নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

অশান্ত বাশিওলা

raselabe

তাই মনে হয় আমি বড় স্বার্থপর।

raselabe › বিস্তারিত পোস্টঃ

ভিআইপি প্রটোকল, নাগরিকের অধিকার ও গণতন্ত্র: আমরা কেমন বাংলাদেশে বাস করছি?

১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ৯:৫৫

প্রতি দিনের মত আজও সকালে অফিসে যাচ্ছিলাম। রাস্তা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় পুলিশ আমাকে জানাল, এই পথ দিয়ে যাওয়া যাবে না, রাস্তার অন্য পাশ দিয়ে যেতে হবে। দেখলাম, আমার মতো অনেক পথচারীও একই সমস্যায় পড়েছেন। ভিআইপি চলাচলের কারণে জনসাধারণের এমন দুর্ভোগে বিরক্ত হয়ে আমি বললাম,“আবার কোন ভিআইপি আসছেন, যার জন্য আমরা সোজা পথে যেতে পারব না?

আমার কথা শুনে সামনে থাকা পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আমাকে থামিয়ে বললেন, “এই দাঁড়ান, আপনি কী বলছেন? এদিকে আসেন।” এরপর অধস্তন পুলিশ সদস্যদের নির্দেশ দিলেন, আমাকে গ্রেপ্তার করতে। তাঁর অভিযোগ, আমি রাষ্ট্রবিরোধী কথা বলেছি।

মুহূর্তের মধ্যে কয়েকজন পুলিশ আমাকে ঘিরে ধরলেন। আমি বললাম, “আমি একজন নাগরিক।” তাঁরা আমার পরিচয় জানতে চাইলেন। ওই কর্মকর্তা দাবি করলেন, আমি জানি না যে প্রধানমন্ত্রী একজন ভিআইপি। এরপর আবারও আমাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিলেন এবং বারবার রাষ্ট্রবিরোধী আচরণের অভিযোগ তুলে ক্ষমা চাইতে বললেন। অধস্তন সদস্যদের আমার ছবি তুলতেও নির্দেশ দিলেন।

এদিকে আমার পরিচিত কয়েকজন এগিয়ে এসে পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেন। তাঁরা দুঃখ প্রকাশ করে আমাকে সেখান থেকে নিয়ে যেতে চাইলেন। অবশেষে নানা নাটকীয়তার পর আমি অফিসে পৌঁছালাম। কিন্তু পুরো ঘটনাটি আমার মনে একটি প্রশ্ন রেখে গেল—জনদুর্ভোগ নিয়ে সামান্য বিরক্তি প্রকাশ করাও কি এখন রাষ্ট্রবিরোধী অপরাধ?

মত প্রকাশের অধিকার কি শুধু সংবিধানের পাতায়?


বাংলাদেশের সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বাক্‌স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের অধিকার স্বীকৃত হয়েছে, যদিও এই অধিকারের কিছু আইনসিদ্ধ সীমাবদ্ধতা রয়েছে। কোনো সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন তোলা, জনদুর্ভোগের প্রতিবাদ করা কিংবা অসন্তোষ প্রকাশ করা মানেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া নয়।

কেউ আইন ভঙ্গ করলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কিন্তু শুধু বিরক্তি প্রকাশের কারণে কাউকে রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা দেওয়া কিংবা গ্রেপ্তারের ভয় দেখানো কতটা যুক্তিসংগত? গ্রেপ্তার করতে হলে তার নির্দিষ্ট আইনগত ভিত্তি থাকতে হবে। কোনো কর্মকর্তার ব্যক্তিগত অসন্তোষ আইনের বিকল্প হতে পারে না।

ভিআইপি প্রটোকল, নাকি ক্ষমতার অপব্যবহার?

প্রধানমন্ত্রীসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই রাষ্ট্রের দায়িত্ব। নিরাপত্তার প্রয়োজনে সাময়িকভাবে যান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করাও কখনো প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই ব্যবস্থা কতটা প্রয়োজনীয়, আনুপাতিক ও জনবান্ধব—সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ।

প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক চলাচল অযৌক্তিকভাবে ব্যাহত করা কিংবা তাঁদের সঙ্গে অসম্মানজনক আচরণ করা কি গ্রহণযোগ্য? প্রটোকল মানেই কি সাধারণ মানুষের অধিকার উপেক্ষা করা?

প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তা প্রটোকল নির্ধারণ করেন সংশ্লিষ্ট দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষ। তাই জনদুর্ভোগ সৃষ্টি হলে দেখতে হবে, বিধিনিষেধটি প্রকৃত নিরাপত্তার প্রয়োজনে আরোপ করা হয়েছে, নাকি দায়িত্ব পালনের নামে কোথাও অতিরিক্ত ক্ষমতা প্রয়োগ করা হচ্ছে। নিরাপত্তা ও নাগরিক অধিকার—দুটিই রক্ষা করা প্রশাসনের দায়িত্ব।

পুলিশের দায়িত্ব ক্ষমতা দেখানো, নাকি আইন রক্ষা করা?

একজন ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তার কাছ থেকে সংযম, পেশাদারত্ব ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রত্যাশিত। নাগরিকের বক্তব্য অপছন্দ হলেই তাঁকে গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেওয়া, রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা দেওয়া কিংবা ক্ষমা চাইতে চাপ সৃষ্টি করা আইনের শাসনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা প্রশ্নের দাবি রাখে।

সংবিধানের ৩১ অনুচ্ছেদে আইনানুযায়ী আচরণ পাওয়ার অধিকার এবং ৩২ অনুচ্ছেদে জীবন ও ব্যক্তিস্বাধীনতার সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। তাই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরাও আইনের ঊর্ধ্বে নন। তাঁদের ক্ষমতা প্রয়োগের প্রতিটি পদক্ষেপ আইনসম্মত হতে হবে।

একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা যদি নাগরিকের সঙ্গে এমন আচরণ করেন, তাহলে সাধারণ পুলিশ সদস্যদের দায়িত্ব পালনের মান ও জবাবদিহি নিয়েও প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। তবে কোনো ব্যক্তির আচরণের ভিত্তিতে পুরো বাহিনীকে বিচার না করে, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায় প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই জরুরি।

আমরা কি সত্যিই কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশ পেয়েছি?

গণতন্ত্র কেবল নির্বাচন আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। গণতন্ত্রের প্রকৃত চর্চা প্রকাশ পায় নাগরিক কতটা নির্ভয়ে কথা বলতে পারেন, প্রশাসন কতটা জবাবদিহিমূলক আচরণ করে এবং আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ হয় কি না—তার মধ্য দিয়ে।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে প্রধানমন্ত্রী ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে, পাশাপাশি সাধারণ মানুষের চলাচল ও মর্যাদাও সুরক্ষিত থাকবে। যেখানে পুলিশকে দেখে মানুষ ভয় নয়, আস্থা অনুভব করবেন। যেখানে নাগরিকের প্রশ্নের জবাব হবে যুক্তি দিয়ে, হুমকি দিয়ে নয়। রাষ্ট্র, সরকার এবং সরকারের কোনো ব্যক্তি এক বিষয় নয়। সরকারের কোনো সিদ্ধান্তের সমালোচনা করা মানেই রাষ্ট্রের বিরোধিতা করা নয়। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে এই পার্থক্য বোঝা এবং তা সম্মান করা অত্যন্ত জরুরি।

সকালে অফিসে যাওয়ার পথে ঘটে যাওয়া এই অভিজ্ঞতা তাই শুধু একজন নাগরিকের দুর্ভোগের গল্প নয়; এটি নাগরিক অধিকার, পুলিশি জবাবদিহি এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রয়োগ নিয়ে বৃহত্তর প্রশ্ন।

আমরা কি এমন বাংলাদেশ চাই, যেখানে সাধারণ মানুষকে নিজের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পরিচিতজনের আশ্রয় নিতে হবে? যেখানে জনদুর্ভোগ নিয়ে প্রশ্ন তুললে রাষ্ট্রবিরোধী আখ্যা পাওয়ার ভয় থাকবে?

গণতন্ত্রে রাষ্ট্রের মর্যাদা রক্ষা করা যেমন নাগরিকের দায়িত্ব, তেমনি নাগরিকের মর্যাদা রক্ষা করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। রাষ্ট্র যদি নাগরিকের প্রশ্ন শুনতে না পারে, তবে সেই রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের চর্চা কতটা কার্যকর—এই প্রশ্ন তোলা নাগরিকের অধিকার।

মন্তব্য ৩ টি রেটিং +০/-০

মন্তব্য (৩) মন্তব্য লিখুন

১| ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:০৭

রাসেল বলেছেন: নতুন বোতলে...।

২| ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১০:৩৬

raselabe বলেছেন: সবাই ক্ষমতার মাতাল।

৩| ১৮ ই অক্টোবর, ২০২৬ রাত ১১:২১

সৈয়দ কুতুব বলেছেন: আপনি স্বপ্নের বাংলাদেশ যাদের কাছে চান এরা সেটা দিতে অক্ষম । বেটার হয় বিদেশ চলে যাওয়া ।

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.