| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
দোহারের অকাল-প্রয়াত কবি মিজানুর রহমান শমশেরীর কবিতা
দোহারের অকাল-প্রয়াত কবি মিজানুর রহমান শমশেরীর কবিতাগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে এই ব্লগটি খোলা হয়েছে। সময়ে সময়ে তাঁর কবিতাগুলোকে গুচ্ছাকারে এখানে পোস্ট করা হবে। পাঠকদের ভালো লাগলে এই ব্লগ-পরিচালকের শ্রম সার্থক হবে বলে মনে করবো। সামহোয়্যারইন ব্লগের প্রতি ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা থাকলো। *** কবি মিজানুর রহমান শমশেরী ৮ কার্তিক ১৩৫৩ বঙ্গাব্দে (২৩ অক্টোবর ১৯৪৬ খ্রিষ্টাব্দে) ঢাকা জেলার দোহার উপজেলার অন্তর্গত সুতারপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ২৯ আষাঢ় ১৩৮৮ বঙ্গাব্দে (১৪ জুলাই ১৯৮১) বিয়ের পূর্বরাতে হৃৎযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে অকালে প্রয়াত হোন। তবে এ-ও জনশ্রুতি আছে যে, আরাধ্য মানবীকে না পেয়ে বিয়ের আগের রাতে তিনি বিষপানে আত্মহত্যা করেন। তাঁর পিতার নাম শমশের উদ্দিন। সর্বজ্যেষ্ঠা এক বোন ও পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে শমশেরী ছিলেন পঞ্চম। একান্ত কৈশোর থেকেই লেখালেখির প্রতি শমশেরীর আগ্রহ গড়ে ওঠে। সাহিত্যসাধনা ও সাহিত্যচর্চা ছিল তাঁর প্রাণ। স্কুল-কলেজের বন্ধু-বান্ধবী ও এলাকার তরুণ-কিশোরদের নিয়ে গড়ে তোলেন সাহিত্যচর্চা বিষয়ক আসর 'পদ্মাপার খেলাঘর'। এর পূর্বে আদমদজী নগরের 'অগ্নিবন্যা খেলাঘর' আসরের সাহিত্য সম্পাদক হিসাবে তিনি তাঁর খেলাঘর জীবন শুরু করেন। শমশেরী ৭০ দশকের কবি। ধূমকেতু, দৈনিক বাংলার বাণী, দৈনিক ইত্তেফাক, দৈনিক সমাচার সহ তদানীন্তন গুটিকতক জাতীয় দৈনিকের সবকটাতেই এবং অন্যান্য লিটল ম্যাগাজিন ও সাময়িকীতে তিনি নিয়মিত লিখতেন। দৈনিক বাংলার বাণীতে সাপ্তাহিক ভিত্তিতে লিখতেন উপ-সম্পাদকীয়। শমশেরীর জীবদ্দশায় একটিমাত্র কাহিনিকাব্য ‘অশ্রুমালা’ প্রকাশিত হয়েছিল। তাঁর অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপির আয়তন সুবিশাল। এই পাণ্ডুলিপিতে যে বইগুলোর নাম উল্লেখ আছে তা হলো : জীবন যন্ত্রণা বসন্ত পরাগ একাত্তরের চিঠি শিকল ভাঙ্গার গান (গান) হিজলফুলের মালা (কাহিনিকাব্য)। এ পাণ্ডলিপিতে সর্বমোট ১৩৭টি কবিতা, ৪০টি ছড়া ও ৫২টি গান রয়েছে। শমশেরীর কবিতায় কঠিন জীবন-যুদ্ধ ও ঘাত-প্রতিঘাতের এক নিষ্ঠুর বাস্তবচিত্র ফুটে উঠেছিল। স্বাধীনতা-উত্তর কালে এদেশের মানুষের মধ্যে বিরাজমান নিদারুণ দুঃখ-দুর্দশা, অনাহার, নৃশংসতা, দুর্নীতি- এসবও অতি প্রকটভাবে তাঁর কবিতায় উঠে এসেছিল। তাঁর কবিতায় সুকান্তের সুর সুস্পষ্ট; তিনি এতোখানিই সুকান্ত-প্রভাবিত হয়ে উঠেছিলেন যে, তাঁর বাক্যের গাঁথুনিতেও সুকান্তের কবিতার শব্দগুচ্ছের ব্যবহার লক্ষ করা যায়।
প্রতিভা-১
ইতিহাস বিজ্ঞান ধারাপাত অঙ্ক’র
একগাদা বই পড়ে ও-পাড়ার শঙ্কর।
মাথা নয় যতটুকু পড়ে বই ততোধিক
সারাদিন পড়াশুনা, চেহারাটা লিকলিক।
রামপাল শিক্ষক তারে যিনি পড়াতেন
প্রতিভাটা দেখে তিনি মাঝে মাঝে ডড়াতেন।
এত জ্ঞান কোথা পেলো এতটুকু ভাণ্ডে?
রামপাল ভাবেন বসে প্রতিদিন সানডে।
প্রতিভা-২
সুকুমার মণ্ডল ঝানু পাকা নকলে
ও পাড়ার ছেলেবুড়ো চিনে তাঁকে সকলে।
টুকটাক কাটাছেঁড়া ছিল তাঁর নলেজে
পাশ করে তাই তিনি চলে যান কলেজে।
কলেজের মোটা বই দেখে বলে বাপরে!
এতসব পড়াশুনা কী যে অভিশাপরে!
মনটারে ঠিক করে কাঁচি লয়ে আফটার
কচাকচ কেটে ফেলে বড় বড় চাপটার।
ছড়াকারের ছড়া
এক.
সুকুমার বড়ুয়া
ঝানু পাকা পড়ুয়া
যতসব কথা বলে
সবকিছু ঘরোয়া।
ছড়া-গড়া মনটা
নেই উৎকণ্ঠা
সপ্তাহে মনে পড়ে
দুই চার ঘণ্টা।
দুই.
ছড়া কাটে ছড়াকার
মুখ ভরা দাঁড়ি তার
পল্টনে লোকটারে
দেখা যায় বার বার।
কী যেন কী নাম তার
পড়ে বই নামতার
এক টাকা পাঁচ সিকে
এক দুই তিন চার।
হতাম যদি
হতাম যদি আমি কোনো গাঁও গেরামের চাষা
মাটির সাথে থাকতো আমার নিগূঢ় ভালোবাসা।
নদীর পারে থাকতো আমার ছোট্ট সোনার গাঁও
উজান-ভাটি স্রোতের টানে চলতো আমার নাও।
মাঠের পাশে থাকতো পাতা মাচান-বাঁধা খড়
বাড়ির পাশে থাকতো আমার ছোট্ট গোয়ালঘর।
গোয়াল ভরা থাকতো গরু আথাল ভরা গাই
সারা গাঁয়ের মানুষ আমায় ডাকতো কৃষান ভাই।
লাঙ্গল কাঁধে মাঠে যেতাম সূর্য ওঠার আগে
স্বপ্ন আমার সফল হয়ে ফুটতো নবীন রাগে।
দাদুর পায়ে খড়ম
দাদুর পায়ে খড়ম
নাকের ডগায় চশমা আঁটা
মেজাজ বড় গরম।
মাথায় বড় পাগড়ি আঁটা
লম্বা বেজায় পাতলা গা’টা
দুই হাতেতেই লাঠি-সোটা
বন্ধু যেন পরম।
বন্ধু তাহার জুটলো আরেক
বয়স তাহার কুড়ি চারেক
মুচকি হেসে ডাকলো বারেক
মেজাজটা তার নরম।
দিন কয়েক হয় মরছে দাদি
তাইতো দাদু করবে সাদি
বন্ধু শুনে খবর আদি
বললো, ছিঃ ছিঃ শরম!
বিদ্রোহী
পিঁপড়েরা সব জোট করেছে
রাজার কাছে বিচার চাই,
দেখছো না তাই এক মিছিলে
চলছে কেমন চলনটাই!
ওদের রাজা বেজায় পাজি
ওদের প্রতি নজর নেই,
রাজা থাকেন তিনতলাতে
ওদের বাসা গাছতলাতেই।
ওরা ফলায় শস্য-ফসল
রাজা করেন হুকুমজারি,
রাজবাড়িতে থাকবে জমা
দেখছো কেমন অত্যাচারী!
নিত্য রাজা খায় যে পোলাও
মাংস চিনি ঘি লুচি
হাভাতে সব শ্রমিকেরা
ওদের বুঝি নেই রুচি!
ওদের রাজা অত্যাচারী
তাই করেছে বিদ্রোহ
দেখছো না তাই এক মিছিলে
কেমন চলার আগ্রহ!
বখেটে
টাকা নেই পকেটে
লোকটা কি বখেটে!
বাসে ভাড়া না দিয়েই
চলে আসে ফকেটে।
মালপানি বাঁকাতে
খুব পারে তাকাতে
সারাদিন চলাফেরা
ডেমরা টু ঢাকাতে।
পয়সাটা না দিয়েই গাড়িতে
চট করে চলে এসে বাড়িতে
বয়কে সে ডেকে কয়,
দে কী আছে হাঁড়িতে
সিনেমায় চলে যায়
খেয়ে তাড়াতাড়িতে।
আমরা আছি
ঘুরছে লাটিম ঘুরতে থাকে ঘুরুক
লাগছে আগুন পুড়তে থাকে পুড়ুক।
মরি বাঁচি আমরা আছি
উড়ছে ধোঁয়া উড়তে থাকে উড়ুক।
অস্ত্রপাতি ধরছে যারা ধরুক
লাগছে লড়াই লড়তে থাকে লড়ুক
মরি বাঁচি আমরা আছি
মরছে মানুষ মরতে থাকে মরুক।
অভাব
অভাব অভাব দারুণ অভাব
পালটে গেলো লোকের স্বভাব
রাঘববোয়াল ফস্কে গেলো
চিংড়ি হলো দেশের নবাব।
করছে যে যা করে করুক
মরছে যারা মরে মরুক
চুনপুঁটিরা লেজ নাড়িয়ে
খাচ্ছে আহা মজার কাবাব।
স্বপ্ন
তুই যদি মা রানি হতিস কত্ত ভালো লাগতো!
আমি হতাম রাজকুমারী, চাকর-নফর থাকতো।
আব্বা যেতেন সিংহাসনে, আমি যেতাম তাঁর পেছনে
উজির-নাজির পেয়াদা-পাইক কত্ত ভালোবাসতো!
আমি যখন ছাদের পরে চুল শুকাতাম গোসল করে
দূর থেকে সব গরিব প্রজা আমায় চেয়ে দেখতো।
বলতো সবে রাজার মেয়ে, অনেক ভালো সবার চেয়ে
বল্ না গো মা, এসব কথা কেমন ভালো লাগতো?
বাড়ি ভরা দালান হতো, আব্বা কত ভোজ বসাতো
তখন কি আর ছাদভাঙা এই খড়ের কুটির থাকতো?
হাইজ্যাকার
হাইজ্যাকারের পকেট ভরা একশ টাকার নোট
তাই সে পরে জাপান থেকে তৈরি করা স্যুট।
বাপ যে ওদের কামলা খাটে, নেই পরনে শার্ট
ছেলেগুলো পয়সা কামায়, তাই তো এতো ডাঁট।
বাপের মাথায় টাক পড়েছে, বব কাটানো চুল
ওদের মতো ছেলেগুলোর বাপ হওয়াটাই ভুল।
অবৈধ ইচ্ছে
ইচ্ছে করেই ওরা আমায় মারতে আসে ঐ
অনিচ্ছাতে এখন আমি পালিয়ে যাবো কই?
ইচ্ছে করেই ওরা আমায় দিচ্ছে বহুত গাল
ইচ্ছে করে ওরা আমার ভাঙছে ভাতের থাল।
ইচ্ছে করেই ওরা আমার টানছে ঘরের খুঁটি
ইচ্ছে করে ওরা আমার নিচ্ছে সকল লুটি।
ইচ্ছে ওদের আমার ঘাড়ে থাকবে ওরা চেপে
মুছিয়ে দিবে মিষ্টি হাসি চুনকালিতে লেপে।
ইচ্ছে করেই ওদের সাথে মিষ্টি কথা কই
ইচ্ছে করে তবু ওরা মারতে আসে ঐ।
খাজনাপাতি
পাট কেটেছি ক’দিন হলো, মাত্র ক’টা দিন-
খাজনাপাতি সবই দেবো, সবুর করে নিন।
আজো জমির ধান পাকে নি, চাল-ডাল নেই ঘরে
পাঁচ বছরের কচি মেয়ে ভুগছে কালা জ্বরে।
কৃষানি আজ ক’দিন হলো খায় নি কিছু ভাই
হালের বলদ গেছে মারা, কাঁদছে শুধু তাই।
কলা দিয়ে জাউ রেঁধেছি, মরিচ বেটেছি
এই কটা দিন এমনি করে চালিয়ে যেতেছি।
উলুর পাকে ঘুরছে মাথা, খাটছি সারা দিন
খাজনাপাতি সবই দেবো, সবুর করে নিন।
দুর্ভিক্ষের ছড়া
গল্প শোনো ছোট্ট খুকু, গল্প শুনে হাসতে মানা
ক্ষুধার দেশে খোদার মানুষ ক’দিন হলো খায় নি খানা।
থাকার ঘরের চাল ভেঙেছে, গাছতলাতে বাসা
ভুলেই গেছে দেশের মানুষ মিষ্টি করে হাসা।
পায় নি মানুষ খাবার খেতে একটা রুটি, একটু ডাল
মরছে মানুষ জঠর-জ্বালায়, চাল-বাজারে নেই যে চাল।
দেশের রাজা টানছে গাঁজা, ছড়ান কথার বুলি
রাজপুতনার মোটর গাড়ি উড়ায় পথের ধূলি।
যে দেশে লোক ভাত না পেয়ে পথে-ঘাটে জীবন খোয়ায়
ঠিক সে দেশের রাজপুতেরা প্যারিস থেকে কাপড় ধোয়ায়।
২|
২৭ শে আগস্ট, ২০১৪ দুপুর ১:০১
পলক শাহরিয়ার বলেছেন: সত্যিই সুন্দর। মুগ্ধ হলাম।
৩|
২৮ শে আগস্ট, ২০১৪ দুপুর ১২:১৫
জাহাঙ্গীর.আলম বলেছেন:
অনেক ধন্যবাদ চমৎকার সংগ্রহ শেয়ার করার জন্য ৷ কবি প্রতি শ্রদ্ধা ৷
©somewhere in net ltd.
১|
২৭ শে আগস্ট, ২০১৪ সকাল ৯:২৪
জাফরুল মবীন বলেছেন: অসাধারণ সব ছড়া!!!
কবি মিজানুর রহমান শমশেরীর প্রতি শ্রদ্ধা জানাই।
আপনাকেও অসংখ্য ধন্যবাদ এরকম একটি মহৎ উদ্যোগ নেওয়ার জন্য।
পোস্ট প্রিয়তে নিলাম।