নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

যে কোনো ভূমিকায় সমানে লড়ে যাই, আপনি যেমন চান আমি ঠিক তাই।

নান্দনিক নন্দিনী

লেখালেখি হচ্ছে প্রেমে পড়ার মতন একটা ব্যাপার, কোনো ধরনের কর্তৃত্ব জাহির করা নয়।

নান্দনিক নন্দিনী › বিস্তারিত পোস্টঃ

‘সম্পর্কের দুষ্ট-চক্র’

১৫ ই নভেম্বর, ২০১৭ রাত ১০:৪০



সম্পর্কের ভাঙ্গাগড়ার ভেতর দিয়েই আমাদের পথচলা। দারিদ্র্যের দুষ্টচক্র যেমন কিছু শক্তির একত্রীকরণ যেগুলো পরস্পরের সঙ্গে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে একটি দেশকে দরিদ্র করে রাখে। ঠিক তেমনি সম্পর্কের দুষ্টচক্রও অনেক গুলো পারিপার্শ্বিক ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে একজন মানুষকে সম্পর্কে আবদ্ধ করে রাখে। এদেশে বিয়েকে মনে করা হয় সর্বরোগের মহৌষধ আর সব সমস্যার একমাত্র সমাধান। তাই তো বিয়ে নিয়ে আলোচনা অন্য বিষয়াদি থেকে বেশি হবে সেটাই স্বাভাবিক। সেটা আরো বেশি স্বাভাবিক বিয়ে ভাঙ্গা নিয়ে আলোচনা। এক্ষেত্রে বিবাহ বিচ্ছেদকারী দু’জন বাদে বাকি সবাই বিশেষজ্ঞ!

সাম্প্রতিককালে বেশ কয়েকজন তারকার ঘর ভাঙ্গলেও তাহসান-মিথিলার বিবাহ বিচ্ছেদ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক বেশ কিছুদিন বেশ সরগরম ছিলো। সেই সুবাধে মিডিয়া প্রতিদিন বিষয়টার নতুন নতুন এঙ্গেল নিয়ে নিউজ করতে থাকে। থাকে ফলোয়াপ। একটা অনলাইন নিউজ পোর্টালে নিউজের শিরোনাম ছিলো এমন, ‘স্বাভাবিক জীবনে ফিরেছেন তাহসান-মিথিলা’। বন্ধু তালিকায় থাকা কেউ রিএ্যাক্ট করাতে হয়তো আমার হোম পেইজে নিউজটা আসে। হেডলাইনে চোখ বুলিয়ে স্ক্রল করে নিচে চলে যাই, কিন্তু কিছুতেই মাথা থেকে লাইনটা ঝেড়ে ফেলতে পারছিলাম না। তাহসান-মিথিলা যদি স্বাভাবিক জীবনে ফিরে থাকেন, তাহলে এতোদিন কিংবা কিছুদিন কি ‘তারা’ অস্বাভাবিক জীবনে ছিলেন? বিবাহ বিচ্ছেদ সামাজিক ভাবে নতুন কিছু না হলেও এই তারকা দম্পতির বিবাহ বিচ্ছেদ নিয়ে নানা জন নানা মত প্রকাশ করতে থাকেন। সামাজিক মাধ্যমে দেয়া তাহসানের এক বার্তার মাধ্যমে বিষয়টি প্রথম আলোচনায় আসে। জানা যায়, গত দু’বছর ধরে তারা নিজেদের দ্বিমতের জায়গাগুলো নিয়ে কাজ করেছেন এবং যখন তাদের মনে হয়েছে, তারা নিশ্চিত ভাবে আলাদা থাকতে চান, তখনই বিবাহ বিচ্ছেদের আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেছেন। এবং তারা দু’জনই তাদের সন্তানের দায়িত্ব নিয়েছেন বলেও উক্ত পোষ্টে জানানো হয়।

ঘটনাটা গণমাধ্যমে আসার পর থেকে আমরা আতিপাতি করে কেবল-ই খুঁজেছি ‘কারণটা কী’। তাই তো দৈনিক যুগান্তরের শিরোনামে ছিলো, ‘তাহসান-মিথিলার বিচ্ছেদের নেপথ্যে’ কিংবা প্রথম আলোর শিরোনাম ছিলো ‘গানে ফিরলেন তাহসান, অভিনয়ে মিথিলা’। আর বিডিনিউজ২৪ডটকম লিখেছিল ‘বিচ্ছেদ ভুলে কাজে ফিরলেন তাহসান-মিথিলা’। যেমনটা আচরণ শুরু থেকে গণমাধ্যমের ছিলো যে, বিবাহ বিচ্ছেদের কারণ জানতেই হবে এবং জানাতেই হবে, কেননা অডিয়েন্স রায় দিবেন বিবাহ বিচ্ছেদটা যৌক্তিক কারনে হয়েছে কিনা। অথবা বিয়ে এবং ঘর সংসার সামলে তাহসান গান গাইতে এবং মিথিলা অভিনয় করার সময় এবং সুযোগ বের করতে পারছিলেন না, এবার বিচ্ছেদের অবসরে তাই তারা কাজে ফিরেছেন। কিংবা বিচ্ছেদ হয়তো ভুলে যাবার মতো একটা বিষয় তাই পাঁচ/সাত দিন সময় নিয়ে বিচ্ছেদ ভুলে তারপর কাজে যোগ দিতে হয়!

বিচ্ছেদ শব্দটার সাথে বিষাদময় অনুভূতি জড়িত। সাধারণত আইন দ্বারা স্বীকৃত হতে হয় এমন সম্পর্কে বিচ্ছেদ করতে হলে বেশ কিছু পর্ব পেরোতো হয়। কিন্তু যে সম্পর্ক অলিখিত সেখানে বিচ্ছেদ শব্দটা অনেক বেশি আড়ম্বর মনে হতে পারে। বিচ্ছেদ লিখিত সম্পর্কে হোক কিংবা অলিখিত সম্পর্কে হোক তার জন্য মানসিক প্রস্তুতির দরকার আছে। এবং সে জন্য সময় নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানো উচিৎ। কোন রুগ্ন সম্পর্ককে দিনের পর দিন বাঁচিয়ে রেখে মহৎ মানুষ হওয়া যায় বটে, সুখি মানুষ নয়। একটা বিষয় উল্লেখ্য যে, মানুষের সম্পর্কগুলো আলো-বাতাসের মত সহজ এবং স্বাভাবিক হওয়া প্রয়োজন। তাতে আন্তরিকতা, সমানুভূতি আর সহমর্মিতার মিশেল থাকা চাই। একে অন্যের প্রতি দায়িত্ব থাকবে, তবে অবশ্যই সেটা দায়বদ্ধতা নয়। যেখানে আপনার প্রিয়জন আছে, লাইফ নেই; সেটাই দায়বদ্ধতা। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় পারস্পারিক সম্পর্কটা আর আন্তরিকতার নয়, কেবলই আনুষ্ঠানিকতার। সম্পর্কে সাইকোলজিক্যাল স্যাটিসফেকশন না থাকা মানেই বেদনার তাড়না এবং ব্যর্থতার বোধ। ভালোবাসা এবং ঘৃণা খুব দূরের কিছু নয়। একই রেখাপথে নিকতমত দূরত্বে তাদের বাস। তবে বিচ্ছেদ মানেই কিন্তু ঘৃণা নয়, আবার যথেচ্ছা অবজ্ঞার নামও ভালোবাসা নয়। সমস্তটা ঝড়ের পরেও অটুট থাকার মানে ভালোবাসা। ভালোবাসা এমন একটা ব্যাপার যা নিজে নিজেই সব কিছুকে বদলে নেয়। প্রেম পোশাকের মতো বদলে ফেলা যায়; ভালোবাসা তো শরীর, সেটা বদলানো যায় না। পেছনে ফিরে তাকালেই যে সম্পর্কটাকে খুব দূরের এবং নিরানন্দের মনে হচ্ছে সেই সম্পর্কের বিষয়ে চিন্তা করার সময় বের করা উচিৎ। মনে রাখতে হবে ইমোশনাল এবং সেন্টিমেন্টাল এক বিষয় নয়।

এবছর মে মাসের মাঝামাঝি রাজধানীর ধানমন্ডিতে একটি বহুতল ভবনে অবস্থিত নষ্টালজিক ক্যাফে থেকে লাফিয়ে পড়ে সুলভ (৩৬) নামের এক ব্যক্তি আত্মহত্যা করেন। কাজী ফার্মস গ্রুপে কর্মরত ওই ব্যক্তি রেস্টুরেন্টের বারান্দায় বসে ধূমপান করছিলেন। এর আগে তিনি তার স্ত্রীর সঙ্গে মোবাইল ফোনে কথা বলেন। পরে ৯ তলার বারান্দা থেকে ঝাঁপিয়ে পড়েন তিনি। বছর খানিক আগে রাজধানীর বসুন্ধরা সিটি শপিং কমপ্লেক্সের অষ্টম তলা থেকে এক সন্ধ্যায় লাফিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করে বুয়েটের শাহরিয়ার রিপন (২৬) নামক এক শিক্ষার্থী। আত্মহত্যা করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন মেধাবী শিক্ষার্থী পিংকি, আত্মহত্যার আগে তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে লিখে যান, ‘সবাইকে ধন্যবাদ’। সম্প্রতি রাজধানীর সোবহানবাগে প্রেমিকার সামনে গায়ে কেরোসিন ঢেলে আত্মহত্যা করেছে সুমন কুমার পাল (২৬) নামের এক যুবক। সম্পর্কে টানাপোড়েনের কারণে শনিবার বিকেলে সুমন ওই তার প্রেমিকাকে ডেন্টাল কলেজ হোস্টেলের পাশে ডেকে আনেন। কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে সুমন নিজের গায়ে কেরোসিন ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরে রোববার রাতে মোহাম্মাদপুরের একটি হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।

গণমাধ্যম থেকে জেনেছি সুমন বেকারত্বের হতাশায় ছিলেন। তার প্রেমিকার বিয়েও ঠিক হয়ে গিয়েছিল। যেহেতু তিনি প্রেমিকার সামনেই গায়ে আগুন দিয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন সেহেতু ধরে নিচ্ছি, প্রেমের সাম্পর্কিক জটিলতাটাই তাকে সবথেকে বেশি পীড়া দিয়েছে। ভল্টেয়ার এর মতে, যে লোক মানসিক অবস্থার কারণে নিজের জীবন বিসর্জন দেয়, সে আর এক সপ্তাহ অপেক্ষা করতে পারলে হয়তো; জীবনে বেঁচে থাকতে আগ্রহী হতো। অনেকে তাৎক্ষনিক তর্কবিতর্কের কারণে ‘Psycheache’এ আক্রান্ত হয়ে ইগো নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে আত্মহত্যা করে বসে। পূর্বনির্ধারিত পরিকল্পনা ছাড়াও অনেকে আত্মহত্যা করে থাকে।

এই সময়ের একটা বয়সের(১৬-২৪বছর) বেশিরভাগ মানুষের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য হচ্ছে ‘প্রেম করা’। সোস্যাল নেটওয়ার্ক বা ফেসবুকের কল্যাণে মানুষ এখন তার অনুভুতি ছড়িয়ে দেয়। এবং অন্য অনেকেরটা জানার ও মেশার সুযোগ পায়। প্রেম যে আসলে করা যায় না, বরং সেটা হয় এই বোধটাই তাদের নেই। নিজেকে কৃত্রিম ভাবে উপস্থান করে, অন্যের চাওয়া অনুযায়ী বদলে প্রেমিক/প্রেমিকার মন রক্ষা করে। এভাবে অন্যের জীবনে প্রয়োজনীয় হওয়া যায়, অপরিহার্য হওয়া যায়না। আমার মনে হয়, ভালোবাসার জন্য চাই ‘যথাযথ মন (proper mind) এবং প্রস্তুত মন(prepared mind)’।

‘যথাযথ মন’ প্রয়োজন, কেননা সবার সাথে প্রেমটা ঠিক হয়না। দু’জনের চাওয়া-পাওয়া, ইচ্ছে-অনিচ্ছার মধ্যে কোথাও একটা কমননেস থাকতে হয়। কারো চোখ দেখে, হাসি দেখে আপনি প্রেমে পড়তেই পারেন। তাতে সুন্দর সমাপ্তি হবে এমন নিশ্চয়তা দেয়া যাচ্ছে না। মানুষ আসলে আশ্রয় খোঁজে। দিন শেষে হেলান দেয়ার জন্য একজন মানুষ চায়। আমার কাছে ঠিক মানুষ টা হচ্ছেন তিনি ‘যার কাছে আমার বার বার ফিরতে ইচ্ছে করে। কারনে- অকারনে। ভালোবেসে- অভিমানে, ঝগড়া আর আপোষে’। ‘প্রস্তুত মন’ এর ব্যাখ্যাটা হলো, আপনাদের মধ্যে সব কিছুই ঠিকঠাক কিন্তু সম্পর্কটা দীর্ঘস্থায়ী হল না। খুব সিম্পল, হতেই পারে। কারন আপনি যাকে ভালোবাসেন তিনি হয়তো ভালোবাসার সম্পর্কের জন্য প্রস্তুত নয়। প্রস্তুতি নেয়ার সময় দুপক্ষেরই প্রয়োজন। জীবনে ‘সঠিক সময়’টাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। আগেও না পরেও না। লোহা নামক প্রয়োজনীয় ধাতু টাকে গরম করে- নরম করে ঠিক সময়ে শেইপ দিতে হয়। যাকে বলা হয় On Time। ঠিক সময়ের আগে কিংবা পরে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলেও খুব একটা ফলপ্রসু কিছু-হয়না।

বাছবিচারহীন ভাবে জীবনে কিছু গ্রহন করাটা মস্তবড় বোকামী। যাকে ধারন করতে পারবেন না তাকে গ্রহন করে “ল্যাজেগবোরে করবেন না”। আকাশ যেমন চোখের মাপে হয় না, ঠিক তেমনি মনের মাপে মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়না। এই প্রজন্মের বড্ড তাড়াহুড়া। প্রেম তো করতেই হবে তাদের। এখনো হচ্ছেনা কেন! আরো ভয়ংকর কথা তাদের মধ্যে হারানো ভয় এক্কেবারেই নেই। ভালোবাসার মানুষকে হারানো ভয় না থাকাটা অনেকটা ‘ব্রেক লেস’ গাড়ীর মত। উদাসীনতা থেকে আর যা কিছুই হোক; ভালো কিছু যে হয়না, এটা নিশ্চিত।

জীবন আমাদের অনেক কিছু দেয়। আপনি বলতেই পারেন যারা আত্মহত্যা করেছেন তাদের ব্যক্তিগত জীবনে যা টানাপোড়েন ঘটে গেছে সেখানে প্রাপ্তিটা কোথায়? জীবনে অপ্রাপ্তির সবথেকে বড় প্রাপ্তি হলো ‘শিক্ষা কিংবা অভিজ্ঞতা’। দিন শেষে, একটা ভ্রমন শেষে যেটা শিখলেন, সেটাই বা কম কি। জীবনে একজন ভালো মানুষ দেখার আগে অনেক জন খারাপ মানুষ দেখা উচিৎ। তাহলেই আপনি বুঝতে পারেন ‘আপনার জীবনে আসা ভালো মানুষটা আসলে কত ভালো’। হুমায়ূন আহমেদ এর ‘চলে যায় বসন্তের দিন’ আমাকে যতটা হতাশ করেছে, তার থেকেও আরিয়ানা ফ্যালাচি’র ‘সুন্দর আগামীকাল আসবেই’ আমাকে অনেক বেশি অনুপ্রাণিত করে। অনেকেরই অভিযোগ থাকে, ভাল কাউকে পেলেই মেয়েটি/ছেলেটি বিয়ে করে চলে যায়। ভাল’র প্রতি কার না লোভ থাকে বলুন।‘প্রলোভন জয় করা কি সহজ পরীক্ষা?’। সামাজিক অবস্থান আর নিরাপদ ভবিষ্যতের মোহ কাটতে সম্ভবত খুব বেশিদিন সময় মানুষের লাগেনা। তারপর…… সারা জীবনের আফসোস। কত কাছের মানুষ, শুধু প্রলোভনের কাছে হেরে গিয়ে, কত সহজেই অচেনা হয়ে যায়। হেসে, ভালোবেসে, মন থেকে……। সেই মানুষটাকে মনে রাখা মানে তো শুধু কষ্ট পাওয়া।

মানুষ যখন ভালোবাসে তখন কেবল নিজের মনের কথা শুনে। আর যখন বিয়ে করে তখন তাকে পরিবারের সবার কথা মাথায় রাখতে হয়। তাই তো প্রেম-ভালোবাসা আর বিয়ের মধ্যে যোজন যোজন দুরত্ব। বাঙ্গালী পরিবারে ছেলেরা বাবার কথা না শুনিলেই, তাকে ‘ত্যাজ্য’ করে দেয়ার হুমকী দিয়ে পথে আনা হয়। আর মেয়ে কথা না শুনিলেই বাবা ‘হার্ট এট্যাক করেন’ তারপর ইমোশনাল ব্ল্যাক মেইল করে তথাকথিত পথে আনেন মানে সন্তানের মত পরিবর্তন করান। একটু ভাবুন তো আপনার বাবা-মা-ই যেখানে আপনার ভালোবাসা সম্মান করেন না, মেনে নেননা, স্বীকৃতি দেননা; সেই আজন্ম পরিচিত গন্ডির বাইরে পরিমিত পরিচিত একজন মানুষ আপনাকে তার জীবনে সবথেকে বেশি গুরুত্ব দিবেন, আপনার জন্য সব কিছুকে অগ্রাহ্য করে চলে আসবে, সেই চাওয়াটা অনেক অনেক বেশি কিছু।

প্রেমে বিশ্বাস থাকতে হয়, আর বিয়েতে বিশ্বস্ততা। কবি শামসুর রাহমান লিখেছিলেন, ‘তোমার প্রেম, প্রিয়া, সরকারি প্রেসনোটের চেয়েও মিথ্যা’। কিংবা মুজতবা আলী লিখে গেছেন, আমার প্রেমে তুমি অভ্যস্ত হয়ে যেও না, আমার বিরহে তুমি অভ্যস্ত হয়ে যেও না। ভালোবাসায় কখনো প্রমান দিতে নেই, ভালোবাসায় জানান দিতে হয়। ভালোবাসতে হলে সময় দিতে হয়। আমাদের আশপাশের অনেকেই প্রেমে ব্যর্থ হচ্ছেন। সবাই আত্মহত্যা করেন না, কেউ কেউ করেন। এই আত্মহননের পেছনে রয়েছে নিজস্ব চিন্তা, ধারনা আর আবেগ নিয়ন্ত্রণের ঘাটতি। পরিস্থিতি কাটিয়ে না উঠতে ব্যর্থতা। জীবনে কিছু মানুষ আসেন, যারা ভালোবেসে থেকে যান আজীবন। তারা আমাদের জন্য ‘উপহার’ স্বরূপ। আর কিছু মানুষ আসেন যারা জীবনটাকে অগোছালো করে দিয়ে চলে যান নিজ গন্তব্যে। তারা আমাদের জীবনের জন্য ‘শিক্ষা কিংবা অভিজ্ঞতা’। প্রবল অভিমানে হেরে গিয়ে হারিয়ে যাওয়াটা অন্যায়। কেননা, ‘অপূর্ণতার মাঝেই থাকে জীবনের সব দাম্ভিক সুখের গল্প’। বেঁচে থাকলে মানুষ ভালো থাকাটাও শিখে যায়।

প্রশ্ন আসতে পারে, বিচ্ছেদের মনস্তাত্ত্বিক প্রস্তুতিটা কেমন হওয়া উচিৎ? যার ক্রাইসিস যত বড় তাকে সেভাবে প্রস্তুতি নিতে হয়, তিনি ক্রাইসিসটা কিভাবে ম্যানেজ করবেন। অনেক ক্ষেত্রেই আমরা ভাবি, “মানুষ জিজ্ঞেস করলে কী বলবো? তাকে (পার্টনারকে) আমি আমার সিদ্ধান্তটা কিভাবে জানাবো? জানার পর কী রিএ্যাক্ট করবে?” সবার আগে মনে রাখতে হবে ‘কেউই জীবনে অপরিহার্য নয়’। বড় জোড় প্রয়োজনীয় হতে পারে। সম্পর্কের সংক্ষিপ্ত সীমারেখা সামনের সীমাহীন সম্ভাবনাকে তুলে ধরে। মূলত অবিশ্বাস থেকেই সম্পর্কের টানাপোড়েন শুরু হয়। দানা বাঁধে অসন্তোষ। শুরু হয় সন্দেহের পৌনঃপুনিকতা। একের কাছে অন্যের গোপনীয়তা। বাড়তে থাকে কলহ-বিবাদ। আস্থাহীন-নির্ভরতাহীন সম্পর্কে বয়ে বেড়ানো হয়ে ওঠে অভিশাপের মতো। সমাধান যোগ্য হলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে নেয়া যেতে পারে। আর তা নাহলে সম্পর্ক মচকে থাকার চেয়ে ভেঙ্গে যাওয়াই ভালো। তাতে যন্ত্রণাটা কিছুটা কম হয় বলে মানি।

সংসার, সম্পর্কের কাঠামোগত ধারনাগুলোর একটা। সম্পর্কে আড়াল থাকতে হয়। স্পেস থাকা লাগে। সমমানসিকতা সম্পন্নদেরই শয্যাসঙ্গিনী হওয়া উচিৎ। ‘শীতের সঙ্গে বসন্তের পরিনয় কখনো সুখের হয় না। না শীতের জন্য, না বসন্তের’। বিয়ে সামাজিক ভাবে হলেই টেকার সম্ভবনা সব থেকে বেশি। এত বেশি মানুষকে ইনভলব করে যাতে সবাই নিজ দায়িত্ব বুঝতে পারে। সংসার,গোছানো জীবন; এর বাইরে- অনেকে বের হতে পারেনা। তাই সম্পর্ক উষ্ণ থাকুক আর না থাকুক এক সাথে থাকবেই হবে সেই সামাজিক প্রেসার নিয়ে অনেকে এক সাথে থাকে। বিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই হয়ে ওঠে আনন্দহীন দায়িত্ব পালন। আনুষ্ঠানিকতা মাত্র! বিয়েতে স্ত্রী’রা ছেলেদের দায়িত্ব আর স্বামীরা মেয়েদের কর্তব্যবোধের অবস্থানে চলে আসে। খুব গোছানো সংসারে ক্ষেত্রবিশেষ মনোসংযোগের অভাব থাকে। সংসারে সবসময়ই হ্যাঁ মানে উপেক্ষাও হতে পারে। যদিও তাকে আমরা বাইরে থেকে ইতিবাচক বলে ধরে নিয়ে থাকি। ভালোর সাথে মন্দের দ্বন্দ্ব হয় না। দ্বন্দ্বটা ভালোর সাথে আরো ভালোর।

কিছু সম্পর্কের উপরটা চাকচিক্যময় জৌলুসে ভরা; ভেতরটা অন্তঃসার শূন্য, ফাঁকা। প্রেমহীন দাম্পত্য জীবন যেমন ‘হয় বরফ নয় অগ্নিরথ!’। জীবনের সবথেকে বড় শিক্ষা, ‘জীবন কখনো থেমে থাকে না’। তাই অন্যরা আপনার সম্পর্কে কী ভাববে সেই ভাবনাই নিজেকে ক্লান্ত করে তোলার কোনো কারণ নেই। ভাবনার আচ্ছন্নতা আচরণে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। মানুষ একসময় শিখে যায় যাবতীয় না-পাওয়াকে ভুলে যেতে। বুঝতে শিখে যায়, ছোট খাটো লোকসান, অপূর্নতা, শোক, ব্যর্থতা এগুলো সত্যিকারের দুঃখ নয়। তারপরও কোনো একজনকে ভালোবেসে বলতে ইচ্ছে করে – ‘তোমাকে পেতে ঈশ্বরকেও বেঁচে দেবো ওই খুচরোর বাজারে ……………’

মন্তব্য ১৬ টি রেটিং +৭/-০

মন্তব্য (১৬) মন্তব্য লিখুন

১| ১৫ ই নভেম্বর, ২০১৭ রাত ১১:২৬

মাইনুল ইসলাম আলিফ বলেছেন: অসাধারণ।



খুব মন দিয়ে পড়লাম
ভাল থাকুন। শুভ কামনা।

১৬ ই নভেম্বর, ২০১৭ দুপুর ২:৩৮

নান্দনিক নন্দিনী বলেছেন: ধন্যবাদ মাইনুল ইসলাম আলিফ

২| ১৬ ই নভেম্বর, ২০১৭ রাত ২:০৯

সচেতনহ্যাপী বলেছেন: পুরো বিষয়টাই অনেক জটিল।। স্বাভাবিক ধান-ধারনার বাহিরে।।

১৬ ই নভেম্বর, ২০১৭ দুপুর ২:৩৮

নান্দনিক নন্দিনী বলেছেন: তাই নাকি?

৩| ১৬ ই নভেম্বর, ২০১৭ সকাল ১০:৩০

মোস্তফা সোহেল বলেছেন: সম্পর্কের টানাপোড়ন নিয়ে লেখাটি অনেক ভাল লাগ।

১৬ ই নভেম্বর, ২০১৭ দুপুর ২:৪০

নান্দনিক নন্দিনী বলেছেন: ধন্যবাদ সোহেল!

৪| ১৭ ই নভেম্বর, ২০১৭ বিকাল ৫:২৩

নাহিদ০৯ বলেছেন: সম্পর্ক নিয়ে লিখাগুলো প্রায় ই একপেশে বা দুই একটি ঘটনার উপর ভিত্তি করে লিখা হয় দেখেছি। আপনার লিখাটি খুব মন দিয়ে পড়লাম। এত স্পষ্ট ধারনা নিয়ে লিখেছেন যে এত বড় লিখাও একবাড়ে পড়ে ফেললাম। কিছু কিছু লাইন খুবই মনে ধরেছে।

আপনার এবং আপনার সম্পর্কের সুস্থতা কামনা করছি। ভালো থাকবেন।

১৮ ই নভেম্বর, ২০১৭ বিকাল ৪:২৯

নান্দনিক নন্দিনী বলেছেন: ধন্যবাদ ভাই, আপনিও ভালো থাকবেন।

৫| ১৮ ই নভেম্বর, ২০১৭ রাত ২:১৮

ফেরদৌসা রুহী বলেছেন: আপনার সবগুলি লেখায় অন্য রকম, পড়ে জানা হয় অনেক কিছু, শেখা হয় অনেক কিছু।

এই লেখাটা এখন পর্যন্ত আপনার যত লেখা পড়েছি তার মধ্যে আমার কাছে সেরা লেখা।

১৮ ই নভেম্বর, ২০১৭ বিকাল ৪:৩১

নান্দনিক নন্দিনী বলেছেন: ধন্যবাদ ফেরদৌসা রুহী আপু। এতো সুন্দর মন্তব্য পেয়ে অনেক ভাল লাগছে। আনন্দ আর আনন্দ !!

৬| ১৯ শে নভেম্বর, ২০১৭ বিকাল ৫:০৪

রাতু০১ বলেছেন: হাল ছেড়ে দেবার অর্থ হল নিজেকে ছেড়ে দেয়া , এটা আপনার সেরা একটা । ভালবাসা এবং শুভকামনা।

২৬ শে নভেম্বর, ২০১৭ সন্ধ্যা ৭:৪৪

নান্দনিক নন্দিনী বলেছেন: তাই নাকি রাতু০১!
ভালো থাকবেন

৭| ২৭ শে ডিসেম্বর, ২০১৭ রাত ৯:২৪

রুদ্র জাহেদ বলেছেন: সম্পর্কের বহুমাত্রিক কথন। খুব মনোযোগ দিয়ে পড়লাম, নিজের ভেতর লালিত জীবনবোধ আরো ঋদ্ধ হলো।

০২ রা জানুয়ারি, ২০১৮ রাত ৮:৩১

নান্দনিক নন্দিনী বলেছেন: হা হা হা ...
নিজেকে এখন আমার বড় মানুষ মনে হচ্ছে!

৮| ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১৮ রাত ১২:২০

ফ্রিটক বলেছেন: কথাগুলি অনেক গুছিয়ে লিখেছেন। ভাল লাগলো।

২৪ শে ডিসেম্বর, ২০১৮ দুপুর ২:৩৪

নান্দনিক নন্দিনী বলেছেন: ধন্যবাদ! ধন্যবাদ!!

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.