![]() |
![]() |
নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
সম্প্রতি লেখক শহরের কোলাহল ছেড়ে যতটুকু পারা যায় গ্রাম আর প্রকৃতির কাছাকাছি থাকতে চান। বিকেলে মাঠে ঘুড়ি উড়িয়ে শৈশবে ফিরে যাওয়া, সন্ধ্যায় ঝিঁঝিঁপোকার দল বুকে নিয়ে এক টুকরো নীরবতা খুঁজে পাওয়া — এ যেন তার নতুন জীবনের ছোট ছোট জয়। আজকের দুনিয়ার অস্থিরতা আর যুদ্ধের গন্ধের ভেতরেও তিনি স্বপ্ন দেখেন গ্রামের শান্ত আকাশ আর মাটির ঘ্রাণে ভিজে থাকার। শহরের ব্যস্ত দালান থেকে পালিয়ে মাটির কাছে ফেরার এ চেষ্টাই তার সবচেয়ে বড় আরাধ্য।
আজ আকাশ যেন অভিমান করেছে। মেঘে মেঘে ঢাকা শহরের চূড়া, যেন কোনো এক অজানা বেদনায় ছেঁকে আছে প্রকৃতি। জ্যৈষ্ঠ মাসের মাঝামাঝি, বাংলা তারিখ মনে নেই হাবিবুর রহমানের, বরাবরের মতোই। তিনি সরকারি চাকরিজীবী, নিয়মিত অফিসে ডুবে থাকা মানুষ—তবু সুযোগ পেলেই একমাত্র মেয়ে অপরাজিতাকে নিয়ে বেরিয়ে পড়েন কোথাও না কোথাও। আজ ছুটি, আর সেই ছুটিকে ঘিরেই ছিল পরিকল্পনা—চট্টগ্রাম চিড়িয়াখানায় যাওয়ার। কিন্তু এই আকাশ!
আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা আর মেয়ের মুখের উচ্ছ্বাসের মাঝে দ্বন্দ্বে পড়ে যান হাবিবুর রহমান। অবশেষে মেয়ের উচ্ছ্বল চোখের দিকে তাকিয়ে সিদ্ধান্ত নেন—“চলো মা, মেঘকে উপেক্ষা করে আজ চলেই যাই, দেখা যাক না হয় বৃষ্টি আমাদের সঙ্গী হয়।”
চট্টগ্রামে ঘুরতে যাওয়ার জায়গার সংখ্যা হাতেগোনা। ফয়’স লেক আর তার পাশের চিড়িয়াখানা—এ দুটি জায়গা এখনো স্বল্পমূল্যে ভ্রমণ ও শেখার অন্যতম স্থান। পাহাড়তলী ইউএসটিসি হাসপাতালের উল্টো দিকে ছয় একর জমির ওপর গড়ে ওঠা এই চিড়িয়াখানা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৮৯ সালে। প্রথমদিকে ফয়’স লেক ও চিড়িয়াখানার একটিই প্রবেশপথ ছিল, তবে ১৯৯৫ সালে দুটির টিকিট পৃথক করে দেয় কর্তৃপক্ষ।
বাস থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে চিড়িয়াখানার মূল ফটকের সামনে পৌঁছেই তারা দেখে, এক দৃষ্টিনন্দন কৃষ্ণচূড়া গাছে লাল ফুলের ছটা—মেয়েটির চোখ যেন আনন্দে জ্বলে ওঠে। ফটকের ভেতর ঢুকতেই বানরের দল তাদের স্বাগত জানায়, দর্শনার্থীরা বাদাম ছুঁড়ে দিচ্ছে, মেয়েটি খিলখিলিয়ে হেসে ওঠে।
হাবিবুর রহমান মেয়েকে বলছিলেন, “আজ যাদের দেখবে, তারা শুধু বইয়ের পাতায় নয়, বাস্তবেও আছে। তুমি আজ সত্যিকারের ভাল্লুক দেখবে, সিংহ, ময়ূর, কুমির—আরও কত কী!” অপরাজিতার প্রশ্ন থামে না, “বাবা, এরা কী খায়?”, “ওর রঙ এমন কেন?”, “ও একা কেন থাকছে?”—প্রত্যেক প্রশ্নের জবাবে বাবার চোখে ছিলো মুগ্ধতা, কণ্ঠে ছিলো ধৈর্য ও উৎসাহ।
কিন্তু আনন্দঘন দিনটা শেষ হয় কিছু চিরন্তন হতাশায়। হাবিবুর লক্ষ করলেন—অনেক খাঁচায় অতিমাত্রায় দুর্গন্ধ, পশুদের শেডের দূরত্ব মাত্র ৪-৫ হাত, যেখানে প্রয়োজন ছিল ৫০ ফুট। কিছু খাঁচায় পুরুষ প্রাণী থাকলেও নেই স্ত্রী, আবার কোথাও স্ত্রী আছে কিন্তু পুরুষ নেই—ফলে প্রজনন প্রক্রিয়াও ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি বানর, হরিণ, ময়ূরের মতো প্রাণীরা যেন কেবল দর্শনার্থীদের বিনোদনের বস্তু হয়ে রয়ে গেছে, তাদের স্বাভাবিক জীবনধারার কোনো ছায়া নেই।
হাবিবুর রহমান একবার পিছনে তাকিয়ে মেয়ের দিকে চাইলেন। অপরাজিতার চোখে তখনো উচ্ছ্বাস, কিন্তু বাবার চোখে একরাশ অভিমান। “সরকার বদলায়, নাম বদলায়, কিন্তু এই চিড়িয়াখানার দুর্দশা বদলায় না কেন?”, মনে মনে প্রশ্ন করেন তিনি। তবুও, তিনি আশাবাদী—একদিন হয়তো এই চিড়িয়াখানা শুধু চট্টগ্রামের নয়, এশিয়ার অন্যতম সুন্দর প্রাণী উদ্যান হয়ে উঠবে।
যেখানে কর্মব্যস্ত মানুষ একটুখানি সময় পেলে পরিবার নিয়ে ছুটে আসবে, শিশুদের প্রশ্নে মুখর হয়ে উঠবে চারপাশ, প্রজন্মের পর প্রজন্ম বন্য প্রাণীকে নিয়ে শিখবে, বুঝবে এবং ভালোবাসবে।
হাবিবুর রহমানের মতো অসংখ্য বাবা—যারা এখনো স্বপ্ন দেখে, চায় তাদের সন্তান প্রকৃতি ও প্রাণীর সঙ্গে সম্পর্ক গড়ুক—তারা চায় এই জায়গাটা হোক সামাজিক সংহতি, শিক্ষা ও ভালোবাসার এক স্থায়ী প্রতীক।
তাদের জন্যই এই চিড়িয়াখানা শুধু একটি ভ্রমণের স্থান নয়, বরং একটি জীবন্ত স্বপ্ন।
©somewhere in net ltd.