নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস

https://www.facebook.com/sahadat.sahed.50এই লিংকটি থেকে বিস্তারিত জানা যাবে।

শাহাদাৎ শাহেদ

বেড়ে ওঠা লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে। গ্রামে। শহুরে হাজারো রংয়ের মধ্যেও চোখের পাতায় গ্রাম লেপ্টে আছে। স্বপ্ন নিয়ে যে তরুণরা ঢাকায় পাড়ি জমিয়েছে আমি তাদের একজন। ২৪ অক্টোবর ২০১৪ সালে লেখা-লেখির জগতে প্রবেশ। ৩ জানুয়ারি ২০১৫ দৈনিক বাংলাদেশ সময়ে প্রথম ছড়া প্রকাশের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গভাবে লেখা-লেখিতে মনযোগ। মূলত ছড়া, কিশোর কবিতা, কবিতা, গল্প, ফিচার ও প্রবন্ধ লিখছি। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত। ভবিষ্যতের পরিকল্পনা বলতে কিছু নেই, স্বপ্ন তো অনেক রকমই দেখি। অনেকের মতো অচিন পথে হাঁটতে পছন্দ করি। শত কোলাহলের ভেতরও আমি একা। খুব সহজে করো সাথে মিশতে পারি না। ভুলো মন। স্কেপিস্ট, মানে দেয়ালে পিঠ ঠেঁকে যাওয়ার আগ পর্যন্ত বিপদ থেকে পালিয়ে বেড়াই। ভোজন রসিক। ইচ্ছে হলে আমাকে খাওয়ার দাওয়াত দিতে পারেন

শাহাদাৎ শাহেদ › বিস্তারিত পোস্টঃ

যুক্তির নিরিখে কিশোরকবিতা

২১ শে মে, ২০১৭ রাত ৮:৫৫

শিল্পীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা-প্রসূত অনুভূতি রং রেখা শব্দ বা রূপকের সাহায্যে অন্যের মনে সঞ্চারিত করাই যদি আর্ট হয় তাহলে এই শর্ত বজায় রেখে যে কেউ যে কোন মাধ্যমেই তো ফলাতে পারে তার কল্পনা-নিগুঢ় সত্যের ফসল। সাহিত্য মাধ্যমে তা হতে পারে কবিতা, গল্প, উপন্যাস, গদ্য, নাটক ইত্যাদি ইত্যাদি। সাহিত্য হতে পারে বয়ষ্কজনের, হতে পারে ছোটদের। সাহিত্যের মূল শ্রোতধারায় মানুষের গোটা জীবনটাই উপজীব্য। কিন্তু কে না জানে বয়ঃসন্ধির অদ্ভুত ঘেরাটোপে আমাদের সাহিত্য বয়ষ্ক ও শিশু রচনার মাঝে শিশুসাহিত্যের ভিন্ন ভুবন নিয়ে দু’ফালা হয়ে আছে। বিশ্বসাহিত্যে এই স্বপ্নময় আগামী প্রজন্মের সাহিত্য-পরিচর্যা কিভাবে হয়ে থাকে তা নিয়ে আমাদের নমস্য প্রাজ্ঞজনেরা আলোকপাত করতে পারেন, তবে আমাদের শিশুসাহিত্য যে কোন এক বিভেদের সু-উচ্চ পাঁচিল দিয়ে মূল শ্রোত থেকে সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বেশ কিছুদিন যাবৎ এই শিশুসাহিত্যের বলয়ের মধ্যেও ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয়ে শিশু ও বড়োদের মাঝখানে একটি স্বচ্ছ পর্দা নিরন্তর শৈল্পিক দোলায় আন্দোলিত হতে দেখা যাচ্ছে। যেমন : কিশোরগল্প, কিশোরউপন্যাস, কিশোরকবিতা ইত্যাদি। তবে কিশোরসাহিত্য নামে স্বতন্ত্র কোনো সাহিত্যের জন্মচিৎকার এখনো অস্বীকার করে চলছেন অনেকে। ‘কিশোরকবিতা’ অভিধা নিয়ে তর্ক-বিতর্কের এখনো অবসান হয়নি, যদিও সেই তর্ক-বিতর্ক আড্ডায় সীমাবদ্ধ, মৌখিক। লিখিত নয়। তাই এর লিখিত একটি যৌক্তিকতা পেশ সময়ের দাবি।

অভিযোগকারীরা মনে করেন, ‘কিশোরকবিতা’ বলে পৃথক কিছুই নেই, সাহিত্যে এমন বিভাজন নিরর্থক। এর নির্দিষ্ট কোনো সংজ্ঞা থাকা তাদের কাজ যারা কবিতা লিখতে অপারগ কিন্তু ঠিক ছড়াও লিখতে পারেন না; ব্যর্থতার ঘ্নানি নিয়ে সাহিত্য ক্ষেত্র থেকে প্রস্থান না করে কিশোরকবিতা নামে নাতুন ‘লোকাল বাসের’ রুট ঠিক করছেন মাত্র! কে না জানে- কবিতার কোনও গণ্ডি নেই? যে কোনো বিষয়কে ধারণ করেই কবিতা সৃষ্ট হতে পারে। কিন্তু যারা কিশোরকবিতা অভিধার বিরোধী তারা বলেন, শিশুসাহিত্য, কিশোরসাহিত্য, যুবকসাহিত্য- এভাবে বিভাজন কি চলতেই থাকবে? কিন্তু এওতো যৌক্তিক যে, কিশোরকবিতা যদি আলাদা হওয়ার গৌরবী না হবে, তাহলে তার রচনারীতি, তার পরতে-পঙ্ক্তিতে চিত শব্দরাজি, সর্বোপরি, তার প্রকাশভঙ্গি এতটা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত কেন হবে? উপর্যুক্ত স্পষ্ট বৈশিষ্ট্যর মিত্র ও মিশ্রতায় কবিতার যে পৃথক ধারা, অন্তিমে তা-ই কিশোরকবিতা।

বাল্য থেকে কৈশোরকাল পর্যন্ত বিস্তৃত সময় পরিধিতে একজন মানুষের স্বাভাবিক, অস্বাভাবিক কিছু ভাবনা-কল্পনা, জগৎ পরিপার্শ্ব সম্পর্কে তার পর্যবেক্ষণজাত চেতনাবচেতনের বিবরণ ইত্যাদিকেই কবি যখন ধারণ ও তার স্বীয় অভিজ্ঞতার মিশেলে উপর্যুক্ত বিবরণকে কাব্য-শক্তিতে রূপান্তরিত করে শিল্পীত বিন্যাসে অক্ষর বন্ধি করেন, তারই একটি দিব্যরূপ কিশোরকবিতা। কবিতার সকল শর্ত পূরণ করেই কিশোরকবিতা। কবিতা হয়ে ওঠার আবহ ও প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে কিশোরকবিতার কবিকে অতিক্রম করতে হয়। তবে কিশোরকবিতায় কবি থাকবেন কিছুটা নমনীয়, কেননা তার পাঠক বিষয় গাম্ভীর্যে অতিক্রমের জন্য যথার্থ অভিজ্ঞ নয়। এই কথাগুলোর সমর্থনই পাওয়া যাবে গুণীজনের বক্তব্যে। সুজন বড়ুয়া কিশোরকবিতার সংজ্ঞায় বলেন, “কিশোর উপযোগী অনুভূতির রঙে রঞ্জিত শব্দমালার সান্নিধ্যে সুমধুর ছন্দে যখন কোন বিশেষ সৌন্দর্যের প্রকাশ ঘটে, তখন তাকে বলা যেতে পারে কিশোরকবিতা।” রাশেদ রউফ প্রায় কাছাকাছি কথা বলেছেন, “নরম নকশামেদুর শব্দ বিন্যাসে এবং মনস্তত্ত্বের নিবিড়তম সংলগ্নতায় কৈশোরিক অনুভূতি স্নিগ্ধ কবিতাই ‘কিশোরকবিতা’।”

কৈশোরসংলগ্ন অনুভূতিকে কিশোরকবিতা হিসেবে দেখতে চাইলেও কিশোরের মন শুধু কৈশোরিক ভাবনার প্রতি নিবিষ্ঠ নয়। সে কখনোসখনো বড়োদের চেয়ে বড়ো ভাবনা ভাবে। বাস্তব জগতের সাথে তার পরিচয় তখন পর্যন্ত না ঘটায় তার খেয়ালি জগৎ, কল্পনার জগৎ, সৌন্দর্যের জগৎ যে এই মহাজগৎ থেকে বিশাল একথা বলার অপেক্ষা রাখে না। তার মধ্যে কৈশোরিক দুরন্তপনা, রাগ-ক্ষোভ বা উঠতি বয়োসের কোন বিপরীত লিঙ্গভাবনা যেমন থাকে তেমনি থাকে কল্পনার জগৎ, স্বপ্নের জগৎ-ও। এগুলোকে কিশোরকবিতায় উপেক্ষার সুযোগ নেই। বাস্তবে যে এক অজ পাড়াগাঁয়ের এক দুরন্ত কিশোর সে-ই তো রবীন্দ্রনাথের ভাষায় ‘বীরপরুষ’ হয়ে ডাকাত দলের সাথে যুদ্ধ করে, মাকে বাঁচায়; সেই কিশোরই তো কল্পনায় নজরুলের ভাষায় ‘সাগর সেঁচে মুক্তা আনে’ কিংবা আল মাহমুদের ভাষার ‘পাখির কাছে ফুলের কাছে মনের কথা খুলে বলে’, তাদেরকে পকেটে ভাঁজ করা কাব্য শোনায়। কল্পনার জগতে তারা পৃথিবীর সবচে ক্ষমতাবানের চেয়েও বেশি ক্ষমতাবান। জিগ্মুন্ড ফ্রয়েড্কেও তাই বলতে দেখি, ‘ভাগ্যিস শিশুরা বলহীন, নইলে তাদের যে-পরিমাণ ইচ্ছাশক্তি ও বাসনার ব্যাপ্তি তাতে ইচ্ছাপূরণের শক্তি যদি তাদের থাকতো এই পৃথিবী যে কতোবার ধ্বংস ও পুনর্নির্মিত হতো তার ঠিক নেই।’ তাদের এই কল্পনা জগতের প্রতি ইঙ্গিত করেই হায়াৎ মামুদ বলেন, “শিশুর (কিশোররাও বাদ পড়ে না) পৃথিবী বয়স্কদের মহাবিশ্বের চেয়ের বিশাল”। বিশাল তাদের জগৎ, সুতরাং কিশোরকবিতার কবিকে হতে হবে এই বিশাল জগতেরই কবি। জুলফিকার শাহাদাৎ এই দিকটিকে গুরুত্ব দিয়েছেন, “কিশোরকালের কল্পনার রাজ্য নিয়ে যে কবিতা লেখা হয়, তাই কিশোর কবিতা।”

আমাদের ধারণা, কবিতার মতো কিশোরকবিতাকেও কোন সংজ্ঞায় আবদ্ধ করা কল্পনাপ্রয়াস কেবল। তথাপি বলতে হচ্ছে, কবিতার সকল র্শতপূরণ করে ছন্দ ও অন্ত্যমিল সন্নিবেশিত কৈশোরিক ভাবনাসংলগ্ন কবিতা হলো কিশোরকবিতা। মনে রাখা জরুরী, যতোই নরম নকশা মেদুর কাব্য হোক-না কেন তাকে সর্বজনে রসসঞ্জার করার ক্ষমতায় ক্ষমতাবান হতে হবে; হোক তা কিশোরকবিতা কিন্তু থাকতে হবে সবার মন জয়ের ক্ষমতা। এই পর্যন্ত রচিত স্বার্থক কিশোরকবিতাগুলো বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, এগুলো শিশু-কিশোরদের উপযোগী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সর্বজন রসগ্রাহীও বটে। ‘কবিতার শেষ কথা কবিতা’ বলেই জানতেন বোদলেয়ার। কিশোরকবিতাও সবশেষে পূর্ণ কবিতা হয়ে উঠতে হবে। বুদ্ধদেব বসু বলেছেন, “মৌলিক শিশুগ্রন্থ (কিশোর গ্রন্থও) তখনই উৎকৃষ্ট হয়, যখন তাতে সর্বজনীনতার স্বাদ থাকে।” একটি কিশোরকবিতা সবার আগে কবিতা; কেবল কিশোরদের বোধ্যগম্যতার বিচারে আমরা কিশোরকবিতার আলোচনায় উদ্ধত হয়েছি। ভাবকে ভাষা দেওয়া কবির ব্রত; কোনটি কবিতা, তা পাঠক পড়েই বুঝতে পারেন। বিনয় মজুমদার বলেন, কবির চরম উদ্দেশ্য পাঠককে ভালো লাগানো, বোঝানো নয়। ম্যাকলেশ বলেছেন, অ ঢ়ড়বস ংযড়ঁষফ হড়ঃ সবধহ, নঁঃ নব। কবিতার মতো কিশোরকবিতারও কোন ধ্রুব সংজ্ঞা নির্ধারণ করা অসম্ভব। কিশোরকবিতার পরিচয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা শেষে কেউই আসলে শেষ কথা বলতে পারবেন না, এটিই কিশোরকবিতা। আমার কাছেও যদি জানতে চাওয়া হয় কিশোরকবিতা কি, তাহলে বলবো, ‘যদি জিজ্ঞেস না করো, তাহলে আমি উত্তর জানি; যদি জিজ্ঞেস করো, তাহলে আমি জানি না।’

আসলে কিশোরকবিতা বলে কিছু একটা যে বাংলা সাহিত্যে অনেক আগে থেকে হয়ে আছে এই কথাটি ঠিক তেমনই সত্য যেভাবে সত্য আল মাহমুদের, ‘ও পাড়ার সুন্দরী রোজেনা’র নিজেই কবিতা হয়ে ওঠা। আল মাহমুদের ভাষায় রোজেনা- ‘সারা অঙ্গে ঢেউ তার, তবু মেয়ে/ কবিতা বোঝে না!’। এই যে রোজেনা নিজে যেমন কখন যেন কবিতা হয়ে উঠলো তেমনি বাংলা সাহিত্যের দুই হাজার বছরের ইতিহাস ঘাটলে কিশোরকবিতার জন্মইতিহাস চোখের সামনে দিবালোকের ন্যায়ই প্রতীয়মান হবে; তখন কিশোরকবিতা নিয়ে প্রশ্ন অবান্তর বৈ কিছুই মনে হবে না। যারা কিশোরকবিতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তারা শেষ পর্যন্ত ‘কবি’ হয়ে থাকতে চান, তাদের ধারণা- সাধারণের জগতে টিকে থাকতে হলে কবি হয়েই কেবল তা সম্ভব। তাদের কাছে শিশুসাহিত্যে ভাগ্যান্বেষণের প্রস্তাব এলে, আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের ভাষায়, ‘গলায় নৈরাশ্যের সুর ফুটে ওঠে।’ অথচ বাংলা সাহিত্যের প্রায় সকাল বড়ো কবিই শিশুসাহিত্যে তো হাত দিয়েছেনই, এখন আমরা যেগুলোকে কিশোরকবিতার বৈশিষ্ট্য উদ্ঘাটনের জন্য সামনে আনি, তেমন ভুরি ভুরি কবিতাও লিখেছেন। কি রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, কি আল মাহমুদ, শামসুর রাহমান, সৈয়দ শাসুল হক বা আহাসান হাবীব, আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ, ফররুখ, সুকান্ত, বুদ্ধদেব, হুময়ুন আজাদ, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব, আবু হাসান শাহরিয়ার কিংবা ও পাড় বাংলার শক্তি, শঙ্খ- কে বাদ আছেন এই ধরণের রচনায়?

পৃথিবীর এ-যাবৎ কালের কোটি কোটি কবিযশপ্রার্থী যেমন বিস্তৃতির নিষ্পত্র জগতে হারিয়ে গেছেন তেমনি শিশুকিশোরসাহিত্যের অসংখ্য শক্তিমান স্রষ্টা মানব-স্মরণে অমর জায়গা পেয়েছেন। হ্যান্সা ক্রিশ্চিয়ান এন্ডারসন বা মার্ক টোয়েন তাদের সাহিত্যের পৃষ্ঠায় যে অনুপম স্বপ্নজগৎ রচনা করেছেন, সে-সবের শিল্প-সিদ্ধি পৃথিবীর হাতে-গোনা গুটিকয়েক শ্রেষ্ঠ কবিকে বাদ দিলে ক’জনার চাইতেই-বা খাটো? প্রকৃতপক্ষে, কিশোরকিবতার যে বহু আরাধ্য, নিষ্ঠার সাধনায় এক বিশাল কল্পনা বৈভবের স্বপ্নীল জগৎ সেই কল্পনা যাকে স্পর্শ করে সে তো পৃথিবীর আর অন্য আট দশটা শিল্প মাধ্যমের স্রষ্টার মতোই এক শিল্পী; তার রচনার নাম শিল্প- যা অনুপম, অশ্রুতপূর্ব ও অপার্থিব। কবিতা, নাটক, কথাসাহিত্য, শিশুসাহিত্য এমনকি প্রবন্ধ- যা-ই তার হিরণ-ত্বকের স্পর্শ পায়, তাই সোনা হয়ে যায়। ছেঁড়াছাতা আর রাজছত্রের মতো, আকবর বাদশা আর হরিপদ কেরানির মতো, কবিতা আর শিশুকিশোরসাহিত্যের কোনো ভেদ মানতে নারাজ ক্ষণজন্মা আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদও। কল্পনার দীপ্তিতে সম্পন্ন হলে অন্যান্য শিল্প মাধ্যমের মতো কিশোরকবিতাও একইরকম চিরন্তন। গড়নে, অবয়বে, শিল্প-স্বভাবে ও ভেতরের তাগিদে কিশোরকবিতা আর কবিতা এক হয়েও পৃথক। দুজনেরই কারবারের মূল পুঁজি সেই দুই আদি অকৃত্রিম জিনিস : শব্দ ও ছন্দ। কবির মতো কিশোরকবিতার কবিকেও জীবনের কোনও একটা আবেগাশ্রিত বিষয়কে ধ্বনিময় চিত্রলোকের বিস্মিত বাসিন্দা করে তুলতে হয় কল্পনা ঐশ্বর্যের সমান স্বচ্ছলতা দিয়ে, কবিত্বেরই শক্তি দিয়ে। এখানে কি কেউ কারো চেয়ে কম? ‘লুকোচুরি’, ‘বীরপুরুষ’, ‘একদিন রাতে আমি’, ‘বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর’ রচনাগুলোয় রবীন্দ্র চিত্রজগৎ, ধ্বনিজগৎ বা ভাবনাজগৎ রচনার কল্পনায় কোনখানে কম তার কবিতার অন্য এলাকাগুলোর চেয়ে? নজরুলের ‘খুকু ও কাঠবেড়ালি’ কবিতায় শিশুমনের যে করুণ লুব্ধ অসহায়তা আর্ত হয়ে উঠেছে কবিতা প্রতিভার নিরিখে তাকে ক’টা কবিতার চেয়ে হীন বলা যাবে? সুকুমার রায়ের ‘ছায়াবাজি’তে যে কবিত্বের প্রমাণ মেলে বাংলাসাহিত্যে ক’টি কবিতা তার সমান মাপের? কিশোরকবিতার কবিকে ছড়াকার না বলে আমি বুদ্ধদেব বসু বা আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের অনুসরণে ‘কবি’ বলেই খুশি। মহাকাব্যের কবি, গীতিকবিতার কবি, প্রকৃতির কবি, প্রেমের কবি, সবাই যদি কবি হতে পারে, তবে কিশোরকবিতার কবি ‘কবি’ হতে আপত্তি কোথায়? আর তার কিশোর মনসংলগ্ন কবিতা কিশোরকবিতা হতেই-বা আপত্তি কি?

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় শতক পর্যন্ত, বিদগ্ধ পাঠকেরা ছন্দ ও মিলকে কবিতার একটি অভিন্ন ও অবধারিত বৈশিষ্ট্য হিসেবেই দেখেছেন এবং কবিতাকে প্রধানভাবেছন্দ-মিলবদ্ধ একটি সংগীতমধুর বক্তব্য মনে করেছেন। আধুনিক কবিতা যেহেতু অন্ত্যমিলের চেয়ে অর্ন্তমিল ও প্রাকৃত স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তের চেয়ে অক্ষরবৃত্ত ও গদ্যছন্দকেই প্রধান নিয়ামক করে নিয়েছে তাই কিশোরকবিতাকে আলাদা করে চেনা যায়। কিশোরকবিতা ছন্দান্ত্যমিলের সেই পুরানো বৃত্তে নবতর সৃষ্টিকে স্বাগত জানায় বিধায় আমরা বিন্দুবিসর্গ শঙ্কিত নয়, কেননা ছন্দের অন্তর্নিহিত সংগীতকে শক্তি ও সম্ভাবনার পরিপূর্ণতম বিকাশে উত্তীর্ণ করা ছন্দের সঙ্গে অন্ত্যমিলের পরিপূর্ণতম সহযোগের ফলেই সম্ভব। আমাদের বিশ্বাস, মিল দেয়ার ক্ষমতার উপর একজন কবির শক্তিমত্তার পরিচয় পাওয়া যায়। তাই কিশোরকবিতার কবিরা নিখুঁত নতুন মিলের বিষয়ে ওয়াকেবহাল। ছন্দ ও মিল দিয়ে ভালো কবিতা লেখা সম্ভব- এই দাবিকে কি উপেক্ষা করবেন কেউ? কিন্তু সমসাময়িক প্রতিভাবান তরুণ কবির, বড়োদের উপযোগী কবিতায়, লেখা পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায় যে তারা অন্য যে কোন ছন্দের তুলনায় গদ্য ছন্দে বেশি স্বাচ্ছন্দবোধ করেন। কিন্তু কিশোরকবিতার কবি যেহেতু প্রধানত স্বরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তে আস্থাবান তাই একটি রেখা এদুটোকে আলাদা করেই দেয়। প্রশ্ন হতে পারে, কিশোরকবিতার কবি কেন গদ্য ছন্দে বা অক্ষরবৃত্তে যান না। এর দুটি উত্তরের প্রথমটি হলো- অনেকে এই দুই ছন্দে শিশুকিশোরদের জন্য লিখেছেন, লিখছেন। দ্বিতীয় উত্তর- অক্ষরবৃত্ত বা গদ্য ছন্দের চাল লম্বা শ্বাসের চাল। কিশোররা একবারে একদমে যতোটুকু পড়তে পারেন বড়োরা তো তার চেয়ে ঢের পড়তে সক্ষম। শিশু-কিশোরদের উচ্চারণ স্বাচ্ছন্দের উপর লক্ষ রেখে যেভাবে কবিতার ভাষায় সারল্য নিয়ে আসা হয় তেমনি ছন্দের নমনীয়তার প্রয়োজনে দীর্ঘ গতিময় ছন্দ কিশোরকবিতার কবির অপছন্দ।

ছন্দান্ত্যমিলের মতো আধুনিককালে (১৮০০ সাল পরবর্তী) এসে কবিতায় আরও একটি পরিবর্তন ঘটছে- কাব্যভাষার পরিবর্তন। সুজিত সরকার সেটি বলেছেন এভাবে, “একটা সময় ছিল যখন কবিতার ভাষা ও মুখের ভাষার মধ্যে পার্থক্য ছিল।” কিন্তু এখন মুখের ভাষা ও কবিতার ভাষার মধ্যে সে পার্থক্য নেই। এই যে ‘পার্থক্য নেই’-এর সময় থেকে কিশোরকবিতার উত্থানপর্ব যে ক্রমশ চঞ্চল হয়ে উঠেছে তা আমাদের ইতোপূর্বের দীর্ঘ আলোচনা থেকে পরিষ্কার হওয়ার সুযোগ রয়েছে। কাব্যভাষায় পরিবর্তন আসায় বড়োদের কবিতার ভাব ও ভাষা এতাটাই ঘনীভূত হয়ে পড়েছে যে তা বয়ঃসন্ধিকাল পর্বের একজন কিশোরের উপলব্ধিতে ধরা পড়ে না বা কবিতার মর্ম উদ্ধারে সে অক্ষম হয়ে পড়ে। অন্যদিকে সে ছড়ার হালকা চালের চটুল শব্দের বুননে ছন্দময় রচনার চেয়ে বেশি কিছু চায়। এই দুইকে তাই ফেঁড়ে নতুন কিছুর সন্ধান পেতে সে যে কিশোরকবিতার প্রতি পা বাড়াবেন একথা তো কিশোরকবিতার কবির বহু পূর্বেই জানা। তাই এই কবি তার উপযোগী করে কিশোর মনসংলগ্ন কবিতায় ব্রত হয়েছেন- এ অত্যন্ত আনন্দের সংবাদ, অথচ কিনা তা নিয়ে কারো কারো এই সেই প্রশ্নের তুড়িতে ‘নাই’ হয়ে যেতে হয় কিশোরকবিতার কবিকে।

কিশোরকবিতা রচনা সময়ের দাবি। যথা সময়ে যথযোগ্য পুষ্টির অভাবে বাড়ন্ত কিশোরের যেমন ঠিকঠাক শারীরিক বিকাশে বাঁধা পেতে হয় তেমনি কিশোরবেলায় কিশোর মনসংলগ্ন কবিতাও তাকে মানসিক বিকাশে করে তুলতে পারে বলিষ্ঠ। শিল্পের উদ্দেশ্য যদি হয় আনন্দ দান তবে একথা কি আবন্তর যে কিশোরকে আধুনিক কবিতার অযুতগুণ সমৃদ্ধ কঠিন কিছু দিলে সে মানসিক আনন্দ পাবে? বরং কবিতা বিমুখিতা ঘটবে অচিরেই। কিশোরকবিতা সেই যায়গাটি করে নিয়েছে বাংলার কিশোরমনে। সুতরাং একে উপেক্ষা করা আমাদের আগামী, আমাদের ভবিষ্যৎ, কিশোরসত্তাকে অস্বীকারের সামীল। তবে এও মনে রাখা আবশ্যকীয় যে, কিশোরকবিতাকে শেষবধি কবিতাই হতে হবে। হালকা চালে ছন্দান্ত্যমিলের শরীরে কোন পদ্যকে কিশোরকবিতা বলা জ্ঞানহীনতা; আবার ভালো একটি পদ্যও- হুমায়ুন আজাদের ভাষায়- অনেক দামী। কিশোরকবিতাকে সবকিছু চাপিয়ে শুধু কিশোরদের মনে ব্যঞ্জনা সৃষ্টির মাধ্যমে সার্থকতা খুঁজলেও প্রকৃত সার্থক কিশোরকবিতা সেটিই যা বয়স নির্বিশেষে সকলকে অনির্বচনীয় রস জোগাতে সক্ষম।

মন্তব্য ১ টি রেটিং +১/-০

মন্তব্য (১) মন্তব্য লিখুন

১| ২২ শে মে, ২০১৭ রাত ১২:৩৪

সালমান মাহফুজ বলেছেন: কিশোরকবিতাকে সবকিছু চাপিয়ে শুধু কিশোরদের মনে ব্যঞ্জনা সৃষ্টির মাধ্যমে সার্থকতা খুঁজলেও প্রকৃত সার্থক কিশোরকবিতা সেটিই যা বয়স নির্বিশেষে সকলকে অনির্বচনীয় রস জোগাতে সক্ষম। - লাইকড্‌ !

আপনার মন্তব্য লিখুনঃ

মন্তব্য করতে লগ ইন করুন

আলোচিত ব্লগ


full version

©somewhere in net ltd.