নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

নাঈমা মাহ্ফুজা

নাঈমা মাহ্ফুজা › বিস্তারিত পোস্টঃ

পতাকা

০২ রা এপ্রিল, ২০১৬ রাত ৯:৪৬

আমার নাম আইয়ুব। বাবা রাখছিল আইয়ুব নবীর নামে। বাবায় নাকি খুব ভালো আছিল। মায় কইছে বাঁইচা থাকতে। এখন বাবায় মায় কেউই নাই। আমি একলা বাঁইচা রইসি আল্লার দুইন্যায়।



আমি থাহি একটা বস্তিতে। মায় থাকতে মায়ের লগে একটা ঝুপড়িতে থাকতাম। মায় একটা বাসায় কাম করতো। আমিও করতে চাইসিলাম। আমার সমান সব পোলামাইয়া ই কাম করে বাসাবাড়িতে। মায় দেয়নাই। কইসে বাবা তুই পড়বি! আমগো বড় সাহেবের লাহান ডাক্তার হবি! তরে আমি কাম করবার দিমু না!



আমি একটা সরকারি ইশকুলে পড়তাম। ওইহানে আমার মত বস্তির পোলাপাইন ও ছিল আবার একটু বড়লোক ও ছিল। মায়ের বড়সাহেবের লাহান এত বড়লোকের পোলাপাইন না। তয় অগো তিনচাইরখান জামা আছিল। কয়েকজনের বই নেওনের ব্যাগ ও আছিল। বড়লোক হইতে আর কি লাগে আল্লায় জানে!



ভালোই যাইতেসিল আমার আর মায়ের দিনগুলান। পেট ভইরা খাইতে পারতাম না কিন্তু রাইতে মায় যহন আমারে জড়ায়ে ধইরা ঘুমাইতো, মনে হইত, আল্লা আমারে বাপের আদর দেয় নাই, তিনচারখান জামা ও দেয় নাই, তিনবেলা খাওয়া ও দেয় নাই, হেরপরেও এই দুইন্যায় আমার থেইকা বড়লোক কেউ নাই!




কিন্তুক আমার বড়লোকের কপাল বেশিদিন থাহেনাই। মায়ের ঠাণ্ডা আছিল। কাশত মাজেমইদ্যে। কইত বাবা শ্বাস লইতে পারি না রে! আমি পানি আইন্যা দিতাম। কইতাম মা একটু পানি খাইয়া শুইয়া থাকো। মাজেমইদ্যে কাশ অনেক বেশি হইলে মা কইতাম মা ওষুদের দোকানের কাকারে নিয়া আসি? মায় কইত লাগবো না বাজান! আরেকটু পানি দে। খাইয়া শুইয়া থাকলেই সাইরা যাইবো!



আমার মায় অনেক ভালা নাটক করবার পারতো। শাবনূর পপি রাও এত ভালো পারেনা। হেরা কানলে বুজা যায় পেয়াজের কষ লাগায়া কানতেসে। আমি কাকারে আনবার চাইলে মায় কাশ কমায়া দিত। কি সুন্দর কইরা লুকাইয়া রাখতো যে কষ্ট হইতাসে! আমি বুজবার ও পারতাম না! ভাবতাম আসলেই পানি খাইয়া কাশ কইমা গেসে!



যেই রাইতে মায় মইরা গেল, আমি এহনো হেই রাতটা স্বপ্নে দেহি। অনেক ঠাণ্ডা আছিল। ডিসেম্বর মাস আমি জানি। বড়লোকেরা যহন লাল আর সবুজ রঙ্গের কাপড় পরা শুরু করে, বুইঝা লইতে হয় ডিসেম্বর আইসা গেসে। মার দুইদিন ধইরা খুব বেশি কাশ আছিল। কামে যাইবার পারতাছিল না। আমগো একটা বহুত পুরান কম্বল আছে। নানা দিসিল মা রে। ওইডা গায় দিয়া আমি আর মায় ঘুমাইতাম। ওইদিন সারাদিন ই মায় শুইয়া আসিল আর কাশতাসিল। সন্দা হইলে আমারে কইল বাপ সারাদিন তো কিছু খাইবার পারোস নাই। শাড়ির আচলটায় কয়ডা টেকা আছে। যা কিছু কিন্যা খাইয়া আয়। আমারো খিদা লাগচিল। টেকাগুলান বাইর কইরা মা রে কইলাম, মা তোমার লাইগা কি আনমু? কি খাইবা? মায় কইল না রে বাপ এত কাশ নিয়া খাইতে পারতাম না। তুই খাইয়া আয়।



আমার প্যাডে আগুন জ্বলতাসিল। আর কিছু না কইয়া খাইতে গেলাম গা। খাইয়া আইসা দেখি মায় আবার কাশতাসে। আগের থেইকা ও বেশি। একটু ডরাইলাম। আগে তো এত কাশতে দেখিনাই! মারে কইলাম মা কাকারে আনি? তোমার কাশ বাইরা গেছে। মায় কইলো না রে বাপ লাগবো না। আমারে একটু পানি দে আর আমারে ধইরা শুইয়া থাক। কাল্ লাগতাসে রে বাবা!

মারে পাজা কইরা ধইরা শুইলাম। যতই কাশুক আমার মারে ধরলে সবসময় ই উম পাওন যায়। কিন্তু ওইদিন মারে সারারাত ধইরা রাইখাও আমি উম পাইনাই।



সারারাত মায়ে কাশল। সে কি কাশি রে খোদা! অনেক রাইতে আমি ঘুমাইয়া গেলাম। সকালে উইঠা দেহি মায় সারারাইত কম্বলের তলে থাইকা ও উম হয়নাই। কিন্তু কাশটা থামছে। কোন কাশ দিতাসে না। মায়েরে ঠেলা দিলাম। ও মা উডো! কাশ তো থামছে এহন কিছু খাইয়া লও! মায় দেহি উডে না! আবার ঠেলা দিলাম। খোদা মায় এমন শক্ত হইয়া রইসে ক্যান? এত ডাকি উডেনা ক্যান?



দৌড়ায়া গেলাম ডাক্তার কাকার দোকানে। মায় কতা কয়না। কইলে কইত না বাপ যাইস না। আমারে একটু পানি আইনা দে!



কাকা আইল। মায়রে দেখল। হাতটা ধরল। চোখ উল্টাইল। আমারে কইল আইয়ুব তোগো টেকা আছে? আমি কইলাম ক্যান কাকা? মায়রে বড় হাসপাতালে নেওন লাগবো? কাকা আমারে জড়ায়া ধরল। কইল তোর মারে আর কোন জাগায় নেয়া লাগবো না রে। তোর মায় আর নাই। মইরা গেছে তোর মায়।



হেরপর কি অইল? শুইনা কাম নাই। এইডা কইতে পারি, আর আমার পড়ালেখা হয়নাই। ডাক্তার হইতে চাইসিলাম এইডা চিন্তা করলেই এহন নিজেরে একটা আস্তা বেকুব মনে হয়..



আমি অহন জুতা কালি করি মাইনষের। খায়া না খায়া চইলা যায় দিন আমার।

শহীদ মিনার দেহা যায় যেইহানে বসি সেইখান থেইকা। অনেকদিন ধইরা ই দেখতাসি একটা জিনিস। তাজ্জিব ব্যাপার! মাজে মইদ্যে অনেক ভিড় হয় শহীদ মিনারে। অনেক মাইনষে ফুল নিয়া আসে। কালা কাপড় পিন্দা আসে। ২১শে ফেব্রুয়ারির কতা আমি জানি। যহন ইশকুলে পড়ছি তহন আফায় পড়াইছিল। তাজ্জিব ব্যাপার কারণ মানুষ ২১শে ফেব্রুয়ারি না অন্যদিন ও ফুল নিয়া আসে। এক ভাইরে জিগাইলাম উনি কইল দ্যাশের অনেক বড় মানুষরা মারা গেলে হ্যাগোর লাশ পতাকা দিয়া পেচাইয়া শহীদ মিনারে আনে। আর মাইনষে ফুল দিয়া সম্মান জানায়।



শুইনাই মনডা ভইরা গেল। মায় যদি থাকত, আমি যদি পড়তে পারতাম, অনেক বড় হইতে পারতাম, আমি মইরা গেলে আমার লাশডারেও তো পতাকা দিয়া পেচাইত। দ্যাশের পতাকা দিয়া!



আইচ্ছা, ইশকুলের আফায় কইছিল দ্যাশটা আমগো সবার, দ্যাশের পতাকাডা আমগো সবার। তাইলে আমারে ক্যান পতাকা দিয়া পেচান যাইবো না?



জীবনে তো কত স্বপন ই দেকলাম। মায়ে ও দেকল। কিসুই তো অইল না! আইজকা থেইকা একটা স্বপ্ন দেখুম। আমার লাশডা পতাকা পেচান থাকবো! বড় একখান পতাকা! আমার দ্যাশের পতাকা!



নিশার মত অইয়া গেছে স্বপনডা! মাইনষে নিজেরে কত ভালো অবস্তায় কল্পনা কইরা সুক পায়। হাসে। আমি খালি কল্পনা করি আমার লাশ! পতাকা দিয়া পেচান! এইডা ভাইবাই আমি হাসি!



সেইদিন রাস্তার উপ্রে একটা পোলা মইরা গেল গাড়ির তলে পইড়া! ডর করে আমি যদি পতাকা কিনার আগেই মইরা যাই? আমি তো বড় মানুষ না! কেউ তো আর আমার লাইগা পয়সা খরচ কইরা পতাকা কিনবো না! আমার ই কিনন লাগবো! মরণ কহন হইবো কোন গ্যারান্টি নাই! আইজকা থেইকাই পতাকা কিননের টাকা জমান শুরু করমু!

ডিসেম্বর আইসা গেসে। কয়েকমাস ধইরা আমার ও কাশ অইসে মায়ের লাহান! মইরা যামু নি খোদা? মাজেমইদ্যে শ্বাস লইতে পারি না। খুব কষ্ট অয়। খোদা আমার মায়ের ও কি এমুন কষ্ট অইত? মায় কহনো বুজবার দেয় নাই!



পতাকাডা কিন্যাই ফালাইলাম। কাশডা বাইড়া গেসে। পরে মরার সময় দেহা যাইবো কিনাই অয়নাই! এক কাকা ঘুইরা ঘুইরা পতাকা বেঁচে। হেরে কইলাম কাকা সবথিকা বড় পতাকাডা কিনমু। কাকা কইল এত বড় পতাকা দিয়া কি করবা বাপ? ছুডু একটা কিনো। মাথায় বাইন্ধা ঘুইরো ১৬ তারিকে!






কাকারে কইলাম, না কাকা আমার সবথিকা বড়ডাই লাগবো! কাকা আর কিছু জিগাইলো না। দিয়া দিল। ভালা হইছে জিগায় নাই! কিল্লিগা কিনছি কইলে কইত গরীবের ঘোড়া রোগ!



কাইলকা ১৬ ডিসেম্বর। আমার কাশডা অনেক বাড়ছে। আইজকা দুইদিন শুইয়া রইসি। শ্বাস লইতে খুব কষ্ট! মায় ও শেষের দুইদিন শুইয়া আছিল। আজরাইল আওনের সময় হইয়া গেসে মনে অয়। আমার ডর করতাসে। কে জানে দোযখে যামু না বেহেস্তে! কবরে আযাব হইব। অনেক ডর করতাসে। কিন্তু কষ্ট লাগতাসে না। পতাকা কিন্যা ফালাইসি। পতাকা পেচায়া মরমু! কিয়ের কষ্ট আমার!



দম আটকায়ে আসতাসে। কহন জানি বাইর হয়া যায়! সাবধান থাকা ভালা! কষ্ট অইতাছে খুব উঠতে। তাও উডলাম। ট্রাংকের মইদ্যে পতাকাডা ভাঁজ কইরা রাখা আছে। বাইর করলাম। কম্বলডা গা থাইকা ফালাইয়া পতাকাডা গায়ে পেচাইলাম সুন্দর কইরা। বুকডা খুব ভার! কেউ মনে অয় উইডা বইয়া আছে এমুন লাগতাসে। আইয়ুব! নিজেরেই কইলাম। কিয়ের কষ্ট তোর! একখান স্বপ্ন তো সত্যি অইতাসে তোর! আর পারতাসি না! দমডা..

১৬ই ডিসেম্বর বিকাল ৪টা …..

সাব ইন্সপেক্টর সবুজ এর কথা…

নতুন বিয়া করছি। বউরে একটা লাল সবুজ শাড়ি কিন্যা দিসি। নিজেও একটা সবুজ পাঞ্জাবি কিনছি। কথা ছিল আইজকা বিকালে ওগুলা পইরা ঘুরতে বাইর হমু বউ সহ! এক মরা হারামজাদার লাইগা সব গেল! থানায় ফোন আইছে কমলাপুর বস্তির এক পোলা মইরা গেসে শীতে। হের লাশ আনতে হইবো। এখন লাশ আনতে আইছি। লাশ দেইখা মেজাজটা আরো গরম অইয়া গেছে! হারামজাদায় পতাকা পেচাইয়া শুইয়া রইসিল। অমনেই মইরা শক্ত হইয়া রইসে। কি মনে কইরা পতাকা পেচাইলি! ঘরে কি গায়ে দেওনের আর কিছু ছিল না! ঢং যত্তসব! নতুন পতাকা! এত্ত বড়! পাইসে কই শালায়! চুরি করসে নিশ্চই! এত বড় পতাকা বড়লোকেরাই কিনে না এই ছোটোলোকে কিনবো! সাথে আসা হাবিলদার রে বললাম পতাকাডা খুইলা ভাঁজ কইরা আমারে দাও। নতুন বাসা করছি। টাঙ্গামু দিবস টিবস আইলে! বস্তির ঘরের দরজায় একটা আর্জেন্টিনার পতাকা লাগানো পর্দার মত কইরা। খুলো ওইডা। লাশটা পেচাও ওইটা দিয়া। একবারে খালি নেওয়া ঠিক না। হেরপরে আবার কাফন কবরেয টাকা দিতে হইব থানা থেইকা! ধুশশালা! তোর নাম হইল আইয়ুব! আইয়ুব খানের নামে নাম! রাজাকারের গুষ্টি তোর! নাইলে এমন নাম ক্যান! রাজাকার মরবো পতাকা পেচায়া! আমি সবুজ থাকতে এইডা হইতে দিমু না! পতাকার একটা ইজ্জত আছে!

আইয়ুবের কথা..

মরার পরেও যে মানুষ দেখতে পায়, শুনতে পায়, আমারে কেউ কোনদিন কয়নাই। অবশ্য কেমনেই বা কইবো! মায় ও তাইলে দেখছিল আমি মা মা কইরা কানতাসিলাম!



বজ্জাত এক পুলিশে আইসে আমার লাশ নিতে! মায় কইছিলো বাপ কোনদিন গালি দিবি না। মইরা গেলেও না! তাই দিতে পারতাসিনা! চোর কোনহানকার! বেকুব কোনহানকার! খালি আইয়ুব খানের নাম শুনছস! আইয়ুব নবীর নাম শুনস নাই! সবুজ নাম রাইখা ই দ্যাশপ্রেমিক হয়া গেছস! দ্যাশপ্রেমিক হওয়া এত সোজা! আর আমি চোর না! পয়সা বাঁচায়া পতাকা কিনছি! তোর বাপের টাকা দিয়া কিনি নাই! চোর তো তুই! এক বিকালে লাল সবুজ কাপড় পিন্দা ঘুরলেই দ্যাশপ্রেমিক হওন যায় না!



আমারে আমার দ্যাশের পতাকা গায়ে দিয়া মরতে দেস নাই তরা! বড় মানুষ না হইবার পারি, মুক্তিযুদ্ধা না হইবার পারি, দ্যাশডা আমারো! পতাকাডা আমারো! আমার টাকায় কিনা আমার দ্যাশের পতাকা আমার শরীল থিকা খুইলা ভিনদেশের পতাকা দিয়া পেচাইসোস তরা! খোদা তগো বিচার করবো!

মন্তব্য ৭ টি রেটিং +৭/-০

মন্তব্য (৭) মন্তব্য লিখুন

১| ০২ রা এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১০:০৭

হৃদছায়া বলেছেন: :(

২| ০২ রা এপ্রিল, ২০১৬ রাত ১০:২৪

চাঁদগাজী বলেছেন:



ওকে

৩| ০৩ রা এপ্রিল, ২০১৬ রাত ৩:৪১

নিরল হৃদয় বলেছেন: তেলা মাথায় সকলেই তেল মারে। তাতে সে দেশ প্রেমিক হোক বা না হোক মাথায় তেল থাকলেই পতাকা দিয়া জড়ায় মাটি দিব। হায়রে দেশ প্রেম!!!!!!
!

৪| ০৩ রা এপ্রিল, ২০১৬ সকাল ১১:৫০

অলওয়েজ ড্রিম বলেছেন: ভাল লিখেছেন। চর্চা চলতে থাকুক। শুভেচ্ছা।

৫| ০৩ রা এপ্রিল, ২০১৬ দুপুর ১২:৩৪

ইয়েলো বলেছেন: ভাল লিখেছেন

৬| ০৩ রা এপ্রিল, ২০১৬ দুপুর ১:০৬

সোজোন বাদিয়া বলেছেন: খুব ভাল লাগল। দীর্ঘজীবী হোন।

৭| ০৩ রা এপ্রিল, ২০১৬ দুপুর ১:১৫

বৃতি বলেছেন: বেশ ভাল লাগলো।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.