| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
রাজীব নুর
আমি একজন ভাল মানুষ বলেই নিজেকে দাবী করি। কারো দ্বিমত থাকলে সেটা তার সমস্যা।
একসময় আমাদের গ্রামটা খাটি গ্রাম ছিলো।
একদম আসল গ্রাম। খাল-বিল ছিলো, প্রায় সব বাড়িতেই পুকুর ছিলো, গোয়াল ঘর ছিলো, পুরো বাড়ির চারপাশ জুড়ে অনেক গাছপালা ছিলো। বারো মাস ঝিঁঝিঁ পোকা ডাকতো। বর্ষাকালে সারারাত ব্যাঙ ডাকতো। পদ্মার পাড় থেকে আসতো শীতল বাতাস। গ্রামের মানুষ গুলো সহজ সরল ছিলো। গ্রামের চেয়ারম্যান, মেম্বাররাও জটিলতা কুটিলতা মুক্ত ছিলো। সেই সময় ঢাকা থেকে গ্রামে যেতে লম্বা সময় লাগতো। বাস, নৌকা, তারপর মাটির রাস্তায় দুই মাইল হাঁটা পথ। এরপর রিকশা। এখন যেতে যেতে সময় লাগে এক ঘন্টা। নৌকার প্রয়োজন হয় না। দুই মাইল হাঁটতেও হয় না। এখন গ্রামটাকে আর গ্রাম মনে হয় না। প্রতিটা গ্রামে আট দশটা রাজকীয় বিল্ডিং! গ্রামে গেলেও গ্রামের স্বাদ পাওয়া যায় না।
স্কুলের বার্ষিক পরীক্ষা শেষে আব্বার সাথে গ্রামে যেতাম।
এক সপ্তাহ থাকতাম। গ্রামে বেশ আনন্দে দিন যেতো। কেউ কিচ্ছু বলতো না। কোনো শাসন-বাড়ন নেই। বরং সবাই আহ্লাদ করতো। যা চাইতাম তা-ই দিতো। এমনকি গ্রামের মানুষ গুলো পর্যন্ত খাতির যত্ন করতো। আমি সারাদিন গ্রামে ঘুরে বেড়াতাম। গ্রামের সমবয়সী ছেলেমেয়েরা বেশ খাতির করতো। দেখতে শুনতেও ভালো ছিলাম। খোদাবক্স নামে একলোক আমাকে নিয়ে পদ্মানদীতে যেতো। নৌকা করে আমরা ভাগ্যকূল যেতাম। ভাগ্যকূলের মিষ্টি অনেক বিখ্যাত। মিষ্টি খেয়ে আবার নৌকায় করে বাড়ি ফিরতাম। পুকুরে লাফালাফি করে গোছল করতাম। ডাব গাছ থেকে পুকুরে লাফ দিতাম। আমার সারাক্ষনের সঙ্গী ছিলো খোদাবক্স। সোজা বাংলায় বলতে গেলে খোদাবক্স ছিলো আমাদের বাড়ির কামলা। আগে গ্রামে ধনীদের বাড়িতে দুই তিনজন করে কামলা থাকতো।
খোদা বক্সের বয়স হবে প্রায় ত্রিশ।
ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ফরিদপুর থেকে বিক্রমপুর এসেছিলো খোদাবক্স। তার কোনো যোগ্যতা নেই। সে কোনো কাজই করতে পারে না। লেখাপড়া জানে না। তবে লোকটা সৎ। খোদাবক্স ভূত বিশ্বাস করে। সে আমাকে তার জীবনে ঘটে যাওয়া সমস্ত ভৌতিক গল্প কাহিনী বলেছে। আমার ধারনা খোদাবক্স মিথ্যা গল্প বলেনি। বোকা মানুষ মিথ্যা বলতে পারে না। তার একটা গল্প এরকমঃ সে একটা খুন করেছে। নিজ হাতে খুন করেছে। একটা মেয়েকে তার পছন্দ হয়ে যায়। কিন্তু সেই মেয়ের স্বামী আছে। মেয়েটার পরামর্শে খোদাবক্স লোকটাকে খুন করে। লোকটার নাম হারুন। এক বর্ষার রাতে হারুনকে ধাক্কা দিয়ে বিলে ফেলে দেয়। বর্ষার পানিতে ভরা বিল থেকে হাপানীর রোগী হারুন আর উঠতে পারেনি। হারুন তার ভুল বুঝতে পেরে সেই স্ত্রীলোককে আর বিয়ে করেনি।
এরপর থেকে সে মৃত হারুনকে দেখতে পায়।
একবার সে ভাটিয়াপাড়া থেকে যাত্রা পালা দেখে ফিরছে। রাত তখন এগারোটা। চৌধুরী বাড়ি পার হতে কিছুটা জংলা জায়গা। সেখানে সে হারুনকে স্পষ্ট দেখতে পায়। তার চলার পথে বাঁধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। হারুন কিচ্ছু বলে না। শুধু করুন চোখে খোদাবক্সের দিকে তাকিয়ে থাকে। মূলত খোদাবক্স হারুনের কাছ থেকে মুক্তি পেতেই নিজের দেশ ছেড়ে বিক্রমপুর এসেছে। ভাগ্য অন্বেষণের জন্য নয়। খোদাবক্সের ভাগ্য ভালো হারুন ফরিদপুর ছেড়ে বিক্রমপুর আসতে পারেনি। আমার ধারনা হারুন সত্য কথাই বলেছে। স্ত্রীলোকের কথা শুনে সে হারুনকে আড়ই বিলে ফেলে হত্যা করেছে। সে অন্যায় করেছে। সেই অন্যায় খোদাবক্সকে তাড়া করে। সে এখন হারুন থেকে মুক্তি চায়। সহজ সরল সত্য কথা হলো- এক জীবনে মানুষ যে অন্যায় করবে, সেই অন্যায়ের শাস্তি তাকে দুনিয়াতেই ভোগ করে যেতে হয়। এটাই ভালো। তাহলে পরকালে আর শাস্তি ভোগ করতে হবে না।
©somewhere in net ltd.