| নির্বাচিত পোস্ট | লগইন | রেজিস্ট্রেশন করুন | রিফ্রেস |
ভেনিজুয়েলার সাবেক অর্থমন্ত্রী ময়সেস নাইম। এখন কাজ করছেন পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক গবেষণাপ্রতিষ্ঠান কার্নেগি এনডোমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল পিসের বিশেষজ্ঞ হিসেবে। আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ও রাজনীতি বিষয়ে তার কলাম ছাপা হয় স্পেন, ইতালি ও লাতিন আমেরিকার নামি সব খবরের কাগজে। ফরেন পলিসি সাময়িকীর এডিটর-ইন-চিফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘ ১৪ বছর। অলঙ্কৃত করেছিলেন বিশ্বব্যাংকের নির্বাহী পরিচালকের পদও। সম্প্রতি প্রকাশিত হলো ক্ষমতার বিষয়ে তার নতুন বই ‘দ্য এন্ড অব পাওয়ার: ফ্রম বোর্ডরুম টু ব্যাটলফিল্ড’। এ বইয়ে ক্ষমতা সম্পর্কে তার মতামতের সারবস্তু তুলে ধরেছে ইকোনমিস্ট—
আপনার মতে ক্ষমতা পরিবর্তন হয়েছে, কীভাবে?
ক্ষমতা নশ্বর, ক্ষণস্থায়ী ও বিস্মৃতিপ্রবণ। এখন যারা নানা ক্ষেত্রে ক্ষমতায় আছেন, তাদের পূর্বসূরিদের মতো দীর্ঘদিন টিকে থাকার সম্ভাবনা কম। ক্ষমতা বলতে সামরিক, ব্যবসায়িক, রাজনীতি ও ধর্মীয় কর্তৃত্বের কথা বোঝাতে চাইছি আমি। ক্ষমতার হাতবদলের বিষয়টি বেশি ঘটছে বিশ্ববাণিজ্যের ক্ষেত্রে। দিন দিন গুটিকয়েক প্রতিষ্ঠানের হাতেই কুক্ষিগত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য। আবার অল্প সময়ের মধ্যেই পাল্টে যাচ্ছে দৃশ্যপট। নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় জানা যায়, কোনো খাতের একটি শীর্ষ কোম্পানির মুনাফা প্রবৃদ্ধি পাঁচ বছরে নেমে আসে অর্ধেকে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা হুটহাট করেই চাকরিচ্যুত হচ্ছেন। আর শীর্ষপর্যায়ের নির্বাহীদের অবস্থা আরো নাজুক।
কেন?
এখন সবখানে প্রতিযোগিতা। ব্যবসার ধরনেও আসছে পরিবর্তন। আপনি জানেন না, কখন প্রতিষ্ঠানটি আপনাকে হটাতে যাচ্ছে। গত শতকের সত্তরের দশকের মনোপলি (একচেটিয়া বাজার দখলকারী) প্রতিষ্ঠান কোডাকের কথা ধরুন, সম্প্রতি তারা দেউলিয়া হয়ে গেল। অথচ প্রায় একই সময়ে মাত্র ১৩ কর্মীর কোম্পানি স্মার্টফোন অ্যাপ ইনস্ট্যাগ্রাম বিক্রি হলো ১০০ কোটি ডলারে!
কোডাক কখনই চিন্তা করতে পারেনি যে, প্রতিদ্বন্দ্বী একটি প্রতিষ্ঠানের আকার এত ছোট হতে পারে। এখন চ্যালেঞ্জ ও প্রতিযোগিতার আবির্ভাবের উত্স অভাবনীয়। দুই দশক আগে একটি ব্র্যান্ড তাদের বাজার হারানোর ঝুঁকি ছিল ২০ শতাংশ। এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ শতাংশে।
এজন্য কি তথ্যপ্রযুক্তি দায়ী?
না। মূল কথা হচ্ছে, এখন ক্ষমতা অর্জন করা সহজ। মানুষের স্বভাবে গঠনমূলক পরিবর্তন আসায় এখন ক্ষমতা অর্জন করা সহজ, তবে তা ব্যবহার করা কঠিন। জনসংখ্যার বিবেচনায় আমরা কোথায় ও কীভাবে থাকি, তা গুরুত্বপূর্ণ। ছোট শক্তিগুলো চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে, এগুলোই বড় শক্তির লাগাম টেনে ধরছে।
আমি এ কথা বলছি না যে, পাহাড় থেকে ছুটে আসা কিছু গেরিলা পেন্টাগনের বিরুদ্ধে হামলা চালিয়ে বিশাল পরিবর্তন বয়ে আনবে। কিন্তু আমার মতে, গেরিলারা অন্তত পেন্টাগনের জয়যাত্রাকে বুড়ো আঙুল দেখাতে পারে।
অসম প্রতিযোগিতার বিষয়ে হার্ভার্ডের পণ্ডিত ইভান অ্যারেগুইনের গবেষণায় দেখা যায়, ১৮০০ থেকে ১৯৪৯ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দ্বন্দ্বে ছোট শক্তিগুলো জয়লাভ করে ১২ শতাংশ সময়। কিন্তু ১৯৫০-১৯৯৮ পর্যন্ত তারাই জেতে ৫৫ শতাংশ সময়ে। এডেন উপসাগরের জলদস্যুরা সাধারণ বোট ও কালাশনিকভ নিয়ে অত্যাধুনিক প্রযুক্তির জাহাজ কব্জা করে নিচ্ছে। আরেকটি উদাহরণ হতে পারে তালেবানরা, যারা ছোট একটি বাহিনী সত্ত্বেও বড়দের ঘুম হারাম করছে।
কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে? ১৯৫০ সালের আগে ছোট শক্তিগুলো সফল হতো না কেন?
এখন পরিবর্তন এসেছে। ক্ষমতাশালীদের প্রধান বর্ম হওয়ার কথা তাদের অর্থ, প্রযুক্তি ও নিজের আওতা। পরিবর্তনের স্রোতে এ বর্মগুলো এখন দুর্বল হয়ে পড়েছে। এখন গতিশীলতা, মানসিকতায় পরিবর্তনের পাশাপাশি সবকিছুতে ‘আরো বেশি’ বিপ্লব ঘটছে।
সবকিছুই এখন বেশি বেশি। পৃথিবীর জনসংখ্যা বেড়েছে। গত দুই দশকে বেড়েছে ২০০ কোটি। তরুণ ও শহুরে লোকের সংখ্যা বেড়েছে। প্রতি বছর সাড়ে ৬ কোটি মানুষ শহরে পাড়ি জমাচ্ছে। অর্ধেকেরও বেশি মানুষ এখন শহুরে পরিবেশে বাস করে। আগের তুলনায় বেড়েছে অস্ত্রের ঝনঝনানি, বেড়েছে ওষুধ, রাজনৈতিক দল, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, এনজিও, ধর্ম ও যোগাযোগমাধ্যম। পৃথিবীজুড়ে বেড়েছে অর্থের পরিমাণও। বিশ্ব-অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি বেড়েছে পাঁচ গুণ আর মাথাপিছু আয় বেড়েছে সাড়ে তিন গুণ।
মানুষের জীবনে গতিশীলতাও বেড়েছে। এটা আরেক বিপ্লব। জাতিসংঘের হিসাবে, নিজ দেশের বাইরে থাকে ৩৭ শতাংশ মানুষ। এতে তাদের শাসন করা কঠিন। এজন্যই পোলিশ রাজনীতি বিজ্ঞানী জিবিগনিউ ব্রিজনস্কি মন্তব্য করেন, এক মিলিয়ন মানুষকে একসঙ্গে নিয়ন্ত্রণ করার চেয়ে তাদের হত্যা করা সহজ।
এসব পরিবর্তন এখন মানসিকতায় পরিবর্তন এনেছে। এটা মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লব। ভারতে তালাকের ঘটনা বাড়ছে। এর অধিকাংশ ক্ষেত্রেই সিদ্ধান্ত দিচ্ছেন নারীরা। তারা এখন আগের চেয়ে অর্থশালী, শিক্ষিত। কাজেই তাদের আর একতরফা দমিয়ে রাখার সুযোগ নেই।
সাংস্কৃতিক খাতের এ পরিবর্তনের কথা ফুটে উঠেছে বিশ্বমূল্যবোধ জরিপেও। এতে দেখা যায়, দিন দিন আমাদের সমাজে মুক্ত আলোচনা, লিঙ্গসমতা ও ভিন্ন মতে সহিষ্ণুতা বেড়েছে।
এটা কি ভালো?
যা ঘটছে তাকে আমি অভিনন্দন জানাই। স্বৈরশাসক, একচেটিয়ার বাজারের কর্তৃত্বকারী ও কর্তৃত্বপ্রিয় সরকারের যেমন খুশি তেমন করার সুযোগ কমে আসছে। আমার কাছে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ যে, এ উত্সগুলো এক ধরনের পক্ষাঘাত তৈরি করছে। ইতালির কথাই ধরুন, দেশটির কেন্দ্রীয় শাসন সবসময়ই দুর্বল ছিল। আর সাম্প্রতিক নির্বাচনে তা আরো জোরালো হয়ে উঠেছে। এখন জনমত এতটাই বিভক্ত যে, এককভাবে কোনো দল সরকার গঠন করতে পারছে না। এখন আসুন সিরিয়ার দিকে। দুনিয়াবাসী জানে, দেশটির চলমান পরিস্থিতির নিরসন দরকার। কিন্তু তা করার ক্ষমতা তাদের নেই। বর্তমানে ওইসিডির ৩৪ দেশের ৩০টির রাষ্ট্রপ্রধানকে পার্লামেন্টের মাধ্যমে বিরোধী দল বাধা দিতে পারে।
আচ্ছা, আপনি ক্ষমতা পেলে কি আঁকড়ে থাকবেন?
ব্যবসায় সফলতা পেতে হলে আপনাকে সংকল্প নিয়ে গভীরভাবে ডুবে থাকতে হবে। তবে সচেতনও থাকতে হবে, পাছে সম্পর্কিত ছোটখাটো বিষয়গুলোও যেন আপনার চিন্তাভাবনা থেকে ঝিমিয়ে না পড়ে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউইয়র্ক টাইমস ও ওয়াশিংটন পোস্ট কখনই চিন্তা করতে পারেনি, অনলাইন জায়ান্ট গুগল ও ক্রেইগলিস্ট যে তাদের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে। এমন পরিস্থিতির কথা চিন্তা করুন, যেখানে সবারই কমবেশি ক্ষমতা আছে, সবাই ভেটো দিতে পারে, কিন্তু কেউ একতরফা সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে পারে না। তাহলে নিশ্চিত থাকুন পরিস্থিতি নিরাপদ নয়। অর্থনৈতিক মন্দার সময়ও উন্নতির ধারায়ই হেঁটেছে বার্কলেস। অথচ ক্রান্তিকালে নেতৃত্ব দেয়া বব ডায়মন্ড তার চাকরিটা হারান। ১৯৭৭ সালে বিশ্বে স্বৈরশাসক ছিলেন ৮৯ জন আর এখন আছেন মাত্র ২৩ জন। কাজেই এটা বলা যায় যে, পৃথিবীটা এখন আর কর্তৃত্ববাদীদের স্বর্গরাজ্য নয়।
©somewhere in net ltd.