| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
এক
সামনে ঈদ তাই অঙ্কন খুব তোরজোড় করেই ঈদের মার্কেটটা করে ফেললো। তুলি’কে সে এবার সেই রকম সারপ্রাইজ দিবে। তাদের বিয়ে হয়েছে আজ তিন বছর হলো, অনেক ভালোবাসে সে তুলি’কে, কিন্তু তুলির মনটা কেন জানি উড়ু উড়ু। এই ঈদে বাসের টিকেট পাওয়া যে কিরকম একটা ঝামেলা তা গতবারই বুঝেছে, যখন ঈদের ৭ দিন আগে বাড়ি গিয়েছিল। তুলির পছন্দের কাচেঁর চুড়িটাও কিনতে ভোলেনি অঙ্কন। কিন্তু অঙ্কনের চিন্তা অন্যদিকে গতকাল ফুটবল খেলতে গিয়ে সে তার পা টা মচকে ফেলেছে। এইজন্য সকাল থেকেই কিছুটা জ্বর জ্বর ভাব। এই জ্বর নিয়ে বাড়ির পথে কিভাবে রওয়ানা দিবে তাই ভাবছে। এদিকে অফিস থেকে ছুটি হতে হতে বিকেল চারটা বাজলো। অতশত চিন্তা না করে বিসমিল্লাহ বলে রওয়ানা করলো অঙ্কন। ওর সাথে আরও দুই জন কলিগ ছিল। ভাবলো যাই হোক ওদের সাথে টাইম পাস হবে গল্প করতে করতে, যদিও পুরোটা পথ যাবে না ওরা নাটোর নেমে যাবে। সরাসরি যশোরের বাস না পেয়ে অগ্যতা লোকাল বাসেই যেতে হলো অঙ্কনকে। বাসের সিটে বসেই তুলিকে একটা ফোন দিল অঙ্কন।
- হ্যালো।
- হ্যালো, কই তুমি।
- এইতো বাসে উঠলাম মাত্র, তুমি কি করো?
- বসে আছি, অঙ্কন তুমি আমাকে তুমি খুব ভালবাসো তাইনা?
- হ্যা, কিন্তু হঠাৎ এই কথা?
- না, এমনি।
- আচ্ছা রাখি, কেমন।
- ওকে। তুলিকে কেমন জানি চিন্তাগ্রস্থ মনে হলো অঙ্কনের, ‘’যাইহোক বাড়িতে তো যাচ্ছিই আর কিছুক্ষনের মধ্যে’’ এই ভেবে একটু স্বস্তি পেল ও।
দুই
অঙ্কনের দুর সম্পর্কের মামাতো ভাই জাফর, তুলির এক্স। পাঁচ বছরের প্রেম ছিল ওদের, বাবা-মায়ের ইচ্ছার বিরুদ্ধে বিয়ে করার সাহস হয়নি তুলির,তার তার ইচ্ছার বিরুদ্ধেই বিয়েটা হয়েছে। অঙ্কন জানে বিষয়টা কিন্তু এ নিয়ে কোনদিন তুলিকে কিছু বলেনি। বিয়ে হয়েছে আজ তিন বছর হলো কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে শারীরিক সম্পর্ক ছাড়া আর কিছুই হয়নি ওদের মধ্যে। তবে তুলিকে অঙ্কন ভালোবাসে অনেক
- হ্যালো।
- হ্যা, বলো তুলি।
- সবকিছু ঠিকঠাক আছে তো? ও কিন্তু বাসে উঠে গেছে।
- আরে হ্যা তুমি কোন চিন্তা করো না, সব ঠিক করা আছে জান।
- আমারনা খুব ভয় হচ্ছে, বেচারা খুব ভালবাসে আমাকে।
- ও, তাহলে আমি?
- আরে তুমি তো আছোই, আমি ওর কথা বলছি, ও মানুষ হিসেবে খুবই ভাল।
- দেখ তুমি এখন এসব কথা বলোনা, কিচ্ছু হবেনা তুমি এ নিয়ে একদম চিন্তা করোনা, দেখবা সব ঠিক হয়ে যাবে।
তিন
রাত প্রায় ৯ টা বাজে ঘড়িতে। বাস নাটোর এসে থামলে অঙ্কন তার দুইজন কলিগ’কে বিদায় জানিয়ে বাস থেকে নেমে গেল। বাইরের আবহাওয়া আর বাসের ভেতরের গরম হাওয়া ঠিক একরকম না, তাই বাস থেকে নামতেই হালকা মৃদু হাওয়া বয়ে ছুয়েঁ দিয়ে গেল অঙ্কন’কে। কিন্তু বাস স্ট্যান্ডে গিয়ে দেখলো যশোরের কোন বাস নেই এরপর থেকে, যা একটা ছিল মিনিট দশেক আগে চলে গেছে। আরেকটা বাস চলে এই রোডে সেটা পাংচার হয়ে অকেজো অবস্থায় পড়ে আছে। অগ্যতা অঙ্কন পাশে রাখা বেঞ্চে বসে একটা সিগ্রেট ধরালো। আকাশের দিকে তাকালো, কেমন জানি হয়ে আছে আকাশটা আজ। রাতের তারাগুলো কেমন জানি ওর দিকে চেয়ে আছে, কি যেন একটা বলতে চাইছে। সিগ্রেটের ধোয়া আকাশের দিকে ছাড়ছে আকাশের তারা দেখছে অঙ্কন। পনেরো মিটার মত দূরে একটি সাদা মাইক্রোবাস দাড়ানো, কিন্তু কোন লোক নেই ভেতরে। থাকলে কোন দিকে যাবে তা জেনে নিত। দুজন লোক শুধু টং দোকানে বসে চা খাচ্ছে ওরা মাইক্রোর কেউ কিনা, জিজ্ঞাসা করা যায় কিনা সে ব্যাপারে ভাবছে ও। এর মধ্যে তুলি তিন বার ফোন করেছে বার বার জানতে চেয়েছে কোথায় আছি, কি করছি..... তুলি তো কখনো আমাকে এরকম ফোন দেয়নি কোনদিন, তবে আজ কেন ও এত উদ্বিগ্ন? প্রশ্নটা মনের ভেতরই চাপা রয়ে যায় অঙ্কনের।
- ভাই আগুনটা একটু দিবেন? (টি-শার্ট পরিহিত একটি লোক অঙ্কনের দিকে এসেই বলছে)
- হ্যা, অবশ্যই, (একটু অপ্রস্তুত হয়ে)
- থ্যাংক ইউ।
- ওয়েলকাম ভাই।
- ভাই, কোথায় যাবেন?
- যশোর যাব, আপনি?
- আরে ভাই আমিও তো নওপাড়াতে (যশোরের একটি জায়গার নাম) যাব।
- ও, তাহলে তো ভালই হলো একসাথে যাওয়া যাবে।
- ভাই ঐ মাইক্রোর ড্রাইভার বলছিল ওরা নাকি খুলনা যাবে কিন্তু দু চার জন লোক হলো ওরা রওনা দিত, যাবেন নাকি?
- (রাতে মাইক্রোতে করে যাওয়াটা যদিও সুবিধার মনে হলো না অঙ্কনের, কার মনে কি আছে বলা যায়) হ্যা ভাই যাওয়া যেত কিন্তু মাইক্রোতে.......
- (অঙ্কনের কথা শেষ না হতেই লোকটি বলল) আরে কি যে বলেন ভাই এখন কি আর সে যুগ আছে, আর আমরা আছি না? নেহাৎ বিপদে পরেছি তা না হলে কি আর এভাবে যাই বলেন।
- আমতা আমতা করে অঙ্কন বলল, ‘’আচ্ছা ঠিক আছে চলুন।‘’
অঙ্কনের পাশে বসল সেই লোকটি বসে গল্প শুরু করল, চায়ের দোকানের বসে থাকা লোক দুজনের মধ্যে একজন ড্রাইভার আরেকজন কুষ্টিয়া নেমে যাবেন, সে বসল পেছনের সিটে একা। কেন যেন ওর মনটা সায় দিচ্ছিল না ওদের সাথে যেতে। তবুও এক প্রকার মনের বিরুদ্ধেই গেল অঙ্কন ওদের সাথে মাইক্রোতে। হঠাৎ অঙ্কন খেয়াল করলো মাইক্রোটা পাবনা বাইপাসের দিকে মোড় নিচ্ছে.... ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসা করতেই ওর পাশে বসে থাকা লোকটির চেহারা মূর্তিকার ধারণ করলো..................... তারপর ভোর হয়েছে, সে দিনটাও গেছে অঙ্কন ঘরে ফিরেনি, সে ফিরেনি তার কর্মস্থলে................ তার বাড়ি থেকে জানানো হয়েছে অফিসে অঙ্কন বাড়িতে পৌছায়নি........... স্থানীয় থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়, র্যাবও অনেক খোজঁ করেছে। না, পাওয়া যায়নি...... দুইদিন গেল, এক সপ্তাহ গেল, চৌদ্দদিন গেল................ওকে পাওয়া গেল না।
চার
ঢাকা রংপুর হাইওয়ে বাস, ট্রাকগুলো শো শো করে যার যার গন্তব্যের দিকে যাচ্ছে, কারো যেন একটুকু সময় নেই। রাস্তার এক পাশ দিয়ে গমক্ষেত অন্য পাশে ডোবা, ডোবার পানিতে কচি কচি পাতার বাহার নিয়ে কচুরিপানা তার উপরে ফুটে আছে অপূর্ব সুন্দর কিছু ফুল। দেখলে যে কারো মন ভরে যাবে.. সেদিন দিয়ে পনেরো দিন অঙ্কন নিখোঁজ। হাইওয়ের পাশে কিছু লোক একদল শুকর(ভাল নাম মনে নেই) চড়াচ্ছিল...... শুকররা সাধারনত যে দিক দিয়ে যায় সে দিক দিয়ে সব ওলট পালট করে দিয়ে যায়, তাই ই করছিল। কিন্তু হঠাৎ চড়ানোওয়ালা খেয়াল করলো কিছু শুকর এক জায়গায় বেশ ভীর করেছে কচুরীপানার মধ্যে..... যেন অনেকদিন পর তারা ভালো কোন খাবার পেয়েছে বলে মনে হচ্ছে। লোকটার মনে সন্দেহ জাগল, কি এমন ভালো খাবার থাকতে পারে ঐ কচুরিপানার মধ্যে? সে সামনে এগিয়ে দেখল একটা আকাশী কালারের কাপড় আংশিক দেখা যাচ্ছে, আরো কাছে গিয়ে খেয়াল করলো একট দেহ........ যেটা পচেঁ গলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে চারিদিকে। শুকরগুলো তাই খাচ্ছে মজা করে....... স্থানীয় পুলিশ আসে। অঙ্কনের বডি দেখে চেনার উপায় নেই, পা দুটো কলাগাছের মত ফুলে আছে, পেটের অংশটুকু শুকরের খাবারে পরিনত হয়েছে। পরবর্তীতে তার পকেটের আইডি কার্ড দেখে সনাক্ত করা হয়েছে যে এটাই অঙ্কন। মরদেহটার পাশে কিছু কাচেঁর চুড়ি, একটা লাল পাড়ের শাড়ী আরো কিছু তৈজসপত্র পড়ে আছে। অঙ্কন ঈদ করেছিল তবে এপারে নয় ওপারে। আশ্চর্যজনক হলেও সত্য অঙ্কনের পকেটের মানিব্যাগটা অক্ষত অবস্থায়ই পড়ে রয়েছে ওর পকেটে। পিশাচগুলো তাহলে ছিনতাই করেনি..... পুনশ্চঃ উপরের ঘটনাটি একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে লিখেছি, নামগুলো কাল্পনিক, শেষের অংশটুকু সত্য। ঘটনাটি কোন পরিকল্পিত খুন কিংবা ছিনতাই তা সম্পর্কে এখনো কোন কোন নিষ্পত্তি হয়নি, পুলিশ, র্যাবের টেবিলের খাতার নিচে ধামাচাপা হয়ে পড়ে আছে হয়তো ফাইলটি... আমরা যখন রাস্তাঘাটে চলাফেরা করবো অবশ্যই অত্যন্ত ঠান্ডা মাথায় চলাফেরা করবো মনে রাখতে হবে সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্যে অনেক বেশি।
©somewhere in net ltd.