নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

স্বপ্নবাজ এক যন্ত্রমানব

অর্ঘ্য কাব্যিক শূন্য

স্বপ্নবাজ এক যন্ত্রমানব

অর্ঘ্য কাব্যিক শূন্য › বিস্তারিত পোস্টঃ

ছুঁয়ে দেখা তুমি ... ...

১২ ই মার্চ, ২০১৬ বিকাল ৪:৩৫

রাতের সময়টা কেন যেন খুব প্রিয় নিশাদের কাছে। নীরবতারও যে কি অদ্ভুত এক আকর্ষণ আছে, নিশ্চুপতারও যে কি মোহময় এক জাদু আছে, সেটা অনুভব করার উপযুক্ততা, নিশাদ রাত ছাড়া কখনও পায়নি। আর সেটা যদি হয় বৃষ্টির রাত, তাহলে তো কথাই নেই। এমনিতেও বৃষ্টিতে ভেজা নিশাদের কাছে নেশার মতো। দু’দুটো প্রিয় অনুভূতি আজ একসাথে ধরা দিয়েছে নিশাদের কাছে।

রাত এখন একটা ত্রিশ। কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনের খোলা উঠানটাতে তুমুল বৃষ্টি নেমেছে। বড় বড় স্পটলাইটগুলো তাক করা। বৃষ্টির ফোঁটাগুলো মাটিতে আছড়ে পড়ে কুয়াশার মতো সৃষ্টি করছে মাটির একহাত পর্যন্ত। বারান্দাগুলোতে উকিল, পুলিশ, ডাক্তার, জেলার সহ আরও কয়েকজন গণ্যমান্য ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছেন। ম্যাজিস্ট্রেট আফসান আকন্দ মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছেন এক পাশে। তাঁর দৃষ্টি সোজাসুজি চলে গিয়েছে উঠোনের ঠিক মাঝখানে বসে থাকা ছেলেটার উপর। পরনে কয়েদিদের পোশাক। বৃষ্টিতে ভিজছে, পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে বয়স। আফসান আকন্দের ছোট ছেলেটা যে লেখকের মহা ভক্ত, সেই লেখকের একটু পর ফাঁসি হতে যাচ্ছে। উঠোনে বসে ছেলেটাই সেই লেখক, নিশাদ খন্দকার।

এতো রাতে বৃষ্টিতে ভেজাটা অস্বাভাবিক মনে হলেও নিশাদ খন্দকার মৃত্যুর আগে শেষ ইচ্ছে হিসেবে এটাকেই বেছে নেয়। শেষবারের মতো প্রাণ ভরে বৃষ্টিতে ভেজা। হয়তো বা সম্ভব ছিলো না এটা, তবে কাকতালীয়ভাবে ঠিক এই সময়টাতেই বৃষ্টি শুরু হয়। স্ত্রী সানজানাকে হত্যার দায়ে তাকে ফাঁসি দেওয়া হবে একটু পর। নিশাদের এই পরিণতি মেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে ম্যাজিস্ট্রেট আফসান আকন্দের। ঠিক মিল নেই কোথাও যেন। খাপছাড়া, বেমানান লাগছে পুরো ব্যাপারটাই। নিশাদ খন্দকারের পেছনে এসে দাঁড়ালেন। চোখ বন্ধ করে ভিজছে নিশাদ।

- “ তোমার ফাঁসির সময় হয়ে গিয়েছে ” – ইতস্তত কণ্ঠ আফসান আকন্দের।

চোখ খুলে তাকালো নিশাদ, “ হুম, জানি। ” – অদ্ভুতভাবে হাসলো সে।

- “ আমার ছোট ছেলেটা তোমার লেখা অনেক মিস করবে, নিশাদ ” - নিশাদের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নিলেন আফসান আকন্দ। ওর চোখে এমন কিছু একটা আছে, বেশীক্ষণ তাকিয়ে থাকা যায় না।
- “ তাই নাকি ? ” – বিদ্রুপের হাসি ফুটলো নিশাদের মুখে।
- “ সানজানাকে খুন করার ব্যাপারটা আমার এখনও বিশ্বাস হচ্ছে না। কেন করলে এটা ? ”
- “ ঐ যে, বেশী ভালোবাসতাম ” – হাসতে হাসতে উঠে এলো নিশাদ।

দু’দিক থেকে দু’জন গার্ড এসে নিশাদের হাত পিছমোড়া করে বেঁধে ফেললো বৃষ্টির মাঝেই। আফসান আকন্দ কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। এখন কিছু বলেও আর লাভ নেই।
ফাঁসির কাঠগড়ায় নিয়ে যাওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটা যেন চোখের পলকে ঘটে গেলো। ফাঁসির পূর্বে মাথায় কালো কাপড় লাগাতে দিলো না নিশাদ।
- “ বৃষ্টির শেষ ফোঁটাটা মুখে এসে পড়ুক। ওভাবেই না হয় বিদায় নিলাম ” – হাসতে হাসতে বললো নিশাদ।

আফসান আকন্দ আর কিছু বললেন না। ছেলেটার স্নায়ুর জোর অস্বাভাবিক বলে মনে হলো তার।

রুমালটা হাত থেকে ফেলার আগ মুহূর্তে আফসান আকন্দ নিশাদের মুখের দিকে তাকালেন। নিশাদ আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। মুখে বিচিত্র এক তৃপ্তির হাসি। বিড়বিড় করে কি যেন বলছে। শোনা যাচ্ছে না ... ...

আফসান আকন্দ মুখ সরিয়ে নিলেন। রুমালটা ধীরে ধীরে বৃষ্টির মাঝে ভাসতে ভাসতে মাটিতে এসে মুখ থুবড়ে পড়লো।
.
বাসায় ফেরার জন্য গাড়িতে উঠতে যাবেন, এমন সময় জেলার সাহেব পেছন থেকে ডাকলেন আফসান আকন্দকে, “ স্যার ? ”
ফিরে তাকালেন, “ কিছু বলবেন ? ”
হাতে একটা খাম নিয়ে ছাতা হাতে এসেছেন জেলার সাহেব। সেটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,

- “ নিশাদ সাহেব আপনাকে দিয়েছিলো। বলেছিলো সে মারা যাওয়ার পর যেন এই চিঠি আপনাকে দেওয়া হয়। খুলে না পড়তে অনুরোধ করেছিলো আমাকে। ”

গাড়ির দরজাটা আবার বন্ধ করে ছাতা হাতে অবাক মুখে ঘুরলেন আফসান আকন্দ। হাত বাড়ালেন, “ দেখি ? ”
জেলারের হাত থেকে চিঠিটা নিয়ে খোলা মাত্র জমে গেলেন আফসান আকন্দ।


“ আকন্দ ভাই,

খুব অবাক হচ্ছেন ? মৃত্যুর আগে কেউ চিঠি লিখবে, তাও আবার জেলে বসে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে ? অবাক হওয়ারই কথা। বৃষ্টিতে ভিজে মরার খুব ইচ্ছে ছিলো। এখনও জানি না, সেটা পূরণ হবে কিনা, তবে মনে হচ্ছে বৃষ্টি আসবে। বৃষ্টি অনেক ভালোবাসতো সানজানা, পাগল ছিলো একরকম বৃষ্টিতে ভেজার জন্য। আমাকে নিয়ে জোর করে প্রায়ই ছাদে উঠে ভিজতো বৃষ্টিতে। সানজানা যে রাতে মারা যায়, সে রাতেও অঝোরে বৃষ্টি হয়েছিলো।আমি রিডিং রুমে পড়ছিলাম। হঠাৎ ছাদে সানজানার আর্তনাদ শুনতে পেলাম। যতক্ষণে ছুটে গেলাম, ততক্ষণে ছুরিটা পেটে বিঁধিয়ে ফেলেছে। কিছুই করার ছিলো না। ক্যান্সারে ধুঁকে ধুঁকে মরার চাইতে দ্রুত মারা যাওয়াটাই ভালো মনে করেছিলো। আমি আসলে ওকে ছাড়া বেঁচে থাকার খুব একটা বড় যুক্তিও দাঁড় করাতে পারছিলাম না সে মুহূর্তে। লেখক মানুষের মেরুদণ্ডের জোর একটু কম থাকে। আমারও তাই। সানজানার মতো আত্মহত্যা করা আমার পক্ষে সম্ভব ছিলো না। সবসময় যে কোনো কাজ করতে পেছন থেকে ধাক্কা প্রয়োজন ছিল আমার। ধাক্কাটা সানজানাই দিতো এতোদিন। কিন্তু এখন ধাক্কা দেওয়ার জন্য কেউ আর অবশিষ্ট নেই। তাই ওকে খুন করেছি বলে দাবী করলাম। যাতে ওর সাথে আবার দেখা মেলে। মরার আগে বোধহয় সাহিত্যিকদের সাহিত্যে ভাটা পরে। দেখছেন না, কি যাচ্ছেতাই চিঠি লিখছি। হাঃ হাঃ ... ...

তবে একটা ব্যাপার কি জানেন ? ভালোবাসায় বোধহয় যুক্তি থাকে না। থাকলে সানজানা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অপেক্ষা করতো। আরেকটু বেশী সময় আমার পাশে থাকতো। আরেকটু বেশী স্মৃতি দিয়ে যেতো আমায় এ সময়টা একাকী পার করার জন্য। একজন লেখক অনেক সুন্দর সুন্দর কাহিনী সৃষ্টি করতে পারে, কিন্তু তার নিজের কাহিনীটা কখনও সুন্দর হয় না। হয়তো আমার কাহিনীটাও তেমনই রয়ে গেল। শুধু তৃপ্তি এখানটায়, সানজানা আমাকে ফাঁকি দিতে পারে নি। তাকে ক্ষয়ে ক্ষয়ে মরতে দেখলে আমি কষ্ট পাবো বলে জীবনের সাথে যে ফাঁকির অংকটুকু সে কষেছিলো, আমি তার শেষ সমীকরণটাও মিলিয়ে দিলাম আজ।

‘ আমার ব্যাথার পূজা হয়নি সমর্পণ,
আমার সকল দুঃখের প্রদীপ
গেলে দিবস, জ্বেলে করবো নিবেদন ...’

গানটা সানজানার খুব প্রিয় ছিল। আজ কেন জানি এ গানটা কানে বাজছে অনেকক্ষণ ধরে। বোধহয় ব্যাথার সব প্রদীপ বৃষ্টিতে ভিজিয়ে আজ নিভিয়ে দেওয়ার দিন, তাই ... ...

নিশাদ খন্দকার

মন্তব্য ১ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ১২ ই মার্চ, ২০১৬ বিকাল ৫:১১

ইয়েলো বলেছেন: পড়ে ভাল লাগল।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.