| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
না, কিনু গোয়ালার গলি নয়, আমি থাকি কানু কবিরাজের গলিতে। রবীন্দ্রনাথের কবিতার কিনু গোয়ালার গলির চাইতে এ গলিটি আরও বিপন্ন, অধিক দুর্দশাগ্রস্ত। আমি আজকের হরিপদ কেরানি। অবসরপ্রাপ্ত এই অর্ধ বিধ্বস্ত আধো-অন্ধকারশোভিত গৃহ নামক গোয়ালঘর প্রায় পুরনো ইটের দাঁত বের করা উপহাসময় ভাড়াটে আবাসস্থলে আমি একা একাই থাকি। একে ঠিক থাকা বলা যায় না, কোনরকমে মাথা গোঁজা। টিকটিকি, আরশোলা, ইঁদুর, তেলাপোকা, আর ছুঁচোর কলরবে মুখরিত আমার রাত কাটানোর এই নির্জন গৃহটিতে ছাদের টিন ভাঙা, ক্ষয়ধরা। সামান্য একটু বৃষ্টিতেই জল পড়ে, সামনের রাস্তায় জল জমে। কলার খোসা, বর্জ্য, আবর্জনা ভেসে আসে, পচে সুবাতাসের বধ্যভূমি হয়ে ওঠে। সামান্য ভাড়ায় এই শহরতলিতে এর চেয়ে ভালো বাসস্থান জুটিয়ে নেয়া সম্ভব নয়।
এখন কাজ করি একটি ছোট পত্রিকায়, প্রুফরিডার। কখনো তার পাতায় উপ-সম্পাদকীয় লিখি। অতি সামান্য বেতন, তা-ও নিয়মিত নয়। চাকরির শেষে যে ক'টা পয়সা পেয়েছিলাম তা দিয়ে সঞ্চয়পত্র কিনেছিলাম। তা-ও আবার গত বছর থেকে সুদের পরে ট্যাক্স ধরা হয়েছে। এদিকে সব জিনিসের বাজারদর বৃদ্ধির নিয়মিত প্রতিযোগিতা চলছে। পাগলা ঘোড়ার কিছুতেই লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না। কী করে বাঁচা নামক প্রত্যহ প্রয়োজনকে বাঁচিয়ে রাখব? চুরি-ডাকাতি করব? আমাদের মতো নিম্ন-মধ্যবিত্ত মানুষদের ঘাড়ের ওপর বাঁশ চেপে জিহ্বা বের করে লাশঘরে নিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা চলছে। না পারছি জীবন যাপনের ইজ্জত রক্ষা করতে, না পারছি এ বয়সে রাস্তায় নেমে শ্রমিকের হাতুড়ি-কোদাল ধরতে।
আমার জন্য তেমন ভাবি না। মরে এ ঘরে পচে থাকলে পুলিশ এসে লাশ নিয়ে বেওয়ারিশের বহরে ফেলে দিয়ে দায়িত্ব পালন করবে। একমাত্র শুভ ছাড়া আমার জন্য কাঁদবার কেউ নেই। শুভ_ শুভাশিস। আমার একমাত্র ছেলে। একটি মেয়েও ছিল_ প্রীতি। প্রীতির বিয়েতে যৌতুকের সব দাবি মেটাতে পারিনি। সেই অপরাধে বিয়ের দুই বছর পর শ্বশুরবাড়ির নির্যাতনে প্রীতি লাশকাটা ঘরে আশ্রয় নিয়েছিল। আর সুধাময়ী? আমার ভালোবাসার নায়িকা সুধা। মনের জানালা থেকে সে শুভলগ্নে আমার ঘরে এসেছিল। বছর সাতেকের সংসার। তার মধ্যেই প্রীতি আর শুভ। যে যোগ্যতা থাকলে ভরা বয়সের একটি মেয়ের ভালোবাসা পাওয়া যায়_ এ বাজারে সেই যোগ্যতায় একটি ভালোবাসা পাওয়া যায় না।
সুধার আবদার অনেক। বড় লোকের মেয়ে, বয়সের খেয়ালে এক কেরানির সঙ্গে ভালোবাসার ঘর বেঁধেছিল। স্বামীর যোগ্যতার দিকে গুরুত্ব দেয়নি। মিথ্যে বলব না। সুধার শরীরের সুধাপানের জন্য অফিসে অসৎ উপায়ে অতিরিক্ত উপার্জনেও নেমেছি। কিন্তু সুন্দরী সুধাকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখতে পারিনি_ আবদারের পর আবদার। এটা পেয়ে তারপর ওটা। মন পাওয়া ভার। এ নিয়ে মনের আগুনের ফুলকি সংসারে, সংসার থেকে শয্যায়। বিলাসের ফানুস ওড়ানো সুধা আমার প্রিয়তমা স্ত্রী সুধারানী শেষ পর্যন্ত তার নতুন স্বপ্নের সওদাগরের পঙ্খিরাজে উড়ে গেল। প্রীতি-শুভর কথা একবারও ভাবল না, মমতাময়ী মাতৃজাতির আধুনিক সংস্করণ?
সুধার কথা ভেবে কী আর হবে? সে তো আমার বুকের মধ্যে চিরবিরহের অশ্রুময় শাওন। এখনো তাকে তেমনই ভালোবাসি, কষ্টে জ্বলে যাই! প্রীতিও গভীর রাতে বেণুবনের বাতাস হয়ে আসে, আকাশের ছায়াপথে আলতা পায়ে হেঁটে যায়, যেতে যেতে ছায়া হয়ে নক্ষত্র হয়ে হারিয়ে যায়। ভাবছি শুধু শুভর ভবিষ্যৎ। ও ভার্সিটিতে পড়ে। তার খরচ জোগাতে পত্রিকা অফিসে রাত জেগে কাজ করা। সঞ্চয়পত্রের সামান্য সুদে ঘষে মেজে পেট চলে। শুভ_ শুভরা যেন আমাদের মতো জীবনভাঙা প্রতিবন্ধী হরিপদ কেরানির মতো খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ভাঙাড়ি মানুষ হয়ে না বাঁচে। অন্ন-বস্ত্র, সম্মান সমন্বয়ে মানুষের মতো_ পরিপূর্ণ মানুষের মতো মাথা উঁচু করে বাঁচে চলতি প্রজন্মের কাছে_ এই একটিই প্রার্থনা।
কানু কবিরাজের এই গলিতে আমি কতক্ষণইবা থাকি? সকালে বাসার সামনের টিউবয়েল থেকে স্নান সেরে বেরিয়ে যাই। সামনের রেস্টুরেন্টে কিছু খেয়ে পত্রিকা অফিসে পেঁৗছি। দুপুরে অফিসের পাশের তৃতীয় শ্রেণীর হোটেলে মাসচুক্তি। রাতে ওখান থেকে খেয়ে নিয়ে বাসায় ফিরি। তারপর দীর্ঘ রাত পর্যন্ত পত্রিকার অবশিষ্ট কাজ সেরে পড়াশুনা। পড়াশুনা আমার সারাজীবনের সঙ্গী। বাংলাদেশের স্বাধীনতার আগে বিএ পাস করেছি। উনিশশ' একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধ করেছি। নিজ হাতে অস্ত্র ধরে যুদ্ধ বলতে যা বোঝায় ঠিক সেটা নয়, ছদ্মবেশে মুক্তিযোদ্ধাদের ক্যাম্পে রাজাকারদের অবস্থানের খবরাখবর পেঁৗছে দিয়েছি। পাকিস্তানি মিলিটারি ক্যাম্প আক্রমণ করতে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের সহযেগিতা করেছি।
বাংলাদেশের বুকে স্বাধীনতার সূর্যোদয়ের নব প্রত্যুষের ময়ূখ। ইচ্ছে করলে মুক্তিযোদ্ধার সনদপত্র জোগাড় করতে পারতাম। প্রয়োজন মনে করিনি। স্বদেশের স্বাধীনতা পেয়েছি, এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী আছে? কিন্তু চাকরি প্রাপ্তির প্রয়োজনে প্রথম শর্ত হলো_ দল করি কি না। মুক্তিযোদ্ধারা সবাই কি নির্দিষ্ট কোন দলের লোক? মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে বাস্তবায়ন করতে হবে_ এই তো আমার একমাত্র দলীয় পরিচয়। শেষ পর্যন্ত আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু আফতাবের একান্ত প্রচেষ্টায় একটি বেসরকারি অফিসে কেরানির চাকরিটা হয়ে গেল। এ সময় সুধার সঙ্গে পরিচয়, পরিচয় থেকে পূর্বরাগ-অনুরাগ পেরিয়ে অবশেষে মন্দিরের আঙিনায় পরিণয়। কারণ সুধার বড়লোক বাবার আমাদের সামাজিক বিয়েতে একান্ত আপত্তি ছিল। সংসারের আমার বিধবা মা সুধার দুর্ব্যবহারে অনেক কষ্ট পেয়ে ইহলোক ত্যাগ করেছেন।
আমার গ্রামের বাড়ির জমাজমি এখন রাজাকার রাজু মিয়ার দখলে। উদ্ধার করতে গেলে জীবন হারাতে হবে। সেখানে ফিরে যাওয়ার আশা নেই। ভবিষ্যতের সব ভরসা শুধু শুভকে নিয়ে। ভেবেছিলাম স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের সমাজব্যবস্থা পরিবর্তিত হবে, শোষণ থাকবে না, গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত হবে, প্রতিষ্ঠিত হবে আমাদের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ। অবক্ষয়, নিপীড়ন, সাম্রাজ্যবাদী শোষণমুক্ত নতুন স্বদেশ গড়ব, দেশের প্রত্যেকটি মানুষ অন্তত দু'বেলা দু'মুঠো খেতে পারবে, মোটা ভাত-কাপড়ে সুখী থাকবে সাধারণ মানুষ। কোথায় সে আদর্শ? অধিকাংশ প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা পায়নি যথাযথ মূল্যায়ন, অনেক প্রখ্যাত নেতা সাম্রাজ্যবাদের, আধিপত্যবাদের পদলেহন করে যথেষ্ট আখের গুছিয়ে নিয়েছেন। সামরিক শাসন ছদ্মবেশে কিংবা প্রকাশ্যে সাম্প্রদায়িকতা ছড়িয়ে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে করেছে ক্ষত-বিক্ষত, তাই ছদ্মনামে পত্রিকায় কলাম লিখতে হয়। কষ্ট! বড্ড কষ্ট হয়! গণতন্ত্র রক্ষার নামে এসব কী চলছে? আমি নগণ্য হরিপদ কেরানি। স্পষ্ট মতামত ব্যক্ত করার অধিকার আমার বড়ই সীমাবদ্ধ!
সমাজে আমি একজন ভাঙাচুরা উপেক্ষিত নাগরিক। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন_ হরিপদ কেরানির সঙ্গে আকবর বাদশার কোন পার্থক্য নেই, অন্তত হৃদয়ের অনুভূতির প্রেক্ষাপটে। কিন্তু আজকের আকবর বাদশাদের সঙ্গে হরিপদ কেরানিদের হৃদয়ের দিক থেকে অনেক পার্থক্য। সমকালে হৃদয়হীন আকবার বাদশারা আমাদের অন্তরকে হাতির পায়ে পদদলিত করে, ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে। বাঁচার মতো বাঁচাকে করেছে বিড়ম্বনাময়, বর্জ্যময়। সাম্রাজ্যবাদের দাঁড়িপাল্লায় বাঁদরের পিঠা ভাগ দেখি একনিষ্ঠ দেশপ্রেম বুকে নিয়ে।
এই গলির হিংস্র হায়না মকবুল মাস্তান প্রতিরাতে গলির গোলাপজান খালার ঘরে নেশা করে, মেয়ে মানুষ এনে ফুর্তি করে। চারটে খুনের আসামি সে, নারী পাচারের ব্যবসা তার। অথচ প্রকাশ্যে বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়ায়। বড় বড় নেতার সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। মকবুলের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের মিছিল হয়েছে। তারপর প্রতিবাদী তরুণ নেতা ফরহাদের লাশ পাওয়া গেল শহরের শেষ প্রান্তে খালের তীরে, তার কলেজপড়ুয়া বোনটিকে আজ পর্যন্ত খুঁজে পাওয়া যায়নি। শান্তি, নিরাপত্তা, কল্যাণ_ এসব শব্দ এ গলিতে বিবর্জিত, গোটা এলাকায় প্রায় একই পরিস্থিতি। তেলাপোকা, ইঁদুর, বাল্মীক_ এদের অত্যাচারে আমার ঘরের মূল্যবান বইগুলোর অবস্থাও ওই একই রকম। সুধার সঙ্গে সেদিন দেখা হয়েছিল। শহরের নিউমার্কেটের সামনে ট্যাক্সি থেকে নামল। এ বয়সেও উগ্র মেকআপে ওকে রূপজীবীনীদের মতো মনে হচ্ছিল। আগের চেয়ে অনেক মোটা হয়েছে, সারা গায়ে গহনা। সঙ্গের পুরুষটিকে আমি দীর্ঘদিন থেকে চিনি, শহরের নামকরা ভূমিদস্যু পবিত্র মজুমদার। পবিত্রর সঙ্গে একসময় আমার হৃদ্যতা ছিল। তবে মাতাল আর চরম চরিত্রহীন পবিত্রকে আমি অনেক আগেই পরিত্যাগ করেছি। পবিত্রদের মতো ভূমিখাদকরা এ শহরের পাশের খাল, বিল, জলাশয় ভরাট করে হাউজিং প্রকল্প শুরু করেছে। দূর থেকে সুধাকে দেখে নিউমার্কেটের অন্যদিকে সরে এলাম। শুভর মাকে নিয়ে শুভর সঙ্গে আমার বিতর্ক হয়। তুমি ওই চরিত্রহীনা মহিলাটির কথা ভেবে এখনও কেন কষ্ট পাও, বাবা?
_ সে যে তোর মা, শুভ।
_না। সে আমার কেউ নয়। হীনস্বার্থের জন্য যে তোমার মতো ভালো মনের মানুষটিকে ফেলে যেতে পারে সে মানুষ নয়, রাক্ষসী। নোংরা মেয়ে মানুষ!
_ ছি! নিজের মা'র সম্পর্কে ওরকম বলতে নেই, শুভ।
_মা! যে মা তার সন্তান ফেলে ক্লেদাক্ত লালসায় পরপুরষের সঙ্গে পালিয়ে যেতে পারে আমি তাকে মা বলে স্বীকার করি না, বাবা! আমি তাকে ঘৃণা করি!
বলতে বলতে শুভর চোখে জল এসে যায়।
শুভ রাজশাহী ভার্সিটিতে পড়ে। মাঝে মধ্যে কানু কবিরাজের গলির এই বিধ্বস্ত বাসাটিতে আসে। কয়েক দিন থেকে আবার ভার্সিটির হলে চলে যায়। কত প্রত্যাশা তার! আর মাত্র দুটি বছর, বাবা। অনার্সে আমার ফার্স্টক্লাস আছে। মাস্টার্স, সে-ও হয়তো ফার্স্টক্লাস পাব। ডিপার্টমেন্টের হেড আমাকে খুবই ভালোবাসেন। ভার্সিটি পেরিয়ে বেরিয়ে একটি চাকরি নিয়ে তোমাকে এই অভিশপ্ত পচনধরা গলি থেকে ভালো বাসায় নিয়ে যাব, বাবা।
শুভ ভার্সিটিতে ছাত্র রাজনীতি করে। প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনের প্রথম দিকের নেতা সে। আমার ভয় করে। বর্তমানে ভার্সিটিতে ছাত্র সংগঠনগুলোর মধ্যে যা চলছে_ দলাদলি, হানাহানি, খুন-জখম! প্রতিপক্ষ ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে মারামারি, অস্ত্র নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়া, নির্মম হত্যা! ধর্মঘট, সেশন জট, হল দখল। সন্তানদের ভার্সিটিতে পাঠিয়ে অভিভাবকরা নিশ্চিন্তে কাটাতে পারে না। কখন যে কী হয়! তুই রাজনীতিতে অতটা জড়িয়ে পড়িস না, শুভ। আমার ভয় করে! মোবাইলে শুভ অনেক কথা বলে। আমরা তো কোন স্বার্থের রাজনীতি করি না, বাবা। আমরা সাম্রাজ্যবাদ, সাম্প্রদায়িকতাবিরোধী রাজনীতি করি। গণতন্ত্র রক্ষার নাম করে এই যে স্বার্থ উদ্ধার, শোষণ, নিপীড়ন, দুর্নীতি, দখল ও দলবাজির রাজনীতি চলছে, তার বিরুদ্ধেই আমাদের প্রতিবাদ-সংগ্রাম। যেভাবেই হোক মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে এদেশে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। আখের গোছানো এ জঘন্য রাজনীতির ছোবল থেকে দেশকে বাঁচাতে হবে। আমরা সেই লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছি, বাবা।
প্রকৃত ধর্ম নয়, ধর্ম ব্যবসার উদ্দেশে ধর্মের নাম করে এই যে ধর্মান্ধ হিংস্র বিদ্বেষ-বিভেদের রাজনীতি চলছে আমি নিজেও তার প্রতিবাদ করি। বয়স নেই, তাহলে এসব চক্রান্ত প্রতিরোধের রণাঙ্গনে আমিও লড়াকু সৈনিকের দায়িত্ব পালন করতাম। শুভ আমার এই সংগ্রামী চেতনার প্রতিনিধি। তবুও শুভকে নিয়ে আমার দুশ্চিন্তা হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের বিরোধীরা দেশে এখনো সক্রিয়, সক্রিয় সাম্রাজ্যবাদী চক্রান্ত, শোষণ। দেশকে অস্থিতিশীল করে তোলার জন্য বিদেশি ষড়যন্ত্র মাকড়সার জাল বিস্তার করে রেখেছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অনেকেই সেই ফাঁদে জড়িয়ে পড়েছে। সুতরাং ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবনার কথা।
অনেক রাতে অস্ত্রহাতে মকবুল মাস্তান এলো। তার মাতাল কণ্ঠস্বরে জবাই করা ছুরির ধার। ব্যাপারটি কী? আমাদের পত্রিকায় ছিনতাইয়ের একটি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। সুধা নামে একজন মহিলার গহনা ছিনতাই; তার সঙ্গে জালাল, জব্বার, ফরিদের নাম। পুলিশ ওদের খুঁজছে। এই তিনজন মকবুল মাস্তানের পোষা। গলির মোড়ে, সদর রাস্তায়, পার্কের ধারে ওরা প্রায়ই ছিনতাই করে। কানু কবিরাজের গলির সবাই এ কথা জানে, কিন্তু প্রতিবাদ করতে সাহস পায় না। মকবুল মাঝে মধ্যে পুলিশের হাতে ধরা পড়লেও অলৌকিক উপায়ে হাজত থেকে বেরিয়ে আসে। মকবুলের সন্দেহ, আমিই পত্রিকায় এ রিপোর্টটি করেছি। মাস্তান আকবর বাদশা মকবুল আমার বুকের সামনে অস্ত্র উঁচিয়ে যা বলার বলে গেল। কিন্তু রিপোর্টটি আমি করিনি, সে সাহস আমার থাকার কথা নয়। মকবুলকে অনেক বোঝালাম। বুঝল কি না, জানি না। ওর চাঁদাবাজ সাগরেদরা ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে নিয়মিত চাঁদা নেয়, সেটা কমপক্ষে হাজারের উপরে। শেষ পর্যন্ত আমার কাছেও কী চাঁদার চিঠি আসে!
হরিপদ কেরানিরা কোথায় চলেছে? এদের শেষ গন্তব্য কোথায়? মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্ত, সীমিত আয়ের মানুষগুলোর ঘাড়ের পরে খ্তগ তোলা। প্রত্যহ বাজারদর বাড়ছে, সাধ আর সাধ্যের দড়ি টানাটানিতে নিয়মিত পিছিয়ে যাচ্ছি। সঞ্চয়পত্রের পরে ট্যাক্সের কারণে অনেকে শেয়ারমার্কেটে মূলধন হাজির করেছিল। সেখানেও আস্ত বাঁশ_ পথে বসে গেল হাজার হাজার মধ্যবিত্ত। নিম্নবিত্তদের অবস্থা আরও শোচনীয়। উপার্জনের ছেঁড়া কাঁথা একদিক টেনে গায় দিলে অন্যদিক আলগা হয়ে পড়ে। সুতরাং বেঁচে থাকার বধ্যভূমিতে দাঁড়িয়ে তারা।
মুক্তিযুদ্ধের দুশমন 'পাকসরজমিনে'র রাজনীতি আবার ছাড়পত্র পেয়ে গেল? এদেশে যেদিন থেকে রাজাকারের সরকারি গাড়িতে স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা উড়েছে সেদিন থেকে নিজেকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের লোক ভাবতে বড্ড কষ্ট হয়! স্বাধীনতা আমার অহঙ্কার, সেই অহঙ্কার কলুষিত করতে চক্রান্ত লেগেই আছে।
আমার বাসার ছয়টি ঘর ওপাশে মধু থাকে। বিয়ে করেনি, একা। মাঝে মধ্যে রাতে সে আমার ঘরে আসে। বাঁশের বাঁশি বানিয়ে বিক্রি করা তার উপার্জনের উপায়। যৌবনের শেষ সীমা অতিক্রম করা এ লোকটির জীবনকাহিনী নিয়ে উপন্যাস হতে পারে। তাদের গ্রামের এক কৃষককন্যার কথা, মধুর বাঁশি শুনে মেয়েটি সেই মধুর সুরে কাঁচা বয়সে মন দিয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিত্ত-বৈভরের লোভে মেয়েটি মধুকে অস্বীকার করল, অবস্থাপন্ন ঘরে বিয়ে হলো তার। বিরহে গ্রাম ছেড়েছে মধু। তারপর থেকে দীর্ঘদিন এই গলির বাসিন্দা। মাঝে মধ্যে গভীর রাতে মধু বাঁশি বাজায়, সে তখন দুলীর সোজন, সে তখন সাজুর রূপাই, সে তখন রাজকন্যার রাখালবন্ধু। মধুর বাঁশির সুর বাংলাদেশের চিরন্তন বিরহী হৃদয়। বিরহী মধুর বাঁশির সুরে আমিও কাঁদি, শীতের গভীর রাতে শিশিরের মতো কেঁদে কেঁদে কষ্ট পাই। এ কষ্টও এক রকমের সুখ, যা দুঃখের আনন্দ। কেন কাঁদি? সুধাকে মনে পড়ে? পৃথিবীর সব বেদনা আমার বুকে দীর্ঘশ্বাসে যন্ত্রণাবিদ্ধ হয়।
অন্ধকারের নিঃসঙ্গ গভীর রাতে আমার ঘরের কপাটভাঙা খোলা জালনায় এসে দাঁড়াই। গলির নর্দমা থেকে দুর্গন্ধের দোজখ এসে বলে যায়_ আমি জীবনসমুদ্রে হালভাঙা বিধ্বস্ত নাবিক হরিপদ কেরানি আর দারুচিনি দ্বীপে পেঁৗছানোর প্রত্যাশা নেই। বাইরে তাকাই। পাশের রাস্তার ওপাশের দেয়ালে দীর্ঘ বৃহৎ_ সুদীর্ঘ ছায়া দাঁড়িয়ে, বোধহয় আকাশ পর্যন্ত। এই গলির বাসিন্দাদের আকাশে তাকানোর অধিকার নেই। সুদীর্ঘ বিশাল ছায়াটির শেষপ্রান্ত আকাশে অদৃশ্য। এই ছায়াটিকে হরিপদ কেরানি রাতের গভীর অন্ধকারে কিছুদিন ধরে দেখে আসছে। আমি তাকে চিৎকার করে বলি_ খবরদার! তোমার মুখে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা মানায় না, অসাম্প্রদায়িকতার কথা শোভা পায় না, স্বৈরাচারের বিপক্ষে সোচ্চার হওয়ার ভাষণ দেয়ার অধিকার আর নেই তোমার। তুমি মুক্তিযুদ্ধের অর্জনের সঙ্গে আদর্শের সঙ্গে প্রতারণা করেছো, আমাদের জাতির কর্ণধারের আদর্শকে ক্ষত-বিক্ষত করেছো। সামরিক শাসন, স্বৈরাচারের শাসনের সঙ্গে তুমি আপস করেছো, গণতন্ত্রের পূর্ণ প্রতিষ্ঠার বাক্য শুধু তোমার মুখের কথা, ক্ষমতার লিপ্সা তোমার সততাকে গ্রাস করেছে। এসব কষ্টের কথা বলতে হরিপদ কেরানি কেঁদে উঠি। বুকের ভিতরের বিক্ষোভ কান্নার করুণায় একাত্তরের সন্তানহারা জননীর, সম্ভ্রমবিনষ্ট রমণীর শোকের আর্তনাদ হয়ে ওঠে।
শেষ রাতে মোবাইল বেজে ওঠে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আমির আলী হল থেকে নওশাদ শুভর রুমমেট নিজেদের ছাত্র সংগঠনের মিটিং থেকে ফেরার পথে গত সন্ধ্যায় শুভ নিখোঁজ। মধ্য রাতে পদ্মার চরে তাকে পাওয়া গেছে। শুভর হাত-পায়ের রগ কাটা, সারাশরীরে চাপাতির কোপ, পাশে একখানা রক্তাক্ত ক্ষুর।
©somewhere in net ltd.