| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
বিসিএসসহ বিভিন্ন সরকারি চাকরির নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক পরিচয় বা ভেরিফিকেশনের কারণে প্রার্থীদের বাদ পড়ার অভিযোগ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে নতুন কোনো ঘটনা নয়। রাজনৈতিক দলগুলো ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে নিজেদের ছাত্রসংগঠনের কার্যক্রম চালু রাখবে, ছাত্রদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করবে, তাদের দিয়ে নিজেদের স্বার্থ হাসিল করবে। অথচ দিন শেষে ক্ষমতায় গিয়ে সেই ছাত্রদেরই কাউকে কাউকে রাজনৈতিক পরিচয়, মতাদর্শ কিংবা বিরোধী দলের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে চাকরি থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ উঠবে।
এ যেন আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতির এক চিরচেনা দ্বিচারিতা!
কিন্তু সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েন সেই চাকরিপ্রার্থীরা, যাঁরা ছাত্রজীবনে সক্রিয়ভাবে কোনো রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না। তাঁরা রাজনীতির মারপ্যাঁচ বোঝেন না, রাজনৈতিক পরিচয়ের হিসাব-নিকাশ জানেন না। অথচ কোনোভাবে তাঁদের নামের পাশে একবার বিরোধী রাজনৈতিক দলের তকমা লাগিয়ে দেওয়া হলে, সেই পরিচয় থেকে বেরিয়ে আসাই হয়ে পড়ে কঠিন। নিজের যোগ্যতা প্রমাণের চেয়ে তখন বড় হয়ে ওঠে নিজের রাজনৈতিক পরিচয় অস্বীকার করার লড়াই।
ঠিক এমনই একটি পরিস্থিতির সাক্ষী হয়েছিলাম আমি নিজেই।
সময়টা ২০১৪ সাল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিটি সেমিস্টারে সর্বোচ্চ নম্বর পেয়ে প্রথম হয়েছিলাম। স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হব। কারণ, আমি শুধু প্রথম শ্রেণিতে প্রথম ছিলাম না; আমার বিশ্বাস ছিল, মেধা, পরিশ্রম ও যোগ্যতার ভিত্তিতেই আমি সেই পদ অর্জন করতে পারব।
নিয়োগ পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলাম। পরীক্ষার ফলাফলসহ যোগ্যতার বিভিন্ন দিক থেকে আমি এগিয়ে ছিলাম। স্বাভাবিকভাবেই মনে হয়েছিল, দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের স্বীকৃতি এবার হয়তো পাব।
কিন্তু হঠাৎ জানতে পারলাম, আমাকে নাকি নিয়োগপত্র দেওয়া হচ্ছে না!
কারণ হিসেবে জানতে পারলাম, আমি, আমার বাবা-মা নাকি বিরোধী রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত। আমি নাকি বিরোধী ছাত্রসংগঠনের রাজনীতি করি! এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছিল আমার বাড়ি বগুড়ায় হওয়ার বিষয়টিও।
তৎকালীন সরকারের একজন নীতিনির্ধারকের বহুল আলোচিত রাজনৈতিক বক্তব্যের ভাষায়, বগুড়ায় জন্মগ্রহণ করাটাই যেন আমার অপরাধ; যেন আমি কোনো ‘কালসাপের বাচ্চা’!
কী অদ্ভুত যুক্তি!
একজন মানুষ কোথায় জন্মগ্রহণ করবেন, তাঁর বাবা-মা কোন অঞ্চলের মানুষ হবেন, কিংবা তাঁর প্রতিবেশীরা কোন রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাস করবেন—এসব কি তাঁর ব্যক্তিগত যোগ্যতা ও পেশাগত সততার মাপকাঠি হতে পারে?
একজন প্রার্থী বর্তমানে রাজনীতি করেন না, কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী নন—তবুও তাঁকে ভবিষ্যতে বিরোধী শক্তির অংশ হয়ে উঠতে পারেন, এমন আশঙ্কায় অযোগ্য বিবেচনা করা হবে? তাঁর মেধা, ফলাফল ও যোগ্যতার চেয়ে বড় হয়ে উঠবে একটি অনুমাননির্ভর রাজনৈতিক পরিচয়?
তাহলে রাষ্ট্র কি নাগরিকের বর্তমান যোগ্যতা দিয়ে তাঁকে বিচার করবে, নাকি ভবিষ্যতে তিনি কী করতে পারেন—সেই আশঙ্কা দিয়ে তাঁর জীবন নির্ধারণ করবে?**
২০১৪ সালে আমি কোনো রাজনৈতিক দলের সক্রিয় কর্মী ছিলাম না। আমার পরিবারেও কেউ সক্রিয়ভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের অন্ধ অনুসারী ছিলেন না। অথচ নিজের চাকরি ও স্বপ্ন বাঁচানোর তাগিদে তখন আমার একমাত্র চেষ্টা হয়ে দাঁড়িয়েছিল—আমি তৎকালীন ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী, সেটা প্রমাণ করা।
কতটা অসহায় হলে একজন মেধাবী চাকরিপ্রার্থীকে নিজের যোগ্যতার পাশাপাশি নিজের রাজনৈতিক আনুগত্যও প্রমাণ করতে হয়!
আমি আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়েছিলাম। কারণ, আমি রাজনীতির এই জটিল হিসাব-নিকাশ বুঝতাম না। কীভাবে নিজেকে ক্ষমতাসীন দলের আদর্শের মানুষ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হয়, কীভাবে রাজনৈতিক পরিচয়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হয়—সেসব আমার জানা ছিল না।
আমার অপরাধ কী ছিল?
আমি কি পরীক্ষায় খারাপ করেছিলাম? আমার কি প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ছিল না? আমি কি কোনো প্রমাণিত অসদাচরণে জড়িত ছিলাম?
নাকি আমার অপরাধ ছিল—আমি রাজনীতির মাঠে সক্রিয় ছিলাম না, অথচ রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ থেকে নিজেকে মুক্ত প্রমাণ করার মতো ক্ষমতা বা যোগাযোগও আমার ছিল না?
এই অভিজ্ঞতা আমাকে রাষ্ট্রব্যবস্থা সম্পর্কে একটি কঠিন প্রশ্নের সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছিল।
আমরা সংবিধান, গণতন্ত্র, সমতা, সমান অধিকার এবং মেধাভিত্তিক নিয়োগের কথা বলি। কিন্তু বাস্তবে যদি কোনো নাগরিককে সরকারি চাকরি পাওয়ার আগে ক্ষমতাসীন দলের প্রতি আনুগত্য প্রমাণ করতে হয়, তাহলে সেই সমতার মূল্য কোথায়?
সরকারি চাকরি কি কোনো রাজনৈতিক দলের ব্যক্তিগত সম্পত্তি? রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা কি ক্ষমতাসীন দলের প্রতি আনুগত্যের পুরস্কার? আর বিরোধী মতের মানুষ হওয়া, কিংবা কাউকে বিরোধী মতের মানুষ বলে চিহ্নিত করা—এটাই কি তাঁর যোগ্যতা বাতিল করার যথেষ্ট কারণ?
গণতন্ত্রের সৌন্দর্য হলো, একজন নাগরিক ক্ষমতাসীন দলের সমর্থক না হয়েও রাষ্ট্রের সমান অধিকার ভোগ করবেন।
একজন মানুষ যে রাজনৈতিক মতাদর্শেই বিশ্বাস করুন না কেন, আইনসিদ্ধ সীমার মধ্যে তাঁর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা থাকতে হবে। সরকারি চাকরিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা এবং আইনসম্মত মানদণ্ডই হওয়া উচিত বিবেচনার ভিত্তি। কারও রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে অভিযোগ থাকলে তারও নিরপেক্ষ, প্রমাণভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক মূল্যায়ন প্রয়োজন। কেবল অনুমান, পারিবারিক পরিচয়, জন্মস্থান কিংবা রাজনৈতিক তকমার ভিত্তিতে কাউকে বঞ্চিত করা ন্যায়বিচারের ধারণার সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
আজ যে দল ক্ষমতায় আছে, কাল অন্য কোনো দল ক্ষমতায় আসতে পারে। আজ যে ব্যক্তি রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে বঞ্চিত হচ্ছেন, আগামীকাল একই ব্যবস্থা অন্য দলের সমর্থক কিংবা নির্দলীয় কোনো নাগরিকের জীবনেও আঘাত হানতে পারে।
তাই প্রশ্নটি কোনো একটি রাজনৈতিক দলকে ঘিরে নয়। প্রশ্নটি আমাদের রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, নিয়োগব্যবস্থা এবং রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ঘিরে।
আমরা কি এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ ফলাফল করেও একজন তরুণকে নিজের মেধার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্যের প্রমাণ দিতে বেশি ব্যস্ত থাকতে হবে? যেখানে একজন যোগ্য প্রার্থীকে চাকরি পাওয়ার জন্য নিজের জন্মস্থান, পরিবার কিংবা রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা নিয়ে সন্দেহের জবাব দিতে হবে? যেখানে রাষ্ট্রের চাকরি পাওয়ার অধিকার নির্ধারিত হবে ক্ষমতাসীনদের পছন্দ-অপছন্দ দিয়ে?
নাকি আমরা এমন একটি রাষ্ট্র চাই, যেখানে একজন নাগরিকের পরিচয় হবে তাঁর যোগ্যতা, সততা, দক্ষতা ও কর্মদক্ষতা; যেখানে রাজনৈতিক মতপার্থক্য চাকরি পাওয়ার পথে বাধা হবে না; যেখানে নিয়োগের সিদ্ধান্ত হবে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও জবাবদিহিমূলক?
আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ২০১৪ সালের। কিন্তু এর মধ্য দিয়ে যে প্রশ্নটি উঠে আসে, তা কোনো একটি বছর বা সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, রাষ্ট্রীয় নিয়োগে রাজনৈতিক আনুগত্যকে যোগ্যতার বিকল্প বানানোর প্রবণতা বন্ধ হওয়া প্রয়োজন।
কারণ, **সরকার পরিবর্তন হলেই যদি বঞ্চিত মানুষের পরিচয় শুধু বদলায়, কিন্তু বঞ্চনার সংস্কৃতি বদলায় না, তাহলে সেটাকে প্রকৃত গণতান্ত্রিক পরিবর্তন বলা যায় না।**
আমরা মুখে যতই সমতা, সমান অধিকার ও গণতন্ত্রের কথা বলি না কেন, বাস্তবে যদি সরকারি চাকরি পেতে ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাসী হওয়ার প্রমাণ দিতে হয়, কিংবা নিজেকে কোনো দলের অনুসারী নন বলে প্রমাণ করার জন্য লড়তে হয়, তাহলে আমাদের গণতন্ত্রের চর্চা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
রাষ্ট্র কোনো রাজনৈতিক দলের নয়। রাষ্ট্র সব নাগরিকের। সরকারি চাকরিও কোনো দলের প্রতি আনুগত্যের পুরস্কার নয়; এটি যোগ্য নাগরিকের জন্য উন্মুক্ত একটি দায়িত্ব পালনের সুযোগ।
আমার স্বপ্ন ছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হব। সেই স্বপ্নের পথে রাজনৈতিক পরিচয়ের অভিযোগ কীভাবে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তা আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা। কিন্তু আমি চাই না, আগামী প্রজন্মের কোনো মেধাবী তরুণকে একই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হোক—‘তুমি কতটা যোগ্য?’ নয়, বরং ‘তুমি কোন দলের?’
একটি স্বাধীন দেশে একজন তরুণের সবচেয়ে বড় পরিচয় হওয়া উচিত—সে একজন যোগ্য নাগরিক।
রাজনৈতিক আনুগত্য নয়, মেধার মূল্যায়ন চাই। প্রতিহিংসা নয়, ন্যায়বিচার চাই। দলীয় রাষ্ট্র নয়, সবার বাংলাদেশ চাই।
©somewhere in net ltd.
১|
১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ সকাল ৭:০৯
বিষক্ষয়রিটার্নস বলেছেন: আওয়ামী এবং জামাতি ধর্মের অনুসারি সরকারি কর্মকর্তারা রাস্ট্রের জন্য নিরাপত্তা ঝুকি। জনতার মন্চের কথা ভুলে গেলে চলবে না