্গিস

আমি একজন লেখক, সমাজ কর্মি , মা এবং মুক্তিযোদ্ধা

এইচ এন নার্গিস › বিস্তারিত পোস্টঃ

প্রাচীন বাংলার গান, নৃত্য ,অভিনয় আর বাদ্য যন্ত্র , বঙ্গ আর বাঙ্গালী , শেকড়ের খোঁজে

২৪ শে জুন, ২০২৬ রাত ১১:১৫

23 B বঙ্গ আর বাঙ্গালী,শেকড়ের খোঁজে 

প্রাচীন বাংলার গান,নৃত্য,অভিনয় আর বাদ্য যন্ত্র 

"টালত মোর ঘর,  নাহি পড়াবেষী 
হাঁড়িত ভাত নাহি নিতি আবেশী"


(চর্যা ৩৩ ভুসুক  পাদ)
 
অর্থাৎ   
"টিলায় আমার ঘর, কোনো প্রতিবেশী নাই । হাঁড়িতে ভাত নাই,   তবু রোজ অতিথি আসে" ।
দরিদ্র বাঙ্গালীর অভাবের কথা যাকে বলা হয় প্রাণের কথা। 

প্রাচীন বাংলার শিল্প সংস্কৃতি মূলত ধর্ম,লোক-জীবন আর রাজদরবার কেন্দ্র করে গড়ে উঠে।  পাল আর সেন যুগে চর্যাপদের সময় পর্যন্ত তার না না নিদর্শন     দেখা যায়। 
সাধারন মানুষ যে নৃত্য কলায় অভ্যস্থ ছিল তা হল কৃষি,ঋতু,উৎসব এবং বিয়ে কেন্দ্রিক নাচ ।  

গম্ভীরা, ছেই,কাঠি নাচ, ধামাইল এর আদি রূপ তখনও ছিল । পুরুষরা নারী সেজে নাচত । একে  ভাঁড় বলা হতো।   

বাদ্য যন্ত্রঃ 
প্রাচীন বাংলায় চার ধরনের বাদ্য ছিল । ১) তত
২) সুসির ৩) অবনদ্ধ ৪)ঘন 
১) তত তারের যন্ত্র যেমন বীনা, রুদ্র বীণা,  সপ্ততন্ত্রী বীণা 
২) সুষির _ফুঁ দিয়ে বাজানো  বাঁশী,শঙ্খ, শিঙ্গা, সানাই, 
৩) অবরুদ্ধ - চামড়ার ঢাক - মৃদঙ্গ, ঢোল , খোল , মাদল, ডমরু ।
চর্যাপদে "বাজই অলো সহি মাদল" মাদল বাজানোর কথা আছে পাহাড়পুরের ফলকে ঢোল, বাঁশী বাজানোর দৃশ্য আছে। ৮ম -১২ম শতকে বাংলা গানের আদি নিদর্শন বৌদ্ধ সিদ্ধাচার্জরা লিখেছেন যেমন পটমঞ্জুরি ভৈরবী ইত্যাদি ।

 
এখানে উল্লেখ করতে হয় কি ভাবে কখন চর্যাপদের আবিষ্কার হয় । 

"চর্যাপদ" হল বৌদ্ধ ধর্মীয় গানের সংকলোন । কবিতা গুলোই গান করে গাওয়া হতো । 

মানুষের যে মুখের ভাষা সেই ভাষায় রচিত এই গান গুলো। সেই ভাষায় রচিত বই  এর সংখ্যা খুব কম। সাহিত্য বা বিজ্ঞান হিসেবে তার মূল্য খুব কম হলেও লোকায়ত ভাষায় প্রাচীন তম নমুনা হিসেবে এর মূল্য অনেক বেশি । 
চর্যা পদের গান গুলো বাঙ্গালীর গাওয়া গানের নিদর্শন । 
জানা যাক কি ভাবে তা আবিষ্কার হল । 

চর্যাগীতির  আবিষ্কারঃ 
চর্যাগীতি হল গানের মাধ্যমে বৌদ্ধ ধর্ম পালন করা। গানের মধ্য দিয়ে জীবন বোধের প্রকাশ। 

৩৫ বছর আগে "হরপ্রসাদ শাস্ত্রী" নেপাল থেকে চারখানা পুঁথি সংগ্রহ করেন ।যেখানে ছিল ৪৬ টি ছোটো ছোটো গান। বইটির নাম "চর্যাগীত" । 
লুই -পা, কাহ্ন -পা, হাড়ি -পা, শবরী -পা, ভুসুক, তন্ত্রী পাদ সব চেয়ে বিখ্যাত কবি এদের মধ্যে।  


এর অনেক পরে "প্রবোধ চন্দ্র বাগচি" মূল বইটির একটি তিব্বতী  অনুবাদ নেপালেই আবিষ্কার করেন। এই অনুবাদে গীত ৫১ টি । এগুলো প্রাচীন বাংলায় রচিত । 

সুনীতি কুমার চর্যাগীতি গুলোর ভাষা তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করেন এবং প্রমাণ করতে সক্ষম হন যে এগুলো প্রাচীন তম বাংলার "লক্ষণাক্রান্ত"  । 

শুধু তাই নয় এর ব্যাকরণ রীতি এবং বাকভঙ্গি একেবারে বাংলা। এবং এখন পর্যন্ত তা বাংলাদেশে প্রচলিত । 

শুধু তাই নয় এই শ্লোক গুলোতে নৌকা,নদনদী এগুলোর বর্ণনা এবং যে ছবি আছে বা উপমা দেওয়া আছে তা একান্ত নদীমাতৃক বাংলাদেশের । 

এগুলো কোন সময়ে রচিত সুনীতি কুমার ,প্রবোধ চন্দ্র বাগচি , মুহাম্মাদ শহিদুল্লাহ , এবং হর প্রসাদ শাস্ত্রী নানা দিক বিবেচনা করে বুঝতে পারেন মোটামুটি নবম শতক থেকে ১২ শতকের মধ্যে রচিত। (মোঃ শহিদুল্লাহ  ছাড়া) 

মোট ২২ জন কবি তাঁরা সকলেই সিদ্ধাচার্য  । মনে হয় তাঁরা সকলেই প্রাচীন বাংলার অধিবাসী ছিলেন এবং বাংলার জীবন এবং প্রকৃতি সম্বন্ধে তাদের প্রত্যক্ষ জ্ঞান এবং অভিজ্ঞতা ছিল ।  

যদিও এগুলো সাহিত্য সৃষ্টির জন্য নয় এগুলো রচনা করা হয়েছিল বৌদ্ধ সহজ সাধনের জন্য এবং জীবন আনন্দকে ব্যাক্ত করতে। 

তবে "সহজ সাধনের" এই গীত গুলো প্রবর্তিত খাতে প্রবাহিত হয়ে পরবর্তি কালে আউল, বাউল, মারফতি, মুর্শিদা গানে বয়ে চলেছে। 

তৎকালীন সমাজে উঁচু শ্রেণীর জনগোষ্ঠী থাকলেও
চর্যাপদে মূলত নিন্ম বর্গের জনগোষ্ঠীর পরিচয় বেশি পাওয়া যায়।
 
তাঁরা ধর্ম ক্ষেত্রে বৌদ্ধ এবং অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে অবহেলিত জনগোষ্ঠী হিসেবে পরিচিত ছিল । এরা হলেন মাঝি, শিকারি,ডোম , চণ্ডাল, তাঁতি , কাঠুরে ,জেলে,এবং কৃষক।

দারিদ্র ছিল নিত্য সঙ্গী । গান গুলোর মধ্যে দিয়ে তা  প্রকাশ পায় । গান দিয়ে সাধারন মানুষ তাদের সুখ দুঃখ প্রকাশ করতো । হয়তো সেগুলো ধর্মের গান ।   যেমন 

"সের এক্ক জই পাঅই ঘিত্তা
মণ্ডা বীস পকাইল ণিত্তা
টঙ্ক এক্ক জই সিন্ধব পাআ 
জো হই রঙ্ক সো হউ রাআ" 

অর্থাৎ "এক সের ঘি যদি পাই তবে প্রতিদিন বিশটা মণ্ডা পাকাই , যদি এক টাকার সৈন্ধব পাওয়া যায় তবে হক সে  নিঃস্ব ,তবু সে রাজা" ।  

এই শ্লোকের মধ্যে দিয়ে নিন্ম মধ্যবিত্ত সমাজে বাঙ্গালীর সনাতন দুঃখ কষ্ট যে ছিল তার প্রকাশ পায়।

এ ধরনের অন্য অনেক শ্লোকে পাওয়া যায় "হাঁড়িতে ভাত নাই,নিত্য উপবাস, অথচ ব্যাঙের সংসার বৃদ্ধি পেয়েই চলেছে ,ক্ষুধায় শিশুর চোখ আর পেট  বসে গিয়েছে ভাঙ্গা কলসি তাতে এক ফোঁটা জ্ল ধরে, পরিধানে ছিন্ন বস্ত্র, সূচও   নাই যে সেলাই করার ,ভাঙ্গা কুঁড়েঘর,
খুঁটি নড়ে,মাটির দেয়াল গলে যাচ্ছে,খড়ের ছাদে  ছিদ্র "। 

বাঙ্গালীর এই দারিদ্র পুর্ন জীবনে আনন্দ নাই। ধনী দের ঘরে পূজা পার্বন বা বিয়েতে যোগ দেওয়া ছাড়া তাদের আনন্দ ছিল না।

তবে মাঝে মাঝে দরিদ্র স্তরের মানুষ একত্রে আদিম কৌমগত যৌথ নাচ তার সাথে গান গেয়ে কিছু মুহুর্তের জন্য সব দুঃখ ভুলে থাকার চেষ্টা করতো ।    

নারী পুরুষের শ্রমবিভাগ ছিল না। কৃষি কাজ,  হাটবাজার,নৌকা চালানো প্রভৃতি কাজ নারী পুরুষ সমভাবে অংশ গ্রহণ করতেন। 

সমাজে নৃত্য গীতের প্রচলন এবং নৈতিক উচ্ছলতার পরিচয় পাওয়া যায় । 

চর্যাগীতি তে দেখা যায় 
"এক সো পদ্ম চৌষ ঠি পাখুড়ী 
তাহি চড়ি নাচ অ ডোম্বী বাপুড়ী "
অর্থাৎ একটি পদ্ম তার চৌষট্টি পাপড়ি তাতে চড়ে নাচে ডোম্বি _ । 
গ্রামে গ্রামে ঘুরে বেড়াতেন গান গেয়ে গেয়ে যার প্রমাণ দেখা যায় নীচের শ্লোকে 

"সুজ লাউ সসি লাগেলি তান্তী 
অনহা দাম্ভি একি কি অত অব ধৃন্তি 
বাজই অলো সহি হেরু অ বীণা 
সুন তান ধন্বি বিল সই রুনা " 

লাউএর খোলা আর বাঁশের ডাঁটে তার বেঁধে বীণা জাতীয় যন্ত্রে এই সব গান গাওয়া হতো । 
"ডোম্বি" অর্থাৎ নৃত্যগীত পরয়েনা নীচ জাতীয় রমণী । 
"কেহো কেহো তোহেরে বিরু আ বোলহ 
বিদু জন লো অ তোরে কণ্ঠ ন মেলাই 
ডোম্বী আগলি নাহি ছিনালি " 

নিচের লাইন থেকে বোঝা যাচ্ছে এরা খারাপ যাতের মেয়ে ছিল । 
তখন কার সময়ে বঙ্গের পুরুষরা বিয়ের  ব্যাপারে বরপক্ষ যৌতুক লাভ করতো এবং যৌতুকের লোভে নীচ কুল থেকে কন্যা গ্রহণ করতে আপত্তি ছিলনা । তার প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিত এখানে পাওয়া যায় । 


বৈষ্ণব পদাবলী রাধা কৃষ্ণের প্রেমলীলা নিয়ে ভক্তিমূলক গান । মূল সময় ১৪শ থেকে ১৮ শতক ,প্রায় ৪০০ বছর ধরে লেখা। 
১৪ শতকে লেখা চণ্ডী দাস এর লেখা 
কে না বাঁশী বা এ বড়ায়ি 
কালিনী নই কূলে 
কে না বাঁশী বাএ বড়ায়ি 
এ গোঠ গোকুলে 

বিদ্যাপতি ১৪_১৫ শতক 
এ সখি হামারি দুখের নাহি ওর 
এ ভরা বাদর মাহ ভাদর 
শূন্য মন্দির মোর 

জ্ঞান দাস - ১৬ শতক 

সুখের লাগিয়া এ ঘর বাঁধিনু 
অনলে পুড়িয়া গেলো 
অমিয়া -সায়রে সিনান করিতে 
সকলি গরল ভেল  

মোট কথা বলা যায় চর্যাপদ বাংলা গানের দাদা আর বৈষ্ণব পদাবলি হল বাবা। 

লোকসঙ্গীতঃ 
লোকগানের সঠিক কোন তারিখ নাই কখন এর
উৎপত্তি । তবে আনুমানিক সময় ১০ম -১২শ শতক চর্যাপদের গবেষণা থেকে পাওয়া ।

মানুষের নদী পার হওয়া , মাঠে হাল বাওয়া, ধান বুনা বা কাটা ,  মেয়েদের ঢেঁকি বানা, যাঁতা ঘোরানো বা রান্না বান্না নিয়ে প্রাণের গান । চর্যাপদ হল দাদা আর ভাটিয়ালী,আউল বাউল ,  মারফতি,ভাওয়াইয়া হলো নাতি- নাতনি ।

৮ম -১২ শ শতকের চর্যাপদেই নদী ,নৌকা, বিরহের কথা আছে। 
"ভব নই গহন গম্ভীর বেগে বাহী"--ভব নদী বেগে বয়ে
যায় । গবেষকরা বলেন এই ভাবটাই পরে ভাটিয়ালী হয়েছে ।মানে এই বীজ ১০০০ বছরেরও পুরানো । লোকগান মুখে মুখে তৈরি হয়েছে শত শত বছর ধরে। 
লিখিত রূপে আসে ১৮-১৯ শতকে।  

মেয়েদের গানের বৈশিষ্ট্যঃ 

১) শ্বশুর বাড়ির কষ্ট শাশুড়ি -ননদের গঞ্জনা ,সারা দিনের খাটুনি

২) বাপের বাড়ির স্মৃতিঃ মা-ভাই বোন -সইদের জন্য কান্না 

৩) স্বামীর বিরহঃ নৌকা নিয়ে বাণিজ্যে গেলে 

৪) একমাত্র সুখের জায়গা সন্তান বিশেষ করে পুত্র সন্তান  
এই গান গুলোতে আনন্দ কম ,দীর্ঘশ্বাস বেশি ।কারণ মেয়েদের জীবন তখন বাপের বাড়িতে কিছুদিনের
অতিথি, 
আর শ্বশুর বাড়িতে সারা জীবনের দাসী । 

এই গান গুলো কোনো কবির লেখা না। হাজার হাজার নাম -না -জানা মেয়ের বুকের কষ্ট থেকে জন্ম নিত। 

   জাঁতা ঢেকির গানঃ 
 
"ঢেঁকি পাড়ে বউ ,কোমর বাঁকা 
শাশুড়ি বলে ,'আরও দে  চাকা' 
হাত ফাইট রক্ত ঝরে রে 
তবুও শাশুড়ির মন না গলে রে" 

ধান কাটার গানঃ  
কাইটা লইলাম সোনার ধান রে 
আইল কাঁধে ,বোঝা বাঁধে 
বউ ঝি মিল্যা মাড়াই দিব রে 
নতুন চালে ভাত খাব রে 

রান্নার গানঃ 
উনুন জ্বালাই ফুঁ দিয়ে 
চোখে জ্বলে যায় ধোঁয়ায় 
শাশুড়ি বলে বই অলস 
ভাত কেন পুড়ে 
 
বিধবার গানঃ 
একাদশীর দিন আইল রে 
উপোস দিতে হবে ,
হাতের শাখা ভাইঙ্গা গেছে 
সিঁথির সিঁদুর মুছে 

সাধক রা রূপক দিয়ে বললেও কৃষক রা নিজের জীবনের সাথে মিলিয়ে এই সুরে গাইত কাজ করার সময় দেহমনের কষ্ট এভাবে বলতো । 

ময়মনসিংহ গীতিকা যদিও ১৬ শতক থেকে  ১৯ শতকের মধ্যে লেখা তবে বলা যায় এই গানের মধ্যে দিয়ে গ্রাম বাংলার সাধারন মানুষের যে সুখ দুঃখ ,বিরহ, বঞ্চনা, প্রতিবাদ গাওয়া হয়েছে তা আবহ কালের বাঙ্গালীর চিরাচরিত কথা । যা গেয়ে বা শুনে সাধারন মানুষ বিনোদন করতেন ।

তা যেমন প্রাচীন কালে ছিল মধ্য যুগেও ছিল  এবং তা এখনো চলমান।

চর্যাপদ ছিল ধর্মের গান, বৈষ্ণব পদাবলী ভক্তির গান আর ময়মনসিংহ গীতিকা বাংলার মানুষের নিজের জীবনের গান। 

এই গান গুলো গেয়ে সাধারন মানুষ তাদের মনের খোরাক পরিপুর্ন করতেন । 
 
এগুলো গ্রাম বাংলার গল্প -গান । 
রাজা রানীর গল্প না। সাধারন জেলে, বেদে, কৃষক, সাধু বণিকের জীবন । সমাজের অন্ধকার দিকও আছে। যাকে বলা যায় লোক সমাজের ৩০০-৪০০ বছর আগের দলিল। 

এই ছিল প্রাচীন বাংলার গান এবং তার ক্রম বিবর্তন । 

মন্তব্য ০ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (০) মন্তব্য লিখুন

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.