| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ভোরের আজানের সুরেই ঘুম ভাঙে রাইসার। আকাশ এখনও অন্ধকার, তবে পাখিরা জেগে গেছে, বাহিরে পাখিদের কিছিরমিছির আওয়াজ শোনা যাচ্ছে। রাইসা উঠে বসে, চুল বাধতে বাধতে জানালার দিকে তাকায়। জানলা খুললেই দেখা যায় নদী, নদীর ওপর কুয়াশা খেলা। মেঘনগরে প্রতিদিন ভোরে এভাবেই নদীর বুক কুয়াশা নামে। এই সময়ে শহরটা যেন কম কথা বলে, কম দৌড়ায়। দিনের বাকি সময়টায় মেঘনগর যেন একধরনের তাড়াহুড়োর মধ্যে থাকে।চায়ের পানি বসিয়ে উঠানে আসে। বাড়ির সামনে একটা কাঠগোলাপ গাছ। রাতের ঝরে পড়া ফুলগুলো কুড়িয়ে রাখে। কেন রাখে সে জানে না শুধু ফেলে দিতে ইচ্ছে করে না।
রহিম চাচার দোকানের সামনে যেতেই চাচার গলা শোনা যায়,
“রাইসা মা, আজ সকালেই আইলা?”
“হ্যাঁ চাচা,” রাইসা বলে, “কাল বিকেলে আসতে পারিনি।”
“বসো, চা দিই।”
“না চাচা, চা খেয়ে আসছি, ঐদিক থেকে ঘুরে আসি।”
চাচার দোকানে অনেকে বসে। সকাল সকাল এখানে ভীড় জমে থাকে৷ উনার বানানো চা অনেক ভাল তাই দূর থেকে মানুষ উনার হাতের চা খেতে আসে সাথে উনার বানানো স্পেশাল পরটা। এই বাজারটা খুব বেশি বড় না আবার একদম ছোটও না কিন্তু এখানে প্রয়োজনীয় সব কিছুই পাওয়া যায়, গ্রামের বাইরে যেতে হয় না। বাজার ঘুরে কিছু সবজি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিস কিনে বাড়ির দিকে রওনা দেয়।
রাস্তায় সাদেক আর রবিউলের ঝগড়া শোনা যাচ্ছে,সেই পুরোনো জমির সীমানা নিয়ে সেই। রাইসা সেদিন কান না দিয়ে বাড়ির দিকে এগোতে থাকে। মেঘনগরে ঝগড়াগুলোও যেন নিয়ম মেনে হয়, ঠিক সময়মতো। প্রতিদিন একই সময়ে।
বাড়ি ফিরে রান্না বসালো, ছোট মাছ দিয়ে লাউ-এর তরকারি সাথে কচুর লতি ও বেগুন বর্তা। রান্না শেষ করে তৃপ্তি নিয়ে খেলো। খাবারগুলো খুব স্বাদ হয়েছে মনে হচ্ছে অনেক দিন পর এমন তৃপ্তি নিয়ে খেয়েছে সে যদি তার জন্য এটা প্রতিদিনের রুটিন। খাওয়া শেষ করে দুপুরে একটু ঘুমিয়ে নিলো। বিকেলে রাইসা একটা নোটবুক নিয়ে নদীর ঘাটে যায়। ঘাটে বসে নোটবুকে প্রতিদিনের ঘটনা লিখে রাখা তার অভ্যাস।
পুরোনো একটা মরা গাছের উপর পা ঝুলিয়ে বসে নদীর দিকে তাকিয়ে আছে সে। নদীতে দূরে একটা নৌকা যেতে দেখা যাচ্ছে। মাঝিটা চেহারা চেনা যাচ্ছে না ঝাপসা হয়ে আছে, ইদানিং দূরের জিনিস ঝাপ্সা লাগে হয়তো চোখে কোন সমস্যা হয়েছে নরেশ্বর দাদুর কাছে যেতেই হবে হবে চোখ দেখাতে। নিরেশ্বর দাদু খুব ভাল ডাক্তার। উনার কাছে সব রোগের ওষুধ আছে। লোকমুখে প্রচলিত আছে উনি কঠিজ থেকে কঠিন রোগও সারিয়ে তুলতে পারে।
নোটবুক খুলে কলম নিয়ে বসে আছে কিন্তু লিখতে পারছে না। তার চোখ নদীর দিকে আটকে থাকে। হঠাৎ কেউ একজন পেছন থেকে বলে উঠে—
“আমি কি এখানে একটু বসতে পারি?”
রাইসা চমকে তাকায়। একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, বয়স ৩০-৩৫ হবে, কাঁধে ব্যাগ, মুখে হালকা দাড়ি। পোশাক দেখে বোঝা যায়, এখানকার নয়। তার চোখে এমন একটা কৌতূহল, যা মেঘনগরের মানুষের চোখে সচরাচর দেখা যায় না। মেঘনগরে নতুন মুখ আসে না, রাইসা কখনও দেখে নি।
“এখানে কেন?" রাইসা বলে, “ ঐদিকে বসেন”
"এখানে থেকে নদীটা দেখতে সুন্দর লাগছে তাই"
"ঐদিক থেকেও দেখা যায় সুন্দর"
"জ্বী দেখা যায় কিন্তু এখান থেকে ভিউটা বেশি সুন্দর"
"এখানে বসা যাবে না"
''একটু বসে চলে যাবো, প্লিজ...''
"আচ্ছা, বসেন"
ছেলেটা বসে। দুজনই নদীর দিকে তাকিয়ে আছে।
কিছুক্ষণ পর ছেলেটা বলে, “সুন্দর জায়গা। এখান বসে সান্ধ্য নামা ভাগ্যবানরা দেখতে পারে ”
“হ্যাঁ।”
“এই শহরের নাম কী?”
“মেঘনগর।”
“আপনি এখানেই থাকেন?”
“হ্যাঁ।”
ছেলেটা একটু থেমে, আবার বলে, “আমি নাবিল যায়েদ। আপনি”
রাইসা বলে, “ আমি রাইসা।”
বিকেলের আলো পানির রঙ বদলে দিচ্ছে। হলুদ থেকে কমলা, কমলা থেকে আরও গভীর। দুজন কোন কথা বলে না, তাদের চোখ নদীর দিকে...
সূর্য ডুবে গেল নাবিল উঠতে উঠতে বলে,
“আসি তাহলে। যেতে হবে।”
“কোথায় যাবেন?”
“ওপারে”
"ওপারে কি আছে?"
"তা জানি না, গিয়ে দেখি"
রাইসা কিছু বলে না। নাবিল হাঁটতে শুরু করে নৌকার দিকে, কয়েক পা এগিয়ে একটু থেমে ফিরে তাকিয়ে বলে-
“আবার কি দেখা হবে?”
রাইসা কিছু বলে না, শুধু মাথা নাড়ে। নাবিল নৌকায় ওঠে। মাঝি দাঁড় বাইতে শুরু করে। নৌকাটা ধীরে ধীরে মাঝনদীর দিকে যাচ্ছে। রাইসা নৌকার দিকে তাকিয়ে থাকে, নাবিল ছোট হতে হতে দূরে সরে গিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। রাইসা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নদীর দিকে তাকিয়ে থাকে।
নৌকা নদীর মাঝ বরাবর আর ঠিক তখনই নদীতে ঝড় বইতে শুরু করে বিশাল ঢেউ ওঠে যেন সমুদ্রের ঢেউ। আকাশ অন্ধকার, প্রচুর বাতাস, বড় বড় ঢেউ আসে নৌকাটা একপাশে হেলে গিয়ে ডুবে যাচ্ছে এমন সময়
ধপাস..
নাবিল খাট থেকে গড়িয়ে পড়েছে নিচে। কনুইয়ে তীক্ষ্ণ ব্যথা পেয়েছে। কয়েক সেকেন্ড এভাবেই সে শুয়ে থাকে, যেন শরীরকে বোঝাচ্ছে এটা ঢেউ নয়, এটা টাইলস এখন শীতকাল তাই ঠান্ডা লাগছে, উঠে বসে, ঘরটা চেনা, টেবিলে ল্যাপটপ, বইয়ের স্তূপ, দেওয়ালে পুরোনো মানচিত্র। জানালা দিয়ে জোসনার আলো ঢুকছে। এটা কি তাহলে স্বপ্ন ছিল কিন্তু এতো বাস্তব স্বপ্ন কিভাবে হয়? একগ্লাস পানি হাতে নিয়ে ঘড়ি দিকে দেখে রাত বাজে তিনটা সতেরো। আবার বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়ে, চোখ বন্ধ করে কিন্তু ঘুম আসছে না। স্বপ্নটা মাথার ভেতর চেপে ধরে আছে। সাধারণত স্বপ্ন ঘুম থেকে উঠলেই মিলিয়ে যায়, কিন্তু এটা যাচ্ছে না। যেন সব কিছুই সত্যি ছিল। মেঘনগর। নদী। ঘাট। রাইসা। নামটা পর্যন্ত পরিষ্কার।
সকালে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে স্বপ্নের কথা মনে করে হাসছে। রাইসাকে ভুলতে পারছে না। তার জন্য কেমন যেন মায়া কাজ করছে মনে। এটা কি ভালবাসা নাকি শুধুই স্বপ্ন। আচ্ছা স্বপ্ন নিয়ে এত ভাবা কি বোকামি না? মেঘনগর নামে আসলে কোনো জায়গা কি আছে? থাকলেও রাইসাকি চিনতে পারবে? ফোন বের করে গুগোল ম্যাপে খোঁজে কিন্তু কিছু পায় না। তাহলে এটা কাল্পনিক নাম ছিল? স্বপ্নে কাল্পনিক শহরে কাল্পনিক মেয়ে আসতেই পারে এ ভাবে মন খারাপ করলে চলবে না।
"তোমার শায়নকে স্কুলে দিতে যাবে না? এখনও চায়ের কাপ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছ?"
"যাবো ভাবি"
"তাড়াতাড়ি কর, ওর স্কুলের দেরি হয়ে যাচ্ছে"
"যাচ্ছি যাচ্ছি গো ভাবি যাচ্ছি', আচ্ছা ভাবি মেঘনগরের নাম।শুনেছ?"
"এটা কোথায়?''
"থাক বাদ দাও,শায়নকে স্কুল থেকে নিয়ে এসো আমার ফিরতে রাত হবে।"
"কোথায় যাবে"
"মেঘনগর খুজতে যাবো"
রাতে বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রায় ১টা বাজে। বাসার সিবাই ঘুমিয়ে গেছে। তার কাছে থাকা এক্সট্রা চাবি দিয়ে দরজা খুলে সোজা রুমে গিয়ে বিচানায়। বিচানায় পিঠ লাগার সাথে সাথেই ঘুম চলে এলো।
রাইসার উঠান থেকে ঝরা কাঠগোলাপ কুড়িয়ে রাখছে, উঠানের এক কোন নাবিল দাঁড়িয়ে তা দেখছে। মাথা উচিয়ে উঠানের কোণে নাবিলের দিকে চোখ পড়তেই চমকে ওঠে।
“আপনি?”
"জি"
“ওপারে যাবেন বলেছিলেন, যান নি?”
“গিয়েছিলাম”
“আবার ফিরলেন কেন?”
“জানি না।”
রাইসা হালকা হাসে। নাবিল চুপচাপ রাইসার দিকে তাকিয়ে আছে, যেন শেষ বিদায়ে সময় প্রেমিকাকে দেখে নেওয়ার মতন।
©somewhere in net ltd.