| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
পরাশুনা বিষয়ে সব সময়ই আমি একটু উদাসীন ছিলাম, যতদিন মা পেরেছেন শাসন করে পড়িয়েছেন। বাবা এইদিক থেকে অনেক ছার দিতেন। ক্যাডেট এ পরব এটা বাবা মায়ের একটা স্বপ্ন ছিল, কারন তখন ক্যাডেট কলেজ গুলোই পরিক্ষায় ভাল ফলাফল করত। কিন্তু আমি কোন মতেই আগ্রহী ছিলাম না ক্যাডেট এ ভর্তির ব্যপারে। তো যাই হোক বাবা মায়ের পীড়াপীড়িতে পরীক্ষা দিলাম। আল্লার কাছে হাযার শুকুরিয়া যে সুজোগ পাইনি। বাবা মায়ের এমন ইচ্ছার পিছনের কারন হল প্রাথমিক পরিক্ষায় বৃত্তি পেয়েছিলাম, সেটাই কাল হয়ে দারিয়েছিল।
যাই হোক অনেক চরাই উৎরাই পেরিয়ে এল মাধ্যমিক পরীক্ষা, আমার অবস্থা বেহাল, পরাশুনা মোটামুটি শিকে তুলে রেখেছিলাম। কি আর করা পরিক্ষার আগের ২/১ দিন প্রস্তুতি নিয়ে পরীক্ষা দিয়েছিলাম। এই ব্যপারে মজার ঘটনা হল ইসলাম শিক্ষা পরীক্ষার আগে হই খুজতে গিয়ে দেখি আমার বই উধাও। কি আর করা এই কথাতো আর বাবা, মা কে বলা যায় না। বললে ত ছাল চামড়া উঠে যাওয়ার আশঙ্কা ছিল। বুদ্ধি করে মা কে বললাম, সবাই গাইড কিনে পরছে, অইখান থেকে পরে উত্তর দিলে ভাল নাম্বার পাওয়া যাবে, আসল কথা হল পাঠ্যপুস্তক আবার কিনে দিতে বলতে ত পারিনা। যাই হোক কিনে আনলাম বাজার থেকে “পপি গাইড” কি যে কিনলাম, আর কি যে পড়লাম সেটা আজও আমার কাছে রহস্য। সব পরীক্ষা শেষ, দিন ঘনিয়ে আসলো ফলাফল প্রকাশের। বাবা সব সময় আমার ব্যপারে একটু বেশি দয়াবান, ফলাফলের আগে এসে আমাকে বললেন, তুই তর নানা বাড়িতে যা, ফলাফলের সময় এখানে থাকলে আর ফলাফল খারাপ হলে তোর মা তোকে মেরেই ফেলবে। বাবার টাকা নিয়ে আমি সোটকে পরলাম নানা বাড়ির উদ্দেশ্যে। সে ১৯৯৬ সালের ঘটনা। মোবাইলের ছরাছরি নেই। আর গ্রাম থেকে ঢাকায় যোগাযোগ ও ছিল খুব কষ্টের। ধারনা ছিল যেদিন ফলাফল প্রকাশ হবে তার আগের দিন দেখলাম টেলিভিশন এ বলছে ফলাফল হয়ে গেছে, তার উপর পাশের হার ও খুব কম, তার মধ্যে প্রথম বিভাগ পেয়েছে খুবই কম সংখ্যক শিক্ষার্থী। আমার তখন প্রথম দ্বিতীয় নিয়ে চিন্তা না, চিন্তা পাস করবতো, যে পাশের হার। নানা রওয়ানা দিলেন বাজারের উদ্দেশ্যে এবং সাথে আমি, কাজ হল মা কে বাসায় ফোন করে ফলাফল এর খবর নেয়া। সেতো দেখলাম এক বিশাল কাহিনী ঢাকায় ফোন করা, কিসের সিরিয়াল নিতে হবে, কি ট্রাঙ্কল না কি যেন, মাথায় তখন একটাই বিষয় ফলাফল কি হবে আর মায়ের প্রতিক্রিয়া কি হবে, আর বাবার কথা মনে হচ্ছিল, যে তাও বাবা টাকা দিয়ে গ্রামে পাঠিয়ে দিয়েছিল, ঢাকায় থাকলে আমি মনে হয় আর জীবিত থাকতাম না। অনেক কষ্টে ফোন এ পাওয়া গেল মা কে। নানা জিজ্ঞেশ করলেন ফলাফলের ব্যপারে, মনে হল প্রথমে কোন উত্তর পাওয়া গেল না, বরঞ্চ মা প্রশ্ন করলেন আমি কোথায়, নানা উত্তর দিলেন আমি বাসায় এখানে নেই, এর পরে আমার মা আমার ফলাফল জানালেন যে পাশ করেছি, ২টা বিষয়ে এ লেটার মার্ক পেয়েছি। এর মধ্যে সবচেয়ে মজার ব্যাপার হল তার মধ্যে ১ টা বিষয় ছিল ইসলাম শিক্ষা। সে বারের মত কোন ভাবে জানে রক্ষা পেলাম।
এবার আসি ১৯৯৮ সালের উচ্চ মাধ্যমিক পরীক্ষার কথায়, আমি রাজউক কলেজের ছাত্র ছিলাম। ভর্তি হওেরর পর সাংস্কৃতিক কারজক্রমের সাথে জরিয়ে যাই, বলতে গেলে ইচ্ছা করেই যরাই। কারন প্রিফেক্ট হতে পারলে ক্লাস থেকে পালিয়ে থাকার একটা বারতি সুবিধা ছিল, তাই সে পথেই হাটা শুরু করেছিলাম। টেস্ট এর আগে আমি কোন পরীক্ষায় সব বিষয়ে পাস করতে পারিনি, বিশেষ করে ফিসিক্স, কেমিস্ট্রি আর ম্যাথ এ। ক্লাসে একটা আলাদা গ্রুপ ছিল আন্ডার টেকার নামে, মানে আমরা ৫০ টাকার স্ট্যাম্প এ সাইন করে টেস্ট পরীক্ষা দেই যে আমরা এই পরীক্ষায় ফেল করলে কলেজ করতিপক্কখ আমাদের বের করে দিলে আমাদের বা আমাদের অভিভাবক এর কোন ভাষ্য থাকবে না। এটা আমাদের কাছে একটা বারতি গর্বের বিসয় ছিল যে আমরা আন্ডার টেকার, আমি ৩ টা বিষয়ে ফেল করেছি, কেউ আবার বুক ফুলিয়ে বলত আমি ৪ টা বিষয়ে। এই ব্যাপারটা ততদিন ই গর্বের ছিল, স্ট্যাম্প পেপার এ অভিভাবক এর স্বাক্ষর এর আগ পর্যন্ত, বাসায় যেদিন বলতেই হল যে কলেজে যেতে হবে এবং ৫০ টাকার স্ট্যাম্প এ সাইন করতে হবে। আমার কাছে সেই দিনটা খুবই লজ্জাকর দিন ছিল, আমার জন্য বাবাকে অন্নের কাছে ছোট হতে হল। কিন্তু বাবা যাওয়ার পর প্রভাষক আমার ব্যাপারে প্রশংসা করলেন। আকাশ থেকে পরার অবস্থা। কোন মতে বাবা আমার জন্য চরম অপমানিত হবার হাত থেকে রক্ষা পেলেন। টেস্ট দিলাম সব বিষয়ে পাস করলাম, কিন্তু নাম্বার ছিল খুবই হতাশাজনক। উচ্চ পরীক্ষার সময় চলে এল। অনেক কষ্টে পরীক্ষা দিলাম কিন্তু আত্মবিশ্বাস এর ঘাটতি ছিল। তাই কোনভাবেই বুঝতে পারছিলাম না যে কি ফলাফল হবে, তখন ও পাস ফেল নিয়ে চিন্তা করতে লাগলাম। ফলাফল প্রকাশের আগে এবার আর মা, বাবাকে আগের সেই সুযোগ নিতে দিলেন না, আমার উপর চরম নজরদারি। ফলাফল প্রকাশের দিন আমি রীতিমত বাসায় বন্দি, ফলাফল আনতে পাঠানো হল ছোট মামাকে। সময় কাটছিলনা, কি করি কিভাবে পালাই, কার কাছ থেকে একটু আগে থেকে খবর পাবো এই সব নিয়েই চিন্তায় মগ্ন ছিলাম। কিছুক্ষন মামা আসলেন ফলাফল নিয়ে, হাতে মিষ্টির প্যাকেট, হাফ ছেরে বাচলাম শেষ বারের মত।
এর পর যেটা বুঝলাম সেটা হল, ঐটা ছিল আমার আতঙ্ক মা এর ব্যপারে, আসলে ফেল করলেও কিছুই করতেন না, শুধু একটু কথা শুনাতেন এইযা, এর চেয়ে বেশি কিছু না। মায়ের সবচেয়ে অপমানজনক ডায়লগ ছিল “যা অমুকের পা ধোয়া পানি খেয়ে আয়” অমুক বলতে যে বন্ধুরা ভাল ফলাফল করত তারা।
বাবা মা এর পর কোন সময়ই পড়াশুনা নিয়ে আর কোন কথা বলেনি, আমি যেভাবে চেয়েছি, যেখানে চেয়েছি আমি করেছি। তাদের মধ্যে একটা আত্মবিশ্বাস দেখতে পেতাম আমার ব্যপারে যে আমি যা করব ভালই করব।
আপাতত পড়াশুনার পাঠ চুকিয়ে ফেলেছি, আপাতত বলছি কারন ২০০৫ এ স্থাপত্য বিষয়ে পাস করার পর কাজ করেছি প্রায় ৬ বছর। পরে আবার আসি জার্মানিতে মাস্টার্স এর জন্য, সেটাও শেষ। যখনই দেখি মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক এর ফলাফল প্রকাশ হবে তখনই সেই সব দিনগুলোর কথা মনে পরে, আর নিজের অজান্তে মনে মনে হাসি...............
©somewhere in net ltd.