| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ছোটবেলায় সুখী মানুষের একটি গল্প পড়েছিলাম। এক রাজ্যের রাজার অনেক অসুখ। অনেক চিকিৎসা করিয়েও কোন লাভ হচ্ছেনা। এমতাবস্থায় এক কবিরাজ তাকে বলল, "সুখী মানুষের জামা গায়ে দিলে তার অসুখ ভালো হয়ে যাবে"। এ আর এমন কি কঠিন কাজ ভেবে রাজ্যের চারদিকে রাজার লোকজন পাঠিয়ে দিল সুখী মানুষ খুঁজে বের করতে। পুরো রাজ্য জুড়ে তল্লাশী, এত মানুষ, কিন্তু কোথাও একজন সুখী মানুষ খুঁজে পাওয়া যায়না। শেষে একজন সুখী মানুষ খুঁজে পাওয়া গেলো, তাও আবার বনের ভিতর! এবং সে এতই গরীব যে তার গায়ে জামা পর্যন্ত নেই।
ইস! এখন যদি হতো তাহলে আমার দেখা সুখী মানুষটির জামা রাজাকে দিতে পারতাম। সৌদি আসার প্রথম প্রথম খুবই খারাপ লাগতো। চারদিকের সবকিছুই খারাপ লাগতো। সুখ কাকে বলে ভুলে যেতে লাগলাম।প্রবাস মানেই কষ্টের দলা বেঁধে থাকা এক বুক কষ্ট। কারো কষ্ট সদ্যনবজাত সন্তানকে কোলে নিতে না পারার, কারো কষ্ট নতুন বউকে একাকী রাখার, কারো কষ্ট মায়ের আঁচলে ঘামে ভেজা মুখ না মুছার। এক এক জনের এক এক রকম কষ্ট। কিন্তু সবাই যে কষ্টে আছে এতে কারো দ্বিমত নেই। তা সে যে জাতীরই হোক।
আজ যে সুখী মানুষটির গল্প বলবো তার নাম বুতি,পুরো নাম জানিনা, এই নামেই সবাই তাকে ডাকতো। এক ফিলিপিনো ভদ্রলোক। বয়স আনুমানির ষাট এর ঘরে। বেশ প্রফুল্ল থাকতো সবসময়। তার উচ্ছাস ছিল কিশোর বালকের মতো। সবসময় মুখে একটা হাসি ঝুলে থাকতো। যুবক-বৃদ্ধ, লেবার-মুদির সবার সাথে ছিল সমান সখ্যতা। বুতিকে পছন্দ করেনা এমন একজন মানুষও আমার চোখে পড়েনি। আসুন এবার বলি কেন আমি তাকে সুখী মানুষের কাতারে ফেললাম তার গোপন কথন -
একদিন অফিস থেকে ফিরছি। বাসের মধ্যে প্রায় সবাই বুতির সাথে মজা করছে। বুতিকে ব্যার্থ ক্ষেপানোর চেষ্টায় বিভিন্ন কথা বলছে। বুতিও মজার মজার উত্তর দিচ্ছে। কথোপকথনে পুরো বাসের সবাই হো হো করে হাসছে। ভালই লাগছে। সবাই সারাদিন কাজ শেষে ক্লান্ত শরীরেও একজন ব্যাক্তিকে কেন্দ্র করে এমন চমত্কার ফান করে। কেউ কেউ বোগল তল দিয়ে বুতিকে কাতুকুতু দেবার চেষ্টা করে। অমনি চিকন দেহটাকে মোচড় দিয়ে ফিক করে হেসেই খুন। হাসির আওয়াজে যেন বাস নেচেনেচে শাঁই শাঁই করে চলছে ক্যাম্পের দিকে। হঠাৎ বুতির পেছনের সিটে বসা এক শ্রীলংকান মজা করতে গিয়ে বুতির ঘাড়ে চটাশ করে চড় বসিয়ে দিয়ে হেসে উঠলো। বুতি ঘাড় ঢলতে ঢলতে ওদের ভাষায় কি যেন বললো, মনে হয় কোন গালি দিল। ঘটনা দেখে আমার তো চরম রাগ উঠলো। ধমক দিলাম শ্রীলংকান যুবককে। বুঝানো চেষ্টা করলাম বাবার বয়সী একজন লোককে এভাবে কেউ চড় দেয় নাকি। ও তার ভুল বুঝতে পেরে বার বার সরি বলছে। কিন্তু কি আশ্চার্য বুতি বিষয়টিকে তুড়িতে হাসি দিয়ে উড়িয়ে দিল। ওকে মজা করে আলতো দুটি কিল দিয়ে বলল সমান সমান। আর আমার পিঠে হাত বুলিয়ে বলে, ব্যাপারনা ও মজা করেছে, আমি কিচ্ছু মনে করিনি।
লোকটির সহজতা-সরলতা সবসময়ই দৃষ্টি কাড়তো। একদিন হলো কি ও দুপুরের খাবার খাচ্ছে। শক্ত কিছু খেতে পারেনা বলে সূপ কিংবা ঝুল দিয়েই খাওয়া শেষ করে। আমি তো অবাক শক্ত কিছু খেতে পারেনা মানে তাহলে এতো সুন্দর ঝকঝকে সাদা দাঁত আছে কি জন্য। আমি ওরে জিজ্ঞাস করতেই বুতি মিট মিট করে হাসে। হাসির রহস্য বুঝতে পারিনা। যখন বুঝলাম তখন আমিও হাসি চেপে রাখতে পারিনা। কারন ওর সামনের পাটির যে দাঁতগুলো ধবধবে সাদা হয়ে ঝকঝক করছে ওগুলো তার নকল দাঁত। হাহাহাহা। নকল দাঁতে তার কোন দু:খ নেই। হো হো করে হেঁসেই চলছে বুতি। বলে আসল দাঁত নেই বলে খরচ কিছুটা কম। আসল দাঁত থাকলে দাঁত মাজার জন্য পেষ্ট বেশি খরচ হতো। এখন নিচের পাটির কয়েকটি দাঁত মাজলেই চলে সুতরাং ৫০% খরচা কমে গেলো।
এতো সুখ লোকটির কোথা থেকে আসে কে জানে। ভালো লাগে বলে লোকটি সাথে প্রায়ই আড্ডা জমাতাম। লোকটিও মন খুলে সব শেয়ার করতো। মানিব্যাগের পাতায় পাতায় তার পরিবারের সদস্যদের ছবি সেগুলো সাথে নিয়েই প্রবাস করছে। তার বড় মেয়ে কিছুদিন আগে একটি সন্তান প্রসব করেছে কিন্তু এখনো বিয়ে হয়নি। বয় ফ্রেন্ড চিট করেছে। এখনো বাবার সাথেই থাকে। এই কষ্টের কথাগুলো সে অবলিলায় বলে গেল। হয়তো এই ব্যাপারে তাদের কালচারটাই এমন ড্যাম ক্যায়ার টাইপের। তাদের সম্পর্কে আরো জেনে অবাক হলাম যে স্ত্রী থাকা সত্তেও তাদের গার্লফ্রেন্ড থাকে যেটা সামাজিক ভাবেও স্বীকৃত। কে জানে কতটুকু সত্য। সে যাই হোক সবকিছুতেই সে স্বাভাবিক। কোন ব্যাপারকেই সে সিরিয়াসলি দেখতে রাজি নন। তার মতে সে জীবনে কখনো পরিকল্পনা করে কোন কাজ করেনি। যখন যা সামনে এসেছে করেছে। এতো বছর বিদেশ করেছে তবু উল্লেখ করার মতো কোন সঞ্চয় নেই তার। তাই কোম্পানির কাছে অনুরোধ করে রিটায়ারমেন্টর মেয়াদ আরো একবছর বাড়িয়েছে। তার কিছু নেই তবু সে সুখী ভাবতেই অবাক লাগে।
সে কেমন মানুষ বলতে একটা উদাহরন দেই। একদিন রাত্রের শিফটে ডিউটি করতে গিয়ে ঘুমিয়েই রাত পার। ওদিকে কাজের জট লেগে গেছে। কি যেন একটা ঝামেলাও হয়েছে। তো ডিপার্টমেন্ট ম্যানেজার তাকে ডেকে পাঠালো। ম্যানেজারের সামনে ঠাঁই দাঁড়িয়ে। চেহারায় ভয়ের লেশ মাত্র নেই। ম্যানেজারতো রাগে গড়গড় করতে করতে ইচ্ছে মতো ওকে বকতে বকতে হয়রান। ম্যানেজার বকতে বকতে যখন ক্লান্ত তখনও বুতির চেহারা হাস্যউজ্জল। এতো বকার শেষে যখন বুতির আত্বপক্ষ সমর্থ্যনের সুযোগ এলো তখন যা বলল তাতে ম্যানেজারও আর রাগ নিয়ন্ত্রনে রাখতে না পেরে হো হো করে হেসে উঠলো। মাথা কাত করে বিড়বিড় করে বলে, "বস গড গিভ আস এজ ডে ফর ওয়ার্ক, নাইট ফর স্লিপ, সো আই ডিড নট ডু এ্যানি রং" । বসের বুঝার বাকি নাই এই অধমকে বকা-ঝকা করে কোন ফায়দা হবেনা। পৃথিবীর সমস্থ গন্ডারের চামড়া একত্রিত করলে যত মোটা হবে তার গায়ের চামড়া তার চাইতেও মোটা তাই তাকে বকে কোন লাভ নেই, খামোখা নিজের এনার্জি লস... ।
তার সুখের ঘটনা বলে শেষ করতে পারবোনা...তবে তাকে দেখে যে সুখী মানুষ হবার যে বিষয়গুলো আমার কাছে ধরা পরেছে তার কোড আকারে লেখার চেষ্টা দিলাম। হয়তো চেঞ্জ ইউর লাইফ স্লোগানে কারো উপকারে আসলেও আসতে পারে। নিজের স্বভাব থেকে কিছু বিষয় বাদ ও কিছু যোগ করার মাধ্যেমে লাইফ স্টাইল চেঞ্জ করা সম্ভ্যব। জরিপ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান আইপিএসওএস গ্লোবালের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জন রাইট বলেন, সুখ শুধু মানুষের অর্থনীতি ও তাদের ভালো থাকার ওপরই নির্ভর করে না। সুখ নির্ভর করে মানুষের আশপাশের পারিপার্শ্বিকতাসহ এমন সব কিছুর ওপর, যা তাদের জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে। আসুন দেখে নেই সুখী মানুষ হবার কিছু গোপন রহস্য -
=> ত্যাগী হওয়া...প্রাপ্তি নয় প্রদানেই সুখ খুঁজে পাওয়া
=> সবকিছুকেই স্বাভাবিক ভাবে নেওয়া
=> সবসময় সততা বজায় রাখা
=> সবার সাথেই হাসিমুখে কথা বলা
=> ছোট-বড় কিংবা ধনী-গরীব সবার সাথেই বন্ধুসুলভ আচরন করা
=> সুযোগ পেলেই অন্যকে সাহায্য করা
=> খুব কঠিন মার-প্যাঁচের পরিকল্পনার ছকে জীবন না জড়ানো
=> নিজের যা আছে তাতেই তৃপ্ত থাকা...আরো চাই আরো চাই মানসিকতা না থাকা
=> সবাইকে ভালবাসা...ভালবাসা পবার আকাঙ্খা না থাকা
=> সমস্যাকে সমস্যা মনে না করে চ্যালেঞ্জ মনে করে সমাধান করা
=> জীবন সম্পর্কে সব সময় ইতিবাচক চিন্তা করা।
ইলিনয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন, ইতিবাচক মানসিকতা চাপকেন্দ্রিক হরমোন নিঃসরণ কমাতে সাহায্য করে এবং প্রতিরোধক্ষমতা বাড়ায়। একটি গভেষনায় দেখা গেছে সুখী মানুষ যাঁরা বেশি আত্মতৃপ্তি নিয়ে বাঁচেন, তাঁদের অকালমৃত্যুর আশঙ্কাও ৩০ শতাংশ কমে যায়। যুক্তরাজ্যের ইউনিভার্সিটি কলেজ অব লন্ডনের বিজ্ঞানীরা গবেষণার পর এ তথ্য জানিয়েছেন। আরেকটি গবেষণায় অধ্যাপক এডওয়ার্ড ডায়েনার ও তাঁর দল দেখিয়েছেন, সুখ মানুষের দীর্ঘায়ু ও সুস্বাস্থ্যের ওপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। অন্যদিকে উদ্বেগ, হতাশা, দুঃখবাদিতা শরীরে রোগব্যাধি বাড়িয়ে দেয়, যা দীর্ঘজীবী হওয়ার জন্য অন্তরায়।
সুতরাং আর নয় হতাশা আসুন নিজেকে একজন সুখী মানুষ হিসাবে গড়ে তুলতে অংকের মতো অনুশীলন শুরু করি...
১০ ই জুন, ২০১২ দুপুর ১:২১
সৌদি প্রবাসী আশরাফ বলেছেন: অনেক ধন্যবাদ আপনার সুন্দর মন্তব্যর জন্য...
২|
০৯ ই জুন, ২০১২ সন্ধ্যা ৬:১৯
এইচ এম শরীফ বলেছেন: সুন্দর বাস্তব জীবনের কথা।
১০ ই জুন, ২০১২ দুপুর ১:২১
সৌদি প্রবাসী আশরাফ বলেছেন: অনেক অনেক ধন্যবাদ শরীফ ভাই...
৩|
২০ শে আগস্ট, ২০১৩ রাত ৯:২৫
পাকাচুল বলেছেন: প্লাস+++++++
©somewhere in net ltd.
১|
০৯ ই জুন, ২০১২ সন্ধ্যা ৬:১৮
মনে নাই তো কি করার বলেছেন: চমৎকার লাগলো । পোষ্টে +++